শিরোনাম

খামেনি হত্যা ইরানকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে

সিটিজেন ডেস্ক
খামেনি হত্যা ইরানকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার ঘটনায় দেশটির রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর এটিই ইরানের শীর্ষ নেতাদের ওপর সবচেয়ে ভয়াবহ আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। খামেনি মারা যাওয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তার লাখ লাখ সমর্থকদের বিক্ষোভ-প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। এতে ইরানের পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কার করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।

আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খামেনির মৃত্যুর পর ১৯৮৯ সালে দায়িত্ব নিয়েছিলেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রপন্থী মোহাম্মদ রেজা পাহলভীর বিরুদ্ধে পরিচালিত ইসলামী বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

রবিবার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মারা যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিন বলেন, খামেনিসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া ইরানের ‘কর্তব্য ও ন্যায্য অধিকার’। ইরান সর্বশক্তি দিয়ে এসব হত্যাকাণ্ডের বদলা নেবে বলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন তিনি।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অভিযানকে ‘মুক্তি’এর মুহূর্ত হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিন বলেছেন, ‘দেহের মাথা (নেতৃত্ব) সরিয়ে দিলে পুরো শরীর দ্রুত ধসে পড়বে।’ তবে বাস্তবতা হচ্ছে যা ধারণা করা হচ্ছে ইরানের পরিস্থিতি তার চেয়ে বেশি জটিল।

সামরিক ও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে আঘাত হানলেও ইরানের নিরাপত্তা কাঠামো ভেঙে পড়বে- পশ্চিমাদের এমন ধারণা ঠিক নয়। এর পরিবর্তে এটি ‘ সামরিক শাসিত রাষ্ট্রে’ পরিণত হতে পারে, যেখানে দেশ শাসনের ক্ষেত্রে রাজনীতির কোনো স্থান থাকবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা ও বাস্তবতা

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার মৃত্যুর পর দেশটির বর্তমান শাসনব্যবস্থা আর টিকে থাকতে পারবে না-এ ধারণাকে কেন্দ্র করেই অভিযান চালিয়েছে । সিবিএস নিউজে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পতো বলেই ফেলেছেন, ইরানের ক্ষমতা এখন কার হাতে তা তিনি জানেন। সবোর্চ্চ নেতার জায়গা নিতে পারে এমন অনেক যোগ্য ও দক্ষ নেতা সেখানে আছেন। তবে তারা কারা সে বিষয়ে বিস্তারিতভাবে তিনি কিছু বলেননি।

সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা মাইকেল মুলরয় আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, কেবল বিমান হামলা দিয়ে ক্ষমতার পটপরিবর্তন করা সম্ভব নয়। যদি একজনও কথা বলার জন্য বেঁচে থাকে তাহলে ধরে নিতে হবে সেখানে আগের শাসনব্যবস্থা টিকে আছে।

ইরানের নিরাপত্তা কাঠামোর মূল শক্তি এর দ্বৈত সামরিক ব্যবস্থায়। দেশটির নিয়মিত সেনাবাহিনীর পাশাপাশি রয়েছে শক্তিশালী সমান্তরাল বাহিনী ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি), যার সাংবিধানিক দায়িত্ব ইসলামী বিচারকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষনেতাদের মধ্যে অনেকেই নিহত হয়েছেন। এতে তাদের বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে গেছে।

তেহরানভিত্তিক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক হোসেইন রইভারান জানান, খামেনির উপদেষ্টা ও সদ্য গঠিত সর্বোচ্চ নিরাপত্তা কাউন্সিলের সচিব আলী শামখানি নিহত হয়েছেন।

এ অবস্থায় দেশটিন সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের সচিব আলী লারিজানি জানান, নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগের প্রধান ও গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন ধর্মীয় সদস্যকে নিয়ে দ্রুত অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব অস্থায়ী পরিচালনা পরিষদ গঠন করা হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্রুত পদক্ষেপ ইঙ্গিত দেয় রাষ্ট্রের ‘সারভাইভাল প্রোটোকল’ সক্রিয় হয়েছে। ইরানি শাসনব্যবস্থা ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক। নেতৃত্ব বিচ্ছিন্ন হলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা চলার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে তেহরানের আরেক বিশ্লেষক আব্বাস আসলানি বলেন, কর্মকর্তারা স্থিতিশীলতার বার্তা দিতে চাইছেন, কিন্তু এখনো রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে সামরিক স্থাপনায় হামলা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, হামলার ব্যাপকতার বিষয়টিকে ইরানের সাধারণ মানুষ স্বাগত জানাচ্ছেন না। এর মধ্যেই ইরানের সরকারি কর্মখর্তারা বার্তা দিয়ে যাচ্ছেন যে, যুক্তরাষ্ট ও ইসরায়েল হামলা চালালে তারা তা এমন সব সমরাস্ত্র দিয়ে মোকাবিলা করবেন যা তারা আগে কখনো ব্যবহার করেননি।

ধর্মীয় শাসন থেকে জাতীয়তাবাদী চেতনা

এই প্রেক্ষাপটে ইরান ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা থেকে সরে গিয়ে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জাতীয়তাবাদী চেতনার দিকে ঝুঁকতে পারে। তবে এ বিষয়ে আলী লারিজানি সতর্ক করে বলেন, ইসরায়েলের চূড়ান্ত লক্ষ্য ইরানকে ‘খণ্ডিত’ করা। এ বক্তব্যের মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষ নাগরিক ও বিরোধীদেরও বহির্শত্রুর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা চলছে—যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশিত গণঅভ্যুত্থানকে জটিল করে তুলতে পারে।

আরও এক বাস্তবতা হলো আয়াতুল্লাহ আল খামেনির মৃত্যুতে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক। সমাজতাত্ত্বিক সালেহ আল-মুতাইরি বলেন, এই শোকের সময়কে ক্ষমতাসীনরা ‘ফিউনারেল ট্র‍্যাপ’ হিসেবে ব্যবহার করবে। এতে রাজপথে লাখো শোকাহত মানুষের ভিড়ে স্বল্পমেয়াদে সরকারবিরোধী আন্দোলন সংগঠিত করা কঠিন হবে।

সামনে বড় অনিশ্চয়তার বার্তা

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসতে পারে নিরাপত্তা নীতিতে। খামেনির অনুসৃত কৌশলগত ধৈর্যের যুগ শেষ বলে মনে করছেন তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাসান আহমাদিয়ান। তাঁর ভাষায়, সংযমকে দুর্বলতা হিসেবে দেখা হচ্ছে; ফলে ভবিষ্যৎ প্রতিক্রিয়া হতে পারে আরও বিস্তৃত ও বেদনাদায়ক।

আল জাজিরা সেন্টার ফর স্টাডিজের গবেষক লিকা মাকি বলেন, এ হামলা ইরানের গোয়েন্দা ব্যর্থতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। শীর্ষ নেতৃত্ব আত্মগোপনে গেলে দেশটির আরও বেশি সামরিকীকরণ হতে পারে।যেখানে ভিন্নমতকে বিদেশি ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখা হবে। তাঁর মতে, ইরানের ‘মাথা’ সরানো হলেও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বৃহৎ ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারসমৃদ্ধ ‘দেহ’ এখনো অক্ষত এবং সেটিই সামনে বড় অনিশ্চয়তার বার্তা দিচ্ছে।

সূত্র: আল জাজিরা

/বিবি/