বছর ঘুরে আবার এলো অমর একুশে বইমেলা

বছর ঘুরে আবার এলো অমর একুশে বইমেলা
মেহেদী হাছান মাহীম

ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে এক ভিন্নরকমের ব্যস্ততা। শীতের শেষে শুষ্ক বাতাস, ধুলোবালু উড়ছে, বাতাসে ভাসছে কাঁচা কাঠের গন্ধ। চারদিকে হাতুড়ি-বাটালের ঠুকঠাক শব্দ যেন জানান দিচ্ছে, বছর ঘুরে আবার এসেছে অমর একুশে বইমেলা।
বইমেলার পাশাপাশি আরও দুইটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে মেলা প্রাঙ্গণ। বৃহস্পতিবার দুপুর ২টায় প্রধান অতিথি হিসেবে বইমেলার উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান । একই অনুষ্ঠানে তিনি ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-২০২৫’-এর বিজয়ীদের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট ও সনদ তুলে দেবেন। এর আগে সকাল ১১টায় রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে গুণীজনদের হাতে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘একুশে পদক ২০২৬’ তুলে দেবেন প্রধানমন্ত্রী।
বুধবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে দেখা যায়, বইমেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আগের শেষ মুহূর্তে চলছে স্টল নির্মাণের চূড়ান্ত প্রস্তুতি। শ্রমিকেরা প্লাইউড দিয়ে সিলিং ও দেয়াল তৈরির কাজ করছেন। কোথাও কাঠের ফ্রেমে পেরেক ঠোকার শব্দ, কোথাও আবার মাপজোক চলছে।
কিছু স্টলে রঙের প্রলেপ দেওয়া হচ্ছে। সাদা, নীল কিংবা হালকা বাদামি রঙে ঢেকে যাচ্ছে কাঠের কাঁচা গন্ধ। আবার কোথাও জ্যামিতিক নকশায় ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে স্টলের শৈল্পিক লোগো। শিল্পীর তুলির আঁচড়ে একটি সাধারণ কাঠামো প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচয় হয়ে উঠছে। স্তূপ করে রাখা তক্তা, পাশে টিনের চালা—তার নিচেই শ্রমিকদের নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রমে ফুটে ওঠছে বইমেলার একেকটি স্টল।
চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নির্মাণসামগ্রী—কাঠ, প্লাইউড, রঙের বালতি, বিদ্যুতের তার ও বাল্ব। কোনো কোনো জায়গায় বৈদ্যুতিক সংযোগের কাজও চলছে সমানতালে। এতকিছুর মধ্যেও আছে এক ধরনের ছন্দ; যেন সবাই জানে, রাত পোহালেই শুরু হবে বহুলপ্রত্যাশিত বইমেলা।

বইমেলার মাঠে কথা হয় বেলাল নামের এক শ্রমিকের সঙ্গে। কর্মব্যস্ততার ফাঁকে তিনি বলেন, ‘রাত পোহালেই বইমেলা। আজ সকাল থেকেই স্টল তৈরীর কাজ করেছি। রাতের মধ্যেই এই কাজ শেষ করতে হবে।’
ওবায়েদুল্লাহ জাফর নামের আরেকজন শ্রমিক জানান, ‘আজ তিন দিন ধরে কাজ করছি। আশা করছি আজ রাতের মধ্যেই স্টলের কাজ শেষ করতে পারবো।’
প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকেও চলছে সমান প্রস্তুতি। অক্ষর বুনন প্রকাশনীর তদারকির দায়িত্বে থাকা মো. আরফান বলেন, ‘গতকাল থেকে কাজ শুরু করেছি। ইনশাআল্লাহ রাতের মধ্যে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে পারবো।’
