ভয়ংকর মরণফাঁদ বিএমইউর সি ব্লক

ভয়ংকর মরণফাঁদ বিএমইউর সি ব্লক
জুবায়ের আহমেদ

অসুস্থ মায়ের সঙ্গে দেখা করতে হাসপাতালে এসেছিলেন স্কুলছাত্রী সামিয়া নুর। দুপুরে মা-এর সামনে বসে ভাত খায় সে। খাওয়া শেষে ওয়ার্ডের শয্যা সঙ্গে থাকা জানালার পাশে গিয়ে বসে। পরে উঠে বাহিরে তাকাতেই অসাবধানতাবশত সেই জানালা দিয়ে নিচে পড়ে মারা যায় সামিয়া নুর। গত ২৪ অক্টোবর দুপুরে দেশের প্রধান ও বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতাল বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সি ব্লকের আট তলার গাইনি ওয়ার্ডে ঘটে এই দুর্ঘটনা। গ্রিল না থাকায় ওই জানালা দিয়ে পড়ে মারা গেছে সামিয়া নুর।
বিএমইউ সূত্র, রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএমইউ চালুর শুরুতে নির্মিত সি ব্লকের ভবনটি ১০ তলা। এই ভবনের কোনো তলার জানালায় গ্রিল নেই। এই কারণে সি ব্লক এখন ভয়ংকর মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। এখানে প্রতিদিন হাজারখানেক রোগী ভর্তি থাকে। ওই ঘটনার পর থেকে এখানে ভর্তি হওয়া রোগী ও তাদের স্বজনেরা আতঙ্কে আছেন।
সামিয়া নুরের মতো ১৫ বছরের কিশোরীর এই বেদনায়ক মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনা ও রোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে অবহেলার বিষয়গুলোই সামনে এসেছে। আর এই বিষয় নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে উঠেছে নানা প্রশ্ন ।
নিরাপত্তা নিশ্চিতের উদ্যোগ নেই
এই ঘটনা তদন্তে বিএমইউ কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিক একটি কমিটি গঠন করেছিল। তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা। কিন্তু মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) পর্যন্ত কোনো প্রতিবেদনই জমা দেয়নি ওই কমিটি। দুর্ঘটনায় একজনের প্রাণ গেলেও জানালায় গ্রিল লাগানোর বিষয়টিও স্পষ্ট করেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ফলে সি ব্লকের ভবনটিতে থাকা রোগী ও তাদের স্বজনেরা রয়েছন চরম ঝুঁকিতে।
যা ঘটেছিলো সামিয়া নুরের সঙ্গে
সামিয়া নুরদের বাড়ি গাজীপুরের বোর্ডবাজার সাইনবোর্ডসংলগ্ন কলমেশ্বর এলাকায়। তার বাবার নাম নুরুন্নবী আর মায়ের নাম পারুল আক্তার। সামিয়া গাজীপুরের কামারজুরী ইউসুফ আলী হাই স্কুল অ্যান্ড গার্লস কলেজের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন।
মেয়ের এই করুণ মৃত্যুর বিষয়ে জানতে চাইলে সামিয়ার বাবা নুরুন্নবী বলেন, ‘আমার স্ত্রীর জরায়ু টিউমারের চিকিৎসার জন্য তাকে ও মেয়েকে নিয়ে ১৭ অক্টোবর হাসপাতালে এসেছিলাম। ২৮ অক্টোবর অপারেশন হওয়ার কথা ছিল। সেজন্য অপারেশনের আগে সি ব্লকের আট তলার ওই ওয়ার্ডের ছয় নম্বর বেডে সামিয়ার মা ভর্তি ছিল। ঘটনার দিন দুপুরে সামিয়া বাইরে থেকে এসে ভাত খায়। এরপর মায়ের বেডে বসে এবং একপর্যায়ে জানালা দিয়ে নিচে তাকায়। তখনই ভারসাম্য হারিয়ে নিচে পড়ে যায়। বেড আর জানালার মধ্যে কোনো দূরত্ব ছিল না।’
ঘটনার দিন পাশে থাকা এক রোগী বলেন, ‘আমি দুপুরে ঘুমানোর আগে মা-মেয়েকে বেডের কাছে দেখেছি। হঠাৎ ঘুমের মধ্যে চিৎকার শুনে উঠে জানতে পারি, জানালা দিয়ে মেয়ে পড়ে গেছে।’
গত ৩১ অক্টোবর দুপুর ২টার দিকে বিএমইউর সি ব্লকের আট তলায় গিয়ে দেখা যায়, গাইনি ওয়ার্ডের ওই জানালার পাশের শয্যায় নতুন রোগী এসেছে। শয্যার পাশে থাকা জানালাটির দৈর্ঘ্য চার ফুট ও প্রস্থ তিন ফুট। জানালায় গ্রিল বা কোনো নিরাপত্তাবেষ্টনী নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঘটনার সময় সামিয়ার মায়ের শয্যাটি জানালার পাশে আড়াআড়ি রাখা ছিল। সেই শয্যায় বসা অবস্থায় জানালা দিয়ে বাইরে তাকানোর সময় নিচে পড়ে যায় সামিয়া।
