শিরোনাম

অকল্পনীয় হারে পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে উত্তর কোরিয়া

সিটিজেন ডেস্ক
অকল্পনীয় হারে পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে উত্তর কোরিয়া
উত্তর কোরিয়ার একটি অজ্ঞাত স্থানে পারমাণবিক বোমার জ্বালানি উৎপাদনের একটি নতুন স্থাপনা পরিদর্শন করছেন কিম জং উন। ছবি: কেসিএনএ

মার্কিন ও দক্ষিণ কোরীয় সামরিক হুমকি মোকাবিলার অজুহাতে নিজেদের পারমাণবিক সক্ষমতা ‘অকল্পনীয় হারে’ বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছেন উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতা কিম জং উন। এ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে পিয়ংইয়ং পারমাণবিক বোমার জ্বালানি উৎপাদনের একটি নতুন ও অত্যাধুনিক স্থাপনা উন্মোচন করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর ধারণা, নবনির্মিত এই স্থাপনাটি মূলত একটি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র। দেশটির জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ জানিয়েছে, উত্তর কোরিয়ার এই বিপজ্জনক পারমাণবিক তৎপরতার ওপর কড়া নজর রাখছে সিউল ও ওয়াশিংটন। তবে স্পর্শকাতর নিরাপত্তা ইস্যু হওয়ায় এ বিষয়ে এখনই বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা কেসিএনএ দাবি করেছে, নতুন স্থাপনাটিতে অত্যন্ত আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। তবে কৌশলগত কারণে কেন্দ্রটির সুনির্দিষ্ট অবস্থান কিংবা কবে থেকে কার্যকর করা হয়েছে, সে সম্পর্কে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য দেওয়া হয়নি। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত আলোকচিত্রে দেখা গেছে, একটি বিশাল হলরুমে সারিবদ্ধভাবে অসংখ্য সেন্ট্রিফিউজ সাজানো রয়েছে। মূলত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রধান উপাদান তথা ইউরেনিয়ামকে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ করতে এ বিশেষ যন্ত্রগুলো ব্যবহার করা হয়। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, পিয়ংইয়ংয়ের এই নতুন ঘোষণা তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত, যা সামগ্রিকভাবে এশীয় অঞ্চলে নতুন করে তীব্র নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।

ক্রমবর্ধমান মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথ সামরিক তৎপরতা ও হুমকি মোকাবিলার অংশ হিসেবে কিম জং উন দীর্ঘদিন ধরে পারমাণবিক অস্ত্রাগার সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছিলেন। এই কারখানার উন্মোচন তারই বাস্তব প্রতিফলন। কেসিএনএর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিম নিজে এ পারমাণবিক স্থাপনাটি পরিদর্শন করেন এবং এর বর্তমান উৎপাদন পরিস্থিতি ও দীর্ঘমেয়াদী কর্মপরিকল্পনা খতিয়ে দেখেন। তিনি বলেন, দেশের সবচেয়ে বড় শত্রু অর্থাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে চলমান সংঘাতের জেরে নিজেদের পারমাণবিক যুদ্ধ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে গুণগত ও পরিমাণগত উভয় দিক থেকেই শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে তিনি অন্যান্য অনির্দিষ্ট বৈশ্বিক হুমকি ও সংকটের কথাও উল্লেখ করেন। উত্তর কোরিয়ার এ নেতার দাবি, গত ৫ বছরের তুলনায় বর্তমানে দেশটির অস্ত্র তৈরির উপযোগী পারমাণবিক উপকরণ উৎপাদনের সক্ষমতা দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও পিয়ংইয়ংয়ের এ দাবির সত্যতা স্বাধীন কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা দ্বারা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

নতুন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রটি পরিদর্শনের পর কিম ও তার প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেন। সেখানে দেশের পারমাণবিক শক্তি দ্রুত গতিতে বাড়ানোর লক্ষ্যে গৃহীত উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনাগুলোর অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিগুলোতে দেখা যায়, কিম রুপালি রঙের নল ও পাইপের তৈরি সেন্ট্রিফিউজ হলের মাঝখান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। অন্য একটি ছবিতে কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে তার টেবিলের ওপর একটি কোণ আকৃতির বস্তুর ঝাপসা চিত্র লক্ষ্য করা গেছে, যা কোনো পারমাণবিক ওয়ারহেডের নতুন নকশা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে উত্তর কোরিয়া যখন আরেকটি গোপন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র উন্মোচন করেছিল, তার ঠিক দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে এই নতুন স্থাপনার তথ্য সামনে আনা হলো। এর আগে ২০১০ সালে প্রথমবারের মতো বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সামনে ইয়ংবিয়ন পারমাণবিক কমপ্লেক্সের একটি সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র প্রদর্শন করেছিল পিয়ংইয়ং। ২০২৪ সালের ওই পরিদর্শনের সময়ও কিম দেশের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার অকল্পনীয়ভাবে বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে উন্নত প্রযুক্তির নতুন সেন্ট্রিফিউজ তৈরির ওপর জোর দিয়েছিলেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কিংবা প্লুটোনিয়াম উভয় উপাদান দিয়েই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা সম্ভব এবং উত্তর কোরিয়ার ইয়ংবিয়ন নিউক্লিয়ার সায়েন্টিফিক রিসার্চ সেন্টারে দুই ধরনের উপাদান উৎপাদনেরই পূর্ণ সুবিধা রয়েছে। ২০১৯ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কিম জং উনের উচ্চপর্যায়ের আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর থেকেই উত্তর কোরিয়া মূলত তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির আধুনিকীকরণে পূর্ণ মনোযোগ দেয়। এরপর থেকে ওয়াশিংটন ও সিউলের সব ধরনের কূটনৈতিক আলোচনার প্রস্তাব বারবার প্রত্যাখ্যান করে আসছে পিয়ংইয়ং। এরই ধারাবাহিকতায়, সম্প্রতি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রধান রাফায়েল গ্রোসি জানান, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে কার্যক্রমের ‘উল্লেখযোগ্য ও দ্রুত বৃদ্ধি’ লক্ষ্য করা গেছে, যা বিশ্বমঞ্চে দেশটির পারমাণবিক আগ্রাসন নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

সূত্র: এপি

/এমএকে/