শিরোনাম

জরিমানার বিধান রেখে আসছে নতুন ভিসানীতি

বিশেষ প্রতিনিধি
বিশেষ প্রতিনিধি
জরিমানার বিধান রেখে আসছে নতুন ভিসানীতি
প্রতীকী ছবি

বিভিন্ন হারে জরিমানার বিধান রেখে নতুন ‘ভিসা পলিসি ২০২৬’ চালু করতে যাচ্ছে সরকার। এতে বিদেশিদের বাংলাদেশে প্রবেশ, অবস্থান, ভিসা নবায়ন ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে থাকছে নতুন সব বিধান। সম্প্রতি নতুন এই ভিসা নীতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়েছে। যা অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে জানা গেছে।

নতুন ভিসা নীতি অনুযায়ী, বিদেশি নাগরিকদের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বেআইনিভাবে বাংলাদেশ অবস্থান করলে দৈনিক হারে আর্থিক জরিমানা, নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে তাদের স্পনসর প্রতিষ্ঠানকেও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। আর বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে থাকছে বিশেষ ব্যবস্থা। এছাড়া, ভারত ও পাকিস্তানের নাগরিকদের বাংলাদেশে আসার পর নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে এই নতুন ভিসা নীতিতে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন নীতিমালায় পর্যটন ও ব্যবসার জন্য নির্দিষ্ট দেশের নাগরিকদের ৩০ দিনের ‘অন অ্যারাইভাল ভিসা’, ট্রানজিট ভিসা সর্বোচ্চ ৭২ ঘণ্টা এবং নিরাপত্তা সংস্থার ভিসা-সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য সর্বোচ্চ ২১ কর্মদিবস সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশি সাংবাদিকদের বাংলাদেশে চলচ্চিত্র বা তথ্যচিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রেও নতুন শর্ত আরোপ করা হয়েছে।

তবে নতুন এই ভিসা নীতি কার্যকর হলেও যেসব নীতির আওতায় আগে ইস্যু করা হয়েছিল, ভিসা মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত সেসব নীতি বৈধ থাকবে।

ওভারস্টেতে কড়াকড়ি ও নতুন জরিমানা কাঠামো

নতুন নীতিমালায় বৈধ ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে আসার পর মেয়াদ শেষে ওভারস্টে করতে নির্দিষ্ট জরিমানা দিয়ে অবস্থান নিয়মিত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। প্রথম ১৫ দিন অবৈধ অবস্থানের জন্য প্রতিদিন এক হাজার টাকা এবং ১৫ দিনের বেশি হলে প্রতিদিন দুই হাজার টাকা করে জরিমানা দিতে হবে, যা সর্বোচ্চ ৯০ দিন পর্যন্ত প্রযোজ্য।

তবে ৯০ দিনের বেশি অবৈধ অবস্থান করলে প্রতিদিন তিন হাজার টাকা হারে জরিমানা আদায় করা হবে। একই সঙ্গে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে ১৯৪৬ সালের ফরেনার্স অ্যাক্ট (বিদেশি নাগরিক আইন) অনুযায়ী আদালতে মামলা করার বিধানও রয়েছে। তবে, অসুস্থতা বা অনিবার্য কারণে মেয়াদ বাড়লে মওকুফের সুযোগ থাকছে।

এদিকে, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিদেশি নাগরিক, বাংলাদেশি নাগরিকের বিদেশি স্বামী বা স্ত্রী ও সন্তানদের জরিমানা মওকুফের বিধান রাখা হয়েছে নতুন ভিসা নীতিমালায়। পাশাপাশি বিদেশি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ তিন মাস পর্যন্ত জরিমানা মওকুফের সুযোগ রাখা হয়েছে।

তবে, তিন মাসের বেশি হলে দৈনিক তিন হাজার টাকা জরিমানা এবং ছয় মাসের বেশি হলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা কার্যকর হবে। অসুস্থতার কারণে কেউ অবৈধ অবস্থানে পড়লে চিকিৎসা সনদের ভিত্তিতে জরিমানা মওকুফের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠানোর সুযোগ রয়েছে। এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দুর্ঘটনা বা ফ্লাইট বাতিলের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে অবস্থান দীর্ঘ হলে তা অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে না।

ভারত ও পাকিস্তানের নাগরিকদের নিবন্ধন

নতুন নিয়মানুযায়ী, ভারত ও পাকিস্তান থেকে ৯০ দিন বা তার বেশি মেয়াদের ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে আসা ব্যক্তিদের প্রবেশের ১৪ দিনের মধ্যে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছে নিবন্ধন করতে হবে। তবে, এই দুই দেশ ছাড়া অন্যান্য দেশের নাগরিকদের জন্য এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়।

