মেজর মোজাফফর গ্রেপ্তারে আবার আলোচনায় ‘জিয়া হত্যাকাণ্ড’

মেজর মোজাফফর গ্রেপ্তারে আবার আলোচনায় ‘জিয়া হত্যাকাণ্ড’
নিজস্ব প্রতিবেদক

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের সময় তার খুব কাছেই ছিলেন মেজর মোজাফফর। হত্যাকাণ্ডের পর ইতিহাসের দৃশ্যপট থেকে একরকম হারিয়েই গিয়েছিলেন তিনি। ঘটনার ৪৫ বছর পর হঠাৎ তার গ্রেপ্তারের ঘটনা সেই হত্যাকাণ্ডকে আবার আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। হত্যার ঘটনায় চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানায় একটি ফৌজদারী মামলা হয়, সেই মামলার ৬ নম্বর আসামি ছিলেন মেজর মোহাম্মদ মোজাফফর হোসেন।
বুধবার (১৫ জুলাই) রাতে বনানী ডিওএইচএস থেকে মোজাফফর হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, যেহেতু তিনি এতদিন পলাতক ছিলেন, নিয়ম অনুযায়ী আগে তাকে তার বাহিনীতে হস্তান্তর করা হয়েছে।
কর্মকর্তারা বলেছেন, মোজাফফরকে শনাক্ত করেছেন মূলত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তকারীরা। জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধের এক মামলায় গ্রেপ্তার সাবেক লেফটেনেন্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দীন চৌধুরীর সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগের সূত্র ধরে প্রথমে মেজর মোজাফফরকে শনাক্ত করা হয়। তারপর একটি মোবাইল অপারেটরে কর্মরত তার এক স্বজনের সূত্র ধরে বাড়িটি শনাক্ত করে বুধবার মধ্যরাতে সেখানে অভিযান চালানো হয়। নাকের নিচে থাকা তিল দেখে চূড়ান্তভাবে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয় মোজাফফর হোসেনকে।
ওয়ান ইলেভেনের সময় আলোচিত সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর ভায়রা সাঈদ এস্কান্দার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মামা এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শ্যালক। ২০০৭-০৮ সময়ে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে গুরুতর অপরাধ দমন-সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। ওই কমিটির নির্দেশে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ রাজনীতিকদের সেসময় আটক করা হয়। তারেক রহমানকেও সেসময় গ্রেপ্তার করার পর জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
মোজাফফর কীভাবে শনাক্ত হলেন, সেই তথ্য জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা। তিনি বলেন, ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মাসুদ উদ্দিনকে মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় গত ৭ মে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২। একই সঙ্গে এই মামলায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদেরও অনুমতি দেওয়া হয়। মামলা তদন্তের অংশ হিসেবে মাসুদ উদ্দিনের মোবাইল ফোনের ফরেনসিক করে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। তার ফোনের সিডিআর (কল ডিটেইল রেকর্ড) নেওয়া হয়। সিডিআরে ২০২৩ সাল থেকে রাজধানীর বনানী ও মিরপুর ডিওএইচএসের একই অবস্থান থেকে একাধিক নম্বরে মাসুদ উদ্দিনের সঙ্গে মুঠোফোনে এক ব্যক্তির কথা বলা ও এসএমএস আদান-প্রদানের তথ্য পাওয়া যায়। ফোনালাপগুলোর সময়কাল ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। পরে দেখা যায়, সিমগুলো ভুয়া নামে নিবন্ধিত।
তানভীর হাসান জোহা বলেন, সন্দেহজনক নম্বরগুলো ব্যবহার করে কে বা কারা মাসুদ উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, তা ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা কিংবা প্রসিকিউশন (রাষ্ট্রপক্ষ) চিহ্নিত করতে পারছিল না। এ কারণে নম্বরগুলো পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়। এ ব্যাপারে পরবর্তী সময়ে পুলিশ নিজেদের মতো কাজ করে। উদ্ঘাটিত হয় মাসুদ উদ্দিনের সঙ্গে একাধিক নম্বর থেকে যোগাযোগ করা এই ব্যক্তি হলেন জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ৪৫ বছর ধরে পলাতক থাকা সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোজাফফর।
জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনা, বয়ান বা বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে যাওয়া সশস্ত্র সেনা কর্মকর্তাদের একজন ছিলেন মোজাফফর। জিয়াকে হত্যার মুহূর্তে তার কাছেই ছিলেন তিনি। জিয়াউর রহমান হত্যার পর মোজাফফর পালিয়ে যান। তাকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য তখন পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল।

মোজাফফরের ভূমিকা কী ছিল
ব্রিটেনের সানডে টাইমস পত্রিকার সাবেক সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের ‘আ লিগ্যাসি অব ব্লাড’ বইয়ে রাষ্ট্রপতি জিয়াকে হত্যার দিনের ঘটনাপ্রবাহের কিছু বর্ণনা এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘ঘাতকদলের’ নেতৃত্ব দেন লেফটেন্যান্ট কর্নের মতিউর রহমান। তাদের সঙ্গে ছিল ১১টি এসএমজি, তিনটি রকেট লঞ্চার এবং তিনটি গ্রেনেড ফায়ারিং রাইফেল। তিনি ওই সবগুলো অস্ত্রে সঠিকভাবে গোলাবারুদ ভর্তি করা হয়েছে কিনা এবং ঠিকভাবে কাজ করছে কিনা, পরীক্ষা করে নেন। ১৬ জন অফিসারকে একটি পিকআপে গাদাগাদি করে ওঠানো হয়।
চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস এবং থাকার ঘরের একটি নকশা দেখিয়ে মতিউর রহমান অন্যদের পুরো অভিযান পরিকল্পনা বুঝিয়ে দেন। তারপর কোরআন শরীফ হাতে দিয়ে সবাই শপথ নেন– তারা প্রেসিডেন্টকে ‘হাতের মুঠোয় পাওয়ার জন্য’ এগিয়ে যাবেন।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতি ছিলেন দ্বিতীয় দলে। তার সঙ্গে ছিলেন মেজর মোমিন, মেজর মোজাফফর, ক্যাপ্টেন ইলিয়াস, ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন আর লেফটেন্যান্ট মোসলেহউদ্দিন। প্রথম দলটিকে দ্বিতীয় দলটি পেছন থেকে সহায়তা করে। মেজর গিয়াসউদ্দিন আর ফজলুল হক, ক্যাপ্টেন গিয়াসউদ্দিন আর মুনিরকে নিয়ে গঠিত হয় তৃতীয় দল।
রাত সাড়ে ৩টার সামান্য কিছু পরে দল তিনটি কালুরঘাট থেকে প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে আস্তে আস্তে গাড়ি চালিয়ে সামনে এগোতে শুরু করে। যুবক লেফটেন্যান্ট রফিক প্রথম দলের পিকআপে বসে কম্পিত স্বরে কর্নেল ফজলেকে জিজ্ঞেস করেন– ‘আপনারা কি প্রেসিডেন্টকে খুন করতে যাচ্ছেন?’ কর্নেল ফজলে তাকে বলেন, ‘না, আমরা কেবল তাকে তুলে আনতে যাচ্ছি।’
তার ওই কথা থেকে ধারণা পাওয়া যায়, শেষ মুহূর্তেও দলের অনেক সদস্য বিশ্বাস করতেন যে, তারা প্রেসিডেন্টকে তুলে নিয়ে এসে জিম্মি করে রাখতে যাচ্ছেন।
ওই বইয়ে হত্যাকাণ্ডের সময়কার বিবরণ তুলে ধরে অ্যান্থনি মাসকারেনহাস লিখেছেন, ‘মেজর মোজাফফর দৃশ্যতঃ ভয়ে কাঁপছিলেন। মোসলেহউদ্দিন প্রেসিডেন্টকে আশ্বস্ত করতে চাইছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘স্যার, আপনি ঘাবড়াবেন না। এখানে ভয়ের কিছুই নেই।’
‘লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিও কাছাকাছিই ছিলেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট জিয়ার প্রতি তার বিন্দুমাত্র দয়ামায়া ছিল না। তিনি প্রেসিডেন্টকে একটুও সুযোগ দেননি। মোসলেহউদ্দিনের ঠোঁট থেকে জিয়ার প্রতি তার আশ্বাসের বাণী মিলিয়ে যাওয়ার আগেই মতি তার এসএমজি থেকে গুলি চালিয়ে দেন। ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি এসে জিয়ার শরীরের ডান দিক একেবারে ঝাঁঝরা করে ফেলে।
‘দরজার কাছেই জিয়া মুখ-থুবড়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। রক্তের বন্যায় তার সমস্ত শরীর ভেসে যেতে থাকে। খুনের নেশায় ঘাতক মতি পাগল হয়ে ওঠেন। তিনি তার বন্দুকের নল দিয়ে প্রেসিডেন্ট জিয়ার প্রাণহীন দেহ উল্টিয়ে নেন। তারপর জিয়ার মুখমণ্ডল আর বুকের উপর তার এসএমজির ট্রিগার টিপে রেখে ম্যাগজিন খালি করে তার খুনের নেশা মিটিয়ে দেন। গুলির আঘাতে জিয়ার মাথা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।’

হত্যাকাণ্ড শেষে সেনানিবাসে ফেরার পথেও মেজর মোজাফফরের প্রসঙ্গে এসেছে সেই বইয়ে। সেখানে লেখা হয়েছে, ‘জিপে চড়ে ক্যান্টনমেন্টের দিকে যাওয়ার পথে মেজর মোজাফফর ক্ষোভে আর দুঃখে কাঁপতে কাঁপতে লেফটেন্যান্ট মোসলেহউদ্দিনকে বলছিলেন– ‘আমি জানতাম না, আমরা প্রেসিডেন্টকে খুন করতে যাচ্ছি। আমার ধারণা ছিল, আমরা কেবলই প্রেসিডেন্টকে বের করে নিয়ে আসতে যাচ্ছি।’
