চীন সীমান্তের নতুন হ্রদ কীভাবে নেপালের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে

চীন সীমান্তের নতুন হ্রদ কীভাবে নেপালের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে
সিজেডএন ডেস্ক

নেপালে ভয়াবহ হিমবাহ ধস ও আকস্মিক বন্যার ক্ষত এখনো কাটেনি। এর মধ্যেই দেশটির উত্তরাঞ্চলে নতুন করে তৈরি হয়েছে আরেক বিপদের আশঙ্কা। নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে ভূমিধসে নদীর গতিপথ আটকে গিয়ে তৈরি হয়েছে একটি বড় হ্রদ। ক্রমেই বাড়ছে সেই হ্রদের পানির উচ্চতা। ফলে যে কোনো সময় হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে আবারও ভয়াবহ বন্যা নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বুধবার (২৮ আগস্ট) হিমবাহ ধস, ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যায় নেপাল ও তিব্বতের বিস্তীর্ণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে শত শত মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন এক হাজারের বেশি মানুষ। উদ্ধারকাজও বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এর মধ্যেই শুক্রবার রাসুয়া জেলার কর্মকর্তারা জানান, নদীতে পানির প্রবাহ বাড়ছে। ওই এলাকার ভূমিধসের কারণে তৈরি হওয়া হ্রদটি উপচে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রাসুয়া জেলার প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা নরেন্দ্র পারিয়ার বলেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি নদীতে পানির স্তর বাড়ছে।’ তবে হ্রদটিতে ঠিক কতটা পানি জমেছে কিংবা পানির উচ্চতা কত, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এক দুর্যোগের পর আরেক বিপদের শঙ্কা
বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণে, সাম্প্রতিক দুর্যোগে এলাকায় একটি নয়, দুটি নতুন হ্রদ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে একটি তৈরি হয়েছে অনেক উঁচুতে, হিমবাহের কাছাকাছি এলাকায়। সেখানে হিমবাহ গলে আসা পানি আটকে আছে।
অন্য হ্রদটি তুলনামূলকভাবে বড় এবং নিচু এলাকায়। এটিই এখন বেশি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশাল এক ভূমিধসের কারণে নদীর উপত্যকা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেখানে পানি জমতে শুরু করেছে। এক অর্থে ভূমিধসের পাথর, কাদা, বরফ ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ নদীর ওপর প্রাকৃতিক বাঁধের মতো কাজ করছে।
নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পবন ভট্টরাই বলেন, নতুন হ্রদটি সম্ভবত তুষারধসের কারণে তৈরি হওয়া একটি প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধক হ্রদ। বরফ ও পাথরের বিশাল স্তর নদীর উপত্যকায় জমে পানি যাওয়ার পথ বন্ধ বা সংকুচিত করে দিয়েছে। এরপর সেই বাধার পেছনে পানি জমে হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে।
নেপালি গবেষক ও হিমবাহজনিত বন্যা বিশেষজ্ঞ নিতেশ খাড়কার মতে, স্যাটেলাইট ছবি ও ড্রোনের ভিডিওতে দুটি হ্রদের অস্তিত্ব দেখা গেছে। একটি তৈরি হয়েছে উজানের দিকে, আরেকটি লেহেন্দে নদীতে।
তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, উজানের হ্রদটি হিমবাহের গলিত পানি আটকে যাওয়ার কারণে তৈরি হয়েছে। আর লেহেন্দে নদীর হ্রদটি তৈরি হয়েছে ভূমিধস ও কাদাধসের কারণে নদীর প্রবাহ আটকে যাওয়ায়।
হ্রদটি কোথায় তৈরি হয়েছে
নতুন হ্রদটি নেপালের লেহেন্দে নদী ব্যবস্থায় ছোচেন খোলা ও পুরেপু সাংপো নদীর মিলনস্থলের কাছে তৈরি হয়েছে।
এ অঞ্চলটি নেপাল-চীন সীমান্তের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায়। হ্রদটি ভোটেকোশী ও ত্রিশূলী নদীর উজানে অবস্থিত। এই নদীগুলো পরে দক্ষিণ দিকে নেমে কাঠমান্ডু উপত্যকার দিকে পানি বহন করে।
ফলে উজানে তৈরি হওয়া হ্রদের বাঁধ ভেঙে গেলে তার প্রভাব শুধু সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রবল স্রোত ভাটির দিকের নদীপথ ও জনবসতিতেও বড় ধরনের বিপদ তৈরি করতে পারে।
কেন এতটা ভয়াবহ হতে পারে পরিস্থিতি
পাহাড়ি নদীর ওপর ভূমিধসের কারণে যখন এ ধরনের প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হয়, তখন সেটি সাধারণ বাঁধের মতো শক্ত ও স্থায়ী হয় না। পাথর, কাদা, বরফ ও মাটি মিলে তৈরি এই বাধা পানির চাপ সহ্য করতে না পারলে হঠাৎ ভেঙে যেতে পারে।
হ্রদ উপচে পড়লেও একই ধরনের বিপদ তৈরি হতে পারে। পানি প্রথমে বাধার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলে সেটি ধীরে ধীরে মাটি ও পাথর সরিয়ে নিতে পারে। একপর্যায়ে পুরো বাধা ভেঙে গিয়ে বিপুল পরিমাণ পানি, কাদা ও পাথর একসঙ্গে নিচের দিকে ছুটে যেতে পারে।