ওয়ার্ডে জানালার পাশে শয্যা রাখার কারণ জানতে চাইলে ওই ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা এক নার্স বলেন, পাশেই শৌচাগারের প্রবেশপথ থাকায় শয্যাটি এভাবে রাখা হয়েছিল। অন্যভাবে রাখলে শৌচাগারে যাতায়াতে রোগীদের সমস্যা হয়।
পুরো ভবনের জানালায় গ্রিল নেই
সামিয়ার মৃত্যুর পর গত ২৯ অক্টোবর ঘটনাস্থল ঘুরে দেখা গেছে, সি ব্লকের ১০ তলা ভবনটির কোন তলার ওয়ার্ডের জানালায় গ্রিল নেই। এ ছাড়া কোন কোন ওয়ার্ডের রোগীদের শৌচাগারের জানালাতেও কোনো গ্রিল নেই। তাই এসব শৌচাগারও ঝুঁকিপূর্ণ।
সি ব্লকের লিফটেও সমস্যা
জানালার গ্রিল না থাকায় নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত রোগী ও তাদের স্বজনেরা । বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও শারীরিকভাবে দুর্বল রোগীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। শুধু জানালার নিরাপত্তা নয়, ভবনটির লিফটে ওঠানামার সময়ও ভোগান্তির চিত্র দেখা গেছে। লিফটে চলাচলের সময় যাত্রীরা বারবার ঝাঁকুনি অনুভব করছেন।

এ বিষয়ে বিএমইউর সি ব্লকে ভর্তি হওয়া এক রোগীর স্বজন মো. আলম এর সঙ্গে সিটিজেন জার্নাল টোয়েন্টিফোরের এই প্রতিনিধির কথা হয়। তিনি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, 'ওপর থেকে নিচে তাকালে মাথা চক্কর দেয়। মনে হয় পড়ে যাব। কেউ ভুল করে জানালার পাশে দাঁড়ানোর পর সাবধান না হলে নিচে পড়ে যেতে পারে।’
হাসপাতালে ভর্তি লিপি আক্তার নামের অপর এক রোগী বলেন, ‘আমার পাশের রোগী তার ছোট মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে আসছে। মেয়েটা জানালা দিয়ে উঁকি দিতে চায়। তাই জানালা বন্ধ করে রেখেছিলাম। এইটা সত্যিই অনেক ঝুঁকিপূর্ণ।’
আরেক রোগীর স্বজন আক্তার হোসেন একইভাবে ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ করে বলেন, ‘একটি মেয়ের ওপর থেকে পড়ে মারা যাওয়ার কথা শুনেছি। এটা তো অবশ্যই ঝুঁকিপূর্ণ। এত বড় একটা ভবন অথচ বছরের পর বছর জানালায় কোনো গ্রিল নাই, এটা নিয়ে কেউ ভাবছে না। এখন একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেলো, এর দায় কে নেবে।’
সামিয়াকে নেওয়া হয় ঢামেক হাসপাতালে
আট তলা থেকে পড়ে যাওয়ার পর সামিয়াকে প্রথমে বিএমইউ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে নেওয়ার কিছুক্ষণ পর ২৪ অক্টোবর বিকালে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন ।
সামিয়ার বাবা নুরুন্নবীর অভিযোগ, বিএমইউতে তার মেয়েকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না দিয়েই ঢাকা মেডিকেলে পাঠানো হয়েছে। তার মেয়ে পড়ে যাওয়ার পর বিএমইউ কর্তৃপক্ষ দায় নিতে চায়নি। তাই দ্রুত ঢাকা মেডিকেলে রেফার করেছে। সেখানে নেওয়ার কিছুক্ষণ পর চিকিৎসকেরা তার মেয়ে মারা গেছে বলে তাকে জানিয়েছে।
ঘটনার সময় দায়িত্বে থাকা এক নার্স নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘সামিয়ার ঘাড়ে আঘাত লেগেছিল এবং শরীরের ভেতরে রক্তক্ষরণ হচ্ছিলো। উচ্চমাত্রায় অক্সিজেন দিয়েও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাচ্ছিলো না। এ কারণে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।’

জবাবদিহি নেই
সামিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় রোগীদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে ঘটনাটি যেন ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এই বিষয়ে সংবাদ সংগ্রহের কাজে সি ব্লকে গেলে সিটিজেন জার্নালের এই প্রতিবেদককে বাধা দেয় আনসার সদস্যরা। জানালার ছবি তোলার সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্সরাও বাধা দেন।
এমনকি এ বিষয়ে বিএমইউয়ের পরিচালক (হাসপাতাল) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. ইরতেকা রহমানের সঙ্গে তার অফিসে গিয়ে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। সামিয়া নুরের মৃত্যুর ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিএমইউ কর্তৃপক্ষ । কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে কমিটির প্রধান বিএমইউর উপপরিচালক (হাসপাতাল) ডা. আবুনূর মো. মাসুদ রানার দপ্তরে গেলে তিনি সিটিজেন জার্নাল টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘আমাদের রিপোর্ট প্রায় শেষের দিকে। আজ (৩ নভেম্বর) জমা দিতে পারি। গ্রিল না থাকায় মূলত দুর্ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এই হাসপাতালের ইতিহাসে এরকম ঘটনা এটিই প্রথম। ৮০-৮৪ সালে নির্মিত এই ভবনে এরকম কোনো কিছু এতদিন ঘটেনি। মেয়েটার মৃত্যুটা আসলে ওইখানে লেখা ছিল, এটা নিছক একটা দুর্ঘটনা।’
তদন্ত প্রতিবেদনে কী সুপারিশ করা হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা সুপারিশ করবো- যেন গ্রিল লাগানো হয়। তাছাড়া ওই বেডের পজিশন ঠিক ছিল না। টয়লেটে আসা যাওয়া সমস্যার কারণে বেডটি জানালার পাশে আড়াআড়ি রাখা হয়েছিল। এই বিষয়টিও জানানো হবে। এছাড়া দুর্ঘটনা এড়াতে সবার সচেতনতাও জরুরি।’
নিরাপত্তার চেয়ে ভবনের সৌন্দর্যকে প্রাধান্য
বিএমইউর সি ব্লকের ওই বহুতল ভবনের জানালায় গ্রিল না থাকা নিয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালেয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ভবনের নিরাপত্তার বিষয়টি নকশা ও নির্মাণের সময়ই গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, বছরের পর বছর ভবনটির জানালাগুলোতে গ্রিল না থাকার বিষয়টি কারও নজরে না আসাটা দুঃখজনক। শুধু এই হাসপাতালে নয়, নকশার নামে অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তার চেয়ে সৌন্দর্যকে প্রাধান্য দিয়ে গ্রিল ছাড়া কাচের দরজা-জানালা দেওয়া হচ্ছে। এতে নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এতে অগ্নিকাণ্ডের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও সমস্যা হতে পারে।

অসুস্থ মায়ের সঙ্গে দেখা করতে হাসপাতালে এসেছিলেন স্কুলছাত্রী সামিয়া নুর। দুপুরে মা-এর সামনে বসে ভাত খায় সে। খাওয়া শেষে ওয়ার্ডের শয্যা সঙ্গে থাকা জানালার পাশে গিয়ে বসে। পরে উঠে বাহিরে তাকাতেই অসাবধানতাবশত সেই জানালা দিয়ে নিচে পড়ে মারা যায় সামিয়া নুর। গত ২৪ অক্টোবর দুপুরে দেশের প্রধান ও বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতাল বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সি ব্লকের আট তলার গাইনি ওয়ার্ডে ঘটে এই দুর্ঘটনা। গ্রিল না থাকায় ওই জানালা দিয়ে পড়ে মারা গেছে সামিয়া নুর।
বিএমইউ সূত্র, রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএমইউ চালুর শুরুতে নির্মিত সি ব্লকের ভবনটি ১০ তলা। এই ভবনের কোনো তলার জানালায় গ্রিল নেই। এই কারণে সি ব্লক এখন ভয়ংকর মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। এখানে প্রতিদিন হাজারখানেক রোগী ভর্তি থাকে। ওই ঘটনার পর থেকে এখানে ভর্তি হওয়া রোগী ও তাদের স্বজনেরা আতঙ্কে আছেন।
