এলজিইডিতে ২৫৭ প্রকৌশলীর জ্যেষ্ঠতা নিয়ে আপত্তি

এলজিইডিতে ২৫৭ প্রকৌশলীর জ্যেষ্ঠতা নিয়ে আপত্তি
সিজেডএন ডেস্ক
লোগো-CznNewsLab-a1a158.jpg)
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া ২৫৭ প্রকৌশলীকে ঘিরে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, উন্নয়ন প্রকল্প থেকে তাদের রাজস্ব খাতে স্থানান্তর, চাকরি নিয়মিতকরণ এবং পরবর্তী পদোন্নতির বিভিন্ন পর্যায়ে বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। এমনকি বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সুপারিশ ছাড়াই তাঁদের প্রথম শ্রেণির পদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া এসব প্রকৌশলীর কয়েকজনের চাকরির ধারাবাহিকতা এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত। তদন্তে অনিয়মের বিষয়গুলো উঠে এলেও তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করেই চলতি বছরের এপ্রিলে এলজিইডির খসড়া জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রকাশ করা হয়।
নথিপত্র পর্যালোচনা ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
১৮ বছর পর নতুন জ্যেষ্ঠতার তালিকা
এলজিইডির প্রথম শ্রেণির প্রকৌশলীদের সর্বশেষ জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল ২০০৮ সালে। দীর্ঘ ১৮ বছর পর চলতি বছরের ২১ এপ্রিল নতুন খসড়া তালিকা প্রকাশ করা হয়। এতে উন্নয়ন প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত ২৫৭ প্রকৌশলীর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আগের মতামতে বলা হয়েছিল, এসব প্রকৌশলীর চাকরি যথাযথভাবে নিয়মিতকরণ করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার পর জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রস্তুত করা উচিত।
মন্ত্রণালয়ের সেই মতামতের পরও ২৫৭ জনকে তালিকায় রাখায় নিয়ম মেনে চাকরিতে আসা প্রকৌশলীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
পিএসসির সুপারিশ নিয়ে প্রশ্ন
নথি অনুযায়ী, ২০১০ সালে ১৩১ জন, ২০১১ সালে ১০৯ জন এবং ২০১৩ সালে ১৭ জন প্রকৌশলীকে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে রাজস্ব খাতে স্থানান্তর করা হয়।
এলজিইডির সহকারী প্রকৌশলী পদটি নবম গ্রেডের হওয়ায় এসব কর্মকর্তার নিয়মিতকরণের ক্ষেত্রে পিএসসির পরামর্শ নেওয়ার প্রয়োজন ছিল বলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি অনুবিভাগের মতামতে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২২ সালের ২৬ অক্টোবর দেওয়া ওই মতামতে বলা হয়, ২৫৭ প্রকৌশলীকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের সময় পিএসসির পরামর্শসহ প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছিল কি না, তা যাচাই করে এরপর জ্যেষ্ঠতার তালিকা করা সমীচীন।
এরপর ২০২৩ সালের ১২ জানুয়ারি স্থানীয় সরকার বিভাগ এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়।
তবে তথ্য অধিকার আইনে করা এক আবেদনের জবাবে এলজিইডির তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী ২০২২ সালের ২৯ আগস্ট জানিয়েছিলেন, ওই ২৫৭ প্রকৌশলীকে রাজস্ব খাতে নিয়মিত করার ক্ষেত্রে পিএসসির মতামত নেওয়া হয়নি।
নিয়মিতকরণ ছাড়াই জ্যেষ্ঠতার তালিকায় ২১২ জন
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ২০০৫ সালের নিয়মিতকরণ ও জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ বিধিমালা অনুযায়ী, নিয়মিত হওয়া কর্মকর্তা বা কর্মচারীর জ্যেষ্ঠতা নিয়মিতকরণের তারিখ থেকে নির্ধারণ করার কথা।
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, রাজস্ব খাতে এখনো নিয়মিত না হওয়া ২১২ প্রকৌশলীকেও খসড়া জ্যেষ্ঠতার তালিকায় রাখা হয়েছে। ফলে নিয়মিতকরণের আগেই তাঁদের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করা যায় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এ ছাড়া প্রকল্পে চাকরির ধারাবাহিকতা নিয়েও আপত্তি রয়েছে। জনপ্রশাসনের তদন্ত অনুযায়ী, ২৫৭ প্রকৌশলীর মধ্যে অন্তত ৪২ জনের প্রকল্প পর্যায়ের চাকরিতে ধারাবাহিকতা ছিল না। তাঁদের মধ্যে অন্তত ২০ জনের নামও খসড়া জ্যেষ্ঠতার তালিকায় রাখা হয়েছে।
