শিরোনাম

নামেই মশক নিবারণী দপ্তর, নেই মশা নিধনের ক্ষমতা

নামেই  মশক নিবারণী দপ্তর, নেই মশা নিধনের ক্ষমতা
রাজধানীর লালবাগের নূর ফাতাহ লেনে মশক নিবারণী দপ্তর ছবি: সিটিজেন জার্নাল

মশার উপদ্রব অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। শহর, নগর, গ্রাম- সবখানেই মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ মানুষ। মশার কামড়ে ত্বক ফুলে যাওয়া, তীব্র চুলকানি ও অস্বস্তি এখন নগরবাসীর নিত্যসঙ্গী। দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর উদাসীনতা এবং মাঠপর্যায়ের দৃশ্যমান মশা নিধন কর্মসূচি না থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে বলে অভিযোগ করেছে নগরবাসী।

মশার উৎপাত ও প্রজনন বন্ধে সরকারি একটি প্রতিষ্ঠান আছে। এর নাম ঢাকা মশক নিবারণী দপ্তর। শুধুই নামেই যেন সীমাবদ্ধ এই দপ্তরের কার্যক্রম। এটি অনেকটা বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক ও ছড়াকার সুকুমার রায়ের সেই ছড়া ‘বাপুরাম সাপুরে’-এর মতো। এই ছড়ায় সুকুমার রায় কিছু সাপের কথা উল্লেখ করেছেন যেগুলো মানুষকে কামড় দেওয়া না, ফোঁস ফাঁসও করে না। আসলে পর্যাপ্ত জনবল ও মশা নিধনের ওষুধ ও সরঞ্জাম না থাকায় এ কার্যালয় অনেকটা সুকুমার রায়ের ছড়ার ওই সাপগুলোর মতো অচল বা অকার্যকর হয়ে গেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, রাজধানীর লালবাগে অবস্থিত এই দপ্তরের নিচতলার গুদামগুলোতে কিছু মশা মারার ওষুধ মজুত আছে। তবে এ গুদামের চাবি এই দপ্তরের কারও কাছে নেই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কর্মকর্তারা জানালেন, দুটি গুদামই সিটি করপোরেশন মশার ওষুধ মজুত করে রাখা হয়েছে। চাবি তারাই নিয়ে গেছে। দোতলায় মোট কক্ষ নয়টি। আছে মিলনায়তন। এর মধ্যে চারটি কক্ষ ছাড়া বাকিগুলো বন্ধ।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দপ্তরটি সারা দেশে মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাদের মতে, মশক নিবারণী দপ্তরকে একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ দপ্তরে রূপান্তর করার সুযোগ রয়েছে। এখানে মশার বংশবিস্তার নিয়ে গবেষণাগার, পরীক্ষাগার এবং মশা নিয়ন্ত্রণে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি থাকা উচিত। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারাও এটাকে একটি গবেষণাগার এবং পরীক্ষাগার হিসেবে রূপ দিতে পরিকল্পনা করেছেন বলে জানা গেছে।

ঢাকা মশক নিবারণী দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে,এ খানে মোট কর্মকর্তা-কর্মচারী ২০০ জন। তাদের বেতন-ভাতা হয় রাজস্ব খাত থেকে। এখন দেশজুড়ে মশার উৎপাত বেড়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ এই দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মশা নিধনে জোরালোভাবে কাজ করার কথা। কিন্তু তা তারা করছেন কেনো করছেন না জানতে চাইলে এক কর্মকর্তা বলেন, মশা নিধনে ওষুধ কেনা, সংরক্ষণ, মজুত ও ছিটানোর কোনো দায়িত্ব সরাসরি পালন করার ক্ষমতা নেই এ দপ্তরের। মশক নিধনের জন্য বাজেট নেই।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,লালবাগের নূর ফাতাহ লেনে এক একর ৩৯ শতাংশ জমির ওপর ১৯৪৮ সালে ঢাকা মশক নিবারণী দপ্তর প্রতিষ্ঠা করে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার। সে সময় ম্যালেরিয়া মোকাবিলায় পুরো ভূমিকাই রাখত এই দপ্তর। সে সময় এখানে পর্যাপ্ত জনবল ছিল। মশা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত প্রতিষ্ঠানটি। ১৯৭২ সালে দপ্তরটির ৩৩৮ জনবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেয় সরকার। ১৯৮৪ সালে দপ্তরটিকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিয়ে আসা হয়। তখন ঢাকা সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে দেওয়া হয় প্রতিষ্ঠানটিকে।

