শিরোনাম
এক্সপ্লেইনার

হরমুজ প্রণালি নিয়ে সংঘাত কেন মধ্যপ্রাচ্যের জলরাশির জন্য হুমকি

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
হরমুজ প্রণালি নিয়ে সংঘাত কেন মধ্যপ্রাচ্যের জলরাশির জন্য হুমকি
হরমুজ প্রণালি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সামরিক সংঘাত এখন কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশের সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়েছে। তেলের ট্যাংকার এবং যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে দুই পক্ষের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় এ সংবেদনশীল জলপথটি বড় ধরনের পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।

হরমুজে অবরুদ্ধ জ্বালানি

সমুদ্র চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা মেরিনট্র্যাফিকের তথ্য অনুযায়ী, জলপথটি অতিক্রমের অপেক্ষায় হরমুজ ও ওমান উপসাগরে অন্তত ৪২টি ট্যাংকার আটকে রয়েছে, যার মধ্যে ১৮টিতে অপরিশোধিত তেল রয়েছে। সব মিলিয়ে এসব জাহাজে প্রায় ১৭ লাখ ৬০ হাজার ঘনমিটার জ্বালানি রয়েছে। এই পরিমাণ তেল বিশ্বজুড়ে প্রতিদিনের চাহিদার প্রায় ১১ শতাংশ। বাণিজ্য জাহাজে হামলা অব্যাহত থাকায় যেকোনো একটি ট্যাংকার ডুবে যাওয়া বা আগুন লাগার ঘটনা পুরো অঞ্চলে বিশাল তেলের আস্তরণ তৈরি করতে পারে।

ওমানের উপকূলে সমুদ্রে ক্ষতিগ্রস্ত ও আংশিকভাবে ডুবে থাকা তেলবাহী ট্যাংকার ক্যারোলিন বেজেঙ্গি
ওমানের উপকূলে সমুদ্রে ক্ষতিগ্রস্ত ও আংশিকভাবে ডুবে থাকা তেলবাহী ট্যাংকার ক্যারোলিন বেজেঙ্গি

একের পর এক জাহাজে হামলা

যুদ্ধের শুরু থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৭৫টি জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে এবং এতে ২১ জন নাবিক নিহত হয়েছেন। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড সম্প্রতি খার্গ দ্বীপ ও জাস্কের কাছে এবং ওমান উপসাগরে বেশ কয়েকটি ইরানি ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে ইরানও মার্কিন রণতরি ও অন্যান্য বাণিজ্য জাহাজে পাল্টা হামলা চালানোর দাবি করেছে।

ইতোমধ্যে ওমান উপকূল থেকে প্রায় ৪১ কিলোমিটার দূরে চরে আটকে পড়া ‘ক্যারোলিন বেজেঙ্গি’ ট্যাংকার থেকে তেল চুইয়ে পড়তে শুরু করেছে। ওমানের পরিবেশ কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে, এই দূষণ মাসিরাহ দ্বীপসহ ৪০ কিলোমিটার উপকূলরেখায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। এছাড়া আগস্টের শুরুতে ‘মিনোয়ান পাইওনিয়ার’ নামক জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর স্যাটেলাইট চিত্রে কেশম ও সিরি দ্বীপের কাছে বিশাল তেলের স্তর দেখা গেছে। সাউথ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় বলা হয়েছে, মার্চ মাসের তুলনায় বর্তমানে উপসাগরে তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা চারগুণ বেড়েছে।

বিপন্ন সামুদ্রিক প্রাণ

পারস্য উপসাগর একটি অগভীর ও অর্ধ-আবদ্ধ জলরাশি। এখানে রয়েছে সহনশীল প্রবাল প্রাচীর, ম্যানগ্রোভ বন এবং বিরল প্রজাতির সামুদ্রিক প্রাণী। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে কুয়েতের তেলকূপ ও উপকূলে ছড়িয়ে পড়া তেল যেমন ৭৭০ কিলোমিটার এলাকা ধ্বংস করেছিল, বর্তমান সংঘাতও তেমনই দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ওমানের খাসাবে অবস্থিত মুসান্দামের অন্যতম জনপ্রিয় ডাইভিং সাইটে জলজ উদ্ভিদ
ওমানের খাসাবে অবস্থিত মুসান্দামের অন্যতম জনপ্রিয় ডাইভিং সাইটে জলজ উদ্ভিদ

সামুদ্রিক জীবনের ওপর এই প্রভাব নিয়ে সুলতান কাবুস বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. হুসেইন সামহ আল মাসরুরি বলেন, ‘প্রবাল প্রাচীর, ম্যানগ্রোভ, সামুদ্রিক ঘাসের স্তর এবং উপকূলীয় পলির মতো সংবেদনশীল আবাসস্থলগুলো দূষক পদার্থকে অনেক বেশি সময় ধরে ধরে রাখতে পারে। এছাড়াও পানির গুণমান, খাদ্য শৃঙ্খলের উৎপাদনশীলতা, মাছের বণ্টন এবং সম্ভাব্য প্রজনন বা পরিযানের ধরনে পরিবর্তনের মাধ্যমে পরোক্ষ প্রভাবও পড়তে পারে। এর ফলে মাছ ধরার সুযোগ কমে যেতে পারে, খরচ বেড়ে যেতে পারে এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর আয় হ্রাস পেতে পারে।’

২৬ জানুয়ারী, ১৯৯১ সৌদি আরবে কুয়েত সীমান্তে আল খিরানের কাছে মিত্র বাহিনীর বোমাবর্ষণের দৃশ্য
২৬ জানুয়ারী, ১৯৯১ সৌদি আরবে কুয়েত সীমান্তে আল খিরানের কাছে মিত্র বাহিনীর বোমাবর্ষণের দৃশ্য

সুপেয় পানির সংকট

পরিবেশগত এ আঘাত শুধু সমুদ্রের মধ্যেই সীমিত থাকছে না। উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রায় ৬ কোটি ৫০ লাখ মানুষের সুপেয় পানির প্রধান উৎস সমুদ্রের পানি শোধন কেন্দ্রগুলো (ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট)। তেলের স্তর শোধন কেন্দ্রের পাইপে প্রবেশ করলে মারাত্মক সংকট তৈরি হতে পারে।

তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে ড. আল মাসরুরি জানান, প্রকৃত ঝুঁকি অনেকাংশে নির্ভর করে তেল নিঃসরণের স্থান, স্রোত, তেল গ্রহণের স্থানের দূরত্ব ও গভীরতা এবং পরিশোধন প্রযুক্তির ওপর। তিনি মনে করেন, প্রাথমিক পর্যায়ে তেল শনাক্ত করে প্ল্যান্টে দূষিত পানি প্রবেশ বন্ধ করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।

সূত্র: আল জাজিরা

/এমএকে/