শিরোনাম

দেশে বিক্রি হচ্ছে বিদেশি পানি, ক্রেতা কারা

দেশে বিক্রি হচ্ছে বিদেশি পানি, ক্রেতা কারা
গ্রাফিক্স: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

দেশের বাজারে বিক্রি হচ্ছে বিদেশি পানি। এই পানির নির্দিষ্ট কিছু ক্রেতা রয়েছে। বিশেষ করে বিদেশি নাগরিক, বিভিন্ন দূতাবাসের কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশের অনেক নাগরিক যারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাস করছেন তারাই মূলত এই পানির ক্রেতা। দেশে বছরে কয়েক লাখ ডলারের বিদেশি পানি আমদানি হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিদেশি পানির বাজারে এখন রাজত্ব করছে ফ্রান্স, ইতালি, নরওয়ে ও ফিজির নামিদামি ব্র্যান্ড। মূলত দেশের পাঁচ তারকা হোটেল, বিদেশি দূতাবাস, কূটনৈতিক জোনে কর্মরত কর্মকর্তা এবং উচ্চবিত্ত ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের চাহিদার ওপর ভর করেই দেশে এই বিদেশি পানির বাজার তৈরি হয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বিদেশি পানির আমদানিকারক ও পরিবেশকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে বোতলজাত পানির বাজার এক হাজার ২০০ কোটি টাকার। এর মধ্যে বিদেশি পানির বাজার প্রায় ২০ কোটি টাকার। তবে বিদেশি পানির প্রকৃত চাহিদা ও বাজার ঠিক কত কোটি টাকার তা নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। ৯-১০টি প্রতিষ্ঠান এসব পানি আমদানি ও বাজারজাত করছে। তবে অধিকাংশ আমদানিকারকই গোপনীয়তার সঙ্গে আমদানি করছেন।

দেশীয় সাধারণ বোতলজাত পানির তুলনা আমদানি করা পানির দাম প্রায় ১০ থেকে ২০ গুণ বেশি। ব্র্যান্ড, বোতলের উপাদান (প্লাস্টিক ও প্রিমিয়াম কাচ) এবং আমদানিকারকদের লজিস্টিকস খরচের ওপর ভিত্তি করে খুচরা মূল্যে কিছুটা ভিন্নতা দেখা যায়। বাজারে সাধারণত ২৫০ মিলি, ৩৩০ মিলি থেকে শুরু করে ১.৫ লিটার পর্যন্ত বোতলজাত পানি পাওয়া যায়।

বাংলাদেশে বিদেশি বা আমদানি করা প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডের পানি মূলত রাজধানী ঢাকা এবং বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রামের সুনির্দিষ্ট কিছু অভিজাত এলাকা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সরবরাহ ও বিক্রি করা হয়। মহল্লার দোকানে এসব পানি পাওয়া যায় না।

বিদেশি পানি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান শাহীন ফুড সাপ্লায়ার্সের কর্মকর্তা মো. রিপন আহমেদ বলেন, কমপক্ষে ১০ জন আমদানিকারক বিদেশি পানি আমদানি করছেন। সারাদেশে তাদের পরিবেশক রয়েছে। আগে মাসে ৭০০-১২০০ কার্টন পানি বিক্রি করতেন। এখন কিছুটা কমে ৬০০-৭০০ কার্টন বিক্রি হচ্ছে।

রিপন আহমেদ আরও বলেন, রাজধানীর বড় বড় সুপারশপ, শপিংমল ও বিপণিবিতানে এসব পানি বিক্রি হচ্ছে। বোতলের আকারভেদে এসব পানির দামও ভিন্ন। ইভিয়ান ব্র্যান্ডের ৩৩০-৫০০ মিলিলিটারের (মিলি) বোতল ২১৫-২৫০ টাকা, ৭৫০-১০০০ মিলির বোতল ৩২৫-৪০০ টাকা ও দেড় লিটারের বোতল ৪৫০-৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া প্রেরিয়া ব্র্যান্ডের ২৫০–৩৩০ মিলির বোতল ২১০-২৮০ টাকা, ৫০০-১০০০ মিলির বোতল ৩৮০-৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বিদেশি পানি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স মাওলা ট্রেডার্সের নাজমুল হোসেন সম্রাট সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, দেশে ২০০১ সালের দিকে প্রথম বিদেশি পানি আমদানি শুরু হয়। বর্তমানে বিদেশি পানি অনেকেই আমদানি ও বাজারজাত করছেন। এই পানির বড় একটি বাজার ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর বাজার ছোট হয়ে যায়।

ঢাকার রিটেইল চেইন সুপারশপ ইউনিমার্টের বিপণন কর্মকর্তারা জানান, দেশে বিদেশি পানির চাহিদা রয়েছে। শুধু বিদেশি নাগরিকই নন, যেসব বাংলাদেশি বিদেশে বসবাস করছেন, তারা বাংলাদেশে আসলে দেশীয় পানি ব্যবহারে সমস্যা হয়। এই কারণে তারা আমদানি করা পানি ব্যবহার করেন। এছাড়া বিদেশি নাগরিকেরা এসব পানি কিনছেন।

গুলশাল–১ এর ডিসিসি মার্কেটের বিদেশি পানি বিক্রেতা নূর হোসেন বলেন, বিদেশি পানির একটি বাজার রয়েছে। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর এসব পানির বিক্রি কিছুটা কমেছে। এ কারণে আমদানির পরিমাণ কমেছে। দেড় লিটারের ছয় বোতলের কার্টন তিনি দুই হাজার ৫০০ থেকে দুই হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি করছেন।

বিদেশি পানির বিষয়ে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এএইচএম সফিকুজ্জামানের সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, এসব পানি যথাযথভাবে আমদানি শুল্ক পরিশোধ করে দেশে আনা হচ্ছে কি না এবং আমদানির পর বিএসটিআইয়ের ছাড়পত্র নেওয়া হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা দরকার।

তবে বিএসটিআইয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, বিদেশি পানি প্রকৃতপক্ষে বিদেশ থেকে আমদানি করা কি না তা তা খতিয়ে দেখা হবে। কারণ অনেক সময়ই দেশে তৈরি পণ্যে বিদেশি পণ্যের পণ্যের প্যাকেটে ঢুকিয়ে বিক্রি করা হয়।

জানতে চাইলে বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক কাজী ইমদাদুল হক সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, পানি আমদানির জন্য বিএসটিআইয়ের অনুমোদন দরকার হয়। কেউ অনুমোদন না নিয়ে পানি আমদানি করছে কি না তা খতিয়ে দেখা হবে।

ব্যবসায়ীদের মতে, দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রিমিয়াম ফুড ও বেভারেজের বাজার প্রতিনিয়ত বড় হচ্ছে। যদিও ২০ কোটি টাকার এই বিদেশি পানির বাজার বোতলজাত পানির সামগ্রিক বাজারের তুলনায় খুব ছোট। তবুও এ পানির একটি নির্দিষ্ট এবং স্থায়ী গ্রাহক গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে।

/বিবি/