শিরোনাম

আশার নির্বাচনে সহিংসতার কালো ছায়া

বিশেষ প্রতিনিধি
আশার নির্বাচনে সহিংসতার কালো ছায়া
পটুয়াখালী-২ আসনের বাউফল উপজেলার চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নে সংঘর্ষের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থান। (ছবি: সংগৃহীত)

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আছে মাত্র দুই দিন। শেষ মুহূর্তের প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ত প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকেরা। তবে নির্বাচনের দিন যতই এগিয়ে আসছে সহিংসতা ততই বাড়ছে।

সরকারি পরিসংখ্যানই বলছে, তফসিল ঘোষণার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনায় পাঁচজন নিহত এবং পাঁচ শতাধিক আহত হয়েছে। তবে বেসরকারি হিসাবে এবারের নির্বাচন ঘিরে নিহতের সংখ্যা আরও বেশি।

সহিংসতার চিত্র

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১১ ডিসেম্বর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার ৩৬ দিনের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর ১৫ জন নেতা ও কর্মী নিহত হয়েছেন। নির্বাচন ঘিরে সহিংসতার ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ ও নাগরিক সমাজ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।

জানুয়ারি মাসের তথ্য বিশ্লেষণ করে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) জানিয়েছে, জানুয়ারি মাসজুড়ে সহিংসতার মাত্রা ছিল ঊর্ধ্বমুখী। এর মধ্যে ১ থেকে ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত আটটি সহিংস ঘটনায় পাঁচজন নিহত এবং ২৬ জন আহত, ১১ থেকে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত ১০ দিনে ১৮টি ঘটনায় দুইজন নিহত এবং ১৭৬ জন আহত এবং ২১ থেকে ৩১ জানুয়ারি নির্বাচনী প্রচার শুরু হওয়ার পর সহিংসতায় চারজন নিহত এবং ৪১৪ জন আহত হন।

  • তফসিল ঘোষণার পর ৩৬ দিনে সহিংসতায় নিহত অন্তত ১৫
  • ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ৩০০ সহিংসতার ঘটনা
  • দেশের অন্তত ২৫ জেলা ও ঢাকার একাধিক আসন ঝুঁকিপূর্ণ
  • হুমকি, সংঘর্ষ ও হামলায় সুষ্ঠু ভোট নিয়ে উদ্বেগ

২ ফেব্রুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, নির্বাচন ঘিরে গত ১২ ডিসেম্বর থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ৩০০টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে পাঁচটি হত্যাকাণ্ড, ভীতি দেখানো বা আক্রমণাত্মক আচরণের ২৫টি, প্রার্থীর ওপর হামলার ২০টি, সংঘর্ষের ৮৯টি এবং অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহারের ঘটনা ঘটেছে তিনটি। এ ছাড়া প্রচার কাজে বাধার ২৯টি, রাজনৈতিক দল ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের অফিস ও প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ৩০টি, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ৫টি এবং অন্যান্য ৭০টি ঘটনা রয়েছে।

নির্বাচনী বিশ্লেষকেরা বলছেন, এবার নির্বাচনের আগে অনেকেই আশা করেছিলেন কোনো সহিংস ঘটনা ঘটবে না। কারণ এবার ভিন্ন প্রেক্ষাপটে হচ্ছে নির্বাচন। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভূত্থানের পর কার্ষক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ছাড়া অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হচ্ছে। বৈষম্য দূর ও দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার জন্য নানা সংস্কার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে এই নির্বাচন আয়োজন করা হয়েছে।

এই নির্বাচনেও দলগুলোর নেতা ও প্রার্থীরা পরস্পরের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ও অসহিষ্ণুতা দেখিয়েছে। এর জেরে ঘটছে নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনা।

অথচ এই নির্বাচনেও দলগুলোর নেতা ও প্রার্থীরা পরস্পরের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করেছে ও অসহিষ্ণুতা দেখিয়েছে। এর জেরে ঘটছে নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনা।

পুলিশ সদর দপ্তর ও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, তফসিল ঘোষণার পরদিন (২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর) ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি ঢাকায় মোটরসাইকেলে থাকা দুই বন্দুকধারীর গুলিতে গুরুতর আহত হন। ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।

গত ২৮ জানুয়ারী শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নির্বাচনি ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসাকে কেন্দ্র করে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিম নিহত হন। এ ঘটনায় ঝিনাইগাতীর ইউএনও ও ওসিকে প্রত্যাহার করেছে নির্বাচন কমিশন(ইসি)।

এ ছাড়া নির্বাচনী সহিংসতায় গত ২৪ ডিসেম্বর গাজীপুরের শ্রীপুরে জাসাস নেতা ফরিদ সরকার, ১৬ জানুয়ারি ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলায় স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান ওমর রুবেলের সমর্থক নজরুল ইসলাম এবং ৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামের রাউজানে এক যুবদল নেতা ও একই দিন নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় শরৎ চক্রবর্তী নামে একজন মুদিদোকানিকে হত্যা করা হয়েছে। কক্সবাজারে একজন প্রার্থীকে কাফনের কাপড় পাঠিয়ে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে।

নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনায় সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা। এ বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব ও রংপুর-৪ (পীরগাছা-কাউনিয়া) আসনের ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী আখতার হোসেন বলেন, শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে প্রচার চালানোর সময় তাঁকে অপরিচিত মুঠোফোন নম্বর থেকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় তিনি পীরগাছা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘একটি দল দেশব্যাপী বিভিন্ন জায়গায় হামলা করছে, সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাচ্ছে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘নির্বাচনে কিছু কিছু সহিংসতা হচ্ছে। এতে দুই/তিন জন মারাও গেছেন, যা খুবই অনাকাঙ্খিত। তবে আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর অবস্থান নিতে বলেছি। শেরপুরের ঘটনায় ইউএনও এবং ওসিকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। অনেকে কর্মকর্তাকে বদলি করেছি। নির্বাচনী মাঠে পুলিশ, র‌্যাব, আনসার, বিজিবি ও সেনা টহল রয়েছে। নির্বাহী ম্যাজিট্রেটরা মাঠে আছে।’

নির্বাচন ঘিরে নানা স্থানে সহিংস ঘটনা ঘটার বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম বলেন, নির্বাচনে কিছু সহিংসতা হচ্ছে। তবে মৃত্যু কোনোভাবেই কাম্য নয়। এসব ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।’

নির্বাচন কমিশনে গোয়েন্দাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ২৫ টি জেলা সংঘাতপ্রবণ। ঢাকা-১৪ ও ১৬ আসন ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানিয়েছে সেনাবাহিনী। এ ছাড়া ঢাকা-১৪, ১৬ ও ১৮ আসনের ১৮ শতাংশ কেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ বলে তারা জানিয়েছেন।

মানবাধিকার সংগঠর ‘অধিকারের’ অ্যাডভোকেসি ডিরেক্টর তাসকিন ফাহমিনা বলেছেন, ‘নির্বাচনের আর মাত্র দুই দিন বাকি। আমরা আশা করি, আগের নির্বাচনগুলোর মতো এবার যেন নারী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে জন্য কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা নেবে |‘ তিনি আরও বলেছেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন স্থানে যেসব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, তার প্রায় অর্ধেক ক্ষেত্রেই কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

সহিংসতার ধরন বিশ্লেষণ করে অধিকার জানিয়েছে, নির্বাচনী প্রচারের এই সময়ে ভীতি প্রদর্শন বা হুমকি-ধমকির ঘটনা ছিল সবচেয়ে বেশি (৩৩ শতাংশ)। এরপর রয়েছে সম্পদের ক্ষতিসাধন (২০ শতাংশ), সংঘর্ষ (১৭ শতাংশ) এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বাধা দেওয়ার ঘটনা (১৭ শতাংশ)।

শেষ সপ্তাহেও নানা স্থানে সহিংসতা

নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার শেষ সপ্তাহেও নানা স্থানে সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, তফসিল ঘোষণার পর অন্তত ২৫টি জেলা এবং তিনটি মহানগরের বিভিন্ন থানা এলাকায় সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে কুমিল্লা ও লক্ষ্মীপুর জেলায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে চার দফা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, যা অন্য জেলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি।

রবিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) পটুয়াখালী–২ আসনের বাউফল উপজেলার চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নে জামায়াতের প্রার্থীর মিছিলে বিএনপির নেতা-কর্মীরা অতর্কিত হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে অন্তত ৪০ জন আহত হয়েছেন।

৭ ফেব্রুয়ারি পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা–দশমিনা) আসনের গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী ও ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হাসান মামুনের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন।

এ ছাড়া কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, রাউজান, গাজীপুর, ঢাকাসহ দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় কম-বেশী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত নেত্রী ও সংরক্ষিত আসনের সাবেক এমপি রুমিন ফারহানার ওপর আক্রমণ এবং তার মিছিল ও প্রচারে বাঁধা দেওয়া হয়েছে । এ বিষয়ে তিনি ইসিতে অভিযোগ করেছেন।

সহিংসতা ঠেকাতে পরামর্শ

নির্বাচন বিশ্লেষক ও ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলি বলছেন, ‘সহিংসতা রোধে শুধু পুলিশবাহিনী নয়,নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। নির্বাচন কমিশনকে কেবল রেফারি নয়, বরং প্রশাসকের ভূমিকায় আবির্ভূত হতে হবে। আচরণবিধি লঙ্ঘনের যেকোনো ঘটনায় তাৎক্ষণিক ও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দলগুলোর কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীকে শান্ত থাকার নির্দেশ দিতে হবে।’

/বিবি/