পবন ভট্টরাই বলেন, সবচেয়ে বড় আশঙ্কা শুধু হ্রদটির আকার নয়; বরং এর প্রাকৃতিক বাঁধ হঠাৎ ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা। পাহাড়ি এলাকায় এমন বাঁধ ভেঙে গেলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে ভাটির দিকে দ্রুতগতির পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ কাদা ও ধ্বংসাবশেষ নেমে যেতে পারে। এতে নিচের জনবসতিগুলো সতর্ক হওয়ার সময়ও খুব কম পাবে।
চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, হ্রদটিতে আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ লাখ ঘনমিটার পানি রয়েছে। আগামী তিন দিনে সেখানে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি জমতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে।
এই পরিমাণ পানি প্রায় ১ হাজার ২০০টি অলিম্পিক আকারের সুইমিং পুলের সমান।
উদ্ধারকাজেও তৈরি হচ্ছে নতুন বাধা
নেপাল ও তিব্বতে সাম্প্রতিক বন্যা ও ভূমিধসের পর এখনো নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে উদ্ধারকাজ চলছে। কিন্তু নতুন হ্রদের কারণে সেই কাজও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
রাসুয়া জেলায় শুক্রবার নদীর ওপর তৈরি প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর কিছু সময়ের জন্য উদ্ধার অভিযান বন্ধ রাখা হয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে আবার কাজ শুরু করা হয়।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, হ্রদ উপচে পড়ার কারণে তৈরি হওয়া ঝুঁকি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি পুরোপুরি নিরাপদ বলা যাচ্ছে না। হ্রদের পানি হঠাৎ নেমে এলে নতুন করে বন্যা ও ধস তৈরি হতে পারে। এতে নিখোঁজদের সন্ধানে থাকা উদ্ধারকারী দলগুলোর কাজ আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
নিতেশ খাড়কা বলেন, হ্রদটি ভেঙে গেলে শুধু পানি নয়, বিপুল পরিমাণ কাদা, পাথর ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষও ভাটির দিকে চলে আসবে। এতে উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি নদীর আশপাশের এলাকায় থাকা মানুষের জন্যও নতুন ঝুঁকি তৈরি হবে।
বিশেষ করে ভাটির দিকে থাকা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে কর্মরত শ্রমিক ও প্রকৌশলীরা ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। আকস্মিক বন্যার পানি সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়লে সেখানে থাকা মানুষ আটকা পড়তে পারেন।
চীনের বিশেষজ্ঞ দল মাঠে
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে চীন ইতোমধ্যে একটি প্রকৌশলী দল পাঠিয়েছে। সিসিটিভির তথ্য অনুযায়ী, আট সদস্যের ওই দল আকাশপথে হ্রদটি পর্যবেক্ষণ করছে এবং এর ত্রিমাত্রিক মডেল তৈরির কাজ করছে।
প্রকৌশলীদের একজন চেন হানশাও জানান, হিমবাহ ধসের পর হ্রদের আশপাশে অনেক বিচ্ছিন্ন ও খাড়া শৈলশিরা তৈরি হয়েছে। ফলে এলাকাটিতে সরাসরি পৌঁছানো এবং সেখানে কাজ করা অত্যন্ত কঠিন।
নেপালি বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ডের কারণে ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে সেখানে যাওয়া সহজ নয়। প্রয়োজনে হ্রদের পানি নিয়ন্ত্রিতভাবে কমিয়ে আনার চেষ্টা করা গেলেও বাস্তবে সেটি কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
কীভাবে ঝুঁকি কমানো সম্ভব
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাকৃতিকভাবে তৈরি এই হ্রদ বা নদীর ওপর জমে থাকা বিশাল ধ্বংসাবশেষ পুরোপুরি সরিয়ে ফেলা হয়তো সম্ভব নয়। তবে নিয়মিত নজরদারি ও আগাম প্রস্তুতির মাধ্যমে বিপদের মাত্রা কমানো যেতে পারে।
এর জন্য স্যাটেলাইট ও ড্রোনের মাধ্যমে নিয়মিত হ্রদটির আকার ও পানির উচ্চতা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। নদীর পানির স্তরও সার্বক্ষণিক নজরে রাখতে হবে। পাশাপাশি পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন হলে ভাটির দিকে থাকা মানুষকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
পবন ভট্টরাইয়ের মতে, উন্নত স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ, নদীর গতিপথে নতুন কোনো বাধা তৈরি হলে দ্রুত তা শনাক্ত করা, নদীর পানির স্তর সরাসরি পর্যবেক্ষণ এবং সময়মতো মানুষকে সরিয়ে নেওয়া গেলে এ ধরনের দুর্যোগের ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
নেপাল ও চীনের মধ্যে সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন নেই
সাম্প্রতিক বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও নেপাল আপাতত বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন নেই বলে জানিয়েছে।
নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লোক বাহাদুর ছেত্রী শুক্রবার বলেন, বিভিন্ন দেশ ও পক্ষ থেকে সহযোগিতার প্রস্তাব আসা স্বাভাবিক। তবে বর্তমানে নেপালের নিরাপত্তা বাহিনীগুলোই অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম চালাচ্ছে। এই মুহূর্তে বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন নেই বলে জানান তিনি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় নেপালের অন্তত ছয়টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন আটজন স্বাস্থ্যকর্মীও।
হিমালয়ে এমন ঘটনা নতুন নয়
নেপালে এবার যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট রূপ আগে দেখা না গেলেও হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ধস, ভূমিধস এবং হিমবাহের হ্রদ ভেঙে বন্যা হওয়ার ঘটনা নতুন নয়।
নেপালের ২০১২ সালের সেতি নদীর ভয়াবহ বন্যাকে এর একটি বড় উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন পবন ভট্টরাই। ওই ঘটনায় ভূমিধস, নদীর প্রবাহ সাময়িকভাবে আটকে যাওয়া এবং বরফ-পাথরের ধস মিলিয়ে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়েছিল।
সহজভাবে বললে, হিমবাহ ধস হলো পাহাড়ের ঢালে থাকা হিমবাহের বিশাল বরফের অংশ হঠাৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে নিচে নেমে আসা। এতে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর, মাটি ও পানি নিচের দিকে ছুটে যেতে পারে। কখনো এই প্রবাহ নদীর গতিপথ আটকে দেয়, আবার কখনো সরাসরি নদীতে পড়ে আকস্মিক বন্যা তৈরি করে।
আর হিমবাহ হ্রদের আকস্মিক বন্যা বা ‘গ্লেশিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড’ হলো হিমবাহের পাশে বা সামনে জমে থাকা হ্রদের বাঁধ হঠাৎ ভেঙে বিপুল পরিমাণ পানি নিচের দিকে নেমে যাওয়া।
আগেও হিমালয়ে ঘটেছে এমন দুর্যোগ
২০১৬ সালের জুলাইয়ে তিব্বতের আরু পর্বতমালায় একটি হিমবাহের বড় অংশ হঠাৎ ভেঙে পড়ে। এতে প্রায় ৬ কোটি ৮০ লাখ ঘনমিটার বরফ পাহাড় থেকে নিচে নেমে আসে। ওই ঘটনায় নয়জন পশুপালক ও শত শত প্রাণী মারা যায়।
ঘটনাটি ভারতের সঙ্গে চীনের সীমান্তবর্তী প্যাংগং সো এলাকার কাছাকাছি পশ্চিম তিব্বতে ঘটেছিল। এর মাত্র দুই মাস পর কাছাকাছি আরেকটি হিমবাহ ধসে পড়ে। সে সময় প্রায় ৮ কোটি ৩০ লাখ ঘনমিটার বরফ নিচে নেমে আসে।
২০২২ সালের নভেম্বরে চীনের কিংহাই প্রদেশে কুনলুন পর্বতমালার বুকাদাবান ফেং হিমবাহ থেকেও প্রায় ৪ কোটি ঘনমিটার বরফ ধসে পড়ে। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার বিশ্লেষণে দেখা যায়, বরফের একটি বড় অংশ নিচের হ্রদে আছড়ে পড়ে প্রায় ১৩ মিটার বা ৪২ ফুট উঁচু ঢেউ তৈরি করেছিল।
হিমবাহজনিত বন্যার ঘটনা ঘটেছে পাকিস্তানেও। ২০২২ সালের মে মাসে শিশপের হিমবাহ থেকে প্রবল বরফ ও পানির স্রোতে একটি বরফ-আবদ্ধ হ্রদের বাঁধ ভেঙে যায়। এতে হুনজা উপত্যকার হাসানাবাদ এলাকায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়।
হিমালয়ের এই ঘটনাগুলো দেখিয়ে দেয়, পাহাড়ি এলাকায় হিমবাহ ধসের বিপদ শুধু ধসের সময়টুকুতেই শেষ হয় না। ধসের পর নদীর গতিপথ বদলে যাওয়া, নতুন হ্রদ তৈরি হওয়া কিংবা প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে যাওয়ার মতো একের পর এক বিপদ তৈরি হতে পারে।
সূত্র: আল জাজিরা

নেপালে ভয়াবহ হিমবাহ ধস ও আকস্মিক বন্যার ক্ষত এখনো কাটেনি। এর মধ্যেই দেশটির উত্তরাঞ্চলে নতুন করে তৈরি হয়েছে আরেক বিপদের আশঙ্কা। নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে ভূমিধসে নদীর গতিপথ আটকে গিয়ে তৈরি হয়েছে একটি বড় হ্রদ। ক্রমেই বাড়ছে সেই হ্রদের পানির উচ্চতা। ফলে যে কোনো সময় হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে আবারও ভয়াবহ বন্যা নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বুধবার (২৮ আগস্ট) হিমবাহ ধস, ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যায় নেপাল ও তিব্বতের বিস্তীর্ণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে শত শত মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন এক হাজারের বেশি মানুষ। উদ্ধারকাজও বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এর মধ্যেই শুক্রবার রাসুয়া জেলার কর্মকর্তারা জানান, নদীতে পানির প্রবাহ বাড়ছে। ওই এলাকার ভূমিধসের কারণে তৈরি হওয়া হ্রদটি উপচে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রাসুয়া জেলার প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা নরেন্দ্র পারিয়ার বলেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি নদীতে পানির স্তর বাড়ছে।’ তবে হ্রদটিতে ঠিক কতটা পানি জমেছে কিংবা পানির উচ্চতা কত, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এক দুর্যোগের পর আরেক বিপদের শঙ্কা
বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণে, সাম্প্রতিক দুর্যোগে এলাকায় একটি নয়, দুটি নতুন হ্রদ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে একটি তৈরি হয়েছে অনেক উঁচুতে, হিমবাহের কাছাকাছি এলাকায়। সেখানে হিমবাহ গলে আসা পানি আটকে আছে।
অন্য হ্রদটি তুলনামূলকভাবে বড় এবং নিচু এলাকায়। এটিই এখন বেশি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশাল এক ভূমিধসের কারণে নদীর উপত্যকা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেখানে পানি জমতে শুরু করেছে। এক অর্থে ভূমিধসের পাথর, কাদা, বরফ ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ নদীর ওপর প্রাকৃতিক বাঁধের মতো কাজ করছে।
নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পবন ভট্টরাই বলেন, নতুন হ্রদটি সম্ভবত তুষারধসের কারণে তৈরি হওয়া একটি প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধক হ্রদ। বরফ ও পাথরের বিশাল স্তর নদীর উপত্যকায় জমে পানি যাওয়ার পথ বন্ধ বা সংকুচিত করে দিয়েছে। এরপর সেই বাধার পেছনে পানি জমে হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে।
নেপালি গবেষক ও হিমবাহজনিত বন্যা বিশেষজ্ঞ নিতেশ খাড়কার মতে, স্যাটেলাইট ছবি ও ড্রোনের ভিডিওতে দুটি হ্রদের অস্তিত্ব দেখা গেছে। একটি তৈরি হয়েছে উজানের দিকে, আরেকটি লেহেন্দে নদীতে।
তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, উজানের হ্রদটি হিমবাহের গলিত পানি আটকে যাওয়ার কারণে তৈরি হয়েছে। আর লেহেন্দে নদীর হ্রদটি তৈরি হয়েছে ভূমিধস ও কাদাধসের কারণে নদীর প্রবাহ আটকে যাওয়ায়।
হ্রদটি কোথায় তৈরি হয়েছে
নতুন হ্রদটি নেপালের লেহেন্দে নদী ব্যবস্থায় ছোচেন খোলা ও পুরেপু সাংপো নদীর মিলনস্থলের কাছে তৈরি হয়েছে।
এ অঞ্চলটি নেপাল-চীন সীমান্তের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায়। হ্রদটি ভোটেকোশী ও ত্রিশূলী নদীর উজানে অবস্থিত। এই নদীগুলো পরে দক্ষিণ দিকে নেমে কাঠমান্ডু উপত্যকার দিকে পানি বহন করে।
ফলে উজানে তৈরি হওয়া হ্রদের বাঁধ ভেঙে গেলে তার প্রভাব শুধু সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রবল স্রোত ভাটির দিকের নদীপথ ও জনবসতিতেও বড় ধরনের বিপদ তৈরি করতে পারে।
কেন এতটা ভয়াবহ হতে পারে পরিস্থিতি
পাহাড়ি নদীর ওপর ভূমিধসের কারণে যখন এ ধরনের প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হয়, তখন সেটি সাধারণ বাঁধের মতো শক্ত ও স্থায়ী হয় না। পাথর, কাদা, বরফ ও মাটি মিলে তৈরি এই বাধা পানির চাপ সহ্য করতে না পারলে হঠাৎ ভেঙে যেতে পারে।
হ্রদ উপচে পড়লেও একই ধরনের বিপদ তৈরি হতে পারে। পানি প্রথমে বাধার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলে সেটি ধীরে ধীরে মাটি ও পাথর সরিয়ে নিতে পারে। একপর্যায়ে পুরো বাধা ভেঙে গিয়ে বিপুল পরিমাণ পানি, কাদা ও পাথর একসঙ্গে নিচের দিকে ছুটে যেতে পারে।
পবন ভট্টরাই বলেন, সবচেয়ে বড় আশঙ্কা শুধু হ্রদটির আকার নয়; বরং এর প্রাকৃতিক বাঁধ হঠাৎ ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা। পাহাড়ি এলাকায় এমন বাঁধ ভেঙে গেলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে ভাটির দিকে দ্রুতগতির পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ কাদা ও ধ্বংসাবশেষ নেমে যেতে পারে। এতে নিচের জনবসতিগুলো সতর্ক হওয়ার সময়ও খুব কম পাবে।
চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, হ্রদটিতে আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ লাখ ঘনমিটার পানি রয়েছে। আগামী তিন দিনে সেখানে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি জমতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে।
এই পরিমাণ পানি প্রায় ১ হাজার ২০০টি অলিম্পিক আকারের সুইমিং পুলের সমান।
উদ্ধারকাজেও তৈরি হচ্ছে নতুন বাধা
নেপাল ও তিব্বতে সাম্প্রতিক বন্যা ও ভূমিধসের পর এখনো নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে উদ্ধারকাজ চলছে। কিন্তু নতুন হ্রদের কারণে সেই কাজও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
রাসুয়া জেলায় শুক্রবার নদীর ওপর তৈরি প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর কিছু সময়ের জন্য উদ্ধার অভিযান বন্ধ রাখা হয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে আবার কাজ শুরু করা হয়।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, হ্রদ উপচে পড়ার কারণে তৈরি হওয়া ঝুঁকি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি পুরোপুরি নিরাপদ বলা যাচ্ছে না। হ্রদের পানি হঠাৎ নেমে এলে নতুন করে বন্যা ও ধস তৈরি হতে পারে। এতে নিখোঁজদের সন্ধানে থাকা উদ্ধারকারী দলগুলোর কাজ আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