তদন্তে উঠে এসেছে গুরুতর অনিয়ম
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেও এসব বিষয়ে আপত্তি জানানো হয়েছে। কমিটির সমন্বয়ক ছিলেন বর্তমান যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম এবং এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন।
তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ভূতাপেক্ষ তারিখ থেকে নিয়মিত করার সুযোগ না থাকায় প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে ২৫৭ প্রকৌশলীর নিয়মিতকরণের আদেশ দিতে হবে। তাঁদের নিয়মিতকরণ যথাযথভাবে না হওয়ায় জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণেরও সুযোগ নেই।
এমনকি সপ্তম গ্রেডে সিলেকশন গ্রেড এবং ষষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতি দেওয়ার আইনগত সুযোগও ছিল না বলে কমিটি মত দিয়েছে।
শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও আপত্তি
খসড়া জ্যেষ্ঠতার তালিকায় থাকা কয়েকজন প্রকৌশলীর শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট নথিতে বলা হয়েছে, তালিকার ৩৭৬ ও ৪৭১ নম্বরের দুই সহকারী প্রকৌশলী প্রকল্পে যোগদানের সময় বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রিধারী ছিলেন না। পরে তাঁদের রাজস্ব খাতে স্থানান্তর করা হয় এবং ষষ্ঠ ও পঞ্চম গ্রেডের নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়।
এ ছাড়া ৩৩৮, ৩৪০, ৩৪১, ৩৪৭ ও ৩৫১ নম্বরের পাঁচ প্রকৌশলীর এলজিইডির নিয়োগ বিধিমালা-২০০৯ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল না বলেও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদেরও পদোন্নতি দিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে জ্যেষ্ঠতার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভিন্ন শাখার প্রকৌশলীদের পুরকৌশলে নিয়োগ
নথিতে আরও বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও কৃষি ও যান্ত্রিক প্রকৌশলসহ ভিন্ন শাখার পাঁচ প্রকৌশলীকে পুরকৌশলের সহকারী প্রকৌশলী পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
তদন্ত নথিতে অভিযোগ করা হয়েছে, নির্ধারিত প্রকৌশল শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্তের ব্যত্যয় ঘটিয়ে তাঁদের নিয়োগ ও পরবর্তী পদোন্নতির সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
নিয়মিতকরণ ছাড়াই ১৮০ জনকে চলতি দায়িত্ব
অনিয়মের অভিযোগ শুধু জ্যেষ্ঠতার তালিকাতেই সীমাবদ্ধ নয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ‘শূন্য পদে চলতি দায়িত্ব প্রদান সংক্রান্ত নীতিমালা, ২০২৩’-এর ৮(৮) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রকল্প থেকে আসা কোনো কর্মকর্তাকে রাজস্ব বাজেটে নিয়মিত না করা হলে তাঁকে চলতি দায়িত্ব দেওয়ার সুযোগ নেই।
কিন্তু চলতি বছরের এপ্রিল ও মে মাসে দুই দফায় অনিয়মিত ১৮০ প্রকৌশলীকে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এখন পিএসসির মতামত নেওয়ার উদ্যোগ
২৫৭ প্রকৌশলীর নিয়মিতকরণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর এখন তাঁদের ভূতাপেক্ষ নিয়মিতকরণের বিষয়ে পিএসসি সচিবালয়ের মতামত বা সুপারিশ নেওয়ার উদ্যোগ চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী ভূতাপেক্ষ নিয়মিতকরণ করা হলেও আগের তারিখ থেকে জ্যেষ্ঠতা দেওয়ার সুযোগ নেই বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১০ সালের ১১ অক্টোবর তৎকালীন সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের জারি করা একটি স্পষ্টীকরণ পত্রেও এ ধরনের সুযোগ না থাকার কথা বলা হয়েছে।
কমিটি শুনানি করেছে
জনপ্রশাসনের মতামত উপেক্ষা করে ২১ এপ্রিল খসড়া জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রকাশের পর আপত্তি জানানোর জন্য ৩০ কর্মদিবস সময় দেওয়া হয়। এর মাত্র চার দিন পর ২৬ এপ্রিল তালিকাটি পর্যালোচনা ও হালনাগাদের জন্য পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে স্থানীয় সরকার বিভাগ।