হত্যাকাণ্ডের কিছু পরের দৃশ্যপট বর্ণনা করে বইয়ে বলা হয়েছে, ‘এক ঘণ্টা পরে তিনজন বিদ্রোহী মেজর ১২ জন সিপাই নিয়ে সার্কিট হাউসে এসে পৌঁছায়। ওই তিনজন হচ্ছেন– মোজাফফর, শওকত আলী এবং রেজা। দুটি জিপ আর একটি আর্মি ভ্যানে করে তারা পূর্ণ অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে এখানে আসেন। গোপন কাগজপত্র এবং জিয়ার ব্যক্তিগত ডায়েরিটি খোঁজার জন্যে তারা প্রেসিডেন্টের শয়নকক্ষ একেবারে তছনছ করে ফেলেন।
‘একটা পুরনো স্যুটকেসে বিদ্রোহীরা জিয়ার সব ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ঢুকিয়ে নেন। তারপর তার লাশ একটি সাদা বিছানার চাদরে মুড়ে ফেলেন। কর্নেল আহসান আর ক্যাপ্টেন হাফিজের লাশও তারা একইভাবে মুড়ে তিনটি লাশ একত্র করে ভ্যানে উঠিয়ে কবর দেওয়ার জন্যে নিয়ে চলে যান। তখন সকাল ৯টা ৩০ মিনিট।’রাষ্ট্রপতি জিয়াকে হত্যার ঘটনায় যুক্ত থাকার অভিযোগে সেসময় সামরিক আদালতে ১৮ জন সেনা কর্মকর্তার বিচার করা হয়। তাদের মধ্যে ১৩ জন সেনা কর্মকর্তার ফাঁসি এবং বাকিদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড হয়। তবে অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া মেজর খালেদ ও মেজর মোজাফফর পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। তাদের দুজনকে ধরিয়ে দিতে সেসময় পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল।
মোজাফফরের পলাতক জীবনের বিষয়ে জানতে চাইলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হত্যাকাণ্ডের পর তিনি প্রথমে গহীন জঙ্গলে আশ্রয় নেন। দীর্ঘদিন পুলিশ ও গোয়েন্দাদের চোখ ফাঁকি দিতে তিনি বিভিন্ন স্থানীয় চক্র ও দালালের সাহায্য নেন। তাদের মাধ্যমে গোপনে সীমান্ত পারি দিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশে পালিয়ে যান। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তিনি দেশে ফিরে আসেন। এরপর থেকে তিনি দেশেই অবস্থান করছিলেন। ছিলেন চুপচাপ। কোনো প্রকাশ্য রাজনৈতিক বা সামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়াননি। তিনি মূলত ঘরের চার দেওয়ালের মাঝেই নিজেকে বন্দি রেখেছিলেন।
মোজাফফর হোসেন এখন সেনাবাহিনীর হেফাজতে রয়েছেন। বিএনপির চেয়ারম্যানের একজন উপদেষ্টা শনিবার (১৮ জুলাই) জানান, অধিকতর তদন্তের জন্য তাকে চট্টগ্রামে নেওয়া হয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, মোজাফফরকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের তদন্তে বড় অগ্রগতি হয়েছে। বিস্তারিত ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য বের করার আগে তার শাস্তি নিশ্চিত করা ঠিক হবে না।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের সময় তার খুব কাছেই ছিলেন মেজর মোজাফফর। হত্যাকাণ্ডের পর ইতিহাসের দৃশ্যপট থেকে একরকম হারিয়েই গিয়েছিলেন তিনি। ঘটনার ৪৫ বছর পর হঠাৎ তার গ্রেপ্তারের ঘটনা সেই হত্যাকাণ্ডকে আবার আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। হত্যার ঘটনায় চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানায় একটি ফৌজদারী মামলা হয়, সেই মামলার ৬ নম্বর আসামি ছিলেন মেজর মোহাম্মদ মোজাফফর হোসেন।
বুধবার (১৫ জুলাই) রাতে বনানী ডিওএইচএস থেকে মোজাফফর হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, যেহেতু তিনি এতদিন পলাতক ছিলেন, নিয়ম অনুযায়ী আগে তাকে তার বাহিনীতে হস্তান্তর করা হয়েছে।
কর্মকর্তারা বলেছেন, মোজাফফরকে শনাক্ত করেছেন মূলত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তকারীরা। জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধের এক মামলায় গ্রেপ্তার সাবেক লেফটেনেন্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দীন চৌধুরীর সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগের সূত্র ধরে প্রথমে মেজর মোজাফফরকে শনাক্ত করা হয়। তারপর একটি মোবাইল অপারেটরে কর্মরত তার এক স্বজনের সূত্র ধরে বাড়িটি শনাক্ত করে বুধবার মধ্যরাতে সেখানে অভিযান চালানো হয়। নাকের নিচে থাকা তিল দেখে চূড়ান্তভাবে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয় মোজাফফর হোসেনকে।
