বিশ্ব বিস্মিত হবে: নতুন সংঘাতের প্রস্তুতি ইরানের

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
বিশ্ব বিস্মিত হবে: নতুন সংঘাতের প্রস্তুতি ইরানের
আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আবারও বড় ধরনের সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান। ওয়াশিংটন এবং তাদের মিত্রদের সরাসরি হুমকি দিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি নতুন করে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবেন, তবে তার পরিণতি হবে সুদূরপ্রসারী। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের সামরিক শীর্ষ কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও পদক্ষেপে এ সংঘাতের প্রস্তুতি স্পষ্ট।

অস্ত্রের মজুত ও নতুন নিশানা

গত এক মাস ধরে ইরানের সামরিক কমান্ডাররা প্রকাশ্যেই দাবি করে আসছেন, দেশটি প্রচুর নতুন অস্ত্র মজুত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে এসব অস্ত্র মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতেও আঘাত হানতে পারে। সংঘাত নতুন করে শুরু হলে যুদ্ধের পরিধি কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা ছড়িয়ে পড়তে পারে আরও অনেক দূরে। সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় রয়েছে সমুদ্রের তলদেশের ইন্টারনেট কেবল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ডেটা সেন্টার এবং আঞ্চলিক তেল-গ্যাস স্থাপনা।

গত মাসের শেষ দিকে আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি বলেন, ‘বিশ্ব অবাক হয়ে যাবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের এমন নতুন লক্ষ্যবস্তু রয়েছে, যেগুলোতে এখনো হামলা চালানো হয়নি।’

ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরুর পর প্রায় আট মাস কেটে গেছে। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চূড়ান্ত লক্ষ্য নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি। এর জেরে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দিন দিন বাড়ছে। দুই পক্ষই নিজেদের বিজয়ী দাবি করছে। তেহরানের বক্তব্য, এত হামলা ও চাপের পরও তারা টিকে আছে। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানকে নতিস্বীকার করাতে নানামুখী অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ বজায় রাখলেও তেহরান তা মোকাবিলা করার ঘোষণা দিয়েছে।

মোহেব্বি বলেন, ‘যুদ্ধ শেষ হয়নি। আইআরজিসি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করেছে।’

আতঙ্কিত সাধারণ মানুষ

সামরিক কমান্ডাররা হুমকি দিলেও ইরানের সাধারণ মানুষের মনে বিরাজ করছে আতঙ্ক। দীর্ঘদিনের সংঘাত আর অর্থনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যে নতুন করে যুদ্ধের ভয়ে তাদের দিন কাটছে এক অজানা শঙ্কায়।

গত সপ্তাহে তেহরানের ৭০ বছর বয়সি এক বাসিন্দা সিএনএনকে বলেন, ‘প্রতিদিন, প্রতি রাতে আমরা অপেক্ষা করছি, কখন আবার বোমা হামলা শুরু হবে। আমি আমার সব পাওয়ার ব্যাংক চার্জ দিয়ে রেখেছি, পানির মজুত করেছি এবং প্রয়োজনীয় সবকিছু প্রস্তুত রেখেছি। কারণ যেকোনো দিন, যেকোনো মুহূর্তে আবার হামলা শুরু হতে পারে।’

অন্য একজন নিজের শঙ্কার কথা জানিয়ে বলেন, প্রতিদিন সকালে সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর সময় চরম আতঙ্কে থাকেন তিনি। আশপাশে বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি এবং সক্রিয় সামরিক ঘাঁটিগুলো পরিস্থিতি আরও ভীতিপ্রদ করে তোলে। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ঠিক আর কী কী করতে চায়, তা আমি জানতে চাই। তারা ইরানের নেতৃত্বকেও সরাতে পারেনি। আলোচনার মাধ্যমেও কোনো সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি। তাহলে আবার যুদ্ধ শুরু করার অর্থ কী?’