নিতেশ খাড়কা বলেন, হ্রদটি ভেঙে গেলে শুধু পানি নয়, বিপুল পরিমাণ কাদা, পাথর ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষও ভাটির দিকে চলে আসবে। এতে উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি নদীর আশপাশের এলাকায় থাকা মানুষের জন্যও নতুন ঝুঁকি তৈরি হবে।
বিশেষ করে ভাটির দিকে থাকা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে কর্মরত শ্রমিক ও প্রকৌশলীরা ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। আকস্মিক বন্যার পানি সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়লে সেখানে থাকা মানুষ আটকা পড়তে পারেন।
চীনের বিশেষজ্ঞ দল মাঠে
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে চীন ইতোমধ্যে একটি প্রকৌশলী দল পাঠিয়েছে। সিসিটিভির তথ্য অনুযায়ী, আট সদস্যের ওই দল আকাশপথে হ্রদটি পর্যবেক্ষণ করছে এবং এর ত্রিমাত্রিক মডেল তৈরির কাজ করছে।
প্রকৌশলীদের একজন চেন হানশাও জানান, হিমবাহ ধসের পর হ্রদের আশপাশে অনেক বিচ্ছিন্ন ও খাড়া শৈলশিরা তৈরি হয়েছে। ফলে এলাকাটিতে সরাসরি পৌঁছানো এবং সেখানে কাজ করা অত্যন্ত কঠিন।
নেপালি বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ডের কারণে ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে সেখানে যাওয়া সহজ নয়। প্রয়োজনে হ্রদের পানি নিয়ন্ত্রিতভাবে কমিয়ে আনার চেষ্টা করা গেলেও বাস্তবে সেটি কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
কীভাবে ঝুঁকি কমানো সম্ভব
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাকৃতিকভাবে তৈরি এই হ্রদ বা নদীর ওপর জমে থাকা বিশাল ধ্বংসাবশেষ পুরোপুরি সরিয়ে ফেলা হয়তো সম্ভব নয়। তবে নিয়মিত নজরদারি ও আগাম প্রস্তুতির মাধ্যমে বিপদের মাত্রা কমানো যেতে পারে।
এর জন্য স্যাটেলাইট ও ড্রোনের মাধ্যমে নিয়মিত হ্রদটির আকার ও পানির উচ্চতা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। নদীর পানির স্তরও সার্বক্ষণিক নজরে রাখতে হবে। পাশাপাশি পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন হলে ভাটির দিকে থাকা মানুষকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
পবন ভট্টরাইয়ের মতে, উন্নত স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ, নদীর গতিপথে নতুন কোনো বাধা তৈরি হলে দ্রুত তা শনাক্ত করা, নদীর পানির স্তর সরাসরি পর্যবেক্ষণ এবং সময়মতো মানুষকে সরিয়ে নেওয়া গেলে এ ধরনের দুর্যোগের ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
নেপাল ও চীনের মধ্যে সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন নেই
সাম্প্রতিক বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও নেপাল আপাতত বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন নেই বলে জানিয়েছে।
নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লোক বাহাদুর ছেত্রী শুক্রবার বলেন, বিভিন্ন দেশ ও পক্ষ থেকে সহযোগিতার প্রস্তাব আসা স্বাভাবিক। তবে বর্তমানে নেপালের নিরাপত্তা বাহিনীগুলোই অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম চালাচ্ছে। এই মুহূর্তে বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন নেই বলে জানান তিনি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় নেপালের অন্তত ছয়টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন আটজন স্বাস্থ্যকর্মীও।
হিমালয়ে এমন ঘটনা নতুন নয়
নেপালে এবার যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট রূপ আগে দেখা না গেলেও হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ধস, ভূমিধস এবং হিমবাহের হ্রদ ভেঙে বন্যা হওয়ার ঘটনা নতুন নয়।
নেপালের ২০১২ সালের সেতি নদীর ভয়াবহ বন্যাকে এর একটি বড় উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন পবন ভট্টরাই। ওই ঘটনায় ভূমিধস, নদীর প্রবাহ সাময়িকভাবে আটকে যাওয়া এবং বরফ-পাথরের ধস মিলিয়ে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়েছিল।
সহজভাবে বললে, হিমবাহ ধস হলো পাহাড়ের ঢালে থাকা হিমবাহের বিশাল বরফের অংশ হঠাৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে নিচে নেমে আসা। এতে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর, মাটি ও পানি নিচের দিকে ছুটে যেতে পারে। কখনো এই প্রবাহ নদীর গতিপথ আটকে দেয়, আবার কখনো সরাসরি নদীতে পড়ে আকস্মিক বন্যা তৈরি করে।
আর হিমবাহ হ্রদের আকস্মিক বন্যা বা ‘গ্লেশিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড’ হলো হিমবাহের পাশে বা সামনে জমে থাকা হ্রদের বাঁধ হঠাৎ ভেঙে বিপুল পরিমাণ পানি নিচের দিকে নেমে যাওয়া।