সামিয়া নুরের মতো ১৫ বছরের কিশোরীর এই বেদনায়ক মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনা ও রোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে অবহেলার বিষয়গুলোই সামনে এসেছে। আর এই বিষয় নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে উঠেছে নানা প্রশ্ন ।
নিরাপত্তা নিশ্চিতের উদ্যোগ নেই
এই ঘটনা তদন্তে বিএমইউ কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিক একটি কমিটি গঠন করেছিল। তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা। কিন্তু মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) পর্যন্ত কোনো প্রতিবেদনই জমা দেয়নি ওই কমিটি। দুর্ঘটনায় একজনের প্রাণ গেলেও জানালায় গ্রিল লাগানোর বিষয়টিও স্পষ্ট করেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ফলে সি ব্লকের ভবনটিতে থাকা রোগী ও তাদের স্বজনেরা রয়েছন চরম ঝুঁকিতে।
যা ঘটেছিলো সামিয়া নুরের সঙ্গে
সামিয়া নুরদের বাড়ি গাজীপুরের বোর্ডবাজার সাইনবোর্ডসংলগ্ন কলমেশ্বর এলাকায়। তার বাবার নাম নুরুন্নবী আর মায়ের নাম পারুল আক্তার। সামিয়া গাজীপুরের কামারজুরী ইউসুফ আলী হাই স্কুল অ্যান্ড গার্লস কলেজের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন।
মেয়ের এই করুণ মৃত্যুর বিষয়ে জানতে চাইলে সামিয়ার বাবা নুরুন্নবী বলেন, ‘আমার স্ত্রীর জরায়ু টিউমারের চিকিৎসার জন্য তাকে ও মেয়েকে নিয়ে ১৭ অক্টোবর হাসপাতালে এসেছিলাম। ২৮ অক্টোবর অপারেশন হওয়ার কথা ছিল। সেজন্য অপারেশনের আগে সি ব্লকের আট তলার ওই ওয়ার্ডের ছয় নম্বর বেডে সামিয়ার মা ভর্তি ছিল। ঘটনার দিন দুপুরে সামিয়া বাইরে থেকে এসে ভাত খায়। এরপর মায়ের বেডে বসে এবং একপর্যায়ে জানালা দিয়ে নিচে তাকায়। তখনই ভারসাম্য হারিয়ে নিচে পড়ে যায়। বেড আর জানালার মধ্যে কোনো দূরত্ব ছিল না।’
ঘটনার দিন পাশে থাকা এক রোগী বলেন, ‘আমি দুপুরে ঘুমানোর আগে মা-মেয়েকে বেডের কাছে দেখেছি। হঠাৎ ঘুমের মধ্যে চিৎকার শুনে উঠে জানতে পারি, জানালা দিয়ে মেয়ে পড়ে গেছে।’
গত ৩১ অক্টোবর দুপুর ২টার দিকে বিএমইউর সি ব্লকের আট তলায় গিয়ে দেখা যায়, গাইনি ওয়ার্ডের ওই জানালার পাশের শয্যায় নতুন রোগী এসেছে। শয্যার পাশে থাকা জানালাটির দৈর্ঘ্য চার ফুট ও প্রস্থ তিন ফুট। জানালায় গ্রিল বা কোনো নিরাপত্তাবেষ্টনী নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঘটনার সময় সামিয়ার মায়ের শয্যাটি জানালার পাশে আড়াআড়ি রাখা ছিল। সেই শয্যায় বসা অবস্থায় জানালা দিয়ে বাইরে তাকানোর সময় নিচে পড়ে যায় সামিয়া।
ওয়ার্ডে জানালার পাশে শয্যা রাখার কারণ জানতে চাইলে ওই ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা এক নার্স বলেন, পাশেই শৌচাগারের প্রবেশপথ থাকায় শয্যাটি এভাবে রাখা হয়েছিল। অন্যভাবে রাখলে শৌচাগারে যাতায়াতে রোগীদের সমস্যা হয়।
পুরো ভবনের জানালায় গ্রিল নেই
সামিয়ার মৃত্যুর পর গত ২৯ অক্টোবর ঘটনাস্থল ঘুরে দেখা গেছে, সি ব্লকের ১০ তলা ভবনটির কোন তলার ওয়ার্ডের জানালায় গ্রিল নেই। এ ছাড়া কোন কোন ওয়ার্ডের রোগীদের শৌচাগারের জানালাতেও কোনো গ্রিল নেই। তাই এসব শৌচাগারও ঝুঁকিপূর্ণ।
সি ব্লকের লিফটেও সমস্যা
