শিরোনাম

ফেব্রুয়ারিতে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ১০, গণপিটুনিতে ১৯

নিজস্ব প্রতিবেদক
ফেব্রুয়ারিতে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ১০, গণপিটুনিতে ১৯
ছবি: সংগৃহীত

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে সারা দেশে রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতায় ১০ জন নিহত এবং অন্তত ১ হাজার ৯৩৩ জন আহত হয়েছেন। দলীয় কোন্দল, অভ্যন্তরীণ বিরোধ, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ এবং নানা রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের জেরে এই হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।

এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। মঙ্গলবার (৩ মার্চ) গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারিতে অন্তত ৩৪৬টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ১০ জন নিহত এবং কমপক্ষে ১ হাজার ৯৩৩ জন আহত হয়েছেন। জানুয়ারির তুলনায় ফেব্রুয়ারিতে সহিংসতা ও হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে। জানুয়ারিতে ১৫১টি ঘটনায় ৮ জন নিহত ও ১ হাজার ২৩৩ জন আহত হয়েছিলেন।

৩৪৬টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে কেন্দ্র করে ৯৫টি ঘটনায় ৫৯৯ জন আহত এবং ৮ জন নিহত হন। বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে ১৯১টি ঘটনায় ৯৯৮ জন আহত ও ১ জন নিহত হন। এছাড়া বিএনপি-আওয়ামী লীগ সংঘর্ষে ৯টি ঘটনায় ২৭ জন আহত এবং ১ জন নিহত হন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, জাতীয় নির্বাচন ঘিরে উত্তেজনা, সমাবেশকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, প্রার্থীর সমর্থকদের দ্বন্দ্ব, হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও চাঁদাবাজির কারণেই অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।

সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বস্তরে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। তিনি সতর্ক করে বলেন, নির্বাচনী সহিংসতা, গণপিটুনি, হেফাজতে মৃত্যু ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ অব্যাহত থাকলে মানবাধিকার পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।

তিনি সরকারের প্রতি আরও জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সক্রিয় ভূমিকার প্রত্যাশা করেন।

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোট ৩৪৬টি সহিংস ঘটনার মধ্যে অন্তত ২৮৫টি ছিল নির্বাচন সংশ্লিষ্ট। এসব ঘটনায় ১ হাজার ৫৫৫ জন আহত এবং ৫ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে বিএনপির ৩ জন, আওয়ামী লীগের ১ জন এবং জামায়াতের ১ জন রয়েছেন। নির্বাচন-পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে ৪৫০টির বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর ও নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, এ মাসে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৩০টির বেশি মামলা দায়ের হয়েছে। এসব মামলায় ৪৯৭ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং ১৪ হাজার ৭৮৭ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। রাজনৈতিক মামলায় আওয়ামী লীগের ৯৮ জন, বিএনপির ১৮১ জন এবং জামায়াতের ৫০ জনসহ মোট ৩৩৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযানে প্রায় ৩ হাজার ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এদিকে ফেব্রুয়ারিতে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির অন্তত ৪২টি ঘটনায় ১৯ জন নিহত এবং ৩০ জন আহত হয়েছেন। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, ধর্মীয় অবমাননা ও আধিপত্য বিস্তারসহ বিভিন্ন অভিযোগকে কেন্দ্র করে এসব ঘটনা ঘটেছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারিতে ২৮টি হামলার ঘটনায় ৬৩ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৫৫ জন আহত, ১ জন লাঞ্ছিত, ৪ জন হুমকির সম্মুখীন এবং ১ জনকে আটক করা হয়েছে।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ৬টি সভা-সমাবেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাধা দিয়েছে। এতে ৯২ জনের বেশি ব্যক্তি আহত হন।

এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্যাতন ও কথিত বন্দুকযুদ্ধে ২ জন নিহত হওয়ার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। গুলশান লেকে ঝাঁপ দিয়ে ১ জন এবং নির্বাচনের দিন ধাওয়া খেয়ে আরও ১ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানানো হয়। কারাগারে সাবেক এক মন্ত্রীসহ মোট ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে ১০ জন কয়েদি ও ২ জন হাজতি ছিলেন।

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর ১৪টি হামলায় ১৫ জন আহত হয়েছেন। এসব হামলায় ৩টি মন্দির, ১টি প্রতিমা ও ১১টি বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সীমান্ত সহিংসতার ঘটনায় ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ৩টি ঘটনায় ৬ জন নিহত ও ৯ জন আটক হন। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে ২টি ঘটনায় ৫ জন আটক হওয়ার তথ্য দেওয়া হয়েছে। টেকনাফ সীমান্তে গুলিবিদ্ধ হয়ে এক শিশুর মৃত্যুর কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, শ্রমিক নির্যাতনের ৩৩টি ঘটনায় ৫ জন নিহত এবং ১২৩ জন আহত হয়েছেন। কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন আরও ২০ শ্রমিক। গৃহপরিচারিকা হত্যার একটি ঘটনাও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।

নারী ও শিশু নির্যাতনের চিত্রকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারিতে ২৩৬ জন নারী ও কন্যাশিশু সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৪৫ জন ধর্ষণের, ১০ জন গণধর্ষণের এবং ৩ জন ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হন। পারিবারিক সহিংসতায় ৪১ জন নিহত, ২৬ জন আহত এবং ৩০ জন আত্মহত্যা করেছেন। এছাড়া ৯৫ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যাদের মধ্যে ৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।

/জেএইচ/