আগেও হিমালয়ে ঘটেছে এমন দুর্যোগ
২০১৬ সালের জুলাইয়ে তিব্বতের আরু পর্বতমালায় একটি হিমবাহের বড় অংশ হঠাৎ ভেঙে পড়ে। এতে প্রায় ৬ কোটি ৮০ লাখ ঘনমিটার বরফ পাহাড় থেকে নিচে নেমে আসে। ওই ঘটনায় নয়জন পশুপালক ও শত শত প্রাণী মারা যায়।
ঘটনাটি ভারতের সঙ্গে চীনের সীমান্তবর্তী প্যাংগং সো এলাকার কাছাকাছি পশ্চিম তিব্বতে ঘটেছিল। এর মাত্র দুই মাস পর কাছাকাছি আরেকটি হিমবাহ ধসে পড়ে। সে সময় প্রায় ৮ কোটি ৩০ লাখ ঘনমিটার বরফ নিচে নেমে আসে।
২০২২ সালের নভেম্বরে চীনের কিংহাই প্রদেশে কুনলুন পর্বতমালার বুকাদাবান ফেং হিমবাহ থেকেও প্রায় ৪ কোটি ঘনমিটার বরফ ধসে পড়ে। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার বিশ্লেষণে দেখা যায়, বরফের একটি বড় অংশ নিচের হ্রদে আছড়ে পড়ে প্রায় ১৩ মিটার বা ৪২ ফুট উঁচু ঢেউ তৈরি করেছিল।
হিমবাহজনিত বন্যার ঘটনা ঘটেছে পাকিস্তানেও। ২০২২ সালের মে মাসে শিশপের হিমবাহ থেকে প্রবল বরফ ও পানির স্রোতে একটি বরফ-আবদ্ধ হ্রদের বাঁধ ভেঙে যায়। এতে হুনজা উপত্যকার হাসানাবাদ এলাকায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়।
হিমালয়ের এই ঘটনাগুলো দেখিয়ে দেয়, পাহাড়ি এলাকায় হিমবাহ ধসের বিপদ শুধু ধসের সময়টুকুতেই শেষ হয় না। ধসের পর নদীর গতিপথ বদলে যাওয়া, নতুন হ্রদ তৈরি হওয়া কিংবা প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে যাওয়ার মতো একের পর এক বিপদ তৈরি হতে পারে।
সূত্র: আল জাজিরা

চীন সীমান্তের নতুন হ্রদ কীভাবে নেপালের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে
সিজেডএন ডেস্ক

নেপালে ভয়াবহ হিমবাহ ধস ও আকস্মিক বন্যার ক্ষত এখনো কাটেনি। এর মধ্যেই দেশটির উত্তরাঞ্চলে নতুন করে তৈরি হয়েছে আরেক বিপদের আশঙ্কা। নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে ভূমিধসে নদীর গতিপথ আটকে গিয়ে তৈরি হয়েছে একটি বড় হ্রদ। ক্রমেই বাড়ছে সেই হ্রদের পানির উচ্চতা। ফলে যে কোনো সময় হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে আবারও ভয়াবহ বন্যা নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বুধবার (২৮ আগস্ট) হিমবাহ ধস, ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যায় নেপাল ও তিব্বতের বিস্তীর্ণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে শত শত মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন এক হাজারের বেশি মানুষ। উদ্ধারকাজও বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এর মধ্যেই শুক্রবার রাসুয়া জেলার কর্মকর্তারা জানান, নদীতে পানির প্রবাহ বাড়ছে। ওই এলাকার ভূমিধসের কারণে তৈরি হওয়া হ্রদটি উপচে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রাসুয়া জেলার প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা নরেন্দ্র পারিয়ার বলেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি নদীতে পানির স্তর বাড়ছে।’ তবে হ্রদটিতে ঠিক কতটা পানি জমেছে কিংবা পানির উচ্চতা কত, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এক দুর্যোগের পর আরেক বিপদের শঙ্কা
বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণে, সাম্প্রতিক দুর্যোগে এলাকায় একটি নয়, দুটি নতুন হ্রদ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে একটি তৈরি হয়েছে অনেক উঁচুতে, হিমবাহের কাছাকাছি এলাকায়। সেখানে হিমবাহ গলে আসা পানি আটকে আছে।
অন্য হ্রদটি তুলনামূলকভাবে বড় এবং নিচু এলাকায়। এটিই এখন বেশি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশাল এক ভূমিধসের কারণে নদীর উপত্যকা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেখানে পানি জমতে শুরু করেছে। এক অর্থে ভূমিধসের পাথর, কাদা, বরফ ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ নদীর ওপর প্রাকৃতিক বাঁধের মতো কাজ করছে।
নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পবন ভট্টরাই বলেন, নতুন হ্রদটি সম্ভবত তুষারধসের কারণে তৈরি হওয়া একটি প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধক হ্রদ। বরফ ও পাথরের বিশাল স্তর নদীর উপত্যকায় জমে পানি যাওয়ার পথ বন্ধ বা সংকুচিত করে দিয়েছে। এরপর সেই বাধার পেছনে পানি জমে হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে।
নেপালি গবেষক ও হিমবাহজনিত বন্যা বিশেষজ্ঞ নিতেশ খাড়কার মতে, স্যাটেলাইট ছবি ও ড্রোনের ভিডিওতে দুটি হ্রদের অস্তিত্ব দেখা গেছে। একটি তৈরি হয়েছে উজানের দিকে, আরেকটি লেহেন্দে নদীতে।
তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, উজানের হ্রদটি হিমবাহের গলিত পানি আটকে যাওয়ার কারণে তৈরি হয়েছে। আর লেহেন্দে নদীর হ্রদটি তৈরি হয়েছে ভূমিধস ও কাদাধসের কারণে নদীর প্রবাহ আটকে যাওয়ায়।