কমিটির আহ্বায়ক করা হয় স্থানীয় সরকার বিভাগের উন্নয়ন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহকে। এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেনকে করা হয় সমন্বয়ক।
কমিটি সংশ্লিষ্টদের শুনানি নিয়েছে। গত ১৭ আগস্ট তালিকা চূড়ান্ত করার বিষয়ে কমিটির সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে।
কমিটির আহ্বায়ক ড. আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় সরকার বিভাগের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, শুনানির পাশাপাশি সব বিধিবিধান অনুসরণ করেই বিষয়টি নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে। এখনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, কোনো অনিয়ম বা কারও প্রতি অন্যায় করা হচ্ছে না।
প্রশ্নের মুখে জ্যেষ্ঠতার তালিকা
সব মিলিয়ে উন্নয়ন প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে ২৫৭ প্রকৌশলীর স্থানান্তর, তাঁদের নিয়মিতকরণ, পিএসসির সুপারিশ, চাকরির ধারাবাহিকতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং পদোন্নতি—প্রতিটি ধাপেই প্রশ্ন উঠেছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন এবং পরবর্তী লিখিত মতামতে এসব বিষয়ে আপত্তি থাকলেও তাদের নাম জ্যেষ্ঠতার খসড়া তালিকায় রাখা হয়েছে। ফলে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—যাদের রাজস্ব খাতের চাকরিই যথাযথভাবে নিয়মিত হয়েছে কি না, তা নিয়ে আপত্তি রয়েছে, তাঁদের কীভাবে প্রথম শ্রেণির প্রকৌশলীদের জ্যেষ্ঠতার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হলো?
উন্নয়ন প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত হয়ে সম্প্রতি নির্বাহী প্রকৌশলী হওয়া একজন কর্মকর্তা বলেন, সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্ত যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই হয়েছে। নিয়মিত কর্মকর্তাদের ‘কাদা ছোড়াছুড়ি’ বন্ধ করে সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া উচিত।
অন্যদিকে নিয়মিত কর্মকর্তাদের পক্ষের একজন নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে ধাপে ধাপে কীভাবে অনিয়মের বিস্তার ঘটেছে, জনপ্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদনেই তার প্রমাণ রয়েছে। এসব বিষয়ে মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা না নিলেও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংরক্ষিত থাকবে এবং ভবিষ্যতে এর দায় এড়ানোর সুযোগ থাকবে না।
লোগো-CznNewsLab-a1a158.jpg)
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া ২৫৭ প্রকৌশলীকে ঘিরে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, উন্নয়ন প্রকল্প থেকে তাদের রাজস্ব খাতে স্থানান্তর, চাকরি নিয়মিতকরণ এবং পরবর্তী পদোন্নতির বিভিন্ন পর্যায়ে বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। এমনকি বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সুপারিশ ছাড়াই তাঁদের প্রথম শ্রেণির পদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া এসব প্রকৌশলীর কয়েকজনের চাকরির ধারাবাহিকতা এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত। তদন্তে অনিয়মের বিষয়গুলো উঠে এলেও তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করেই চলতি বছরের এপ্রিলে এলজিইডির খসড়া জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রকাশ করা হয়।
নথিপত্র পর্যালোচনা ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
১৮ বছর পর নতুন জ্যেষ্ঠতার তালিকা
এলজিইডির প্রথম শ্রেণির প্রকৌশলীদের সর্বশেষ জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল ২০০৮ সালে। দীর্ঘ ১৮ বছর পর চলতি বছরের ২১ এপ্রিল নতুন খসড়া তালিকা প্রকাশ করা হয়। এতে উন্নয়ন প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত ২৫৭ প্রকৌশলীর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আগের মতামতে বলা হয়েছিল, এসব প্রকৌশলীর চাকরি যথাযথভাবে নিয়মিতকরণ করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার পর জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রস্তুত করা উচিত।
