শিরোনাম

মধ্যপ্রাচ্যে যেসব দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে

সিটিজেন ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে যেসব দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলো ইরানের টার্গেটে পরিণত হয়। ছবি: সংগৃহীত

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি (শনিবার) ভোরে ইরানে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। আজ সোমবার (২ মার্চ) পর্যন্তও এই হামলা অব্যাহত রয়েছে। এতে নতুন করে সামরিক উত্তেজনায় পড়েছে মধ্যপ্রাচ্য। এর আগে অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছিল তেহরান। মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশে মার্কিন সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি ওই অঞ্চলের জলসীমায়ও যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজ মোতায়েন করা আছে।

এসব ঘাঁটিতে সামরিক ও বেসামরিক নাগরিক মিলিয়ে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ আছেন বলে ধারণা করা হয়। এছাড়াও রয়েছে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধজাহাজ।

ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ অভিযানের জবাবে ইরান ইতোমধ্যে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে প্রতিশোধমূলক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।

এর আগে গত বছর জুনে ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালানোর পর এসব সামরিক ঘাঁটিগুলো ইরানের সম্ভাব্য 'টার্গেট' (লক্ষ্যবস্তু) হয়ে দাঁড়ায়। ইরান আগেই সতর্ক করেছিল যে পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য তারা ‘সমস্ত বিকল্প খোলা রাখছে।’

মার্কিন যুদ্ধবিমান। ছবি: সংগৃহীত
মার্কিন যুদ্ধবিমান। ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি কোনো নতুন বিষয় নয়। ইরাকে যুদ্ধের সময় ওই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেনা সংখ্যা ১ লাখ ৬০ হাজারেরও বেশি ছাড়িয়ে গিয়েছিল। আফগানিস্তানে যুদ্ধের সময়েও মার্কিন সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।

ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা এবং লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজে ইয়েমেনের হুথিদের ক্রমাগত হামলার পর প্রতিক্রিয়াস্বরূপ ওই অঞ্চলে মার্কিন সেনা উপস্থিতি জোরদার করা হয়।

সামগ্রিকভাবে, এই অঞ্চলে বর্তমানে কমপক্ষে ১৯টি স্থানে স্থায়ী ও অস্থায়ী ঘাঁটি রয়েছে। এর মধ্যে স্থায়ী ঘাঁটি ৮টি। এগুলো রয়েছে বাহরাইন, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), ইরাক, সৌদি আরব ও জর্ডানে।

এই ঘাঁটিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের 'সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)' বা মার্কিন সেনাবাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ডের অধীনে।

কাতার

রাজধানী দোহার বাইরে মরুভূমিতে অবস্থিত ২৪ হেক্টর আয়তনের আল উদেইদ বিমানঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের ফরোয়ার্ড সদরদপ্তর এবং এর বিমান বাহিনীর ফরওয়ার্ড হেডকোয়ার্টার অবস্থিত। এটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত, যেখানে প্রায় ১০ হাজার সেনা অবস্থান করে।

সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। ছবি: সংগৃহীত
সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। ছবি: সংগৃহীত

এই সেন্ট্রাল কমান্ড মিসর থেকে কাজাখস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে মার্কিন সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। ইরাক, সিরিয়া ও আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে আল উদেইদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। মার্কিন বিমান বাহিনীর ৩৭৯তম এয়ার এক্সপিডিশনারি উইংও এই ঘাঁটিতে মোতায়েন রয়েছে।

চলতি বছর জানুয়ারিতে এই ঘাঁটিতে আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা জোরদারে একটি নতুন সমন্বয় কেন্দ্র চালু করা হয়েছে।

স্যাটেলাইট চিত্র অনুযায়ী, সম্প্রতি ওয়াশিংটন আল উদেইদের রানওয়ে থেকে কয়েক ডজন বিমান প্রত্যাহার করে নিয়েছে। গত ৫ জুন সেখানে ৪০টি বিমান দেখা গিয়েছিল। এর ঠিক দুই সপ্তাহ পরে সেখানে মাত্র তিনটি বিমান দেখা গিয়েছিল বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি। অনুমান করা হচ্ছে মার্কিন হস্তক্ষেপের পর পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসাবে ইরানের সম্ভাব্য হামলা থেকে রক্ষা করার জন্যই সেগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

বাহরাইন

বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম ফ্লিটের সদর দফতর অবস্থিত। এটি পারস্য উপসাগর, লোহিত সাগর, আরব সাগর এবং কেনিয়ার দক্ষিণে পূর্ব আফ্রিকার উপকূলে মার্কিন নৌবাহিনীর দায়িত্বে রয়েছে। এখানে মার্কিন নৌবাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ডের সদর দফতরও রয়েছে।

শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) ইরানে মার্কিন হামলার পর বাহরাইনে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে হামলা চালায় তেহরান। ছবি: সংগৃহীত
শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) ইরানে মার্কিন হামলার পর বাহরাইনে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে হামলা চালায় তেহরান। ছবি: সংগৃহীত

এই ঘাঁটিতে প্রায় ৯ হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে।

বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর চারটি মাইন বিধ্বংসী জাহাজ এবং দুটি লজিস্টিক সহায়তা জাহাজ রয়েছে। এছাড়া কোস্টগার্ডের ছয়টি ‘র‍্যাপিড রেসপন্স বোট’সহ আরও বেশ কয়েকটি জলযান অবস্থান করছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।

