শিরোনাম

প্রশ্নফাঁসের টাকায় সম্পদের পাহাড়, আবেদ আলীর নেতৃত্বে ৫৫ সদস্যের চক্র

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রশ্নফাঁসের টাকায় সম্পদের পাহাড়, আবেদ আলীর নেতৃত্বে ৫৫ সদস্যের চক্র
পিএসসির সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলী

এক সময় সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতেই হিমশিম খেতে হতো পিএসসির সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলীকে। কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে বদলে যায় তার জীবনযাত্রার চিত্র। মাদারীপুরের ডাসার উপজেলার বোতলা গ্রামে গড়ে তোলেন বিলাসবহুল বাড়ি। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে নিজের ও বেনামি মালিকানায় বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হন তিনি। আওয়ামী লীগের নেতা পরিচয়ে ডাসার উপজেলা চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়েই আবেদ আলী এই বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। সম্প্রতি আদালতে জমা দেওয়া অভিযোগপত্রে উঠে এসেছে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য।

প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার তদন্ত শেষে ১৮ মে আদালতে ৪১ পৃষ্ঠার চার্জশিট জমা দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ৯ জুলাই রাজধানীর পল্টন থানায় মামলাটি দায়ের হয়েছিল। দীর্ঘ তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, আবেদ আলীর নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ চক্র বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িত ছিল।

চার্জশিট অনুযায়ী, ৫৫ সদস্যের এই চক্রে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী এবং পরীক্ষার্থী সংগ্রহকারী দালালরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন।

মামলায় গ্রেফতার হওয়া ৩৬ আসামির মধ্যে রয়েছেন পিএসসির সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলী, মো. নোমান সিদ্দিক, মো. খলিলুর রহমান, পিএসসির অফিস সহায়ক সাজেদুল ইসলাম, ব্যবসায়ী আবু সোলেমান মো. সোহেল, জাহাঙ্গীর আলম, এসএম আলমগীর কবীর, প্রতিরক্ষা ও অর্থ বিভাগের অডিটর প্রিয়নাথ রায়, মো. জাহিদুল ইসলাম, পিএসসির উপপরিচালক (ডিডি) মো. আবু জাফর, মো. শাহাদত হোসেন, ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক মো. মামুনুর রশিদ, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিকেল টেকনিশিয়ান নিয়ামুল হাসান, ব্যবসায়ী মো. সাখাওয়াত হোসেন, সাইম হোসেন, ড্যাফোডিলের শিক্ষার্থী লিটন সরকার, আবেদ আলীর ছেলে সৈয়দ সোহানুর রহমান সিয়াম, পিএসসির সাবেক সহকারী পরিচালক নিখিল চন্দ্র রায়, মো. শরীফুল ইসলাম ভূঁইয়া, দীপক বণিক, মো. খোরশেদ আলম খোকন, কাজী মো. সুমন, একেএম গোলাম পারভেজ, মেহেদী হাসান খান, মো. মিজানুর রহমান, আতিকুল ইসলাম, এটিএম মোস্তফা, মাহফুজ কালু, মো. আসলাম হোসেন, কৌশিক দেবনাথ, মোজাহিদুল ইসলাম, মজনু মিয়া, মোহাম্মদ আকরাম হোসেন, মো. আব্দুল আজিম, রুপন চন্দ্র দাস এবং মাহামুদ হাসান মান্না।

অন্যদিকে মামলার ১৯ আসামি এখনো পলাতক। তারা হলেন—সুমন কুমার বসু, বিপাশ চাকমা, মো. দেলোয়ার হোসাইন, মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান দিপু, মো. শহিদুল ইসলাম, মো. আল মামুন, মো. আনিছুর রহমান, মো. ওয়াসিম খান, মো. জসিম উদ্দিন, মো. ফেরদৌস আহম্মদ, মো. মান্নান উদ্দিন, মো. আশরাফুল আলম, জাহিদুল সরদার, মো. সোহেল পারভেজ, মো. জুয়েল আল মামুন, মো. বিল্লাল হোসেন, মো. রুবেল শরীফ, শাকের আহমেদ আল-আমিন এবং এম এম নাজমুল হাসান। তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আবেদন করা হয়েছে।

তদন্তে সংশ্লিষ্টতা না পাওয়ায় ৩১তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তা মো. জাকারিয়া রহমানকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া পলাতক আসামি মো. গোলাম হামিদুর রহমান, হামিদুল ইসলাম জিয়া, মো. মাহাবুব আলম এবং আজাদের সম্পূর্ণ নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করা সম্ভব না হওয়ায় তাদের বিষয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।

চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে, পরীক্ষার আগেই নির্দিষ্ট প্রার্থীদের কাছে প্রশ্ন ও তার উত্তর সরবরাহ করা হতো। পরীক্ষার্থীদের নির্ধারিত স্থানে এনে প্রশ্ন ও উত্তর মুখস্থ করানো হতো এবং পরে পরীক্ষার দিন কেন্দ্রে পাঠানো হতো। এর বিনিময়ে তাদের কাছ থেকে আগাম মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করত চক্রটি।

তদন্তে আরও জানা গেছে, এই নেটওয়ার্ক দেশের বিভিন্ন জেলায় বিস্তৃত ছিল। এতে সরকারি চাকরিজীবী, পিএসসির বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারী, ব্যবসায়ী, চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, শিক্ষার্থীসহ নানা পেশার মানুষ যুক্ত ছিলেন। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, প্রশ্নফাঁস চক্রের যোগাযোগ ও কার্যক্রম বিজি প্রেস থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং কিছু বেসরকারি সংস্থার স্তর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে সুসংগঠিতভাবে পরিচালিত এই চক্র রাষ্ট্রীয় নিয়োগ ব্যবস্থার গোপনীয়তা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তাদের কর্মকাণ্ডের ফলে সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

অভিযোগপত্রে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন আইন, ২০২৩-এর ১১ ও ১৫ ধারায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিচার চাওয়া হয়েছে। এসব ধারায় অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

তদন্তে চক্রের কয়েকজন সদস্যের নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ সম্পদের তথ্যও পাওয়া গেছে। এসব সম্পদের উৎস যাচাই এবং সম্ভাব্য অর্থ পাচারের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পৃথক অনুসন্ধানের সুপারিশ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ধারণা, মানি লন্ডারিং সংক্রান্ত তদন্ত শুরু হলে প্রশ্নফাঁস বাণিজ্যের প্রকৃত আর্থিক পরিধি এবং এর পেছনে জড়িত আরও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তথ্য সামনে আসতে পারে।

চার্জশিটে এই প্রশ্নফাঁস চক্রের কর্মকাণ্ডকে রাষ্ট্রীয় নিয়োগ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংঘটিত একটি সুপরিকল্পিত ও সংঘবদ্ধ অপরাধ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আদালতে বিচারিক কার্যক্রম শুরু হলে এই চক্রের নেপথ্যে থাকা আরও প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর নাম প্রকাশ্যে আসার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

/এমআর/