এক্সপ্লেইনার

মধ্যপ্রাচ্য সংকট কীভাবে বিশ্বকে খাদ্য সংকটের মুখে ফেলছে

অমিত কুমার মন্ডল
অমিত কুমার মন্ডল
মধ্যপ্রাচ্য সংকট কীভাবে বিশ্বকে খাদ্য সংকটের মুখে ফেলছে

সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর তেলের দাম বাড়ার খবরটা আমাদের চোখ এড়ায় না। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য সংকটের আসল ধাক্কাটা আসবে অন্যভাবে, একেবারে নীরবে। একজন কৃষক যখন প্রয়োজনের চেয়ে কম সার কেনেন, মাঠে ফসল মারা যায়, কিংবা একটা পরিবার যখন ভালো খাবার জোগাড় করতে হিমশিম খায় তখনই আসল সংকট বোঝা যায়।

উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের খাদ্যের একটা বড় অংশই আমদানি করে। আবার এ অঞ্চল থেকেই আসে সার তৈরির কাঁচামাল। সমুদ্রপথ বন্ধ থাকলে উপসাগরীয় অঞ্চলে ভোক্তা ও হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে যারা ফসল ফলাচ্ছে- উভয়েই ক্ষতির সম্মুখীন হবে।

পাত্রে ইউরিয়া সার ঢালছেন এক চাষী
পাত্রে ইউরিয়া সার ঢালছেন এক চাষী

সারের বাজারে বড় ধাক্কা ও জাতিসংঘের সতর্কবার্তা

বুধবার (১৪ অক্টোবর) জাতিসংঘের আন্ডার-সেক্রেটারি-জেনারেল হোর্হে মোরেইরা দা সিলভা বলেছেন, একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে এশিয়া ও আফ্রিকার কিছু অংশে খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে। তিনি বলেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি চুক্তি হলে সাত থেকে দশ দিনের মধ্যেই তার প্রণীত ব্যবস্থাটি কাজ শুরু করতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উৎপাদনশীল দেশগুলোতে সারের সরবরাহ অব্যাহত রাখা। এরজন্য দিনে পাঁচটি জাহাজই যথেষ্ট।

উপসাগরীয় অঞ্চল বিশ্বকে কী পরিমাণ সার দেয়, সেটাই এই উদ্বেগের মূল কারণ। এফএও-এর মহাপরিচালক জানিয়েছেন, অঞ্চলটি বিশ্বের প্রায় ৩০-৩৫ শতাংশ ইউরিয়া, ৫০ শতাংশ সালফার এবং ২০-৩০ শতাংশ অ্যামোনিয়া সরবরাহ করে। ‘ফার্টিলাইজার ডেইলি’-র প্রতিবেদন অনুসারে, এফএও-এর হিসাব অনুযায়ী প্রতি মাসে দেড় থেকে তিন মিলিয়ন টন সারের বাণিজ্য ঘাটতি হচ্ছে। এগুলোই আগামী মৌসুমের গম, চাল আর ভুট্টার কাঁচামাল।

কৃষিকাজ তো কোনো আপোস বোঝে না। সঠিক সময় পার হওয়ার পর সার পৌঁছালে, তা কোনো ক্ষতি পুষিয়ে দিতে পারে না। আর কোনো যুদ্ধবিরতিই হাতছাড়া হয়ে যাওয়া সুযোগ ফিরিয়ে আনতে পারে না। মে মাসেও মোরেইরা দা সিলভা বলেছিলেন, কৃষি মৌসুম অপেক্ষা করে না। তিনি সতর্ক করেছিলেন, হরমুজ প্রণালিটি অবিলম্বে পুনরায় খুলে দেওয়া হলেও বিশ্বে সার সরবরাহ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে তিন থেকে চার মাস সময় লাগবে।

এক কৃষক তার জমি পর্যবেক্ষণ করছেন
এক কৃষক তার জমি পর্যবেক্ষণ করছেন

কারণ ও ফলের ব্যবধান ও জ্বালানি বাজারের চাপ

মূলত কারণ ও ফলাফলের মধ্যে সময়ের ব্যবধানেই সংকটটি খুব সহজে আমাদের নজর এড়িয়ে যায়। সারের দাম বেড়ে যায়, কিন্তু কম উৎপাদনের বিষয়টি ধরা পড়ে অনেক মাস পরে। ততক্ষণে প্রতিরোধের সব সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়। দেশগুলো যদি কেবল প্রতিদিন তেলের বাজারের দিকে তাকিয়ে থাকে, তবে তারা ভুল জায়গায় নজর দিচ্ছে। তাদের উচিত এ সংকটকে বীজ বপন এবং সার প্রয়োগের সময়সূচির নিরিখে বিচার করা।

