শিরোনাম

জীবন বাঁচাতে কবরের জায়গা বিক্রি করছেন ইরানিরা

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
 জীবন বাঁচাতে কবরের জায়গা বিক্রি করছেন ইরানিরা
তেহরানের বেহেশত-ই জাহরা কবরস্থান। ছবি: ইরান ইন্টারন্যাশনাল

ইরানের সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকেছে অনেক আগেই। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি আর চরম অর্থনৈতিক মন্দায় কোনোমতে বেঁচে থাকাই এখন এক সংগ্রাম। তার ওপর নতুন এক দুঃস্বপ্ন হয়ে চেপে বসেছে শেষ বিদায়ের আকাশচুম্বী খরচ। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে, প্রিয়জনকে চিরনিদ্রায় শায়িত করতে গিয়ে ভিটেমাটি খোয়ানোর উপক্রম হচ্ছে সাধারণ পরিবারগুলোর। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের কোনো সামঞ্জস্য না থাকায় স্বজন হারানোর শোকের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে কবরের চিন্তা।

রাজধানী তেহরানের বিখ্যাত ‘বেহেশত-ই জোহরা’ গোরস্থানের চিত্র দেখলে চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। সেখানে তিন স্তরের একটি বেসরকারি প্লটের দাম হাঁকা হচ্ছে প্রায় ৩ হাজার কোটি রিয়াল—যা প্রায় ১৫ হাজার ডলারের সমান। অথচ সরকার নির্ধারিত হারের চেয়ে এই দাম প্রায় সাড়ে ৮ গুণ বেশি। বর্তমানে ইরানে একজন শ্রমিকের সর্বনিম্ন মাসে আয় করেন মাত্র ৮৩ ডলার বা ১৬.৬ কোটি রিয়ালের কাছাকাছি। এ হিসাবে কোনো শ্রমিক যদি এক টাকাও খরচ না করে পুরো আয় জমাতে থাকেন, তবুও একটি সাধারণ প্রাইভেট কবর কিনতে তার জীবনের অন্তত ১৫ বছর কেটে যাবে। এমনকি সরকার নির্ধারিত কম দামের প্লট কিনতে গেলেও শেষ হয়ে যাবে ২১ মাসের পুরো আয়।

এ সংকট কেবল রাজধানীতেই আটকে নেই, ছড়িয়ে পড়েছে মাশহাদ, কেরমানশাহ, কারাজ ও ইয়াজদের মতো শহরগুলোতেও। মাশহাদের পারিবারিক প্লট কিংবা পবিত্র ইমাম রেজার মাজারে দাফন করতে গুনতে হচ্ছে হাজার কোটি রিয়ালের ওপর। তার ওপর কবর কেনাই শেষ কথা নয়—লাশ পরিবহন, গোসল, কাফনের কাপড়, অ্যাম্বুলেন্স, এপিটাফ আর কুলখানির আপ্যায়ন মিলিয়ে শেষ বিদায়ের ন্যূনতম আয়োজন করতেই পকেট খালি হয়ে যাচ্ছে। তেহরানে মাত্র ১০০ জন অতিথির এক সাধারণ আয়োজনেই খরচ দাঁড়িয়েছে ১২০ থেকে ১৮০ কোটি রিয়াল। ফলে ব্যয় সামলাতে না পেরে শতবর্ষের পারিবারিক ও ধর্মীয় প্রথা কাটছাঁট করতে বাধ্য হচ্ছেন স্বজনেরা।

মূলত বিগত এক দশকে ডলারে আয়ের মান আড়াই গুণ কমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। আর এই কম সরবরাহ ও বেশি চাহিদার সুযোগে গজিয়ে উঠেছে এক শক্তিশালী দালাল চক্র। একটি জাতীয় পরিচয়পত্রে একাধিক কবর কেনায় নিষেধাজ্ঞা দিলেও পর্দার আড়ালের কেনাবেচা থামানো যাচ্ছে না। উল্টো বেঁচে থাকার তাগিদে অনেক পরিবার আগে থেকে কিনে রাখা কবরের জমি বিক্রি করে দিচ্ছে সংসারের খরচ চালাতে। আবার দেনার দায়ে আদালতের পরোয়ানায় স্বজনদের কবর নিলামে ওঠার মতো ঘটনাও ঘটছে।

শহরের এ চড়ামূল্য এড়াতে এখন মরদেহ নিয়ে গ্রামের দিকে ছোটাই নতুন প্রথায় পরিণত হয়েছে। তবে শহর থেকে আসা এ ‘মৃতদেহের অভিবাসনে’ অতিষ্ঠ হয়ে অনেক গ্রামের মানুষ এখন গোরস্থানের চারপাশে বেড়া দিতে শুরু করেছেন। এর ওপর যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক নিপীড়ন। আন্দোলনে প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের মরদেহ স্বজনদের হাতে তুলে দেওয়ার বিনিময়েও কোটি কোটি রিয়াল দাবির অভিযোগ উঠছে। সব মিলিয়ে ইরানে মৃত্যু এখন আর স্বজন হারানোর শোক নয়। এটি রূপ নিয়েছে এক অমানবিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটে।

সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল

/এমএকে/