মন্ত্রণালয়ের সেই মতামতের পরও ২৫৭ জনকে তালিকায় রাখায় নিয়ম মেনে চাকরিতে আসা প্রকৌশলীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
পিএসসির সুপারিশ নিয়ে প্রশ্ন
নথি অনুযায়ী, ২০১০ সালে ১৩১ জন, ২০১১ সালে ১০৯ জন এবং ২০১৩ সালে ১৭ জন প্রকৌশলীকে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে রাজস্ব খাতে স্থানান্তর করা হয়।
এলজিইডির সহকারী প্রকৌশলী পদটি নবম গ্রেডের হওয়ায় এসব কর্মকর্তার নিয়মিতকরণের ক্ষেত্রে পিএসসির পরামর্শ নেওয়ার প্রয়োজন ছিল বলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি অনুবিভাগের মতামতে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২২ সালের ২৬ অক্টোবর দেওয়া ওই মতামতে বলা হয়, ২৫৭ প্রকৌশলীকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের সময় পিএসসির পরামর্শসহ প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছিল কি না, তা যাচাই করে এরপর জ্যেষ্ঠতার তালিকা করা সমীচীন।
এরপর ২০২৩ সালের ১২ জানুয়ারি স্থানীয় সরকার বিভাগ এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়।
তবে তথ্য অধিকার আইনে করা এক আবেদনের জবাবে এলজিইডির তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী ২০২২ সালের ২৯ আগস্ট জানিয়েছিলেন, ওই ২৫৭ প্রকৌশলীকে রাজস্ব খাতে নিয়মিত করার ক্ষেত্রে পিএসসির মতামত নেওয়া হয়নি।
নিয়মিতকরণ ছাড়াই জ্যেষ্ঠতার তালিকায় ২১২ জন
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ২০০৫ সালের নিয়মিতকরণ ও জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ বিধিমালা অনুযায়ী, নিয়মিত হওয়া কর্মকর্তা বা কর্মচারীর জ্যেষ্ঠতা নিয়মিতকরণের তারিখ থেকে নির্ধারণ করার কথা।
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, রাজস্ব খাতে এখনো নিয়মিত না হওয়া ২১২ প্রকৌশলীকেও খসড়া জ্যেষ্ঠতার তালিকায় রাখা হয়েছে। ফলে নিয়মিতকরণের আগেই তাঁদের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করা যায় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এ ছাড়া প্রকল্পে চাকরির ধারাবাহিকতা নিয়েও আপত্তি রয়েছে। জনপ্রশাসনের তদন্ত অনুযায়ী, ২৫৭ প্রকৌশলীর মধ্যে অন্তত ৪২ জনের প্রকল্প পর্যায়ের চাকরিতে ধারাবাহিকতা ছিল না। তাঁদের মধ্যে অন্তত ২০ জনের নামও খসড়া জ্যেষ্ঠতার তালিকায় রাখা হয়েছে।
তদন্তে উঠে এসেছে গুরুতর অনিয়ম
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেও এসব বিষয়ে আপত্তি জানানো হয়েছে। কমিটির সমন্বয়ক ছিলেন বর্তমান যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম এবং এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন।
তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ভূতাপেক্ষ তারিখ থেকে নিয়মিত করার সুযোগ না থাকায় প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে ২৫৭ প্রকৌশলীর নিয়মিতকরণের আদেশ দিতে হবে। তাঁদের নিয়মিতকরণ যথাযথভাবে না হওয়ায় জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণেরও সুযোগ নেই।
এমনকি সপ্তম গ্রেডে সিলেকশন গ্রেড এবং ষষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতি দেওয়ার আইনগত সুযোগও ছিল না বলে কমিটি মত দিয়েছে।
শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও আপত্তি
খসড়া জ্যেষ্ঠতার তালিকায় থাকা কয়েকজন প্রকৌশলীর শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট নথিতে বলা হয়েছে, তালিকার ৩৭৬ ও ৪৭১ নম্বরের দুই সহকারী প্রকৌশলী প্রকল্পে যোগদানের সময় বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রিধারী ছিলেন না। পরে তাঁদের রাজস্ব খাতে স্থানান্তর করা হয় এবং ষষ্ঠ ও পঞ্চম গ্রেডের নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়।