বিনিয়োগকারীদের জন্য এনভিআর সুবিধা

নতুন নীতিতে বাংলাদেশের ভারী শিল্পে অন্তত ৫০ লাখ মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করলে বিদেশি উদ্যোক্তারা ‘নো ভিসা রিকোয়ার্ড’ (এনভিআর) সুবিধা পাবেন, তবে তাদের অর্থায়নের উৎস ও ব্যাকগ্রাউন্ড কঠোরভাবে যাচাই করা হবে।পাশাপাশি আবেদনের সঙ্গে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বেপজা, বেজা কিংবা সংশ্লিষ্ট সরকারি বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষের সনদ জমা দিতে হবে।

তবে, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কোনো বিদেশি নাগরিক কিংবা তাদের স্বামী বা স্ত্রী ও সন্তানরা যদি বিনিয়োগের ভিত্তিতে বিদেশের নাগরিকত্ব বা স্থায়ী বসবাসের সুযোগ পেয়ে থাকেন, তবে তাদের ক্ষেত্রে এনভিআর পাওয়ার আগে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এবং আইনশৃঙ্খলা ও তদন্তকারী সংস্থার ইতিবাচক প্রতিবেদন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

এছাড়া, সরকারি আমন্ত্রণে আসা বিনিয়োগকারী ও উন্নয়ন অংশীদার, যেসব দেশে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশন নেই সেসব দেশের নাগরিক, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিদেশি ও তাদের পরিজন, বাংলাদেশে কর্মরত কূটনৈতিক মিশন ও জাতিসংঘের কর্মকর্তা এবং কূটনৈতিক/জাতিসংঘের পাসপোর্টধারীরাও এনভিআর সুবিধা পাবেন।

পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু দেশের নাগরিকেরা পর্যটন ও ব্যবসার উদ্দেশ্যে ৩০ দিনের জন্য একবার প্রবেশের ক্ষেত্রে ‘ভিসা অন অ্যারাইভাল’ সুবিধা পাবেন। এ তালিকায় রয়েছে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ব্রুনেই, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান, বাহরাইন, মিসর, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, রাশিয়া, তুরস্ক, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ।

এছাড়া, সংযোগকারী ফ্লাইটের জন্য ট্রানজিট ভিসা দেওয়া যাবে, যার সর্বোচ্চ মেয়াদ হবে ৭২ ঘণ্টা এবং ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ মার্কিন ডলার বা সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। ভিসার মেয়াদ বাড়াতে হলে মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত ১৫ দিন আগে আবেদন করতে হবে। মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আবেদন করলে ওভারস্টের জন্য নির্ধারিত জরিমানা প্রযোজ্য হবে। তবে ভিসার আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে ভিসা ফি ফেরত দেওয়া হবে না।

একই সঙ্গে পুরোনো পাসপোর্টে থাকা বৈধ ভিসা আবেদনের মাধ্যমে নতুন পাসপোর্টে স্থানান্তরের সুযোগও রাখা হয়েছে।

২১ কর্মদিবসের মধ্যেই নিরাপত্তা প্রতিবেদন

এদিকে, ভিসা ইস্যু বা মেয়াদ বাড়ানোর ক্ষেত্রে নিরাপত্তা প্রতিবেদন প্রয়োজন হলে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে (বিশেষ শাখা বা এনএসআই) সংশ্লিষ্ট ভিসা কর্তৃপক্ষের অনুরোধ পাওয়ার পর ২১ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন না এলে সংশ্লিষ্ট সংস্থার আপত্তি নেই ধরে ভিসা কর্তৃপক্ষ যথাযথ সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। তবে ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে নিরাপত্তা সংস্থার এমন মতামত প্রয়োজন হবে না।

তথ্য গোপনে শাস্তির আওতায় আসবে স্পনসর প্রতিষ্ঠান

নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, ব্যবসা কিংবা শিক্ষার উদ্দেশ্যে আসা কোনো বিদেশি নাগরিক যদি ভিসার আবেদনে তথ্য গোপন করেন অথবা ভিসার কোনো শর্ত লঙ্ঘন করেন, তবে তার নিয়োগকারী বা স্পনসর প্রতিষ্ঠানকে শাস্তির আওতায় আনা হবে। এ ধরনের অপরাধে প্রথমবারের জন্য জনপ্রতি এক লাখ টাকা এবং পরবর্তী প্রতিবারের জন্য জনপ্রতি দুই লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা যাবে।