লেখক ও প্রকাশকদের ভাষায় এটি শুধু বইয়ের মেলা নয়, এটি বাংলা ভাষাভাষী মানুষের জন্য ভিন্ন এক উৎসব। তাইতো হাজারো প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তাদের প্রস্তুতির যেন শেষ নেই। একজন প্রকাশকের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, ‘আমাদের অনেকের বইমেলা বর্জনের সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি যতই প্রতিকূল হোক না কেনো, পাঠকের ভালোবাসার কাছে হার মানতে হয়।’ এমন মন্তব্যই বইমেলার শক্তিকে তুলে ধরে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিস্তৃত প্রান্তরে হাঁটলে চোখে পড়ে একেকটি স্টল যেন একেকটি স্বপ্ন। কোথাও কাঠামো এখনও অসম্পূর্ণ, কোথাও শেষ মুহূর্তে রঙের তুলিতে ব্যস্ত শিল্পী, আবার কোথাও রঙিন আলোর তার জড়ানো হচ্ছে মাথার ওপরে। বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণেও একই চিত্র—ধুলো আর নির্মাণসামগ্রীর ভিড়ে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে বইমেলার রূপ।
এই দৃশ্য শুধু নির্মাণকাজের নয়, এটি একটি সম্মিলিত প্রয়াস। শ্রমিক, কারিগর, শিল্পী, প্রকাশকদের চেষ্টায় স্বার্থক হয়ে ওঠে বইমেলা।
এত ব্যস্ততার মাঝেও আছে উচ্ছ্বাস। কেউ কেউ বলছেন, প্রতি বছরই এমন দৌড়ঝাঁপ থাকে, কিন্তু মেলা শুরু হওয়ার পর সব ক্লান্তি ভুলে যান সবাই। বইয়ের তাক ভর্তি হয়ে গেলে, পাঠকের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠলে এই ধুলোমাখা মুহূর্তগুলোই তখন আনন্দের হয়ে ওঠে।
বৃহস্পতিবার থেকে আগামী ১৫ মার্চ পর্যন্ত ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন বেলা ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা চলবে। রাত সাড়ে ৮টার পর নতুন করে কেউ মেলা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে পারবেন না। ছুটির দিন বইমেলা চলবে বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত।
বইমেলা শুরু হলো যেভাবে
১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির যে প্রেক্ষাপটকে ঘিরে আজকের এই বইমেলা, সেই প্রসঙ্গেও কিছু বলতেই হয়। বাঙালি জাতির যতগুলো গৌরবের বিষয় আছে তার মধ্যে একুশে ফেব্রুয়ারি অন্যতম। পৃথিবীর ইতিহাসে মাতৃভাষার জন্যে অকাতরে আত্মদানের নজির একমাত্র বাঙালিরই রয়েছে। জীবন উৎসর্গ করার এই অবিস্মরণীয় ঘটনার স্বীকৃতি দিয়ে ইউনেসকো ১৯৯৯ সালে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করেছে। বাংলার মানুষের মাতৃভাষাপ্রীতির স্বীকৃতিতে ২১ ফেব্রুয়ারি পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। একুশ আমাদের দিয়েছে আত্মপরিচয়ের সম্মান, অধিকার আদায়ের সংগ্রামে জীবনদানের প্রেরণা। এই গৌরবকে স্মরণীয় করে রাখতেই বাংলা একাডেমি ১৯৮৪ সাল থেকে ‘অমর একুশে বইমেলার’ আয়োজন করে আসছে।

ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে এক ভিন্নরকমের ব্যস্ততা। শীতের শেষে শুষ্ক বাতাস, ধুলোবালু উড়ছে, বাতাসে ভাসছে কাঁচা কাঠের গন্ধ। চারদিকে হাতুড়ি-বাটালের ঠুকঠাক শব্দ যেন জানান দিচ্ছে, বছর ঘুরে আবার এসেছে অমর একুশে বইমেলা।
বইমেলার পাশাপাশি আরও দুইটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে মেলা প্রাঙ্গণ। বৃহস্পতিবার দুপুর ২টায় প্রধান অতিথি হিসেবে বইমেলার উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান । একই অনুষ্ঠানে তিনি ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-২০২৫’-এর বিজয়ীদের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট ও সনদ তুলে দেবেন। এর আগে সকাল ১১টায় রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে গুণীজনদের হাতে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘একুশে পদক ২০২৬’ তুলে দেবেন প্রধানমন্ত্রী।
বুধবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে দেখা যায়, বইমেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আগের শেষ মুহূর্তে চলছে স্টল নির্মাণের চূড়ান্ত প্রস্তুতি। শ্রমিকেরা প্লাইউড দিয়ে সিলিং ও দেয়াল তৈরির কাজ করছেন। কোথাও কাঠের ফ্রেমে পেরেক ঠোকার শব্দ, কোথাও আবার মাপজোক চলছে।
কিছু স্টলে রঙের প্রলেপ দেওয়া হচ্ছে। সাদা, নীল কিংবা হালকা বাদামি রঙে ঢেকে যাচ্ছে কাঠের কাঁচা গন্ধ। আবার কোথাও জ্যামিতিক নকশায় ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে স্টলের শৈল্পিক লোগো। শিল্পীর তুলির আঁচড়ে একটি সাধারণ কাঠামো প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচয় হয়ে উঠছে। স্তূপ করে রাখা তক্তা, পাশে টিনের চালা—তার নিচেই শ্রমিকদের নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রমে ফুটে ওঠছে বইমেলার একেকটি স্টল।
চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নির্মাণসামগ্রী—কাঠ, প্লাইউড, রঙের বালতি, বিদ্যুতের তার ও বাল্ব। কোনো কোনো জায়গায় বৈদ্যুতিক সংযোগের কাজও চলছে সমানতালে। এতকিছুর মধ্যেও আছে এক ধরনের ছন্দ; যেন সবাই জানে, রাত পোহালেই শুরু হবে বহুলপ্রত্যাশিত বইমেলা।

বইমেলার মাঠে কথা হয় বেলাল নামের এক শ্রমিকের সঙ্গে। কর্মব্যস্ততার ফাঁকে তিনি বলেন, ‘রাত পোহালেই বইমেলা। আজ সকাল থেকেই স্টল তৈরীর কাজ করেছি। রাতের মধ্যেই এই কাজ শেষ করতে হবে।’
ওবায়েদুল্লাহ জাফর নামের আরেকজন শ্রমিক জানান, ‘আজ তিন দিন ধরে কাজ করছি। আশা করছি আজ রাতের মধ্যেই স্টলের কাজ শেষ করতে পারবো।’
প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকেও চলছে সমান প্রস্তুতি। অক্ষর বুনন প্রকাশনীর তদারকির দায়িত্বে থাকা মো. আরফান বলেন, ‘গতকাল থেকে কাজ শুরু করেছি। ইনশাআল্লাহ রাতের মধ্যে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে পারবো।’
লেখক ও প্রকাশকদের ভাষায় এটি শুধু বইয়ের মেলা নয়, এটি বাংলা ভাষাভাষী মানুষের জন্য ভিন্ন এক উৎসব। তাইতো হাজারো প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তাদের প্রস্তুতির যেন শেষ নেই। একজন প্রকাশকের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, ‘আমাদের অনেকের বইমেলা বর্জনের সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি যতই প্রতিকূল হোক না কেনো, পাঠকের ভালোবাসার কাছে হার মানতে হয়।’ এমন মন্তব্যই বইমেলার শক্তিকে তুলে ধরে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিস্তৃত প্রান্তরে হাঁটলে চোখে পড়ে একেকটি স্টল যেন একেকটি স্বপ্ন। কোথাও কাঠামো এখনও অসম্পূর্ণ, কোথাও শেষ মুহূর্তে রঙের তুলিতে ব্যস্ত শিল্পী, আবার কোথাও রঙিন আলোর তার জড়ানো হচ্ছে মাথার ওপরে। বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণেও একই চিত্র—ধুলো আর নির্মাণসামগ্রীর ভিড়ে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে বইমেলার রূপ।
এই দৃশ্য শুধু নির্মাণকাজের নয়, এটি একটি সম্মিলিত প্রয়াস। শ্রমিক, কারিগর, শিল্পী, প্রকাশকদের চেষ্টায় স্বার্থক হয়ে ওঠে বইমেলা।
এত ব্যস্ততার মাঝেও আছে উচ্ছ্বাস। কেউ কেউ বলছেন, প্রতি বছরই এমন দৌড়ঝাঁপ থাকে, কিন্তু মেলা শুরু হওয়ার পর সব ক্লান্তি ভুলে যান সবাই। বইয়ের তাক ভর্তি হয়ে গেলে, পাঠকের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠলে এই ধুলোমাখা মুহূর্তগুলোই তখন আনন্দের হয়ে ওঠে।
