তেল নিয়ে তেলেসমাতি

তেল নিয়ে তেলেসমাতি
সিটিজেন ডেস্ক

জ্বালানি তেল নিয়ে দেশ জুড়ে শুরু হয়েছে এক নজিরবিহীন ‘তেলেসমাতি’ কারবার। বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি ও মজুতের অপতৎপতায় মেতে উঠেছে একটি অসাধু সিন্ডিকেট। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অভিযান চালিয়ে লাখ লাখ লিটার তেল জব্দ এবং জেল-জরিমানা করার পরও থামছে না সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য। ফলে তেলের ‘কৃত্রিম’ সংকটে ভোগান্তি পোহানোর পাশাপাশি হয়রানির শিকার হচ্ছে ভোক্তারা। এই অপরাধ বন্ধে মজুতকারীদের কঠোর শাস্তি প্রয়োজনে– ‘মৃত্যুদণ্ড’ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলমান সংকট মোকাবেলায় সরকার বিভিন্ন নিয়ম-কানুন মেনে চলার আহ্বান জানায়। পাশাপাশি নেওয়া হয় নানা উদ্যোগ। তবুও দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল পাচ্ছে না গ্রাহকেরা। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর পরপরই সংকট আঁচ করতে পেরে দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুতের হিড়িক পড়ে। অতিরিক্ত মূল্যে বিক্রির উদ্দেশ্যে অসাধু ব্যবসায়ীরা ড্রাম ও বোতলে তেল ভরে মজুত করছেন।
সংকটের অজুহাতে জ্বালানি ‘তেল নেই’ লেখা সাইনবোর্ড টাঙিয়েছে কিছু ফিলিং স্টেশন। তবে তারা গোপনে অতিরিক্ত দামে তেল বিক্রি করছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) নির্ধারিত তেল বিপণন কোম্পানিগুলো থেকে চাহিদা অনুযায়ী তেল বরাদ্দ না পাওয়ার অভিযোগ তুলে কিছু ফিলিং স্টেশন মালিক কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ মার্চ থেকে ১ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে মজুত করা ৩ লাখ ৭২ হাজার ৩৮৮ লিটার জ্বালানি তেল জব্দ করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত ।
বর্তমানে তেলের জন্য হাহাকার, অবৈধ তেল মজুত, পেট্রোল পাম্পে তেল না থাকা, অবৈধ ভাবে অতিরিক্ত দামে তেল বিক্রি, পাশের দেশগুলোতে তেল পাচার, তেলের জন্য হামলা, বিভিন্ন জায়গায় ফিলিং স্টেশন বন্ধ করে দেওয়াসহ নানা ঘটনায় সারা দেশে এক ধরনের অরাজকতা বিরাজ করছে। গত কয়েকদিনে সংবাদদাতাদের প্রতিবেদনেও উঠে আসে এসব চিত্র।
পানির ট্যাংকে মিললো ৮০০ লিটার ডিজেল
তেল মজুতে বহুবিধ উপায় বের করেছে দেশের অসাধু ব্যবসায়ীরা। বাদ যায়নি বাড়ির ছাদের পানির ট্যাংক। বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) দিবাগত মধ্য রাতে নোয়াখালীর সুবর্ণচরে এক ব্যবসায়ীর বাড়ির ছাদে পানির ট্যাংকে অবৈধভাবে মজুত রাখা ৮০০ লিটার ডিজেল জব্দ করেছে উপজেলা প্রশাসন। এ ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যবসায়ীকে ১০ হাজার জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

মুদি দোকানির ৩০০ টাকা দরে অকটেন বিক্রি
অবৈধভাবে মজুত তেল চড়া মূল্যে বিক্রি করছেন এক মুদি দোকানি। বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) সন্ধ্যায় রাজবাড়ী পৌরসভার ১নং বেড়াডাঙ্গা চরকেষ্টপুর এলাকায় অভিযানকালে এ তথ্য জানায় ভ্রাম্যমাণ আদালত।

জানা গেছে, ওই এলাকার মেসার্স জমশেদ স্টোরের মালিক বিভিন্ন প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেল চালকদের কাছ থেকে অকটেন ও পেট্রোল ক্রয় করে তা মজুত করেন। পরে এসব তেল গ্রাহকদের কাছে ৩০০ টাকা লিটার বিক্রি করেন। অভিযোগের সত্যতা মেলায় ওই মুদি দোকানিকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা হয়।
লিখে রেখেছে ‘তেল নেই’, অভিযানে মিললো ১৩ হাজার লিটার
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার একটি প্রতিষ্ঠানের নাম নয়ন ফিলিং স্টেশন। গত ২৮ মার্চ ‘তেল নেই’ লেখা নির্দেশিকা টাঙিয়ে জ্বালানি বিক্রি বন্ধ রাখে কর্তৃপক্ষ। এমন খবরে সেখানে অভিযান চালানোর পর ২ হাজার ৪৮৯ লিটার পেট্রোল এবং ১০ হাজার ৯৪১ লিটার ডিজেল পাওয়া যায়।