ওয়ান ইলেভেনের সময় আলোচিত সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর ভায়রা সাঈদ এস্কান্দার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মামা এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শ্যালক। ২০০৭-০৮ সময়ে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে গুরুতর অপরাধ দমন-সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। ওই কমিটির নির্দেশে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ রাজনীতিকদের সেসময় আটক করা হয়। তারেক রহমানকেও সেসময় গ্রেপ্তার করার পর জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
মোজাফফর কীভাবে শনাক্ত হলেন, সেই তথ্য জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা। তিনি বলেন, ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মাসুদ উদ্দিনকে মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় গত ৭ মে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২। একই সঙ্গে এই মামলায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদেরও অনুমতি দেওয়া হয়। মামলা তদন্তের অংশ হিসেবে মাসুদ উদ্দিনের মোবাইল ফোনের ফরেনসিক করে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। তার ফোনের সিডিআর (কল ডিটেইল রেকর্ড) নেওয়া হয়। সিডিআরে ২০২৩ সাল থেকে রাজধানীর বনানী ও মিরপুর ডিওএইচএসের একই অবস্থান থেকে একাধিক নম্বরে মাসুদ উদ্দিনের সঙ্গে মুঠোফোনে এক ব্যক্তির কথা বলা ও এসএমএস আদান-প্রদানের তথ্য পাওয়া যায়। ফোনালাপগুলোর সময়কাল ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। পরে দেখা যায়, সিমগুলো ভুয়া নামে নিবন্ধিত।
তানভীর হাসান জোহা বলেন, সন্দেহজনক নম্বরগুলো ব্যবহার করে কে বা কারা মাসুদ উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, তা ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা কিংবা প্রসিকিউশন (রাষ্ট্রপক্ষ) চিহ্নিত করতে পারছিল না। এ কারণে নম্বরগুলো পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়। এ ব্যাপারে পরবর্তী সময়ে পুলিশ নিজেদের মতো কাজ করে। উদ্ঘাটিত হয় মাসুদ উদ্দিনের সঙ্গে একাধিক নম্বর থেকে যোগাযোগ করা এই ব্যক্তি হলেন জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ৪৫ বছর ধরে পলাতক থাকা সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোজাফফর।
জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনা, বয়ান বা বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে যাওয়া সশস্ত্র সেনা কর্মকর্তাদের একজন ছিলেন মোজাফফর। জিয়াকে হত্যার মুহূর্তে তার কাছেই ছিলেন তিনি। জিয়াউর রহমান হত্যার পর মোজাফফর পালিয়ে যান। তাকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য তখন পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল।

মোজাফফরের ভূমিকা কী ছিল
ব্রিটেনের সানডে টাইমস পত্রিকার সাবেক সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের ‘আ লিগ্যাসি অব ব্লাড’ বইয়ে রাষ্ট্রপতি জিয়াকে হত্যার দিনের ঘটনাপ্রবাহের কিছু বর্ণনা এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘ঘাতকদলের’ নেতৃত্ব দেন লেফটেন্যান্ট কর্নের মতিউর রহমান। তাদের সঙ্গে ছিল ১১টি এসএমজি, তিনটি রকেট লঞ্চার এবং তিনটি গ্রেনেড ফায়ারিং রাইফেল। তিনি ওই সবগুলো অস্ত্রে সঠিকভাবে গোলাবারুদ ভর্তি করা হয়েছে কিনা এবং ঠিকভাবে কাজ করছে কিনা, পরীক্ষা করে নেন। ১৬ জন অফিসারকে একটি পিকআপে গাদাগাদি করে ওঠানো হয়।
চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস এবং থাকার ঘরের একটি নকশা দেখিয়ে মতিউর রহমান অন্যদের পুরো অভিযান পরিকল্পনা বুঝিয়ে দেন। তারপর কোরআন শরীফ হাতে দিয়ে সবাই শপথ নেন– তারা প্রেসিডেন্টকে ‘হাতের মুঠোয় পাওয়ার জন্য’ এগিয়ে যাবেন।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতি ছিলেন দ্বিতীয় দলে। তার সঙ্গে ছিলেন মেজর মোমিন, মেজর মোজাফফর, ক্যাপ্টেন ইলিয়াস, ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন আর লেফটেন্যান্ট মোসলেহউদ্দিন। প্রথম দলটিকে দ্বিতীয় দলটি পেছন থেকে সহায়তা করে। মেজর গিয়াসউদ্দিন আর ফজলুল হক, ক্যাপ্টেন গিয়াসউদ্দিন আর মুনিরকে নিয়ে গঠিত হয় তৃতীয় দল।
রাত সাড়ে ৩টার সামান্য কিছু পরে দল তিনটি কালুরঘাট থেকে প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে আস্তে আস্তে গাড়ি চালিয়ে সামনে এগোতে শুরু করে। যুবক লেফটেন্যান্ট রফিক প্রথম দলের পিকআপে বসে কম্পিত স্বরে কর্নেল ফজলেকে জিজ্ঞেস করেন– ‘আপনারা কি প্রেসিডেন্টকে খুন করতে যাচ্ছেন?’ কর্নেল ফজলে তাকে বলেন, ‘না, আমরা কেবল তাকে তুলে আনতে যাচ্ছি।’
তার ওই কথা থেকে ধারণা পাওয়া যায়, শেষ মুহূর্তেও দলের অনেক সদস্য বিশ্বাস করতেন যে, তারা প্রেসিডেন্টকে তুলে নিয়ে এসে জিম্মি করে রাখতে যাচ্ছেন।
ওই বইয়ে হত্যাকাণ্ডের সময়কার বিবরণ তুলে ধরে অ্যান্থনি মাসকারেনহাস লিখেছেন, ‘মেজর মোজাফফর দৃশ্যতঃ ভয়ে কাঁপছিলেন। মোসলেহউদ্দিন প্রেসিডেন্টকে আশ্বস্ত করতে চাইছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘স্যার, আপনি ঘাবড়াবেন না। এখানে ভয়ের কিছুই নেই।’
‘লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিও কাছাকাছিই ছিলেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট জিয়ার প্রতি তার বিন্দুমাত্র দয়ামায়া ছিল না। তিনি প্রেসিডেন্টকে একটুও সুযোগ দেননি। মোসলেহউদ্দিনের ঠোঁট থেকে জিয়ার প্রতি তার আশ্বাসের বাণী মিলিয়ে যাওয়ার আগেই মতি তার এসএমজি থেকে গুলি চালিয়ে দেন। ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি এসে জিয়ার শরীরের ডান দিক একেবারে ঝাঁঝরা করে ফেলে।
‘দরজার কাছেই জিয়া মুখ-থুবড়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। রক্তের বন্যায় তার সমস্ত শরীর ভেসে যেতে থাকে। খুনের নেশায় ঘাতক মতি পাগল হয়ে ওঠেন। তিনি তার বন্দুকের নল দিয়ে প্রেসিডেন্ট জিয়ার প্রাণহীন দেহ উল্টিয়ে নেন। তারপর জিয়ার মুখমণ্ডল আর বুকের উপর তার এসএমজির ট্রিগার টিপে রেখে ম্যাগজিন খালি করে তার খুনের নেশা মিটিয়ে দেন। গুলির আঘাতে জিয়ার মাথা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।’

হত্যাকাণ্ড শেষে সেনানিবাসে ফেরার পথেও মেজর মোজাফফরের প্রসঙ্গে এসেছে সেই বইয়ে। সেখানে লেখা হয়েছে, ‘জিপে চড়ে ক্যান্টনমেন্টের দিকে যাওয়ার পথে মেজর মোজাফফর ক্ষোভে আর দুঃখে কাঁপতে কাঁপতে লেফটেন্যান্ট মোসলেহউদ্দিনকে বলছিলেন– ‘আমি জানতাম না, আমরা প্রেসিডেন্টকে খুন করতে যাচ্ছি। আমার ধারণা ছিল, আমরা কেবলই প্রেসিডেন্টকে বের করে নিয়ে আসতে যাচ্ছি।’
হত্যাকাণ্ডের কিছু পরের দৃশ্যপট বর্ণনা করে বইয়ে বলা হয়েছে, ‘এক ঘণ্টা পরে তিনজন বিদ্রোহী মেজর ১২ জন সিপাই নিয়ে সার্কিট হাউসে এসে পৌঁছায়। ওই তিনজন হচ্ছেন– মোজাফফর, শওকত আলী এবং রেজা। দুটি জিপ আর একটি আর্মি ভ্যানে করে তারা পূর্ণ অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে এখানে আসেন। গোপন কাগজপত্র এবং জিয়ার ব্যক্তিগত ডায়েরিটি খোঁজার জন্যে তারা প্রেসিডেন্টের শয়নকক্ষ একেবারে তছনছ করে ফেলেন।
‘একটা পুরনো স্যুটকেসে বিদ্রোহীরা জিয়ার সব ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ঢুকিয়ে নেন। তারপর তার লাশ একটি সাদা বিছানার চাদরে মুড়ে ফেলেন। কর্নেল আহসান আর ক্যাপ্টেন হাফিজের লাশও তারা একইভাবে মুড়ে তিনটি লাশ একত্র করে ভ্যানে উঠিয়ে কবর দেওয়ার জন্যে নিয়ে চলে যান। তখন সকাল ৯টা ৩০ মিনিট।’রাষ্ট্রপতি জিয়াকে হত্যার ঘটনায় যুক্ত থাকার অভিযোগে সেসময় সামরিক আদালতে ১৮ জন সেনা কর্মকর্তার বিচার করা হয়। তাদের মধ্যে ১৩ জন সেনা কর্মকর্তার ফাঁসি এবং বাকিদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড হয়। তবে অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া মেজর খালেদ ও মেজর মোজাফফর পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। তাদের দুজনকে ধরিয়ে দিতে সেসময় পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল।
