শিরোনাম

নকশিকাঁথা সেলাইয়ের আয়ে চলে স্কুল

রাজশাহী সংবাদদাতা
রাজশাহী সংবাদদাতা
নকশিকাঁথা সেলাইয়ের আয়ে চলে স্কুল
নারীরা কাঁথা সেলাইয়ে ব্যস্ত। সম্প্রতি রাজশাহীর পবা উপজেলার ভূগরইল খ্রিষ্টানপাড়া গ্রামে

সরজমিনে দেখা গেছে, বাচ্চারা শ্রেণিকক্ষে পড়ছে আর বাইরে মায়েরা বসে কাঁথা সেলাই করছেন। ১০-১৫ জন নারী একসঙ্গে বসে কাঁথা সেলাই করছেন এবং গল্প করছেন। পাশে দাঁড়িয়ে সে গল্প বোঝা যায় না। কারণ, তারা কথা বলছেন সাঁওতালি ও মাহালি ভাষায়।

জানা গেছে, কাঁথা সেলাইয়ের আয়ে চলে বিদ্যালয়টি। একজন মা বললেন, ‘মাকার কি ইশকুলে বে আমালকো লেখাপড়া মিললেনি।’ যা বাংলা তরজমা করলে দাঁড়ায়, ‘এই স্কুল না থাকলে আমাদের বাচ্চারা লেখাপড়া শিখতে পারত না।’

যেভাবে বিদ্যালয়

নকশিকাঁথা সেলাইয়ের কাজ শুরুর পর সুমী লক্ষ্য করলেন, তার সেলাইয়ের কাজের সঙ্গে নগরের কয়েরদাঁড়া খ্রিষ্টানপাড়া ও পবা উপজেলার ভূগরইল গ্রামের নারীরা বেশি জড়িত। তাদের সন্তানদের পড়াশোনার কোনো সুযোগ নেই। ভূগরইল গ্রামেও কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। সেই চিন্তা থেকে গির্জার ভেতরে ঘর ভাড়া নিয়ে স্কুলের কার্যক্রম শুরু করেন।

শিশুপ্রভাত বিদ্যানিকেতন
শিশুপ্রভাত বিদ্যানিকেতনের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী

স্কুল প্রতিষ্ঠার গল্প জানতে চাইলে সুমী মুর্মু বলেন, ‘আমি আদিবাসী নারী উন্নয়নের জন্য কাজ করি। নারীরা কাঁথা সেলাই করে যে মজুরি পান, তার একটা অংশ স্কুলের পেছনে ব্যয় করেন। শিশুরা সারাদিন ঘুরে ফিরে। তারা যদি অনন্ত চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করতে পারে, তাহলে কিছুটা হলেও অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন হবে। প্রতি মাসে স্কুলের ঘরভাড়া দিতে হয় ১ হাজার টাকা। শিক্ষক কর্মচারী ৭ জন। তাদের মধ্যে ৫ জন শিক্ষক ও দু্ইজন আয়া রয়েছেন। স্কুলের দুই শাখায় শিক্ষার্থী ১২৫ জন। ২০২২ সালের শুরুতে শিক্ষকরা স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করেছেন। আসা-যাওয়ার ভাড়া দিয়েছি মাত্র ১৫০০ টাকা। এখন শিক্ষকদের তিন হাজার ও আয়াকে মাসে দুই হাজার টাকা সম্মানী দেই। স্কুলের সব ব্যয় সংস্থা থেকে মেটানো হয়।’

উদ্যোক্তা সুমী মুর্মু
উদ্যোক্তা সুমী মুর্মু

তিনি আরও বলেন, ‘স্কুলে মিড ডে মিল কার্যক্রম এখনো চালু হয়নি। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।’

সুমী মুর্মু ২০২২ সালে সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে ‘নারী ও শিশুকল্যাণ সংস্থা’র নিবন্ধন নেন। সেখানে সংস্থার কাজের পরিধি হিসেবে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য বিদ্যালয় পরিচালনার কথাও বলা হয়। তখন অধিদপ্তর থেকে তাকে শর্ত দেওয়া হয়, বিদ্যালয়ে শুধু নিজের সম্প্রদায় নয়, সব সম্প্রদায়ের শিশুদের পড়ার সুযোগ দিতে হবে। তিনি সেই শর্তেই কার্যক্রম শুরু করেন।

একইভাবে উপজেলার সন্তোষপুর গ্রামের মিশনে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করেছেন। এতে প্লে থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত সব সম্প্রদায়ের শিশুরা পড়াশোনা করছে।