তবে ২০১১ সালে জাতীয় সংসদে স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) সংশোধনী বিল পাসের মাধ্যমে ঢাকা সিটি করপোরেশন বিলুপ্ত করে ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নামে স্বতন্ত্র দুটি করপোরেশন গঠন হয়। এরপর থেকে ‘ঢাকা মশক নিবারণী দপ্তর’ দুই করপোরেশনের সঙ্গে মিলে কাজ করছে।

ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা

কোনো এলাকায় মশার প্রজননস্থল খুঁজে পেলেও সেই বাড়ির মালিক বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা এই দপ্তরের নেই। তাদের কেবল ‘পরামর্শ’ দেওয়ার অধিকার আছে।

বর্তমানে মশা নিধনের মূল কাজ ও বাজেট নিয়ন্ত্রণ করে সিটি করপোরেশন। মশক নিবারণী দপ্তর কেবল তাদের কর্মী সরবরাহকারী একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। এ ছাড়া দপ্তরটি এখনো কয়েক দশকের পুরোনো বিধিমালায় চলছে। আধুনিক যুগের ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়ার মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাদের জনকাঠামোতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।

জনবল ও সরঞ্জাম সংকট

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দপ্তরে অনুমোদিত পদের বড় একটি অংশই শূন্য। যারা কর্মরত আছেন তাদের অনেকেরই মশক নিধনের আধুনিক পদ্ধতি বা কীটনাশক ব্যবহারের ওপর সঠিক প্রশিক্ষণ নেই। এ ছাড়া ব্যবহৃত ফগার মেশিন বা স্প্রে মেশিনগুলোর অধিকাংশই পুরোনো ও বিকল।

ঢাকা মশক নিবারণী দপ্তরের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. জামাল উদ্দিন সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘বর্তমানে এ দপ্তর নামেই ‘মশক নিবারনী দপ্তর’ কিন্তু বাস্তবে আমরা মশা মারতে পারি না। কারণ আমাদের কোন যন্ত্রপাতি নেই, কীটনাশক নেই। আমাদের তো একটা দৃশ্যমান কাজে আসতে হবে। ফলে আমাদের অর্গানোগ্রাম (জনবলকাঠামো) পরিবর্তন করতে হবে। এজন্য দপ্তর নিয়ে একটি প্রস্তাব প্রস্তুত করা হয়েছে। শিগগিরই তা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।’

জামাল উদ্দিন আরও বলেন, প্র‘তিবছরই মশা বাড়ছে। ওষুধ ছিটানো হচ্ছে, কিন্তু মশা মরছে না। কেনো মরছে না সে বিষয়ে একটি যথাযথ গবেষণা হওয়া দরকার। অথচ উত্তর বা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কোথাও গবেষণার ব্যবস্থা নেই। বিষয়গুলো নিয়ে আমরা প্রস্তাব দিয়েছি যে, আমাদের বিধি সংশোধন করে দপ্তরকে আরো গতিশীল করা যায় কিভাবে- সে ব্যবস্থা করতে হবে।’

দপ্তরের বাজেটের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মশক নিধনের জন্য আমাদের আলাদা কোনো বাজেট নেই। কর্মকর্তা- কর্মচারীদের বেতন, ভাতা, অফিস খরচের জন্য বাজেট দেওয়া হয়। আমাদের সর্বশেষ ১১ কোটি ৮৩ লাখ টাকার বাজেট দেওয়া হয়েছে।’

যদিও রাজধানী ঢাকায় উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় মশা নিধনের জন্য বেশ কিছু কার্যক্রম হাতে নিয়েছে নতুন সরকার। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের আওতায় মাসব্যাপী বিশেষ পরিচ্ছন্নতা ও ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ শুরু করেছে। তবে এই নগরীতে মশার উপদ্রব বাড়লে সাধারণ মানুষের সব ক্ষোভ গিয়ে পড়ে মশক নিবারণী দপ্তরের ওপর। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মশা নিধনের এই বিশেষায়িত দপ্তরটি নিজেই এখন অচল হয়ে আছে।

/বিবি/