এর সঙ্গে মালামাল পরিবহনের খরচও পরিস্থিতি জটিল করে তুলছে। রয়টার্স জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির ঝুঁকির কারণে তেল পরিবহনের খরচ বহুগুণ বেড়েছে। এশিয়ায় মার্কিন তেল পরিবহনের জন্য একটি সুপারট্যাঙ্কার ভাড়ার খরচ ৭৭ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এটি ২০২৫ সালের গড় খরচের চেয়ে ৭০০ শতাংশেরও বেশি। জ্বালানির দাম বাড়লে ট্রাক্টর চালানো, গ্রামে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পরিবহন এবং বাজারে খাবার পৌঁছে দেওয়ার খরচও বেড়ে যায়। সমগ্র বিষয়টি শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের রাতের খাবারের দাম বাড়িয়ে দেয়।

উপসাগরীয় অঞ্চলও খুব একটা নিরাপদ নয়। অঞ্চলটি আমদানিকৃত খাদ্যের ওপর ৮০-৯০ শতাংশ নির্ভরশীল। চ্যাথাম হাউসের নিল কুইলিয়াম বলেছেন, জিসিসি-ভুক্ত দেশগুলোর ৭০ শতাংশেরও বেশি খাদ্য হরমুজ প্রণালি দিয়েই আসে। তিনি আরও জানান, মজুতকৃত খাদ্য এবং সরবরাহকারী নেটওয়ার্ক এ অঞ্চলকে মাত্র কয়েক মাস টিকিয়ে রাখতে পারবে। অর্থ দিয়ে পণ্য কেনা যায় এবং আকাশপথে মালামাল পরিবহনের খরচ মেটানো যায়, কিন্তু কোনো জাহাজকে তো আর বন্ধ জলপথ দিয়ে পাঠানো যায় না।

হরমুজ প্রণালিতে পন্যবাহী জাহাজ
হরমুজ প্রণালিতে পন্যবাহী জাহাজ

খাদ্য নিরাপত্তার বাস্তব চিত্র

দশটি দেশ থেকে পণ্য ক্রয় করা আর পরিবহনের জন্য দশটি আলাদা পথ থাকা এক জিনিস নয়। যদি প্রতিটি চালানকে শেষ পর্যন্ত একটিমাত্র প্রণালি, একটি বন্দর বা একটি কেন্দ্রের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তবে বৈচিত্র্য কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে। মজুতকৃত পন্য সরকারকে হয়তো কিছু সময় দেয়, কিন্তু তখনই যখন তা দ্রুত প্রতিস্থাপন বা স্থানান্তর করা যায়। প্রকৃত খাদ্য নিরাপত্তা মানে বিদেশি সরবরাহকারীর কাছ থেকে স্থানীয় দোকান পর্যন্ত একটি বস্তার পুরো যাত্রাপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এর কোনো একটি ধাপ ব্যর্থ হলে বাকিগুলোর কোনো মূল্য থাকে না।

বড় কোনো কৃষি-ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান তাদের মজুত, ঋণ ও অন্যান্য নেটওয়ার্ক দিয়ে পরিস্থিতি কিছু সময়ের জন্য সামলে নিতে পারে। কিন্তু একজন ক্ষুদ্র কৃষক চড়া দামের কারণে কম সার কেনে বা কম চাষ করে। সচ্ছল পরিবারগুলো হয়তো মুদিখানার খরচ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে, আর গরিব পরিবারগুলো খাবারের তালিকা ছোট হতে থাকে। বাজারের পণ্যে ভরা তাকগুলো ক্ষুধা মেটাতে পারে না, কারণ তা কেনার সামর্থ্য মানুষের থাকে না।