এ সময় পাম্পটিকে তাৎক্ষণিকভাবে জ্বালানি তেল বিক্রি শুরু করতে নির্দেশ ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
তেল চুরির দণ্ড থেকে বাঁচতে ‘ধর্মঘট’
তেল সরবরাহ ঠিক রাখতে অভিযানেও দেখা গেছে নানা প্রতিবন্ধকতা। মার্চ মাসের শেষের দিকে নীলফামারীতে অবৈধভাবে তেল বহনের অভিযোগে তেলবাহী লরির চালক ও তার সহকারীসহ তিনজনের ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং জরিমানা করা হয়। এ ঘটনায় গত ২৯ মার্চ রংপুর বিভাগের আট জেলায় অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু করেছেন ট্যাংকলরী শ্রমিকরা।
আন্দোলনকালে দিনাজপুরের পার্বতীপুর রেলহেড অয়েল ডিপোতে তেল উত্তোলন ও সরবরাহ কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়। এতে উত্তরাঞ্চলে জ্বালানি তেল সরবরাহ কার্যত বন্ধ হয়ে পড়েছিল। পরবর্তীতে আটককৃতদের মুক্তির আশ্বাসে দীর্ঘ ১২ ঘণ্টা পর ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়।
তেলের দাবিতে আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ
তেলের দাবিতে ভোক্তাদের নামতে দেখা গেছে সড়কে। গত ২৭ মার্চ সাতক্ষীরার ছয়ঘরিয়াস্থ লস্কর পেট্রোল পাম্পে তেল না পেয়ে সড়কে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ করেছে বিক্ষুব্ধ জনতা।
স্থানীয়রা জানান, পাম্পে তেল থাকার পরও সাধারণ গ্রাহকদের দেওয়া হচ্ছে না –এমন অভিযোগে মোটরসাইকেল চালক ও স্থানীয়রা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। একপর্যায়ে তারা পাম্পের সামনের সড়কে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে এবং বাঁশ দিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করেন।
ভুক্তভোগীদের দাবি, পাম্প মালিকরা সিন্ডিকেট করে সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত করে খোলা বাজারে চড়া দামে তেল বিক্রি করছেন।
‘৮ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ২০০ টাকার পেট্রোল পেয়েছি’
দেশের যেসব পাম্পে জ্বালানি তেল পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেও দেখা গেছে নানা হয়রানির চিত্র। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন অনেক ক্রেতা।
গত ২৭ মার্চ জামালপুর সদরের মেসার্স মোমো-মিথি ফিলিং স্টেশনে মনুসুর নামে এক বাইকার বলেন, ৮ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ২০০ টাকার পেট্রোল পেয়েছি। অনেক বাইকারের ভাগ্যে তা-ও জুটছে না।
পাম্পের ভেজাল ডিজেলে বিকল ট্রাক
দীর্ঘ অপেক্ষা পর পাওয়া স্বল্প জ্বালানিতেও চলে নানা প্রতারণা। চাহিদা তুঙ্গে থাকায় অনেক ব্যবসায়ী আবার বিক্রি করছেন ভেজাল জ্বালানি তেল। সাতক্ষীরার কলারোয়ায় একটি ফিলিং স্টেশন থেকে নেওয়া ভেজাল ডিজেলে ট্রাকের ইঞ্জিন বিকল হয়ে ৪ লাখ টাকার কাঁচামাল নষ্ট হওয়ারও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ট্রাকচালক মো. সালাম বলেন, উপজেলার কাজীরহাট এলাকার ‘মেসার্স ডেলমা ফিলিং স্টেশন’ থেকে তেল নেওয়ার কিছু সময় পরেই গাড়ির শব্দ বদলে যায় এবং যশোরে গিয়ে ইঞ্জিন জ্যাম হয়ে যায়। মিস্ত্রীরা তেলের ট্যাংক পরীক্ষা করে পানি মিশ্রিত ডিজেল পেয়েছেন।’
পাম্পের ম্যানেজার মো. আব্দুল হাকিম স্বীকার করেছেন, ডিজেলে পানি মেশানো ছিলো।
তেল না পেয়ে ট্রাকচাপায় ফিলিং স্টেশন ম্যানেজারকে হত্যা
তেলের জন্য দেশের নানা জায়গায় সংহিস ঘটনা ঘটেছে। গত ২৮ মার্চ নড়াইলে জ্বালানি তেল না পেয়ে বাগবিতণ্ডার পর একটি ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজারকে ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যার অভিযোগে আতঙ্ক ছড়ায় দেশের সব পাম্প সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।