মোজাফফরের পলাতক জীবনের বিষয়ে জানতে চাইলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হত্যাকাণ্ডের পর তিনি প্রথমে গহীন জঙ্গলে আশ্রয় নেন। দীর্ঘদিন পুলিশ ও গোয়েন্দাদের চোখ ফাঁকি দিতে তিনি বিভিন্ন স্থানীয় চক্র ও দালালের সাহায্য নেন। তাদের মাধ্যমে গোপনে সীমান্ত পারি দিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশে পালিয়ে যান। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তিনি দেশে ফিরে আসেন। এরপর থেকে তিনি দেশেই অবস্থান করছিলেন। ছিলেন চুপচাপ। কোনো প্রকাশ্য রাজনৈতিক বা সামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়াননি। তিনি মূলত ঘরের চার দেওয়ালের মাঝেই নিজেকে বন্দি রেখেছিলেন।
মোজাফফর হোসেন এখন সেনাবাহিনীর হেফাজতে রয়েছেন। বিএনপির চেয়ারম্যানের একজন উপদেষ্টা শনিবার (১৮ জুলাই) জানান, অধিকতর তদন্তের জন্য তাকে চট্টগ্রামে নেওয়া হয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, মোজাফফরকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের তদন্তে বড় অগ্রগতি হয়েছে। বিস্তারিত ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য বের করার আগে তার শাস্তি নিশ্চিত করা ঠিক হবে না।

মেজর মোজাফফর গ্রেপ্তারে আবার আলোচনায় ‘জিয়া হত্যাকাণ্ড’
নিজস্ব প্রতিবেদক

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের সময় তার খুব কাছেই ছিলেন মেজর মোজাফফর। হত্যাকাণ্ডের পর ইতিহাসের দৃশ্যপট থেকে একরকম হারিয়েই গিয়েছিলেন তিনি। ঘটনার ৪৫ বছর পর হঠাৎ তার গ্রেপ্তারের ঘটনা সেই হত্যাকাণ্ডকে আবার আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। হত্যার ঘটনায় চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানায় একটি ফৌজদারী মামলা হয়, সেই মামলার ৬ নম্বর আসামি ছিলেন মেজর মোহাম্মদ মোজাফফর হোসেন।
বুধবার (১৫ জুলাই) রাতে বনানী ডিওএইচএস থেকে মোজাফফর হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, যেহেতু তিনি এতদিন পলাতক ছিলেন, নিয়ম অনুযায়ী আগে তাকে তার বাহিনীতে হস্তান্তর করা হয়েছে।
কর্মকর্তারা বলেছেন, মোজাফফরকে শনাক্ত করেছেন মূলত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তকারীরা। জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধের এক মামলায় গ্রেপ্তার সাবেক লেফটেনেন্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দীন চৌধুরীর সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগের সূত্র ধরে প্রথমে মেজর মোজাফফরকে শনাক্ত করা হয়। তারপর একটি মোবাইল অপারেটরে কর্মরত তার এক স্বজনের সূত্র ধরে বাড়িটি শনাক্ত করে বুধবার মধ্যরাতে সেখানে অভিযান চালানো হয়। নাকের নিচে থাকা তিল দেখে চূড়ান্তভাবে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয় মোজাফফর হোসেনকে।
ওয়ান ইলেভেনের সময় আলোচিত সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর ভায়রা সাঈদ এস্কান্দার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মামা এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শ্যালক। ২০০৭-০৮ সময়ে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে গুরুতর অপরাধ দমন-সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। ওই কমিটির নির্দেশে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ রাজনীতিকদের সেসময় আটক করা হয়। তারেক রহমানকেও সেসময় গ্রেপ্তার করার পর জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