সাংবাদিকতায় শর্ত ও নিরাপত্তার ভারসাম্য

বিদেশি সাংবাদিকদের বাংলাদেশে চলচ্চিত্র বা তথ্যচিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় মনোনীত প্রতিনিধির সার্বক্ষণিক উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি নির্মাণকাজ শেষে দেশ ছাড়ার পূর্বে ইমিগ্রেশন পয়েন্টে উক্ত মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তিপত্র বা নো অবজেকশন সার্টিফিকেট (এন ওসি) জমা দিতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রক্রিয়াটি যেন আন্তর্জাতিক পর্যটন ও বিনিয়োগে বাধা না হয়ে জাতীয় নিরাপত্তা এবং কূটনৈতিক উদারতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখে, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।

শর্তসাপেক্ষে এনভিআর সুবিধা পাবেন যারা

নতুন নীতিমালায় মূল বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিদেশি নাগরিকদের পাশাপাশি তাদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের বংশধর, তাদের স্বামী বা স্ত্রী এবং সন্তানদের শর্তসাপেক্ষে ‘নো ভিসা রিকোয়ার্ড’ (এনভিআর) সুবিধা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

এই সুবিধা সংশ্লিষ্ট পাসপোর্টের বৈধতার মেয়াদ পর্যন্ত বহাল থাকবে এবং এর আবেদন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ৮০ মার্কিন ডলার বা সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা।

বংশগত সম্পর্কের প্রমাণস্বরূপ আবেদনকারীকে দ্বৈত নাগরিকত্ব সনদ, বাংলাদেশি এমআরপি বা ই-পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, অনলাইন জন্মনিবন্ধন কিংবা নাগরিকত্ব সনদ জমা দিতে হবে। একইভাবে বিদেশি স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানদের ক্ষেত্রেও সম্পর্কের প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক প্রমাণাদি উপস্থাপন করতে হবে। উল্লেখ্য, ১৫ বছরের বেশি বয়সী সন্তান এবং স্বামী বা স্ত্রীর ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশনের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।

শুধু তাই নয়, নীতিমালায় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্যও ‘নো ভিসা রিকোয়ার্ড’ (এনভিআর) পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। বাংলাদেশে ভারী শিল্প বা দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায় অন্তত ৫০ লাখ মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করলে বিদেশি উদ্যোক্তারা এই সুবিধা পাবেন।

নতুন পাসপোর্টে রূপান্তর করা যাবে এনভিআর সুবিধা

পুরোনো পাসপোর্টে এনভিআর থাকলে নির্ধারিত ফি পরিশোধ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে তা নতুন পাসপোর্টে রূপান্তর করা যাবে। নতুন নীতিতে মেশিন রিডেবল এনভিআর দেওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করা হয়েছে।

নীতিমালায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক দেওয়া নিরাপত্তা ছাড়পত্রের মেয়াদ সর্বোচ্চ পাঁচ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি যেসব বিষয়ে স্পষ্ট উল্লেখ নেই— এমন যেকোনো ভিসা বা এনভিআর-সংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, ব্যাখ্যা কিংবা ভিসা বাতিলের সার্বিক ক্ষমতা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হাতেই ন্যস্ত রাখা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মতে, দীর্ঘমেয়াদে থাকা বিদেশি নাগরিকদের উদ্দেশ্য, ঠিকানা ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কিত হালনাগাদ তথ্য রাষ্ট্রের কাছে থাকা নিরাপত্তার স্বার্থেই প্রয়োজন। তবে এই নিয়ম বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সাধারণ বিদেশি বা দর্শনার্থীরা যেন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত হয়রানির শিকার না হন, সেদিকেও খেয়াল রাখা জরুরি।

এর অগে, দেশে-বিদেশে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে ভিসা প্রক্রিয়া আরও সহজ করার লক্ষ্যে গত ২ জুলাই ‘ভিসানীতি-২০২৬’ অনুমোদন দেয় সরকার। নতুন ভিসা নীতিমালার ফলে আগের সব সার্কুলার বাতিল বলে গণ্য হবে। তবে, পুরোনো সার্কুলারের আওতায় ইস্যু করা ভিসা মেয়াদের শেষ দিন পর্যন্ত বহাল থাকবে। প্রয়োজনে সরকার এই নীতিমালার যেকোনো অংশ সংশোধন, পরিমার্জন কিংবা বাতিলের অধিকার সংরক্ষণ করে।

/এফআর/