এ ছাড়া ৩৩৮, ৩৪০, ৩৪১, ৩৪৭ ও ৩৫১ নম্বরের পাঁচ প্রকৌশলীর এলজিইডির নিয়োগ বিধিমালা-২০০৯ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল না বলেও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদেরও পদোন্নতি দিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে জ্যেষ্ঠতার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভিন্ন শাখার প্রকৌশলীদের পুরকৌশলে নিয়োগ
নথিতে আরও বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও কৃষি ও যান্ত্রিক প্রকৌশলসহ ভিন্ন শাখার পাঁচ প্রকৌশলীকে পুরকৌশলের সহকারী প্রকৌশলী পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
তদন্ত নথিতে অভিযোগ করা হয়েছে, নির্ধারিত প্রকৌশল শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্তের ব্যত্যয় ঘটিয়ে তাঁদের নিয়োগ ও পরবর্তী পদোন্নতির সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
নিয়মিতকরণ ছাড়াই ১৮০ জনকে চলতি দায়িত্ব
অনিয়মের অভিযোগ শুধু জ্যেষ্ঠতার তালিকাতেই সীমাবদ্ধ নয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ‘শূন্য পদে চলতি দায়িত্ব প্রদান সংক্রান্ত নীতিমালা, ২০২৩’-এর ৮(৮) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রকল্প থেকে আসা কোনো কর্মকর্তাকে রাজস্ব বাজেটে নিয়মিত না করা হলে তাঁকে চলতি দায়িত্ব দেওয়ার সুযোগ নেই।
কিন্তু চলতি বছরের এপ্রিল ও মে মাসে দুই দফায় অনিয়মিত ১৮০ প্রকৌশলীকে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এখন পিএসসির মতামত নেওয়ার উদ্যোগ
২৫৭ প্রকৌশলীর নিয়মিতকরণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর এখন তাঁদের ভূতাপেক্ষ নিয়মিতকরণের বিষয়ে পিএসসি সচিবালয়ের মতামত বা সুপারিশ নেওয়ার উদ্যোগ চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী ভূতাপেক্ষ নিয়মিতকরণ করা হলেও আগের তারিখ থেকে জ্যেষ্ঠতা দেওয়ার সুযোগ নেই বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১০ সালের ১১ অক্টোবর তৎকালীন সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের জারি করা একটি স্পষ্টীকরণ পত্রেও এ ধরনের সুযোগ না থাকার কথা বলা হয়েছে।
কমিটি শুনানি করেছে
জনপ্রশাসনের মতামত উপেক্ষা করে ২১ এপ্রিল খসড়া জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রকাশের পর আপত্তি জানানোর জন্য ৩০ কর্মদিবস সময় দেওয়া হয়। এর মাত্র চার দিন পর ২৬ এপ্রিল তালিকাটি পর্যালোচনা ও হালনাগাদের জন্য পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে স্থানীয় সরকার বিভাগ।
কমিটির আহ্বায়ক করা হয় স্থানীয় সরকার বিভাগের উন্নয়ন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহকে। এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেনকে করা হয় সমন্বয়ক।
কমিটি সংশ্লিষ্টদের শুনানি নিয়েছে। গত ১৭ আগস্ট তালিকা চূড়ান্ত করার বিষয়ে কমিটির সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে।
কমিটির আহ্বায়ক ড. আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় সরকার বিভাগের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, শুনানির পাশাপাশি সব বিধিবিধান অনুসরণ করেই বিষয়টি নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে। এখনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, কোনো অনিয়ম বা কারও প্রতি অন্যায় করা হচ্ছে না।
প্রশ্নের মুখে জ্যেষ্ঠতার তালিকা
সব মিলিয়ে উন্নয়ন প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে ২৫৭ প্রকৌশলীর স্থানান্তর, তাঁদের নিয়মিতকরণ, পিএসসির সুপারিশ, চাকরির ধারাবাহিকতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং পদোন্নতি—প্রতিটি ধাপেই প্রশ্ন উঠেছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন এবং পরবর্তী লিখিত মতামতে এসব বিষয়ে আপত্তি থাকলেও তাদের নাম জ্যেষ্ঠতার খসড়া তালিকায় রাখা হয়েছে। ফলে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—যাদের রাজস্ব খাতের চাকরিই যথাযথভাবে নিয়মিত হয়েছে কি না, তা নিয়ে আপত্তি রয়েছে, তাঁদের কীভাবে প্রথম শ্রেণির প্রকৌশলীদের জ্যেষ্ঠতার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হলো?
