শিরোনাম

জুলাই সনদের কথা জাতি কখনো ভুলবে না: প্রধান উপদেষ্টা

নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাই সনদের কথা জাতি কখনো ভুলবে না: প্রধান উপদেষ্টা
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস (ছবি:সংগৃহীত)

জাতির উদ্দেশে শেষ ভাষণ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ভাষণে তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের ছোট বড় অনেক কথা ভুলে গেলেও জুলাই সনদের কথা জাতি কখনো ভুলবে না। এই সনদ রচনা এবং গণভেটে পাশ করানোর জন্য আমি সকল রাজনৈতিক দল সামাজিক সংগঠন অধিকার রক্ষা প্রতিষ্ঠান যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন তাদের সবাইকে আজ অভিনন্দন জানাচ্ছি।’

সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) রাত ৯টা ১৫ মিনিটে প্রধান উপদেষ্টা জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রথম কাজ ছিল দেশকে সচল করা। এটা ছিল সবচাইতে কঠিন কাজ।’ এই ভাষণে তিনি সবার কাছে বিদায় চেয়ে বলেছেন, ‘১৮ মাস পর এখন আমার যাওয়ার পালা। আমি আজ আমার কাজ হতে বিদায় নিতে আপনাদের সামনে এসেছি।’

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন স্বরণীয় হয়ে থাকবে উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘গণভোট অনুষ্ঠান হলো। এই নির্বাচনে উৎসবমুখর পরিবেশ, দেশের সর্বত্র একটা ঈদের পরিবেশ ছিল যা আমাদের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’

নির্বাচনকে প্রধান উপদেষ্টা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং এই নির্বাচনে যারা জয়ী হয়েছেন তাদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে যারা জয়ী হয়েছেন তাদের আমি অভিনন্দন জানাচ্ছি। যারা পরাজিত হয়েছেন তাদেরকেও আমি অভিনন্দন জানাচ্ছি। হার-জিতই হলো গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। যারা জয়ী হয়েছেন তারা মোট ভোটের প্রায় অর্ধেক পেয়েছেন। যারা জয়ী হতে পারেননি তারা মোট ভোটের অর্ধেক পেয়েছেন। যারা জয়ী হতে পারেননি তারা এই জেনে আশ্বস্ত হবেন যে প্রায় অর্ধেক ভোটার আপনাদের উপর আস্থা রেখেছে। আগামী দিন (মঙ্গলবার) নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। এর মাধ্যমে আমাদের ১৮ মাসের দায়িত্বের সমাপ্তি হবে।’

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘সবাইকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। দীর্ঘ ১৭ বছর পর একটি উৎসবমুখর, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য। এই নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ, ভোটার, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সম্মিলিতভাবে একটি প্রশংসনীয় নজির সৃষ্টি করেছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নির্বাচন কেমন হওয়া উচিত-এই নির্বাচন তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে থাকবে।’

তিনি বলেন, চব্বিশের জুলাই মাসে বাংলাদেশের মানুষ এক অভূতপূর্ব অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তাদের মুক্তি, আকাঙ্ক্ষা ও মর্যাদার দাবি উচ্চারণ করেছিল। সেই সময় দেশ একটি গভীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও মানবিক সংকটে নিপতিত ছিল। রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল, গণতন্ত্র হয়েছিল ধুলিস্যাৎ, ভবিষ্যৎ ছিল অনিশ্চিত। ঠিক সেই সংকটময় সময়ে আমাকে আহ্বান জানানো হয়েছিল-একটি লক্ষ্য সামনে রেখে। বাংলাদেশকে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর জন্য তিনটি দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। সংস্কার, বিচার এবং নির্বাচন।

১৮ মাসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাজের মূল্যায়ন জনগণের ওপর ছেড়ে দিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, 'আমি ও আমার সহকর্মীরা-সবাই আমরা সেই অঙ্গীকার রক্ষার চেষ্টা করে গেছি। কোথায় কতটুকু সাফল্য অর্জন করতে পেরেছি, কোথায় ব্যর্থ হয়েছি সে বিচারের ভার আপনাদের ওপর থাকলো। আমাদের প্রচেষ্টায় কোনো ঘাটতি ছিল না। আমরা মানবতাবিরোধী অপরাধ, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিচার প্রক্রিয়াকে রাজনীতি ও প্রতিশোধের ঊর্ধ্বে রেখেছি। আমরা ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক, আর্থিক সংস্কারে হাত দিয়েছি—যাতে ভবিষ্যতে কোনো সরকার জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিজেকে স্থাপন করতে না পারে। আর সর্বোপরি, আমরা একটি উৎসবমুখর, অবাধ, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ, পরিচ্ছন্ন ও বিশ্বাসযোগ্য জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করেছি, যার মাধ্যমে জনগণ আবার তাদের ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছে।'

ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘প্রিয় দেশবাসী চব্বিশের গণঅভুত্থানের সময় দেয়ালে দেয়ালে তরুণরা যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন একেছিল তার কেন্দ্র ছিল প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় ১৩০টি নতুন আইন ও সংশোধনী প্রণয়ন করেছে এবং প্রায় ৬০০ নির্বাহী আদেশ জারি করেছে। যার প্রায় ৮৪ শতাংশ ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। এই সংস্কার সমূহ নাগরিক অধিকারকে সংগত করেছে বিচার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছে এবং গুম খুন ও বিচারগ্রহীভূত হত্যার সংস্কৃতি যেন আর কখনো ফিরে না আসে সেটা নিশ্চিত করেছে।’

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত ভঙ্গুর। পুলিশ ও জনগণের মধ্যে আস্থার বদলে ভয় তৈরি হয়েছিল। ধাপে ধাপে আমরা সে অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়েছি আজ পুলিশ আর মরণাস্ত ব্যবহার করে না। কাউকে তুলে নিয়ে যায় না। পুলিশ ও গোয়েন্দা বাহিনীর ভয়ে কাউকে ডিলিট বাটন চাপতে হয় না। জনবান্ধব ও জবাবদিহীমূলক বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫ প্রণয়ন করা হয়েছে। বিচার বিভাগকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করতে পৃথক সচিবালয় গঠন বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছ কাঠামো এবং দেওয়ানী ফজদারিয়ানী যুগান্তকারী সংস্কার করা হয়েছে। গুমকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল আইন সংশোধন করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘স্বৈরাচারের ১৬ বছরে এদেশের রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা যে ভয়াবহ নিপীড়ন, মামলা-হামলা, হত্যার শিকার হয়েছেন তা আমাদের জাতির জন্য এক গভীর বেতনাদায়ক শিক্ষা। এ অভিজ্ঞতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যাতে ভবিষ্যতে আর কখনো ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠিত না হয়।’

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘প্রিয় দেশবাসী, ফ্যাসিস্ট সরকারের ১৬ বছরের নিপীড়ন ও জুলাইয়ের রক্তাক্ত স্মৃতি এখনো আমাদের মাঝে তাজা হয়ে আছে যারা ভয়াবহ নিপীড়নের নির্যাতন চালিয়েছে তাদের বিচার করা এবং যেন আর কেউ এ ধরনের দুঃশাসন কায়েম করতে না পারে সেটা নিশ্চিত করা আমাদের মূল দায়িত্ব। বিচার একটা চলমান প্রক্রিয়া। একাধিক ট্রাইবুনাল বর্তমানে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। ইতিমধ্যে একাধিক মামলার রায় ঘোষণা হয়েছে।’

পোস্টাল ব্যালটে ভোটের বিষয়টি সামনে এনে ইউনূস বলেন ‘এই নির্বাচনে প্রথমবারের মতো প্রবাসীদের ভোট দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। যখন একজন ভোটার গর্ব হয়ে এই নির্বাচনে গণভোটে ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলে তখন একজন নাগরিক হিসেবে আমি আনন্দ ধরে রাখতে পারিনি। আমি আশা করি এই প্রক্রিয়া ভবিষ্যতে আরও অনেক বেশি প্রবাসীরা নিশ্চিন্তে অংশগ্রহণ করতে পারবে।’

বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের কথা উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, ‘প্রিয় দেশবাসী আমরা দায়িত্ব গ্রহণের সময় অর্থনীতি ছিল বিপর্যস্ত। ব্যাংকিং ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছিল। অর্থপাচার ছিল লাগামহীন। আমরা রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, ক্রয়নীতি, মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাতে কাঠামোগত সংস্কার এনেছি। তলাবিহীন অর্থনীতি আমাদের জন্য রেখে গিয়েছিল আগের ফ্যাসিবাদী সরকার। কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বাণিজ্য ব্যাংককে খতম করে নিয়ে গেছে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার। যাবার সময় স্বস্তি পাচ্ছি যে আমরা অবস্থান মোকাবেলা করতে পেরেছি এবং নতুন অর্থ বুনিয়াদ রচনা করে রেখে যেতে পারছি। আমাদের রিজার্ভের পরিমাণ এখন ৩৪ বিলিয়ন ডলার। আমাদের দেশপ্রেমিক প্রবাসী ভাই বোনদের রেমিটেন্সের টাকায় এই রিজার্ভ ক্রমেই বাড়ছে।’

মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, এই নির্বাচন কেবল একটি ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়, এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নতুন অভিযাত্রার সূচনা; নতুন বাংলাদেশের জন্ম।

/বিবি/