জানা গেছে, ট্রাকচাপার আগে অভিযুক্ত সুজাত নামের এক ট্রাকচালক উপজেলার তুলারামপুর এলাকায় তানভীর ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে আসেন। এ সময় তেল নেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ম্যানেজার নাহিদ সরদারের সঙ্গে ট্রাকচালকের কথা কাটাকাটি হয়। তেল না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে চালক প্রকাশ্যে ম্যানেজারকে ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যার হুমকি দেন। হুমকির ঘটনার পর নাহিদ বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ট্রাকচালক বের হয়। পরে পাম্প থেকে একটু সামনে নাহিদের মোটরসাইকেলটি চাপা দিয়ে চলে যায় ট্রাকটি। এ সময় ঘটনাস্থলেই নিহত হন নাহিদ।
মিয়ানমারে ডিজেল পাচারকালে আটক ৭
ভোগান্তি-সংকট-সহিংসতার মধ্যে থেমে নেই তেলের চোরাকারবারিরা। গত ২৭ মার্চ মিয়ানমারে পাচারকালে ১ হাজার ৬০০ লিটার ডিজেল, ৩ হাজার ৩০০ কেজি আলকাতরা, ৪টি ডিজেল ইঞ্জিনসহ একটি নৌযান জব্দ করে কোস্টগার্ড। আটক করা হয় পাচার চক্রের ৭ সদস্যকে।
অভিযানে আটক ব্যক্তিরা স্বীকার করেন, তারা এসব জ্বালানি তেল ও সরঞ্জাম অবৈধভাবে শুল্ক-কর ফাঁকি দিয়ে মিয়ানমারে নিয়ে যাচ্ছিলেন।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, বিশ্ববাজারের অস্থিরতাকে পুঁজি করে দেশে জ্বালানি তেলের যে ‘তেলেসমাতি’ কারবার শুরু হয়েছে, তার বলি হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। মজুতদারি, কৃত্রিম সংকট আর সহিংসতার এই চিত্র বলে দিচ্ছে– কেবল জরিমানা বা বিচ্ছিন্ন অভিযান দিয়ে এই সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব নয়। সংকটের এই সুযোগে যারা জনজীবনকে জিম্মি করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং আরও বেশি তদারকি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সার্বিক পরিস্থিতিতে এবার কঠোর হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। শনিবার (৪ এপ্রিল) এক অনুষ্ঠানে কালোবাজারি ও মজুতদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে আইন, বিচার ও সংসদ-বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘তেল সংকট কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হচ্ছে। আমরা এতদিন নমনীয় ছিলাম। প্রয়োজন হলে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫ ধারা অনুযায়ী কালোবাজারি ও মজুতদারির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।’

জ্বালানি তেল নিয়ে দেশ জুড়ে শুরু হয়েছে এক নজিরবিহীন ‘তেলেসমাতি’ কারবার। বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি ও মজুতের অপতৎপতায় মেতে উঠেছে একটি অসাধু সিন্ডিকেট। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অভিযান চালিয়ে লাখ লাখ লিটার তেল জব্দ এবং জেল-জরিমানা করার পরও থামছে না সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য। ফলে তেলের ‘কৃত্রিম’ সংকটে ভোগান্তি পোহানোর পাশাপাশি হয়রানির শিকার হচ্ছে ভোক্তারা। এই অপরাধ বন্ধে মজুতকারীদের কঠোর শাস্তি প্রয়োজনে– ‘মৃত্যুদণ্ড’ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলমান সংকট মোকাবেলায় সরকার বিভিন্ন নিয়ম-কানুন মেনে চলার আহ্বান জানায়। পাশাপাশি নেওয়া হয় নানা উদ্যোগ। তবুও দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল পাচ্ছে না গ্রাহকেরা। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর পরপরই সংকট আঁচ করতে পেরে দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুতের হিড়িক পড়ে। অতিরিক্ত মূল্যে বিক্রির উদ্দেশ্যে অসাধু ব্যবসায়ীরা ড্রাম ও বোতলে তেল ভরে মজুত করছেন।
