
সিটিজেন ডেস্ক


যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠককে ‘ঐতিহাসিক’ বলে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবের পর এই প্রথমবারের মতো দুই দেশের মধ্যে এমন উচ্চপর্যায়ের সরাসরি যোগাযোগ দেখা গেল। বৈঠকটি ইতিবাচক পরিবেশে শেষ হয়েছে বলে জানা গেছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকটি প্রায় দুই ঘণ্টার কিছু কম সময় স্থায়ী হয় এবং এটি একটি ইতিবাচক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। আলোচনায় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু উঠে এসেছে, যার মধ্যে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়গুলিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
বিশেষভাবে লেবাননের পরিস্থিতি নিয়ে কিছু অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। একাধিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এখন দক্ষিণাঞ্চলে সীমাবদ্ধ রাখা হতে পারে এবং বৈরুতে আর হামলা না চালানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে এসব তথ্য এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণের অপেক্ষা চলছে।
ইরানি সূত্র আরও জানিয়েছে, দেশটির আটকে থাকা সম্পদ অবমুক্ত করার বিষয়েও কিছু অগ্রগতি হতে পারে। যদিও এ সংক্রান্ত বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করা হয়নি।
বৈঠকের বেশিরভাগ অংশই রুদ্ধদ্বার কক্ষে অনুষ্ঠিত হওয়ায় তথ্য খুব সীমিত আকারে বাইরে আসছে। ফলে এসব তথ্য যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ছে এবং প্রকৃত অগ্রগতি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে আরও সময় লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে জানা গেছে, আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে দুই পক্ষ নৈশভোজে আবারও বৈঠকে বসবে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংলাপ ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সম্পর্ক ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন শহরে ইসরায়েলি ড্রোন হামলার নতুন তথ্য প্রকাশ করেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা (এনএনএ)।
সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলের আল-মাজাদেল শহরে একটি ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি তেবনিন শহরেও আরেকটি হামলার খবর পাওয়া গেছে, যেখানে একটি গাড়িকে লক্ষ্য করে আঘাত হানা হয়।
তবে এসব হামলায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেছে কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ লেবাননে এ ধরনের হামলা অব্যাহত থাকায় আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে, বিশেষ করে চলমান কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই এসব ঘটনা নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় তারা লেবাননে হিজবুল্লাহর ২০০টিরও বেশি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। সর্বশেষ যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে দেওয়া এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়।
ইসরায়েলি বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের বিমান বাহিনী দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর বিভিন্ন অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা অব্যাহত রাখবে। এর মাধ্যমে সংগঠনটির সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার চেষ্টা চলছে বলে উল্লেখ করা হয়।
অন্যদিকে, এই অব্যাহত হামলা আঞ্চলিক কূটনৈতিক তৎপরতায় নতুন করে চাপ তৈরি করছে। ইরানের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে যুদ্ধবিরতির আলোচনা চলছে, তার আওতায় লেবাননের পরিস্থিতিও অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান সেই প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক অবস্থান তৈরি করছে।
বিশেষ করে, ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার সূচনাতেই লেবানন ইস্যু একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্তেজনার কারণ হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত কূটনৈতিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
এদিকে আল জাজিরার সাংবাদিক ওসামা বিন জাভেদ জানিয়েছেন, দক্ষিণ লেবাননে হামলা সীমিত রাখতে ইসরায়েলকে রাজি করানোর ক্ষেত্রে কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও পরিস্থিতি এখনও নাজুক এবং যেকোনো সময় নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

লেবাননে চলমান সামরিক অভিযান ঘিরে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ক্রমেই চাপের মুখে পড়ছেন বলে শোনা যাচ্ছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে সামরিক তৎপরতা কমানোর জন্য চাপ দিচ্ছেন।
বিশেষ করে, লেবাননে ওপর হামলা বন্ধ করা এবং লেবানন সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসার বিষয়ে তিনি সরাসরি নির্দেশনা দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, লেবানন সরকারও পরিস্থিতির চাপে নিজেদের সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েছে। তারা চাইছে না যে যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ইরান এগিয়ে আসুক। এই প্রেক্ষাপটে, চলমান সংঘাতের মধ্যেই তারা প্রচলিত কূটনৈতিক রীতি ভেঙে সরাসরি একজন ইসরায়েলি প্রতিনিধির সঙ্গে যোগাযোগ করেছে—যা পরিস্থিতির জটিলতাকেই আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
তবে প্রথম দফার বৈঠক থেকে বড় কোনো অগ্রগতি আসবে বলে মনে করা হচ্ছে না। উভয় পক্ষের অবস্থানের মধ্যে এখনও বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে চাপের মুখে আলোচনায় বসার মতো বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে।
এদিকে দেশের অভ্যন্তরেও নেতানিয়াহুর অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ছে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, তিনি জনপ্রিয়তায় পিছিয়ে পড়ছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এখনই নির্বাচন হলে ডানপন্থী রাজনীতির ভেতরেই তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন লিকুদ পার্টির চেয়ে বেশি আসন পেতে পারেন।
সব মিলিয়ে, লেবানন ইস্যুতে সামরিক ও কূটনৈতিক চাপের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ—এই তিন দিক থেকেই নেতানিয়াহু এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা নিয়ে আবারও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বক্তব্য দিয়েছেন। যদিও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সসহ তার প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিরা ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার লক্ষ্যে পাকিস্তানে অবস্থান করছেন। তবু ট্রাম্প নিজেই অনলাইনে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন।
নিজের সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ স্যোশালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প গণমাধ্যমে প্রচারিত সেই ধারণা নাকচ করেন, যেখানে ইরানকে সংঘাতে সুবিধাজনক অবস্থানে দেখানো হচ্ছে। তার ভাষ্য, বাস্তবে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, ‘সবাই জানে, তারা হেরেছে এবং বড় ব্যবধানে হারছে।’
তিনি আরও দাবি করেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার মতে, দেশটির কার্যত কোনো নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী কিংবা বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অবশিষ্ট নেই।
একই পোস্টে তিনি ইরানের নেতৃত্ব নিয়েও ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেন। ট্রাম্প বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাদের দীর্ঘদিনের ‘নেতারা’ এখন আর আমাদের মধ্যে নেই।’
এরপর ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে তিনি যোগ করেন, ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর!’
এদিকে ট্রাম্প আরও দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের প্রধান অবশিষ্ট হুমকি হলো সমুদ্র মাইন। তার অভিযোগ, ইরানি জাহাজগুলো এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে মাইন পেতে রেখেছে।
তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালি থেকে এসব মাইন অপসারণের কাজ শুরু করেছে। এই প্রক্রিয়ায় চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ফ্রান্স ও জার্মানিসহ একাধিক দেশকে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
একই সঙ্গে ট্রাম্প এসব দেশকে পরোক্ষভাবে সমালোচনা করে বলেন, তাদের মধ্যে এ ধরনের উদ্যোগ নিজেরা নেওয়ার মতো যথেষ্ট সাহস বা সদিচ্ছা নেই বলেই যুক্তরাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হচ্ছে।
ট্রাম্পের এই মন্তব্য ও দাবিগুলো এমন এক সময় এলো, যখন কূটনৈতিক পর্যায়ে উত্তেজনা প্রশমনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে তার বক্তব্য ও আন্তর্জাতিক মহলের মূল্যায়নের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।