শিরোনাম
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র

বদলে দেবে বাংলাদেশের জ্বালানি খাত, উদ্বুদ্ধ করবে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে

সিজেডএন  ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
বদলে দেবে বাংলাদেশের জ্বালানি খাত, উদ্বুদ্ধ করবে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। ছবি: সংগৃহীত

২০১১ সালের কথা। জাপানের ওকুমায় ফুকুশিমা দাইচি পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ভয়ংকর এক দুর্ঘটনা ঘটেছিল। সেই দুর্ঘটনার পর নিরাপত্তা ঝুঁকি আর অতিরিক্ত ব্যয় বিবেচনা করে বিশ্বজুড়ে পারমানবিক শক্তির প্রতি এক ধরনের অনীহা তৈরি হয়েছিল। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও পরিবহন ব্যবস্থার বিদ্যুতায়নের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা আকস্মিকভাবে বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর সঙ্গে কার্বণ নিঃসরণ কমানোর প্রয়োজনীয়তা মিলে পারমানবিক শক্তির প্রতি নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

সেই আগ্রহের পথ ধরেই বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলের রূপপুর এলাকায় পদ্মা নদীর তীরে গড়ে তোলা হয়েছে পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ পুরোপুরি শেষ হবে ২০২৮ সালে। কাজ শেষ হওয়ার পর রাশিয়ার নকশায় নির্মিত দুটি চুল্লি দেশের মোট বিদ্যুতের ১৫ শতাংশ সরবারহ করতে সক্ষম হবে।

শিল্পায়নের পথে এগিয়ে চলা বাংলাদেশের অর্থনীতির চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রে এই প্রকল্পকে সাহসী এক পদক্ষেপই বলা যায়। বিষয়টি বিশ্বজুড়ে অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোরও নজর কেড়েছে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে পারমাণবিক শক্তি বেশি গুরুত্বপূর্ণ জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং ইরান যুদ্ধের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত বাহ্যিক ধাক্কায় অর্থনীতির ঝুঁকি হ্রাস করার জন্য। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাতের কারণে পারস্য উপসাগর থেকে তেল ও গ্যাস রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশের পেট্রল পাম্পগুলোতে যানবাহনের লম্বা সারি নিয়মিত দৃশ্যে পরিণত হয়েছিল। গ্রামীণ এলাকার মানুষকে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকতে হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিভিন্ন কল-কারখানার উৎপাদন।

রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে ‘ফুয়েল লোডিং’ শুরু
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। ছবি: সংগৃহীত

২৪০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম এ প্রকল্প বাস্তবায়নে এক দশকেরও বেশি সময় লেগেছে। এ সময়ে করোনামহামারি, ইউক্রেনে রুশ আক্রমণ এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতসহ একাধিক বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা গেছে। এসব ঘটনা আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কৌশলকে সমর্থন করলেও রূপপুর প্রকল্প চালুর মূল সময়সীমা অতিক্রম করে যায়। প্রকল্পটি মূলত ২০২৩ সালে চালু করার কথা ছিল।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার আসে বাংলাদেশে। সেই থেকে রূপপুর প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর। কেন্দ্রটির পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড জানিয়েছে প্রথম চুল্লিটি ২০২৭ সালের শুরুতে পুরোপুরি চালু হওয়ার কথা রয়েছে এবং দ্বিতীয়টি এর এক বছর পরে চালু হবে।

তবে অন্যান্য উন্নয়নশীল অর্থনীতির মতো বাংলাদেশও দেখেছে যে পারমাণবিক প্রকল্পের ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে। রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত্ব প্রতিষ্ঠান রোসাটমের সঙ্গে প্রধান চুক্তি অনুযায়ী, প্রথম কয়েক বছরের জ্বালানিসহ কেন্দ্রটির ব্যয় প্রায় ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার। ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় এই ব্যয় আরও বাড়ছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি ব্যবহার শুরু হচ্ছে আজ (1)
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। ছবি: সংগৃহীত

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করা গেলে বাড়তি এই ব্যয় এড়ানো সম্ভব হতো। তবে প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহের নিশ্চয়তা, সরবরাহ শৃঙ্খলের সংকট থেকে সুরক্ষা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বিবেচনা করলে এটা সাশ্রয়ী একটি প্রকল্প হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হবে।

জ্বালানি খাতে ভবিষ্যতের ধাক্কা মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হিসেবে বাংলাদেশ এখন ছোট মডুলার রিয়্যাক্টর (এসএমআর) নিয়ে কাজ করছে এবং রোলস-রয়েস হোল্ডিংস পিএলসি ও চীনের বিভিন্ন নির্মাতাসহ সম্ভাব্য সরবরাহকারীদের সঙ্গে প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনা চালাচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিষয়ক মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।

পারমাণবিক শক্তির সুবিধা হলো এটি কার্বন-সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য এবং ধারাবাহিক বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। ফলে জ্বালানি রূপান্তরের সময় সৌর ও বায়ুশক্তির মতো অনিয়মিত নবায়নযোগ্য উৎসের সঙ্গে এটি একটি আদর্শ বেসলোড বিদ্যুৎ উৎস হিসেবে কাজ করতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে রূপপুর প্রকল্পের ফলে আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরে বাংলাদেশকে নতুন কোনো বেসলোড বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে না। ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির স্থাপনা দ্রুত বাড়ানো এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার আধুনিকায়নে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে।

পারমানবিক শক্তি নিয়ে কাজ করা অনেকেই মনে করেন, বাংলাদেশের মতো অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশও একইভাবে উদ্বুদ্ধ হতে পারে। পারমাণবিক শক্তিকে আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে দেখার প্রবণতাও এ নিয়ে বাড়তি আগ্রহ সৃষ্টি করছে। তবে একটি পারমাণবিক কেন্দ্র টেকসইভাবে পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবল, বিশ্বাসযোগ্য ও স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ব্যাপক জনসমর্থন এবং ব্যবহৃত জ্বালানি ব্যবস্থাপনার কার্যকর ব্যবস্থা আগে নিশ্চিত করতে হবে।

আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো প্রযুক্তি কেনার ক্ষেত্রে বিকল্পের স্বল্পতা। কারণ এ ধরনের চুক্তির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক জড়িত থাকে। বৈশ্বিক পারমাণবিক প্রযুক্তির বাজার নিয়ন্ত্রণ করে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ হাতে গোনা কয়েকটি দেশ, যারা সীমিত সংখ্যক রিয়্যাক্টর প্রযুক্তি ব্যবহার করে।

ওয়ার্ল্ড নিউক্লিয়ার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে নির্মাণাধীন ৮০টি পারমাণবিক চুল্লির অধিকাংশই এশিয়ায় এবং এর বেশির ভাগই চীন ও রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে। এই দুই দেশ তাদের বিদ্যমান প্রযুক্তির পাশাপাশি এখনো পরিপক্ব না হওয়া প্রযুক্তিও জোরালোভাবে প্রচার করছে, যাতে আগ্রহ বাড়ে এবং তাদের ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তৃত হয়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশি দেশগুলোর অগ্রগতিও পারমাণবিক শক্তির প্রতি আগ্রহ বাড়িয়েছে।

ভারত ২০৪৭ সালের মধ্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ১১ গুণ বাড়িয়ে ১০০ গিগাওয়াটে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছে।

/আরএ/