সংকটের অজুহাতে জ্বালানি ‘তেল নেই’ লেখা সাইনবোর্ড টাঙিয়েছে কিছু ফিলিং স্টেশন। তবে তারা গোপনে অতিরিক্ত দামে তেল বিক্রি করছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) নির্ধারিত তেল বিপণন কোম্পানিগুলো থেকে চাহিদা অনুযায়ী তেল বরাদ্দ না পাওয়ার অভিযোগ তুলে কিছু ফিলিং স্টেশন মালিক কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ মার্চ থেকে ১ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে মজুত করা ৩ লাখ ৭২ হাজার ৩৮৮ লিটার জ্বালানি তেল জব্দ করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত ।
বর্তমানে তেলের জন্য হাহাকার, অবৈধ তেল মজুত, পেট্রোল পাম্পে তেল না থাকা, অবৈধ ভাবে অতিরিক্ত দামে তেল বিক্রি, পাশের দেশগুলোতে তেল পাচার, তেলের জন্য হামলা, বিভিন্ন জায়গায় ফিলিং স্টেশন বন্ধ করে দেওয়াসহ নানা ঘটনায় সারা দেশে এক ধরনের অরাজকতা বিরাজ করছে। গত কয়েকদিনে সংবাদদাতাদের প্রতিবেদনেও উঠে আসে এসব চিত্র।
পানির ট্যাংকে মিললো ৮০০ লিটার ডিজেল
তেল মজুতে বহুবিধ উপায় বের করেছে দেশের অসাধু ব্যবসায়ীরা। বাদ যায়নি বাড়ির ছাদের পানির ট্যাংক। বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) দিবাগত মধ্য রাতে নোয়াখালীর সুবর্ণচরে এক ব্যবসায়ীর বাড়ির ছাদে পানির ট্যাংকে অবৈধভাবে মজুত রাখা ৮০০ লিটার ডিজেল জব্দ করেছে উপজেলা প্রশাসন। এ ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যবসায়ীকে ১০ হাজার জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

মুদি দোকানির ৩০০ টাকা দরে অকটেন বিক্রি
অবৈধভাবে মজুত তেল চড়া মূল্যে বিক্রি করছেন এক মুদি দোকানি। বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) সন্ধ্যায় রাজবাড়ী পৌরসভার ১নং বেড়াডাঙ্গা চরকেষ্টপুর এলাকায় অভিযানকালে এ তথ্য জানায় ভ্রাম্যমাণ আদালত।

জানা গেছে, ওই এলাকার মেসার্স জমশেদ স্টোরের মালিক বিভিন্ন প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেল চালকদের কাছ থেকে অকটেন ও পেট্রোল ক্রয় করে তা মজুত করেন। পরে এসব তেল গ্রাহকদের কাছে ৩০০ টাকা লিটার বিক্রি করেন। অভিযোগের সত্যতা মেলায় ওই মুদি দোকানিকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা হয়।
লিখে রেখেছে ‘তেল নেই’, অভিযানে মিললো ১৩ হাজার লিটার
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার একটি প্রতিষ্ঠানের নাম নয়ন ফিলিং স্টেশন। গত ২৮ মার্চ ‘তেল নেই’ লেখা নির্দেশিকা টাঙিয়ে জ্বালানি বিক্রি বন্ধ রাখে কর্তৃপক্ষ। এমন খবরে সেখানে অভিযান চালানোর পর ২ হাজার ৪৮৯ লিটার পেট্রোল এবং ১০ হাজার ৯৪১ লিটার ডিজেল পাওয়া যায়।

এ সময় পাম্পটিকে তাৎক্ষণিকভাবে জ্বালানি তেল বিক্রি শুরু করতে নির্দেশ ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
তেল চুরির দণ্ড থেকে বাঁচতে ‘ধর্মঘট’
তেল সরবরাহ ঠিক রাখতে অভিযানেও দেখা গেছে নানা প্রতিবন্ধকতা। মার্চ মাসের শেষের দিকে নীলফামারীতে অবৈধভাবে তেল বহনের অভিযোগে তেলবাহী লরির চালক ও তার সহকারীসহ তিনজনের ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং জরিমানা করা হয়। এ ঘটনায় গত ২৯ মার্চ রংপুর বিভাগের আট জেলায় অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু করেছেন ট্যাংকলরী শ্রমিকরা।
আন্দোলনকালে দিনাজপুরের পার্বতীপুর রেলহেড অয়েল ডিপোতে তেল উত্তোলন ও সরবরাহ কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়। এতে উত্তরাঞ্চলে জ্বালানি তেল সরবরাহ কার্যত বন্ধ হয়ে পড়েছিল। পরবর্তীতে আটককৃতদের মুক্তির আশ্বাসে দীর্ঘ ১২ ঘণ্টা পর ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়।
তেলের দাবিতে আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ
তেলের দাবিতে ভোক্তাদের নামতে দেখা গেছে সড়কে। গত ২৭ মার্চ সাতক্ষীরার ছয়ঘরিয়াস্থ লস্কর পেট্রোল পাম্পে তেল না পেয়ে সড়কে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ করেছে বিক্ষুব্ধ জনতা।
স্থানীয়রা জানান, পাম্পে তেল থাকার পরও সাধারণ গ্রাহকদের দেওয়া হচ্ছে না –এমন অভিযোগে মোটরসাইকেল চালক ও স্থানীয়রা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। একপর্যায়ে তারা পাম্পের সামনের সড়কে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে এবং বাঁশ দিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করেন।
ভুক্তভোগীদের দাবি, পাম্প মালিকরা সিন্ডিকেট করে সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত করে খোলা বাজারে চড়া দামে তেল বিক্রি করছেন।
‘৮ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ২০০ টাকার পেট্রোল পেয়েছি’
দেশের যেসব পাম্পে জ্বালানি তেল পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেও দেখা গেছে নানা হয়রানির চিত্র। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন অনেক ক্রেতা।
গত ২৭ মার্চ জামালপুর সদরের মেসার্স মোমো-মিথি ফিলিং স্টেশনে মনুসুর নামে এক বাইকার বলেন, ৮ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ২০০ টাকার পেট্রোল পেয়েছি। অনেক বাইকারের ভাগ্যে তা-ও জুটছে না।
পাম্পের ভেজাল ডিজেলে বিকল ট্রাক
দীর্ঘ অপেক্ষা পর পাওয়া স্বল্প জ্বালানিতেও চলে নানা প্রতারণা। চাহিদা তুঙ্গে থাকায় অনেক ব্যবসায়ী আবার বিক্রি করছেন ভেজাল জ্বালানি তেল। সাতক্ষীরার কলারোয়ায় একটি ফিলিং স্টেশন থেকে নেওয়া ভেজাল ডিজেলে ট্রাকের ইঞ্জিন বিকল হয়ে ৪ লাখ টাকার কাঁচামাল নষ্ট হওয়ারও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ট্রাকচালক মো. সালাম বলেন, উপজেলার কাজীরহাট এলাকার ‘মেসার্স ডেলমা ফিলিং স্টেশন’ থেকে তেল নেওয়ার কিছু সময় পরেই গাড়ির শব্দ বদলে যায় এবং যশোরে গিয়ে ইঞ্জিন জ্যাম হয়ে যায়। মিস্ত্রীরা তেলের ট্যাংক পরীক্ষা করে পানি মিশ্রিত ডিজেল পেয়েছেন।’
পাম্পের ম্যানেজার মো. আব্দুল হাকিম স্বীকার করেছেন, ডিজেলে পানি মেশানো ছিলো।
তেল না পেয়ে ট্রাকচাপায় ফিলিং স্টেশন ম্যানেজারকে হত্যা
তেলের জন্য দেশের নানা জায়গায় সংহিস ঘটনা ঘটেছে। গত ২৮ মার্চ নড়াইলে জ্বালানি তেল না পেয়ে বাগবিতণ্ডার পর একটি ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজারকে ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যার অভিযোগে আতঙ্ক ছড়ায় দেশের সব পাম্প সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।
জানা গেছে, ট্রাকচাপার আগে অভিযুক্ত সুজাত নামের এক ট্রাকচালক উপজেলার তুলারামপুর এলাকায় তানভীর ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে আসেন। এ সময় তেল নেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ম্যানেজার নাহিদ সরদারের সঙ্গে ট্রাকচালকের কথা কাটাকাটি হয়। তেল না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে চালক প্রকাশ্যে ম্যানেজারকে ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যার হুমকি দেন। হুমকির ঘটনার পর নাহিদ বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ট্রাকচালক বের হয়। পরে পাম্প থেকে একটু সামনে নাহিদের মোটরসাইকেলটি চাপা দিয়ে চলে যায় ট্রাকটি। এ সময় ঘটনাস্থলেই নিহত হন নাহিদ।
মিয়ানমারে ডিজেল পাচারকালে আটক ৭
ভোগান্তি-সংকট-সহিংসতার মধ্যে থেমে নেই তেলের চোরাকারবারিরা। গত ২৭ মার্চ মিয়ানমারে পাচারকালে ১ হাজার ৬০০ লিটার ডিজেল, ৩ হাজার ৩০০ কেজি আলকাতরা, ৪টি ডিজেল ইঞ্জিনসহ একটি নৌযান জব্দ করে কোস্টগার্ড। আটক করা হয় পাচার চক্রের ৭ সদস্যকে।