হ্রদটি কোথায় তৈরি হয়েছে
নতুন হ্রদটি নেপালের লেহেন্দে নদী ব্যবস্থায় ছোচেন খোলা ও পুরেপু সাংপো নদীর মিলনস্থলের কাছে তৈরি হয়েছে।
এ অঞ্চলটি নেপাল-চীন সীমান্তের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায়। হ্রদটি ভোটেকোশী ও ত্রিশূলী নদীর উজানে অবস্থিত। এই নদীগুলো পরে দক্ষিণ দিকে নেমে কাঠমান্ডু উপত্যকার দিকে পানি বহন করে।
ফলে উজানে তৈরি হওয়া হ্রদের বাঁধ ভেঙে গেলে তার প্রভাব শুধু সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রবল স্রোত ভাটির দিকের নদীপথ ও জনবসতিতেও বড় ধরনের বিপদ তৈরি করতে পারে।
কেন এতটা ভয়াবহ হতে পারে পরিস্থিতি
পাহাড়ি নদীর ওপর ভূমিধসের কারণে যখন এ ধরনের প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হয়, তখন সেটি সাধারণ বাঁধের মতো শক্ত ও স্থায়ী হয় না। পাথর, কাদা, বরফ ও মাটি মিলে তৈরি এই বাধা পানির চাপ সহ্য করতে না পারলে হঠাৎ ভেঙে যেতে পারে।
হ্রদ উপচে পড়লেও একই ধরনের বিপদ তৈরি হতে পারে। পানি প্রথমে বাধার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলে সেটি ধীরে ধীরে মাটি ও পাথর সরিয়ে নিতে পারে। একপর্যায়ে পুরো বাধা ভেঙে গিয়ে বিপুল পরিমাণ পানি, কাদা ও পাথর একসঙ্গে নিচের দিকে ছুটে যেতে পারে।
পবন ভট্টরাই বলেন, সবচেয়ে বড় আশঙ্কা শুধু হ্রদটির আকার নয়; বরং এর প্রাকৃতিক বাঁধ হঠাৎ ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা। পাহাড়ি এলাকায় এমন বাঁধ ভেঙে গেলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে ভাটির দিকে দ্রুতগতির পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ কাদা ও ধ্বংসাবশেষ নেমে যেতে পারে। এতে নিচের জনবসতিগুলো সতর্ক হওয়ার সময়ও খুব কম পাবে।
চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, হ্রদটিতে আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ লাখ ঘনমিটার পানি রয়েছে। আগামী তিন দিনে সেখানে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি জমতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে।
এই পরিমাণ পানি প্রায় ১ হাজার ২০০টি অলিম্পিক আকারের সুইমিং পুলের সমান।
উদ্ধারকাজেও তৈরি হচ্ছে নতুন বাধা
নেপাল ও তিব্বতে সাম্প্রতিক বন্যা ও ভূমিধসের পর এখনো নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে উদ্ধারকাজ চলছে। কিন্তু নতুন হ্রদের কারণে সেই কাজও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
রাসুয়া জেলায় শুক্রবার নদীর ওপর তৈরি প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর কিছু সময়ের জন্য উদ্ধার অভিযান বন্ধ রাখা হয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে আবার কাজ শুরু করা হয়।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, হ্রদ উপচে পড়ার কারণে তৈরি হওয়া ঝুঁকি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি পুরোপুরি নিরাপদ বলা যাচ্ছে না। হ্রদের পানি হঠাৎ নেমে এলে নতুন করে বন্যা ও ধস তৈরি হতে পারে। এতে নিখোঁজদের সন্ধানে থাকা উদ্ধারকারী দলগুলোর কাজ আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
নিতেশ খাড়কা বলেন, হ্রদটি ভেঙে গেলে শুধু পানি নয়, বিপুল পরিমাণ কাদা, পাথর ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষও ভাটির দিকে চলে আসবে। এতে উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি নদীর আশপাশের এলাকায় থাকা মানুষের জন্যও নতুন ঝুঁকি তৈরি হবে।
বিশেষ করে ভাটির দিকে থাকা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে কর্মরত শ্রমিক ও প্রকৌশলীরা ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। আকস্মিক বন্যার পানি সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়লে সেখানে থাকা মানুষ আটকা পড়তে পারেন।
চীনের বিশেষজ্ঞ দল মাঠে
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে চীন ইতোমধ্যে একটি প্রকৌশলী দল পাঠিয়েছে। সিসিটিভির তথ্য অনুযায়ী, আট সদস্যের ওই দল আকাশপথে হ্রদটি পর্যবেক্ষণ করছে এবং এর ত্রিমাত্রিক মডেল তৈরির কাজ করছে।
প্রকৌশলীদের একজন চেন হানশাও জানান, হিমবাহ ধসের পর হ্রদের আশপাশে অনেক বিচ্ছিন্ন ও খাড়া শৈলশিরা তৈরি হয়েছে। ফলে এলাকাটিতে সরাসরি পৌঁছানো এবং সেখানে কাজ করা অত্যন্ত কঠিন।
নেপালি বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ডের কারণে ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে সেখানে যাওয়া সহজ নয়। প্রয়োজনে হ্রদের পানি নিয়ন্ত্রিতভাবে কমিয়ে আনার চেষ্টা করা গেলেও বাস্তবে সেটি কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