কুয়েত

কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক বড় সামরিক স্থাপনা রয়েছে। এখানে ক্যাম্প আরিফজান অবস্থিত, যেটি ইউএস আর্মি সেন্ট্রালের ফরোয়ার্ড সদরদপ্তর। ঘাঁটিটি মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কার্যক্রম ও রসদ সরবরাহের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। বিভিন্ন অভিযানের সময় প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দ্রুত পাঠানোর জন্য এখানে বিপুল পরিমাণ উপকরণ মজুদ রাখা হয়।

কুয়েতে ইরাক সীমান্ত থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আলি আল সালেম বিমানঘাঁটি অবস্থিত। এটি ‘দ্য রক’ নামে পরিচিত। ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের সময় এই ক্যাম্প স্থাপন করা হয়।

মার্কিন সেনাবাহিনীর ওয়েবসাইট অনুযায়ী, এটি ইরাক ও সিরিয়ায় মোতায়েনের আগে সেনা ইউনিটগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি কেন্দ্র বা প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

কুয়েতের ক্যাম্প আরিফজান ও আলী আল-সালেম বিমান ঘাঁটি মিলিয়েই প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত

সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবির দক্ষিণে আল ধাফরা বিমান ঘাঁটি অবস্থিত। এখানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি ঘাঁটিও রয়েছে আমিরাত বিমান বাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে ব্যবহৃত হয় এটি।

এই ঘাঁটিতে এফ-২২ এর মতো উন্নত বিমান, ড্রোন এবং সতর্কতা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে।

মার্কিন বিমান বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ইসলামিক স্টেট (আইএস) বিরোধী অভিযানসহ গোটা অঞ্চলে নজরদারি ও সামরিক মিশনে সহায়তা করেছে এটি।

দুবাইয়ের জেবেল আলি বন্দর আনুষ্ঠানিক সামরিক ঘাঁটি না হলেও এটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সবচেয়ে বড় ‘পোর্ট অব কল’ বা বন্দর। এখানে নিয়মিতভাবে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ভিড়ে।

ইরাক

ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের পতনের সময় ইরাকের ৫০০টিরও বেশি ঘাঁটিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার সেনা মোতায়েন ছিল। তবে বর্তমানে দেশটিতে প্রায় আড়াই হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে এবং ওয়াশিংটন তাদের ধীরে ধীরে প্রত্যাহার করার জন্য বাগদাদ সরকারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

ইরাকে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের আইন আল আসাদ সামরিক ঘাঁটি। ছবি: সংগৃহীত
ইরাকে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের আইন আল আসাদ সামরিক ঘাঁটি। ছবি: সংগৃহীত

পশ্চিম আনবার প্রদেশে অবস্থিত আইন আল আসাদ বিমানঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি রয়েছে। ২০২০ সালে ইরানের শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলাইমানি নিহত হওয়ার পর প্রতিশোধ নিতে এই ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল তেহরান।

এটি 'ইসলামিক স্টেট' নামক গোষ্ঠীকে রুখতে আন্তর্জাতিক জোটের অংশ। এখানে মার্কিন সামরিক বাহিনী মূলত কুর্দিস্তানের দু'টি বিমান ঘাঁটি- আল আসাদ এবং ইরবিল থেকে নিজেদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে।

সিরিয়া

সিরিয়ায় মার্কিন সামরিক উপস্থিতি মূলত ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। এর শুরু হয় ২০১১ সালে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার সময়। পরবর্তীতে ইসলামিক স্টেট সিরিয়া ও ইরাকের উল্লেখযোগ্য অঞ্চল দখল করে ফেলে।

সিরিয়ার বিভিন্ন ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২ হাজার সেনা মোতায়েন রয়েছে। তারা স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হয়ে এই গোষ্ঠীর পুনরুত্থান ঠেকাতে কাজ করছে।

গত জুন মাসে ওয়াশিংটন ঘোষণা করে, সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র পরিচালিত সামরিক ঘাঁটির সংখ্যা আট থেকে কমিয়ে কেবল একটিতে নামানো হবে এবং সিরিয়ার বিষয়ে তাদের নীতিতে পরিবর্তন আনা হবে, ‘কারণ এগুলোর কোনোটিই কাজ করেনি।’

সৌদি আরব

২০২৪ সালে সৌদি আরবে মার্কিন সেনার সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৩২১ জন। তারা সৌদি সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার এবং মার্কিন সামরিক বিমান পরিচালনায় সহায়তা করে।

এর কিছু সেনা রাজধানী রিয়াদের প্রায় ৬০ কিলোমিটার দক্ষিণে প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে অবস্থান করছে। এখানে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ও থাড প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন রয়েছে।

জর্ডান

রাজধানী আম্মান থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে আজরাকে অবস্থিত মুয়াফফাক আল সালতি বিমানঘাঁটিতে ইউএস এয়ার ফোর্সেস সেন্ট্রালের ৩৩২তম এয়ার এক্সপেডিশনারি উইং অবস্থান করছে।

জর্ডানে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের মুয়াফফাক আল সালতি বিমানঘাঁটি। ছবি: সংগৃহীত
জর্ডানে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের মুয়াফফাক আল সালতি বিমানঘাঁটি। ছবি: সংগৃহীত

এখান থেকে লেভান্ত অঞ্চল বা পূর্ব ভূমধ্যসাগর বরাবর পশ্চিম এশিয়ায় বিভিন্ন মিশন পরিচালিত হয়।

এছাড়াও জর্ডানে টাওয়ার-২২ নামে যুক্তরাষ্ট্রের একটি লজিস্টিক সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।

সূত্র: বিবিসি, রয়টার্স, আল জাজিরা

/জেএইচ/