অভিযানে আটক ব্যক্তিরা স্বীকার করেন, তারা এসব জ্বালানি তেল ও সরঞ্জাম অবৈধভাবে শুল্ক-কর ফাঁকি দিয়ে মিয়ানমারে নিয়ে যাচ্ছিলেন।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, বিশ্ববাজারের অস্থিরতাকে পুঁজি করে দেশে জ্বালানি তেলের যে ‘তেলেসমাতি’ কারবার শুরু হয়েছে, তার বলি হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। মজুতদারি, কৃত্রিম সংকট আর সহিংসতার এই চিত্র বলে দিচ্ছে– কেবল জরিমানা বা বিচ্ছিন্ন অভিযান দিয়ে এই সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব নয়। সংকটের এই সুযোগে যারা জনজীবনকে জিম্মি করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং আরও বেশি তদারকি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সার্বিক পরিস্থিতিতে এবার কঠোর হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। শনিবার (৪ এপ্রিল) এক অনুষ্ঠানে কালোবাজারি ও মজুতদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে আইন, বিচার ও সংসদ-বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘তেল সংকট কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হচ্ছে। আমরা এতদিন নমনীয় ছিলাম। প্রয়োজন হলে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫ ধারা অনুযায়ী কালোবাজারি ও মজুতদারির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।’

তেল নিয়ে তেলেসমাতি
সিটিজেন ডেস্ক

জ্বালানি তেল নিয়ে দেশ জুড়ে শুরু হয়েছে এক নজিরবিহীন ‘তেলেসমাতি’ কারবার। বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি ও মজুতের অপতৎপতায় মেতে উঠেছে একটি অসাধু সিন্ডিকেট। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অভিযান চালিয়ে লাখ লাখ লিটার তেল জব্দ এবং জেল-জরিমানা করার পরও থামছে না সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য। ফলে তেলের ‘কৃত্রিম’ সংকটে ভোগান্তি পোহানোর পাশাপাশি হয়রানির শিকার হচ্ছে ভোক্তারা। এই অপরাধ বন্ধে মজুতকারীদের কঠোর শাস্তি প্রয়োজনে– ‘মৃত্যুদণ্ড’ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলমান সংকট মোকাবেলায় সরকার বিভিন্ন নিয়ম-কানুন মেনে চলার আহ্বান জানায়। পাশাপাশি নেওয়া হয় নানা উদ্যোগ। তবুও দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল পাচ্ছে না গ্রাহকেরা। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর পরপরই সংকট আঁচ করতে পেরে দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুতের হিড়িক পড়ে। অতিরিক্ত মূল্যে বিক্রির উদ্দেশ্যে অসাধু ব্যবসায়ীরা ড্রাম ও বোতলে তেল ভরে মজুত করছেন।
সংকটের অজুহাতে জ্বালানি ‘তেল নেই’ লেখা সাইনবোর্ড টাঙিয়েছে কিছু ফিলিং স্টেশন। তবে তারা গোপনে অতিরিক্ত দামে তেল বিক্রি করছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) নির্ধারিত তেল বিপণন কোম্পানিগুলো থেকে চাহিদা অনুযায়ী তেল বরাদ্দ না পাওয়ার অভিযোগ তুলে কিছু ফিলিং স্টেশন মালিক কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ মার্চ থেকে ১ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে মজুত করা ৩ লাখ ৭২ হাজার ৩৮৮ লিটার জ্বালানি তেল জব্দ করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত ।
বর্তমানে তেলের জন্য হাহাকার, অবৈধ তেল মজুত, পেট্রোল পাম্পে তেল না থাকা, অবৈধ ভাবে অতিরিক্ত দামে তেল বিক্রি, পাশের দেশগুলোতে তেল পাচার, তেলের জন্য হামলা, বিভিন্ন জায়গায় ফিলিং স্টেশন বন্ধ করে দেওয়াসহ নানা ঘটনায় সারা দেশে এক ধরনের অরাজকতা বিরাজ করছে। গত কয়েকদিনে সংবাদদাতাদের প্রতিবেদনেও উঠে আসে এসব চিত্র।
পানির ট্যাংকে মিললো ৮০০ লিটার ডিজেল
তেল মজুতে বহুবিধ উপায় বের করেছে দেশের অসাধু ব্যবসায়ীরা। বাদ যায়নি বাড়ির ছাদের পানির ট্যাংক। বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) দিবাগত মধ্য রাতে নোয়াখালীর সুবর্ণচরে এক ব্যবসায়ীর বাড়ির ছাদে পানির ট্যাংকে অবৈধভাবে মজুত রাখা ৮০০ লিটার ডিজেল জব্দ করেছে উপজেলা প্রশাসন। এ ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যবসায়ীকে ১০ হাজার জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