লক্ষ্যবস্তু হতে পারে ইউরোপও

হোয়াইট হাউসে উপদেষ্টারা দফায় দফায় বৈঠক করলেও ট্রাম্প জানিয়ে দিয়েছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তিনি বড় কোনো পদক্ষেপ নেবেন না। তবে ৩ নভেম্বরের আগে এ অবস্থানের পরিবর্তন হতে পারে কি না, তা নিয়ে নিশ্চিত নন হোয়াইট হাউসের অনেক উপদেষ্টা। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে সিএনএন জানিয়েছে, নির্বাচনের আগে বা পরে ট্রাম্প নতুন অভিযানের নির্দেশ দিলে ইরানের পারমাণবিক ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার পরিকল্পনা করে রেখেছে মার্কিন বাহিনী। এমনকি আলোচিত ‘মাদার অব অল বম্বস’ বা এমওএবি (জিবিইউ-৪৩/বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট) ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের।

তবে এসব হুমকিকে পাত্তা দিচ্ছে না তেহরান। দেশটির সেনাবাহিনীর কমান্ডার আলিরেজা শেখ জানান, ‘এসব প্রচারণার উদ্দেশ্য ইরানের জনগণকে ভয় দেখানো। ইরানের জনগণই সব বোমার মা।’

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক ফারজিন নাদিমি মনে করেন, ইরান যদি শেষ পর্যন্ত দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইউরোপে আঘাত হানার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে সেখানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। ইংল্যান্ডের বিমানঘাঁটি কিংবা জার্মানির রামস্টাইন সামরিক সরবরাহকেন্দ্রের মতো বড় স্থাপনাগুলোও এর আওতায় পড়তে পারে। নাদিমি আরও যোগ করেন, ‘ইরান সম্ভবত সংঘাতের মাত্রা অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ে না পৌঁছানো পর্যন্ত এ সম্ভাবনা কাজে লাগাবে না।’

এদিকে চলতি মাসের শুরুতে অজ্ঞাত হুমকির ফলে যুক্তরাজ্যে মোতায়েন করা যুক্তরাষ্ট্রের দূরপাল্লার বোমারু বিমানগুলো নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর আগে যুক্তরাজ্য সরকার ওই ঘাঁটিতে হামলার পরিকল্পনায় ইরানের সম্পৃক্ততা থাকার অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছিল। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তির আধুনিকায়ন নিয়েও সতর্কবার্তা দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

মধ্যপ্রাচ্যে বড় যুদ্ধের শঙ্কা

ইরানি কমান্ডাররা সম্ভাব্য সংঘাতকে অবশ্যম্ভাবী ধরে নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির উপপরিচালক আলি ওয়ায়েজ মনে করেন, ‘তেহরান স্পষ্ট করতে চায়, পরবর্তী দফার যুদ্ধ আরও বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়বে। তখন নিয়ন্ত্রণ ও সংযম কম থাকবে এবং পরিণতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘বিপদ হলো, ইরান যে পদক্ষেপগুলোকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে দেখছে, ওয়াশিংটন সেগুলোকে উসকানি হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। এতে যে যুদ্ধ এড়াতে তেহরান চেষ্টা করছে, সেই যুদ্ধের সম্ভাবনাই আরও বেড়ে যেতে পারে।’

ফেব্রুয়ারি মাসের যুদ্ধে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা ও বেসামরিক নাগরিকরা প্রাণ হারান। এর জবাবে ইরান আরব প্রতিবেশী দেশগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ হওয়াসহ দুবাইয়ের পর্যটনকেন্দ্র এবং কুয়েতের পানি শোধনাগারে হামলা হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, আমিরাত লক্ষ্য করে আড়াই হাজারের বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে তেহরান, যার প্রায় সবই প্রতিহত করা হয়েছিল।

নতুন পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিজেদের আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রস্তুত বলে দাবি করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটির কর্মকর্তা আলি আল-নুয়াইমি জানিয়েছেন, ‘আমরা যুদ্ধ চাই না। তবে আজ যদি যুদ্ধ শুরু হয়, তাহলে ২৮ ফেব্রুয়ারির তুলনায় এখন যেকোনো ধরনের হুমকি মোকাবিলায় আমরা অনেক বেশি প্রস্তুত।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও জনগণকে সুরক্ষিত রাখতে যা যা প্রয়োজন, আমরা তা-ই করব।’

সূত্র: সিএনএন

/এমএকে/