বৃহস্পতিবার থেকে আগামী ১৫ মার্চ পর্যন্ত ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন বেলা ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা চলবে। রাত সাড়ে ৮টার পর নতুন করে কেউ মেলা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে পারবেন না। ছুটির দিন বইমেলা চলবে বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত।
বইমেলা শুরু হলো যেভাবে
১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির যে প্রেক্ষাপটকে ঘিরে আজকের এই বইমেলা, সেই প্রসঙ্গেও কিছু বলতেই হয়। বাঙালি জাতির যতগুলো গৌরবের বিষয় আছে তার মধ্যে একুশে ফেব্রুয়ারি অন্যতম। পৃথিবীর ইতিহাসে মাতৃভাষার জন্যে অকাতরে আত্মদানের নজির একমাত্র বাঙালিরই রয়েছে। জীবন উৎসর্গ করার এই অবিস্মরণীয় ঘটনার স্বীকৃতি দিয়ে ইউনেসকো ১৯৯৯ সালে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করেছে। বাংলার মানুষের মাতৃভাষাপ্রীতির স্বীকৃতিতে ২১ ফেব্রুয়ারি পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। একুশ আমাদের দিয়েছে আত্মপরিচয়ের সম্মান, অধিকার আদায়ের সংগ্রামে জীবনদানের প্রেরণা। এই গৌরবকে স্মরণীয় করে রাখতেই বাংলা একাডেমি ১৯৮৪ সাল থেকে ‘অমর একুশে বইমেলার’ আয়োজন করে আসছে।

বছর ঘুরে আবার এলো অমর একুশে বইমেলা
মেহেদী হাছান মাহীম

ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে এক ভিন্নরকমের ব্যস্ততা। শীতের শেষে শুষ্ক বাতাস, ধুলোবালু উড়ছে, বাতাসে ভাসছে কাঁচা কাঠের গন্ধ। চারদিকে হাতুড়ি-বাটালের ঠুকঠাক শব্দ যেন জানান দিচ্ছে, বছর ঘুরে আবার এসেছে অমর একুশে বইমেলা।
বইমেলার পাশাপাশি আরও দুইটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে মেলা প্রাঙ্গণ। বৃহস্পতিবার দুপুর ২টায় প্রধান অতিথি হিসেবে বইমেলার উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান । একই অনুষ্ঠানে তিনি ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-২০২৫’-এর বিজয়ীদের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট ও সনদ তুলে দেবেন। এর আগে সকাল ১১টায় রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে গুণীজনদের হাতে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘একুশে পদক ২০২৬’ তুলে দেবেন প্রধানমন্ত্রী।
বুধবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে দেখা যায়, বইমেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আগের শেষ মুহূর্তে চলছে স্টল নির্মাণের চূড়ান্ত প্রস্তুতি। শ্রমিকেরা প্লাইউড দিয়ে সিলিং ও দেয়াল তৈরির কাজ করছেন। কোথাও কাঠের ফ্রেমে পেরেক ঠোকার শব্দ, কোথাও আবার মাপজোক চলছে।
কিছু স্টলে রঙের প্রলেপ দেওয়া হচ্ছে। সাদা, নীল কিংবা হালকা বাদামি রঙে ঢেকে যাচ্ছে কাঠের কাঁচা গন্ধ। আবার কোথাও জ্যামিতিক নকশায় ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে স্টলের শৈল্পিক লোগো। শিল্পীর তুলির আঁচড়ে একটি সাধারণ কাঠামো প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচয় হয়ে উঠছে। স্তূপ করে রাখা তক্তা, পাশে টিনের চালা—তার নিচেই শ্রমিকদের নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রমে ফুটে ওঠছে বইমেলার একেকটি স্টল।
চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নির্মাণসামগ্রী—কাঠ, প্লাইউড, রঙের বালতি, বিদ্যুতের তার ও বাল্ব। কোনো কোনো জায়গায় বৈদ্যুতিক সংযোগের কাজও চলছে সমানতালে। এতকিছুর মধ্যেও আছে এক ধরনের ছন্দ; যেন সবাই জানে, রাত পোহালেই শুরু হবে বহুলপ্রত্যাশিত বইমেলা।