মুদি দোকানির ৩০০ টাকা দরে অকটেন বিক্রি
অবৈধভাবে মজুত তেল চড়া মূল্যে বিক্রি করছেন এক মুদি দোকানি। বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) সন্ধ্যায় রাজবাড়ী পৌরসভার ১নং বেড়াডাঙ্গা চরকেষ্টপুর এলাকায় অভিযানকালে এ তথ্য জানায় ভ্রাম্যমাণ আদালত।

জানা গেছে, ওই এলাকার মেসার্স জমশেদ স্টোরের মালিক বিভিন্ন প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেল চালকদের কাছ থেকে অকটেন ও পেট্রোল ক্রয় করে তা মজুত করেন। পরে এসব তেল গ্রাহকদের কাছে ৩০০ টাকা লিটার বিক্রি করেন। অভিযোগের সত্যতা মেলায় ওই মুদি দোকানিকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা হয়।
লিখে রেখেছে ‘তেল নেই’, অভিযানে মিললো ১৩ হাজার লিটার
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার একটি প্রতিষ্ঠানের নাম নয়ন ফিলিং স্টেশন। গত ২৮ মার্চ ‘তেল নেই’ লেখা নির্দেশিকা টাঙিয়ে জ্বালানি বিক্রি বন্ধ রাখে কর্তৃপক্ষ। এমন খবরে সেখানে অভিযান চালানোর পর ২ হাজার ৪৮৯ লিটার পেট্রোল এবং ১০ হাজার ৯৪১ লিটার ডিজেল পাওয়া যায়।

এ সময় পাম্পটিকে তাৎক্ষণিকভাবে জ্বালানি তেল বিক্রি শুরু করতে নির্দেশ ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
তেল চুরির দণ্ড থেকে বাঁচতে ‘ধর্মঘট’
তেল সরবরাহ ঠিক রাখতে অভিযানেও দেখা গেছে নানা প্রতিবন্ধকতা। মার্চ মাসের শেষের দিকে নীলফামারীতে অবৈধভাবে তেল বহনের অভিযোগে তেলবাহী লরির চালক ও তার সহকারীসহ তিনজনের ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং জরিমানা করা হয়। এ ঘটনায় গত ২৯ মার্চ রংপুর বিভাগের আট জেলায় অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু করেছেন ট্যাংকলরী শ্রমিকরা।
আন্দোলনকালে দিনাজপুরের পার্বতীপুর রেলহেড অয়েল ডিপোতে তেল উত্তোলন ও সরবরাহ কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়। এতে উত্তরাঞ্চলে জ্বালানি তেল সরবরাহ কার্যত বন্ধ হয়ে পড়েছিল। পরবর্তীতে আটককৃতদের মুক্তির আশ্বাসে দীর্ঘ ১২ ঘণ্টা পর ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়।
তেলের দাবিতে আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ
তেলের দাবিতে ভোক্তাদের নামতে দেখা গেছে সড়কে। গত ২৭ মার্চ সাতক্ষীরার ছয়ঘরিয়াস্থ লস্কর পেট্রোল পাম্পে তেল না পেয়ে সড়কে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ করেছে বিক্ষুব্ধ জনতা।
স্থানীয়রা জানান, পাম্পে তেল থাকার পরও সাধারণ গ্রাহকদের দেওয়া হচ্ছে না –এমন অভিযোগে মোটরসাইকেল চালক ও স্থানীয়রা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। একপর্যায়ে তারা পাম্পের সামনের সড়কে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে এবং বাঁশ দিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করেন।
ভুক্তভোগীদের দাবি, পাম্প মালিকরা সিন্ডিকেট করে সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত করে খোলা বাজারে চড়া দামে তেল বিক্রি করছেন।
‘৮ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ২০০ টাকার পেট্রোল পেয়েছি’
দেশের যেসব পাম্পে জ্বালানি তেল পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেও দেখা গেছে নানা হয়রানির চিত্র। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন অনেক ক্রেতা।
গত ২৭ মার্চ জামালপুর সদরের মেসার্স মোমো-মিথি ফিলিং স্টেশনে মনুসুর নামে এক বাইকার বলেন, ৮ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ২০০ টাকার পেট্রোল পেয়েছি। অনেক বাইকারের ভাগ্যে তা-ও জুটছে না।