মোজাফফর কীভাবে শনাক্ত হলেন, সেই তথ্য জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা। তিনি বলেন, ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মাসুদ উদ্দিনকে মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় গত ৭ মে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২। একই সঙ্গে এই মামলায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদেরও অনুমতি দেওয়া হয়। মামলা তদন্তের অংশ হিসেবে মাসুদ উদ্দিনের মোবাইল ফোনের ফরেনসিক করে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। তার ফোনের সিডিআর (কল ডিটেইল রেকর্ড) নেওয়া হয়। সিডিআরে ২০২৩ সাল থেকে রাজধানীর বনানী ও মিরপুর ডিওএইচএসের একই অবস্থান থেকে একাধিক নম্বরে মাসুদ উদ্দিনের সঙ্গে মুঠোফোনে এক ব্যক্তির কথা বলা ও এসএমএস আদান-প্রদানের তথ্য পাওয়া যায়। ফোনালাপগুলোর সময়কাল ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। পরে দেখা যায়, সিমগুলো ভুয়া নামে নিবন্ধিত।
তানভীর হাসান জোহা বলেন, সন্দেহজনক নম্বরগুলো ব্যবহার করে কে বা কারা মাসুদ উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, তা ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা কিংবা প্রসিকিউশন (রাষ্ট্রপক্ষ) চিহ্নিত করতে পারছিল না। এ কারণে নম্বরগুলো পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়। এ ব্যাপারে পরবর্তী সময়ে পুলিশ নিজেদের মতো কাজ করে। উদ্ঘাটিত হয় মাসুদ উদ্দিনের সঙ্গে একাধিক নম্বর থেকে যোগাযোগ করা এই ব্যক্তি হলেন জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ৪৫ বছর ধরে পলাতক থাকা সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোজাফফর।
জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনা, বয়ান বা বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে যাওয়া সশস্ত্র সেনা কর্মকর্তাদের একজন ছিলেন মোজাফফর। জিয়াকে হত্যার মুহূর্তে তার কাছেই ছিলেন তিনি। জিয়াউর রহমান হত্যার পর মোজাফফর পালিয়ে যান। তাকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য তখন পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল।

মোজাফফরের ভূমিকা কী ছিল
ব্রিটেনের সানডে টাইমস পত্রিকার সাবেক সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের ‘আ লিগ্যাসি অব ব্লাড’ বইয়ে রাষ্ট্রপতি জিয়াকে হত্যার দিনের ঘটনাপ্রবাহের কিছু বর্ণনা এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘ঘাতকদলের’ নেতৃত্ব দেন লেফটেন্যান্ট কর্নের মতিউর রহমান। তাদের সঙ্গে ছিল ১১টি এসএমজি, তিনটি রকেট লঞ্চার এবং তিনটি গ্রেনেড ফায়ারিং রাইফেল। তিনি ওই সবগুলো অস্ত্রে সঠিকভাবে গোলাবারুদ ভর্তি করা হয়েছে কিনা এবং ঠিকভাবে কাজ করছে কিনা, পরীক্ষা করে নেন। ১৬ জন অফিসারকে একটি পিকআপে গাদাগাদি করে ওঠানো হয়।
চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস এবং থাকার ঘরের একটি নকশা দেখিয়ে মতিউর রহমান অন্যদের পুরো অভিযান পরিকল্পনা বুঝিয়ে দেন। তারপর কোরআন শরীফ হাতে দিয়ে সবাই শপথ নেন– তারা প্রেসিডেন্টকে ‘হাতের মুঠোয় পাওয়ার জন্য’ এগিয়ে যাবেন।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতি ছিলেন দ্বিতীয় দলে। তার সঙ্গে ছিলেন মেজর মোমিন, মেজর মোজাফফর, ক্যাপ্টেন ইলিয়াস, ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন আর লেফটেন্যান্ট মোসলেহউদ্দিন। প্রথম দলটিকে দ্বিতীয় দলটি পেছন থেকে সহায়তা করে। মেজর গিয়াসউদ্দিন আর ফজলুল হক, ক্যাপ্টেন গিয়াসউদ্দিন আর মুনিরকে নিয়ে গঠিত হয় তৃতীয় দল।
রাত সাড়ে ৩টার সামান্য কিছু পরে দল তিনটি কালুরঘাট থেকে প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে আস্তে আস্তে গাড়ি চালিয়ে সামনে এগোতে শুরু করে। যুবক লেফটেন্যান্ট রফিক প্রথম দলের পিকআপে বসে কম্পিত স্বরে কর্নেল ফজলেকে জিজ্ঞেস করেন– ‘আপনারা কি প্রেসিডেন্টকে খুন করতে যাচ্ছেন?’ কর্নেল ফজলে তাকে বলেন, ‘না, আমরা কেবল তাকে তুলে আনতে যাচ্ছি।’
তার ওই কথা থেকে ধারণা পাওয়া যায়, শেষ মুহূর্তেও দলের অনেক সদস্য বিশ্বাস করতেন যে, তারা প্রেসিডেন্টকে তুলে নিয়ে এসে জিম্মি করে রাখতে যাচ্ছেন।
ওই বইয়ে হত্যাকাণ্ডের সময়কার বিবরণ তুলে ধরে অ্যান্থনি মাসকারেনহাস লিখেছেন, ‘মেজর মোজাফফর দৃশ্যতঃ ভয়ে কাঁপছিলেন। মোসলেহউদ্দিন প্রেসিডেন্টকে আশ্বস্ত করতে চাইছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘স্যার, আপনি ঘাবড়াবেন না। এখানে ভয়ের কিছুই নেই।’