কীভাবে ঝুঁকি কমানো সম্ভব
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাকৃতিকভাবে তৈরি এই হ্রদ বা নদীর ওপর জমে থাকা বিশাল ধ্বংসাবশেষ পুরোপুরি সরিয়ে ফেলা হয়তো সম্ভব নয়। তবে নিয়মিত নজরদারি ও আগাম প্রস্তুতির মাধ্যমে বিপদের মাত্রা কমানো যেতে পারে।
এর জন্য স্যাটেলাইট ও ড্রোনের মাধ্যমে নিয়মিত হ্রদটির আকার ও পানির উচ্চতা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। নদীর পানির স্তরও সার্বক্ষণিক নজরে রাখতে হবে। পাশাপাশি পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন হলে ভাটির দিকে থাকা মানুষকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
পবন ভট্টরাইয়ের মতে, উন্নত স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ, নদীর গতিপথে নতুন কোনো বাধা তৈরি হলে দ্রুত তা শনাক্ত করা, নদীর পানির স্তর সরাসরি পর্যবেক্ষণ এবং সময়মতো মানুষকে সরিয়ে নেওয়া গেলে এ ধরনের দুর্যোগের ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
নেপাল ও চীনের মধ্যে সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন নেই
সাম্প্রতিক বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও নেপাল আপাতত বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন নেই বলে জানিয়েছে।
নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লোক বাহাদুর ছেত্রী শুক্রবার বলেন, বিভিন্ন দেশ ও পক্ষ থেকে সহযোগিতার প্রস্তাব আসা স্বাভাবিক। তবে বর্তমানে নেপালের নিরাপত্তা বাহিনীগুলোই অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম চালাচ্ছে। এই মুহূর্তে বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন নেই বলে জানান তিনি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় নেপালের অন্তত ছয়টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন আটজন স্বাস্থ্যকর্মীও।
হিমালয়ে এমন ঘটনা নতুন নয়
নেপালে এবার যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট রূপ আগে দেখা না গেলেও হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ধস, ভূমিধস এবং হিমবাহের হ্রদ ভেঙে বন্যা হওয়ার ঘটনা নতুন নয়।
নেপালের ২০১২ সালের সেতি নদীর ভয়াবহ বন্যাকে এর একটি বড় উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন পবন ভট্টরাই। ওই ঘটনায় ভূমিধস, নদীর প্রবাহ সাময়িকভাবে আটকে যাওয়া এবং বরফ-পাথরের ধস মিলিয়ে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়েছিল।
সহজভাবে বললে, হিমবাহ ধস হলো পাহাড়ের ঢালে থাকা হিমবাহের বিশাল বরফের অংশ হঠাৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে নিচে নেমে আসা। এতে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর, মাটি ও পানি নিচের দিকে ছুটে যেতে পারে। কখনো এই প্রবাহ নদীর গতিপথ আটকে দেয়, আবার কখনো সরাসরি নদীতে পড়ে আকস্মিক বন্যা তৈরি করে।
আর হিমবাহ হ্রদের আকস্মিক বন্যা বা ‘গ্লেশিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড’ হলো হিমবাহের পাশে বা সামনে জমে থাকা হ্রদের বাঁধ হঠাৎ ভেঙে বিপুল পরিমাণ পানি নিচের দিকে নেমে যাওয়া।
আগেও হিমালয়ে ঘটেছে এমন দুর্যোগ
২০১৬ সালের জুলাইয়ে তিব্বতের আরু পর্বতমালায় একটি হিমবাহের বড় অংশ হঠাৎ ভেঙে পড়ে। এতে প্রায় ৬ কোটি ৮০ লাখ ঘনমিটার বরফ পাহাড় থেকে নিচে নেমে আসে। ওই ঘটনায় নয়জন পশুপালক ও শত শত প্রাণী মারা যায়।
ঘটনাটি ভারতের সঙ্গে চীনের সীমান্তবর্তী প্যাংগং সো এলাকার কাছাকাছি পশ্চিম তিব্বতে ঘটেছিল। এর মাত্র দুই মাস পর কাছাকাছি আরেকটি হিমবাহ ধসে পড়ে। সে সময় প্রায় ৮ কোটি ৩০ লাখ ঘনমিটার বরফ নিচে নেমে আসে।
২০২২ সালের নভেম্বরে চীনের কিংহাই প্রদেশে কুনলুন পর্বতমালার বুকাদাবান ফেং হিমবাহ থেকেও প্রায় ৪ কোটি ঘনমিটার বরফ ধসে পড়ে। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার বিশ্লেষণে দেখা যায়, বরফের একটি বড় অংশ নিচের হ্রদে আছড়ে পড়ে প্রায় ১৩ মিটার বা ৪২ ফুট উঁচু ঢেউ তৈরি করেছিল।
হিমবাহজনিত বন্যার ঘটনা ঘটেছে পাকিস্তানেও। ২০২২ সালের মে মাসে শিশপের হিমবাহ থেকে প্রবল বরফ ও পানির স্রোতে একটি বরফ-আবদ্ধ হ্রদের বাঁধ ভেঙে যায়। এতে হুনজা উপত্যকার হাসানাবাদ এলাকায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়।
হিমালয়ের এই ঘটনাগুলো দেখিয়ে দেয়, পাহাড়ি এলাকায় হিমবাহ ধসের বিপদ শুধু ধসের সময়টুকুতেই শেষ হয় না। ধসের পর নদীর গতিপথ বদলে যাওয়া, নতুন হ্রদ তৈরি হওয়া কিংবা প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে যাওয়ার মতো একের পর এক বিপদ তৈরি হতে পারে।
সূত্র: আল জাজিরা