পাম্পের ভেজাল ডিজেলে বিকল ট্রাক
দীর্ঘ অপেক্ষা পর পাওয়া স্বল্প জ্বালানিতেও চলে নানা প্রতারণা। চাহিদা তুঙ্গে থাকায় অনেক ব্যবসায়ী আবার বিক্রি করছেন ভেজাল জ্বালানি তেল। সাতক্ষীরার কলারোয়ায় একটি ফিলিং স্টেশন থেকে নেওয়া ভেজাল ডিজেলে ট্রাকের ইঞ্জিন বিকল হয়ে ৪ লাখ টাকার কাঁচামাল নষ্ট হওয়ারও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ট্রাকচালক মো. সালাম বলেন, উপজেলার কাজীরহাট এলাকার ‘মেসার্স ডেলমা ফিলিং স্টেশন’ থেকে তেল নেওয়ার কিছু সময় পরেই গাড়ির শব্দ বদলে যায় এবং যশোরে গিয়ে ইঞ্জিন জ্যাম হয়ে যায়। মিস্ত্রীরা তেলের ট্যাংক পরীক্ষা করে পানি মিশ্রিত ডিজেল পেয়েছেন।’
পাম্পের ম্যানেজার মো. আব্দুল হাকিম স্বীকার করেছেন, ডিজেলে পানি মেশানো ছিলো।
তেল না পেয়ে ট্রাকচাপায় ফিলিং স্টেশন ম্যানেজারকে হত্যা
তেলের জন্য দেশের নানা জায়গায় সংহিস ঘটনা ঘটেছে। গত ২৮ মার্চ নড়াইলে জ্বালানি তেল না পেয়ে বাগবিতণ্ডার পর একটি ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজারকে ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যার অভিযোগে আতঙ্ক ছড়ায় দেশের সব পাম্প সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।
জানা গেছে, ট্রাকচাপার আগে অভিযুক্ত সুজাত নামের এক ট্রাকচালক উপজেলার তুলারামপুর এলাকায় তানভীর ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে আসেন। এ সময় তেল নেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ম্যানেজার নাহিদ সরদারের সঙ্গে ট্রাকচালকের কথা কাটাকাটি হয়। তেল না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে চালক প্রকাশ্যে ম্যানেজারকে ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যার হুমকি দেন। হুমকির ঘটনার পর নাহিদ বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ট্রাকচালক বের হয়। পরে পাম্প থেকে একটু সামনে নাহিদের মোটরসাইকেলটি চাপা দিয়ে চলে যায় ট্রাকটি। এ সময় ঘটনাস্থলেই নিহত হন নাহিদ।
মিয়ানমারে ডিজেল পাচারকালে আটক ৭
ভোগান্তি-সংকট-সহিংসতার মধ্যে থেমে নেই তেলের চোরাকারবারিরা। গত ২৭ মার্চ মিয়ানমারে পাচারকালে ১ হাজার ৬০০ লিটার ডিজেল, ৩ হাজার ৩০০ কেজি আলকাতরা, ৪টি ডিজেল ইঞ্জিনসহ একটি নৌযান জব্দ করে কোস্টগার্ড। আটক করা হয় পাচার চক্রের ৭ সদস্যকে।
অভিযানে আটক ব্যক্তিরা স্বীকার করেন, তারা এসব জ্বালানি তেল ও সরঞ্জাম অবৈধভাবে শুল্ক-কর ফাঁকি দিয়ে মিয়ানমারে নিয়ে যাচ্ছিলেন।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, বিশ্ববাজারের অস্থিরতাকে পুঁজি করে দেশে জ্বালানি তেলের যে ‘তেলেসমাতি’ কারবার শুরু হয়েছে, তার বলি হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। মজুতদারি, কৃত্রিম সংকট আর সহিংসতার এই চিত্র বলে দিচ্ছে– কেবল জরিমানা বা বিচ্ছিন্ন অভিযান দিয়ে এই সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব নয়। সংকটের এই সুযোগে যারা জনজীবনকে জিম্মি করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং আরও বেশি তদারকি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সার্বিক পরিস্থিতিতে এবার কঠোর হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। শনিবার (৪ এপ্রিল) এক অনুষ্ঠানে কালোবাজারি ও মজুতদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে আইন, বিচার ও সংসদ-বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘তেল সংকট কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হচ্ছে। আমরা এতদিন নমনীয় ছিলাম। প্রয়োজন হলে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫ ধারা অনুযায়ী কালোবাজারি ও মজুতদারির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।’