উন্নয়ন প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত হয়ে সম্প্রতি নির্বাহী প্রকৌশলী হওয়া একজন কর্মকর্তা বলেন, সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্ত যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই হয়েছে। নিয়মিত কর্মকর্তাদের ‘কাদা ছোড়াছুড়ি’ বন্ধ করে সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া উচিত।
অন্যদিকে নিয়মিত কর্মকর্তাদের পক্ষের একজন নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে ধাপে ধাপে কীভাবে অনিয়মের বিস্তার ঘটেছে, জনপ্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদনেই তার প্রমাণ রয়েছে। এসব বিষয়ে মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা না নিলেও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংরক্ষিত থাকবে এবং ভবিষ্যতে এর দায় এড়ানোর সুযোগ থাকবে না।

এলজিইডিতে ২৫৭ প্রকৌশলীর জ্যেষ্ঠতা নিয়ে আপত্তি
সিজেডএন ডেস্ক
লোগো-CznNewsLab-a1a158.jpg)
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া ২৫৭ প্রকৌশলীকে ঘিরে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, উন্নয়ন প্রকল্প থেকে তাদের রাজস্ব খাতে স্থানান্তর, চাকরি নিয়মিতকরণ এবং পরবর্তী পদোন্নতির বিভিন্ন পর্যায়ে বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। এমনকি বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সুপারিশ ছাড়াই তাঁদের প্রথম শ্রেণির পদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া এসব প্রকৌশলীর কয়েকজনের চাকরির ধারাবাহিকতা এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত। তদন্তে অনিয়মের বিষয়গুলো উঠে এলেও তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করেই চলতি বছরের এপ্রিলে এলজিইডির খসড়া জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রকাশ করা হয়।
নথিপত্র পর্যালোচনা ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
১৮ বছর পর নতুন জ্যেষ্ঠতার তালিকা
এলজিইডির প্রথম শ্রেণির প্রকৌশলীদের সর্বশেষ জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল ২০০৮ সালে। দীর্ঘ ১৮ বছর পর চলতি বছরের ২১ এপ্রিল নতুন খসড়া তালিকা প্রকাশ করা হয়। এতে উন্নয়ন প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত ২৫৭ প্রকৌশলীর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আগের মতামতে বলা হয়েছিল, এসব প্রকৌশলীর চাকরি যথাযথভাবে নিয়মিতকরণ করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার পর জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রস্তুত করা উচিত।
মন্ত্রণালয়ের সেই মতামতের পরও ২৫৭ জনকে তালিকায় রাখায় নিয়ম মেনে চাকরিতে আসা প্রকৌশলীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
পিএসসির সুপারিশ নিয়ে প্রশ্ন
নথি অনুযায়ী, ২০১০ সালে ১৩১ জন, ২০১১ সালে ১০৯ জন এবং ২০১৩ সালে ১৭ জন প্রকৌশলীকে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে রাজস্ব খাতে স্থানান্তর করা হয়।
এলজিইডির সহকারী প্রকৌশলী পদটি নবম গ্রেডের হওয়ায় এসব কর্মকর্তার নিয়মিতকরণের ক্ষেত্রে পিএসসির পরামর্শ নেওয়ার প্রয়োজন ছিল বলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি অনুবিভাগের মতামতে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২২ সালের ২৬ অক্টোবর দেওয়া ওই মতামতে বলা হয়, ২৫৭ প্রকৌশলীকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের সময় পিএসসির পরামর্শসহ প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছিল কি না, তা যাচাই করে এরপর জ্যেষ্ঠতার তালিকা করা সমীচীন।
এরপর ২০২৩ সালের ১২ জানুয়ারি স্থানীয় সরকার বিভাগ এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়।