সম্প্রতি ভূগরইল বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, ক্ষদ্র জাতিগোষ্ঠীর বাচ্চাদের সঙ্গে একই বেঞ্চে বসে পড়ছেন আলভী, রাফি ও আক্তার হোসনা, অনিষা ভূঁইয়া, শ্রী মাহির। তাদের দেখে বোঝার উপায় নেই তারা কোন সম্প্রদায়ের মানুষ। অভিভাবক মুক্তি বিশ্বাসের বলেন, অনেক দূরে স্কুল। এই স্কুল না থাকলে আমার ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা হতো না।

সন্তোষপুর স্কুলে গিয়েও একই দৃশ্য দেখা গেল। দুটি বিদ্যালয় পরিপাটি করে সাজানো। শিক্ষকরা একই ধরনের শাড়ি পরে এসেছেন। নোটিশ বোর্ডেও হাতের সুন্দর লেখার নোটিশ।

শিক্ষার্থী
শিশুপ্রভাত বিদ্যানিকেতনের শ্রেণিকক্ষ

ভুগরইল গির্জার ফাদার লিটন কস্তা বলেন, ‘পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের শিশুদের লেখাপড়া চালিয়ে নেওয়ার জন্য নামমাত্র ভাড়ায় বিদ্যালয়ের ঘরটি ভাড়া দিয়েছি। সুমীর এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়।’

এলাকার নারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২১ সালে যাত্রা শুরু করে ‘নারী ও শিশুকল্যাণ সংস্থা’র। এই সংস্থার উদ্যোগে তৈরি করা হয় নকশিকাঁথা। সেই কাঁথার আয় দিয়ে চলে স্কুল। একেকটি নকশিকাঁথা ৮০০ টাকা থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। মাসে গড়ে ১৫০টি কাঁথা বিক্রি হয়। কয়েরদাঁড়া খ্রিষ্টানপাড়ায় নিজ বাড়ির আঙিনায় ‘প্রকৃতি কালেকশন’ নামের একটি বিক্রয়কেন্দ্র গড়ে তুলেছেন সংস্থার পরিচালক সুমী মুর্মু। এই কাজে এখন তার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন ১৭২ নারী।

সুমী মুর্মুর বাবা আলবেট মুর্মু রাজশাহী সেনানিবাসের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ছিলেন। তিনি ছেলেমেয়েদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করার স্বপ্ন দেখতেন; কিন্তু যা বেতন পেতেন, তাতে সংসার খরচ মেটানোই দায় ছিল। খরচ যোগাতে তার মা-ও মাঠে কাজ করতেন।

সুমীর পড়াশোনা

১৯৯৬ সালে সুমি ভর্তি পরীক্ষায় ক্যান্টনমেন্ট স্কুলে ভর্তির সুযোগ পান। সেখান থেকেই ২০০৬ সালে এসএসসি পাস করেন। ভর্তি হন রাজশাহী নিউ গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজে। তবে এসএসসি পরীক্ষার পরই পরিবারের চাপে সুমীকে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার আগেই মা হন। শ্বশুরবাড়ির লোকজনের ইচ্ছা আর পড়াশোনার দরকার নেই; কিন্তু সুমী শিশুসন্তানকে ঘুম পাড়িয়ে বই নিয়ে বসেন। এভাবে এইচএসসি পাস করেন। এরপর রাজশাহী কলেজ থেকে ২০১৩ সালে স্নাতক (পাস কোর্স) ও ২০১৫ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। বিরতি দিয়ে পরে বিএড ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মার্কেটিং বিভাগের এমবিএ করেছেন।

চাকরি ছেড়ে উদ্যোক্তা

লেখাপড়া শেষ করে সুমী মুর্মু একটি বেসরকারি ব্যাংকের মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ হিসেবে যোগদান করেন। তিন বছর চাকরি করেন; কিন্তু নিজ সম্প্রদায়ের নারীদের জীবন ছবি তার চোখে ভাসতে থাকে। তিনি চার বছরের মাথায় চাকরি থেকে ইস্তফা দেন। সঞ্চিত অর্থ নিয়ে নিজের সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নয়নের জন্য আত্মকর্মসংস্থানের কথা ভাবেন।

নকশিকাঁথা সেলাইয়ের আয়ে চলে স্কুল 2
নকশিকাঁথা সেলাইয়ে ব্যস্ত নারীরা

সুমী মুর্মু বলেন, নারীদের এখন মাঠে যেতে হয় না। তারা বাচ্চাদের পড়াশোনায় সময় দিতে পারেন। কাঁথা সেলাই করে পরিবারে বাড়তি আয়েরও জোগান দিচ্ছেন।

কয়েরদাঁড়া খ্রিষ্টানপাড়া মহল্লার অ্যামেলি বাষ্কী কাঁথা সেলাই করেন। তিনি বলেন, ‘সংসারে আগে অনেক অভাব ছিল। এখন সুমি দিদির এখানে কাজ করছি। ছয় থেকে আট হাজার টাকা আয় করতে পারছি, এখন ভালো আছি।’

/এসআর/