বইমেলার মাঠে কথা হয় বেলাল নামের এক শ্রমিকের সঙ্গে। কর্মব্যস্ততার ফাঁকে তিনি বলেন, ‘রাত পোহালেই বইমেলা। আজ সকাল থেকেই স্টল তৈরীর কাজ করেছি। রাতের মধ্যেই এই কাজ শেষ করতে হবে।’
ওবায়েদুল্লাহ জাফর নামের আরেকজন শ্রমিক জানান, ‘আজ তিন দিন ধরে কাজ করছি। আশা করছি আজ রাতের মধ্যেই স্টলের কাজ শেষ করতে পারবো।’
প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকেও চলছে সমান প্রস্তুতি। অক্ষর বুনন প্রকাশনীর তদারকির দায়িত্বে থাকা মো. আরফান বলেন, ‘গতকাল থেকে কাজ শুরু করেছি। ইনশাআল্লাহ রাতের মধ্যে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে পারবো।’
লেখক ও প্রকাশকদের ভাষায় এটি শুধু বইয়ের মেলা নয়, এটি বাংলা ভাষাভাষী মানুষের জন্য ভিন্ন এক উৎসব। তাইতো হাজারো প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তাদের প্রস্তুতির যেন শেষ নেই। একজন প্রকাশকের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, ‘আমাদের অনেকের বইমেলা বর্জনের সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি যতই প্রতিকূল হোক না কেনো, পাঠকের ভালোবাসার কাছে হার মানতে হয়।’ এমন মন্তব্যই বইমেলার শক্তিকে তুলে ধরে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিস্তৃত প্রান্তরে হাঁটলে চোখে পড়ে একেকটি স্টল যেন একেকটি স্বপ্ন। কোথাও কাঠামো এখনও অসম্পূর্ণ, কোথাও শেষ মুহূর্তে রঙের তুলিতে ব্যস্ত শিল্পী, আবার কোথাও রঙিন আলোর তার জড়ানো হচ্ছে মাথার ওপরে। বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণেও একই চিত্র—ধুলো আর নির্মাণসামগ্রীর ভিড়ে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে বইমেলার রূপ।
এই দৃশ্য শুধু নির্মাণকাজের নয়, এটি একটি সম্মিলিত প্রয়াস। শ্রমিক, কারিগর, শিল্পী, প্রকাশকদের চেষ্টায় স্বার্থক হয়ে ওঠে বইমেলা।
এত ব্যস্ততার মাঝেও আছে উচ্ছ্বাস। কেউ কেউ বলছেন, প্রতি বছরই এমন দৌড়ঝাঁপ থাকে, কিন্তু মেলা শুরু হওয়ার পর সব ক্লান্তি ভুলে যান সবাই। বইয়ের তাক ভর্তি হয়ে গেলে, পাঠকের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠলে এই ধুলোমাখা মুহূর্তগুলোই তখন আনন্দের হয়ে ওঠে।
বৃহস্পতিবার থেকে আগামী ১৫ মার্চ পর্যন্ত ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন বেলা ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা চলবে। রাত সাড়ে ৮টার পর নতুন করে কেউ মেলা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে পারবেন না। ছুটির দিন বইমেলা চলবে বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত।
বইমেলা শুরু হলো যেভাবে
১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির যে প্রেক্ষাপটকে ঘিরে আজকের এই বইমেলা, সেই প্রসঙ্গেও কিছু বলতেই হয়। বাঙালি জাতির যতগুলো গৌরবের বিষয় আছে তার মধ্যে একুশে ফেব্রুয়ারি অন্যতম। পৃথিবীর ইতিহাসে মাতৃভাষার জন্যে অকাতরে আত্মদানের নজির একমাত্র বাঙালিরই রয়েছে। জীবন উৎসর্গ করার এই অবিস্মরণীয় ঘটনার স্বীকৃতি দিয়ে ইউনেসকো ১৯৯৯ সালে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করেছে। বাংলার মানুষের মাতৃভাষাপ্রীতির স্বীকৃতিতে ২১ ফেব্রুয়ারি পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। একুশ আমাদের দিয়েছে আত্মপরিচয়ের সম্মান, অধিকার আদায়ের সংগ্রামে জীবনদানের প্রেরণা। এই গৌরবকে স্মরণীয় করে রাখতেই বাংলা একাডেমি ১৯৮৪ সাল থেকে ‘অমর একুশে বইমেলার’ আয়োজন করে আসছে।