তবে তথ্য অধিকার আইনে করা এক আবেদনের জবাবে এলজিইডির তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী ২০২২ সালের ২৯ আগস্ট জানিয়েছিলেন, ওই ২৫৭ প্রকৌশলীকে রাজস্ব খাতে নিয়মিত করার ক্ষেত্রে পিএসসির মতামত নেওয়া হয়নি।
নিয়মিতকরণ ছাড়াই জ্যেষ্ঠতার তালিকায় ২১২ জন
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ২০০৫ সালের নিয়মিতকরণ ও জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ বিধিমালা অনুযায়ী, নিয়মিত হওয়া কর্মকর্তা বা কর্মচারীর জ্যেষ্ঠতা নিয়মিতকরণের তারিখ থেকে নির্ধারণ করার কথা।
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, রাজস্ব খাতে এখনো নিয়মিত না হওয়া ২১২ প্রকৌশলীকেও খসড়া জ্যেষ্ঠতার তালিকায় রাখা হয়েছে। ফলে নিয়মিতকরণের আগেই তাঁদের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করা যায় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এ ছাড়া প্রকল্পে চাকরির ধারাবাহিকতা নিয়েও আপত্তি রয়েছে। জনপ্রশাসনের তদন্ত অনুযায়ী, ২৫৭ প্রকৌশলীর মধ্যে অন্তত ৪২ জনের প্রকল্প পর্যায়ের চাকরিতে ধারাবাহিকতা ছিল না। তাঁদের মধ্যে অন্তত ২০ জনের নামও খসড়া জ্যেষ্ঠতার তালিকায় রাখা হয়েছে।
তদন্তে উঠে এসেছে গুরুতর অনিয়ম
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেও এসব বিষয়ে আপত্তি জানানো হয়েছে। কমিটির সমন্বয়ক ছিলেন বর্তমান যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম এবং এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন।
তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ভূতাপেক্ষ তারিখ থেকে নিয়মিত করার সুযোগ না থাকায় প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে ২৫৭ প্রকৌশলীর নিয়মিতকরণের আদেশ দিতে হবে। তাঁদের নিয়মিতকরণ যথাযথভাবে না হওয়ায় জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণেরও সুযোগ নেই।
এমনকি সপ্তম গ্রেডে সিলেকশন গ্রেড এবং ষষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতি দেওয়ার আইনগত সুযোগও ছিল না বলে কমিটি মত দিয়েছে।
শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও আপত্তি
খসড়া জ্যেষ্ঠতার তালিকায় থাকা কয়েকজন প্রকৌশলীর শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট নথিতে বলা হয়েছে, তালিকার ৩৭৬ ও ৪৭১ নম্বরের দুই সহকারী প্রকৌশলী প্রকল্পে যোগদানের সময় বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রিধারী ছিলেন না। পরে তাঁদের রাজস্ব খাতে স্থানান্তর করা হয় এবং ষষ্ঠ ও পঞ্চম গ্রেডের নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়।
এ ছাড়া ৩৩৮, ৩৪০, ৩৪১, ৩৪৭ ও ৩৫১ নম্বরের পাঁচ প্রকৌশলীর এলজিইডির নিয়োগ বিধিমালা-২০০৯ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল না বলেও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদেরও পদোন্নতি দিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে জ্যেষ্ঠতার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভিন্ন শাখার প্রকৌশলীদের পুরকৌশলে নিয়োগ
নথিতে আরও বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও কৃষি ও যান্ত্রিক প্রকৌশলসহ ভিন্ন শাখার পাঁচ প্রকৌশলীকে পুরকৌশলের সহকারী প্রকৌশলী পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
তদন্ত নথিতে অভিযোগ করা হয়েছে, নির্ধারিত প্রকৌশল শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্তের ব্যত্যয় ঘটিয়ে তাঁদের নিয়োগ ও পরবর্তী পদোন্নতির সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
নিয়মিতকরণ ছাড়াই ১৮০ জনকে চলতি দায়িত্ব
অনিয়মের অভিযোগ শুধু জ্যেষ্ঠতার তালিকাতেই সীমাবদ্ধ নয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ‘শূন্য পদে চলতি দায়িত্ব প্রদান সংক্রান্ত নীতিমালা, ২০২৩’-এর ৮(৮) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রকল্প থেকে আসা কোনো কর্মকর্তাকে রাজস্ব বাজেটে নিয়মিত না করা হলে তাঁকে চলতি দায়িত্ব দেওয়ার সুযোগ নেই।