‘লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিও কাছাকাছিই ছিলেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট জিয়ার প্রতি তার বিন্দুমাত্র দয়ামায়া ছিল না। তিনি প্রেসিডেন্টকে একটুও সুযোগ দেননি। মোসলেহউদ্দিনের ঠোঁট থেকে জিয়ার প্রতি তার আশ্বাসের বাণী মিলিয়ে যাওয়ার আগেই মতি তার এসএমজি থেকে গুলি চালিয়ে দেন। ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি এসে জিয়ার শরীরের ডান দিক একেবারে ঝাঁঝরা করে ফেলে।
‘দরজার কাছেই জিয়া মুখ-থুবড়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। রক্তের বন্যায় তার সমস্ত শরীর ভেসে যেতে থাকে। খুনের নেশায় ঘাতক মতি পাগল হয়ে ওঠেন। তিনি তার বন্দুকের নল দিয়ে প্রেসিডেন্ট জিয়ার প্রাণহীন দেহ উল্টিয়ে নেন। তারপর জিয়ার মুখমণ্ডল আর বুকের উপর তার এসএমজির ট্রিগার টিপে রেখে ম্যাগজিন খালি করে তার খুনের নেশা মিটিয়ে দেন। গুলির আঘাতে জিয়ার মাথা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।’

হত্যাকাণ্ড শেষে সেনানিবাসে ফেরার পথেও মেজর মোজাফফরের প্রসঙ্গে এসেছে সেই বইয়ে। সেখানে লেখা হয়েছে, ‘জিপে চড়ে ক্যান্টনমেন্টের দিকে যাওয়ার পথে মেজর মোজাফফর ক্ষোভে আর দুঃখে কাঁপতে কাঁপতে লেফটেন্যান্ট মোসলেহউদ্দিনকে বলছিলেন– ‘আমি জানতাম না, আমরা প্রেসিডেন্টকে খুন করতে যাচ্ছি। আমার ধারণা ছিল, আমরা কেবলই প্রেসিডেন্টকে বের করে নিয়ে আসতে যাচ্ছি।’
হত্যাকাণ্ডের কিছু পরের দৃশ্যপট বর্ণনা করে বইয়ে বলা হয়েছে, ‘এক ঘণ্টা পরে তিনজন বিদ্রোহী মেজর ১২ জন সিপাই নিয়ে সার্কিট হাউসে এসে পৌঁছায়। ওই তিনজন হচ্ছেন– মোজাফফর, শওকত আলী এবং রেজা। দুটি জিপ আর একটি আর্মি ভ্যানে করে তারা পূর্ণ অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে এখানে আসেন। গোপন কাগজপত্র এবং জিয়ার ব্যক্তিগত ডায়েরিটি খোঁজার জন্যে তারা প্রেসিডেন্টের শয়নকক্ষ একেবারে তছনছ করে ফেলেন।
‘একটা পুরনো স্যুটকেসে বিদ্রোহীরা জিয়ার সব ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ঢুকিয়ে নেন। তারপর তার লাশ একটি সাদা বিছানার চাদরে মুড়ে ফেলেন। কর্নেল আহসান আর ক্যাপ্টেন হাফিজের লাশও তারা একইভাবে মুড়ে তিনটি লাশ একত্র করে ভ্যানে উঠিয়ে কবর দেওয়ার জন্যে নিয়ে চলে যান। তখন সকাল ৯টা ৩০ মিনিট।’রাষ্ট্রপতি জিয়াকে হত্যার ঘটনায় যুক্ত থাকার অভিযোগে সেসময় সামরিক আদালতে ১৮ জন সেনা কর্মকর্তার বিচার করা হয়। তাদের মধ্যে ১৩ জন সেনা কর্মকর্তার ফাঁসি এবং বাকিদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড হয়। তবে অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া মেজর খালেদ ও মেজর মোজাফফর পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। তাদের দুজনকে ধরিয়ে দিতে সেসময় পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল।
মোজাফফরের পলাতক জীবনের বিষয়ে জানতে চাইলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হত্যাকাণ্ডের পর তিনি প্রথমে গহীন জঙ্গলে আশ্রয় নেন। দীর্ঘদিন পুলিশ ও গোয়েন্দাদের চোখ ফাঁকি দিতে তিনি বিভিন্ন স্থানীয় চক্র ও দালালের সাহায্য নেন। তাদের মাধ্যমে গোপনে সীমান্ত পারি দিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশে পালিয়ে যান। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তিনি দেশে ফিরে আসেন। এরপর থেকে তিনি দেশেই অবস্থান করছিলেন। ছিলেন চুপচাপ। কোনো প্রকাশ্য রাজনৈতিক বা সামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়াননি। তিনি মূলত ঘরের চার দেওয়ালের মাঝেই নিজেকে বন্দি রেখেছিলেন।
মোজাফফর হোসেন এখন সেনাবাহিনীর হেফাজতে রয়েছেন। বিএনপির চেয়ারম্যানের একজন উপদেষ্টা শনিবার (১৮ জুলাই) জানান, অধিকতর তদন্তের জন্য তাকে চট্টগ্রামে নেওয়া হয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, মোজাফফরকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের তদন্তে বড় অগ্রগতি হয়েছে। বিস্তারিত ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য বের করার আগে তার শাস্তি নিশ্চিত করা ঠিক হবে না।

৪৫ বছর কোথায় ছিলেন জিয়া হত্যা মামলার আসামি মোজাফফর