হরমুজ প্রণালি
হরমুজ প্রণালি

কূটনৈতিক সমাধান ও দীর্ঘমেয়াদী বিকল্প

স্বস্তির বিষয় হলো, একটি কূটনৈতিক সমাধান ইতোমধ্যেই আলোচনার টেবিলে রয়েছে।জাতিসংঘের টাস্ক ফোর্স জাহাজ নিবন্ধন, পর্যবেক্ষণ ও যাচাইয়ের মাধ্যমে শস্যের পূর্ববর্তী ব্যবস্থার আদলে একটি উপায় তৈরি করেছে। জাতিসংঘের কর্মকর্তারা বলছেন, সদস্য রাষ্ট্রগুলো বিশেষ করে সার আমদানির উপর নির্ভরশীল দরিদ্র দেশগুলোর কাছ থেকে এটি জোরালো সমর্থন পেয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো বৃহত্তর আলোচনা চলার পাশাপাশি কিছুটা আস্থা তৈরি করা। যেসব সরকার খাদ্যমূল্য নিয়ে চিন্তিত, তাদের উচিত এ উদ্যোগে জোরালো সমর্থন দেওয়া। তবে কাগজে-কলমে সুরক্ষিত পথ আর সমুদ্রে সুরক্ষিত পথ এক নয়। নাবিক, জাহাজ মালিক, বীমাকারী এবং বন্দর পরিচালনাকারীরা কেবল তখনই এটি ব্যবহার করবে, যখন তারা এটিকে নিরাপদ বলে মনে করবে।

এ সংকট এমন পথের প্রয়োজনীয়তা সামনে নিয়ে আসে যা কোনো একটি প্রণালির উপর নির্ভরশীল নয়। ওমানের সোহর, দুকম এবং সালালাহ বন্দরগুলো হরমুজের বাইরে অবস্থিত এবং বৈশ্বিক নৌপরিবহনের সাথে যুক্ত, এগুলোই বিকল্পপথ হিসাবে শুরু করার জন্য স্বাভাবিক জায়গা। তবে মানচিত্রের ডানদিকের একটি বন্দর কেবল প্রথম ধাপ। সেখানে পৌঁছানো খাদ্যকে সড়ক বা জলপথে আরও গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়। লোহিত সাগর এবং কৃষ্ণ সাগরের পণ্যবাহী জাহাজের উপর হামলার ঘটনাকে বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহের উপর চাপ বৃদ্ধির কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

মধ্য এশিয়ার উৎপাদকদের আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে আরব সাগরের বন্দরগুলোর সঙ্গে এবং ওমান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে সংযোগকারী করিডোর তৈরির চিন্তাও গুরুত্বের দাবি রাখে। তবে এ খারাপ সময়ে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান কি ট্রানজিট ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন রাখবে? যখনই উত্তেজনা বাড়ে, তখনই বন্ধ হয়ে যাওয়া করিডোর নতুন ঝুঁকি তৈরি করে। যৌথ মুনাফা হয়তো উভয় পক্ষকে এটি চালু রাখতে উৎসাহিত করতে পারে, কিন্তু তা দীর্ঘসময়ের নিশ্চয়তা দেয় না।

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকটের ঝুঁকি

বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকট একটি ঝুঁকি, এটি কোনো অবশ্যম্ভাবী পরিণতি নয়। পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হবে তা নির্ভর করবে এ মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত কতদিন স্থায়ী হয়, বিকল্প সরবরাহ কেমন আসে, আবহাওয়া কেমন থাকে এবং সরকারগুলো কী সিদ্ধান্ত নেয় তার ওপর। এ মৌসুমে কোনো করিডোর রাতারাতি কাউকে রক্ষা করবে না। তাই কাজটা মূলত তিন ভাগে বিভক্ত। কূটনীতিকদের অবশ্যই পণ্য পরিবহনের ব্যবস্থা করতে হবে, দেশের অভ্যন্তরে সরকারগুলোকে কৃষক ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাাঁড়াতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগকারী ও পরিকল্পনাকারীদের এমন একটি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যা একটি পথ বন্ধ হলেও টিকে থাকতে পারে।

যারা সংকটের প্রকৃত মূল্য চোকাচ্ছেন এর সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের জন্য সমুদ্রে নিরাপত্তা মানে দোকানে সার, মাঠে ফসল এবং সাধ্যের মধ্যে রুটি। তেলের দাম কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যুদ্ধের ভয়াবহতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, আর ফসলেরহানি সে মূল্য প্রকাশ করে বহু মাস পরে। বর্তমানে বিশ্বনেতাদের উচিত দুইটি বিষয়ের ওপর সমানভাবে নজর দেওয়া।

/এমএকে/