কিন্তু চলতি বছরের এপ্রিল ও মে মাসে দুই দফায় অনিয়মিত ১৮০ প্রকৌশলীকে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এখন পিএসসির মতামত নেওয়ার উদ্যোগ
২৫৭ প্রকৌশলীর নিয়মিতকরণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর এখন তাঁদের ভূতাপেক্ষ নিয়মিতকরণের বিষয়ে পিএসসি সচিবালয়ের মতামত বা সুপারিশ নেওয়ার উদ্যোগ চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী ভূতাপেক্ষ নিয়মিতকরণ করা হলেও আগের তারিখ থেকে জ্যেষ্ঠতা দেওয়ার সুযোগ নেই বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১০ সালের ১১ অক্টোবর তৎকালীন সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের জারি করা একটি স্পষ্টীকরণ পত্রেও এ ধরনের সুযোগ না থাকার কথা বলা হয়েছে।
কমিটি শুনানি করেছে
জনপ্রশাসনের মতামত উপেক্ষা করে ২১ এপ্রিল খসড়া জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রকাশের পর আপত্তি জানানোর জন্য ৩০ কর্মদিবস সময় দেওয়া হয়। এর মাত্র চার দিন পর ২৬ এপ্রিল তালিকাটি পর্যালোচনা ও হালনাগাদের জন্য পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে স্থানীয় সরকার বিভাগ।
কমিটির আহ্বায়ক করা হয় স্থানীয় সরকার বিভাগের উন্নয়ন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহকে। এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেনকে করা হয় সমন্বয়ক।
কমিটি সংশ্লিষ্টদের শুনানি নিয়েছে। গত ১৭ আগস্ট তালিকা চূড়ান্ত করার বিষয়ে কমিটির সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে।
কমিটির আহ্বায়ক ড. আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় সরকার বিভাগের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, শুনানির পাশাপাশি সব বিধিবিধান অনুসরণ করেই বিষয়টি নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে। এখনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, কোনো অনিয়ম বা কারও প্রতি অন্যায় করা হচ্ছে না।
প্রশ্নের মুখে জ্যেষ্ঠতার তালিকা
সব মিলিয়ে উন্নয়ন প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে ২৫৭ প্রকৌশলীর স্থানান্তর, তাঁদের নিয়মিতকরণ, পিএসসির সুপারিশ, চাকরির ধারাবাহিকতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং পদোন্নতি—প্রতিটি ধাপেই প্রশ্ন উঠেছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন এবং পরবর্তী লিখিত মতামতে এসব বিষয়ে আপত্তি থাকলেও তাদের নাম জ্যেষ্ঠতার খসড়া তালিকায় রাখা হয়েছে। ফলে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—যাদের রাজস্ব খাতের চাকরিই যথাযথভাবে নিয়মিত হয়েছে কি না, তা নিয়ে আপত্তি রয়েছে, তাঁদের কীভাবে প্রথম শ্রেণির প্রকৌশলীদের জ্যেষ্ঠতার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হলো?
উন্নয়ন প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত হয়ে সম্প্রতি নির্বাহী প্রকৌশলী হওয়া একজন কর্মকর্তা বলেন, সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্ত যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই হয়েছে। নিয়মিত কর্মকর্তাদের ‘কাদা ছোড়াছুড়ি’ বন্ধ করে সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া উচিত।
অন্যদিকে নিয়মিত কর্মকর্তাদের পক্ষের একজন নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে ধাপে ধাপে কীভাবে অনিয়মের বিস্তার ঘটেছে, জনপ্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদনেই তার প্রমাণ রয়েছে। এসব বিষয়ে মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা না নিলেও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংরক্ষিত থাকবে এবং ভবিষ্যতে এর দায় এড়ানোর সুযোগ থাকবে না।