জানালার গ্রিল না থাকায় নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত রোগী ও তাদের স্বজনেরা । বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও শারীরিকভাবে দুর্বল রোগীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। শুধু জানালার নিরাপত্তা নয়, ভবনটির লিফটে ওঠানামার সময়ও ভোগান্তির চিত্র দেখা গেছে। লিফটে চলাচলের সময় যাত্রীরা বারবার ঝাঁকুনি অনুভব করছেন।

এ বিষয়ে বিএমইউর সি ব্লকে ভর্তি হওয়া এক রোগীর স্বজন মো. আলম এর সঙ্গে সিটিজেন জার্নাল টোয়েন্টিফোরের এই প্রতিনিধির কথা হয়। তিনি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, 'ওপর থেকে নিচে তাকালে মাথা চক্কর দেয়। মনে হয় পড়ে যাব। কেউ ভুল করে জানালার পাশে দাঁড়ানোর পর সাবধান না হলে নিচে পড়ে যেতে পারে।’
হাসপাতালে ভর্তি লিপি আক্তার নামের অপর এক রোগী বলেন, ‘আমার পাশের রোগী তার ছোট মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে আসছে। মেয়েটা জানালা দিয়ে উঁকি দিতে চায়। তাই জানালা বন্ধ করে রেখেছিলাম। এইটা সত্যিই অনেক ঝুঁকিপূর্ণ।’
আরেক রোগীর স্বজন আক্তার হোসেন একইভাবে ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ করে বলেন, ‘একটি মেয়ের ওপর থেকে পড়ে মারা যাওয়ার কথা শুনেছি। এটা তো অবশ্যই ঝুঁকিপূর্ণ। এত বড় একটা ভবন অথচ বছরের পর বছর জানালায় কোনো গ্রিল নাই, এটা নিয়ে কেউ ভাবছে না। এখন একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেলো, এর দায় কে নেবে।’
সামিয়াকে নেওয়া হয় ঢামেক হাসপাতালে
আট তলা থেকে পড়ে যাওয়ার পর সামিয়াকে প্রথমে বিএমইউ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে নেওয়ার কিছুক্ষণ পর ২৪ অক্টোবর বিকালে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন ।
সামিয়ার বাবা নুরুন্নবীর অভিযোগ, বিএমইউতে তার মেয়েকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না দিয়েই ঢাকা মেডিকেলে পাঠানো হয়েছে। তার মেয়ে পড়ে যাওয়ার পর বিএমইউ কর্তৃপক্ষ দায় নিতে চায়নি। তাই দ্রুত ঢাকা মেডিকেলে রেফার করেছে। সেখানে নেওয়ার কিছুক্ষণ পর চিকিৎসকেরা তার মেয়ে মারা গেছে বলে তাকে জানিয়েছে।
ঘটনার সময় দায়িত্বে থাকা এক নার্স নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘সামিয়ার ঘাড়ে আঘাত লেগেছিল এবং শরীরের ভেতরে রক্তক্ষরণ হচ্ছিলো। উচ্চমাত্রায় অক্সিজেন দিয়েও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাচ্ছিলো না। এ কারণে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।’

জবাবদিহি নেই
সামিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় রোগীদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে ঘটনাটি যেন ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এই বিষয়ে সংবাদ সংগ্রহের কাজে সি ব্লকে গেলে সিটিজেন জার্নালের এই প্রতিবেদককে বাধা দেয় আনসার সদস্যরা। জানালার ছবি তোলার সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্সরাও বাধা দেন।
এমনকি এ বিষয়ে বিএমইউয়ের পরিচালক (হাসপাতাল) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. ইরতেকা রহমানের সঙ্গে তার অফিসে গিয়ে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। সামিয়া নুরের মৃত্যুর ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিএমইউ কর্তৃপক্ষ । কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে কমিটির প্রধান বিএমইউর উপপরিচালক (হাসপাতাল) ডা. আবুনূর মো. মাসুদ রানার দপ্তরে গেলে তিনি সিটিজেন জার্নাল টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘আমাদের রিপোর্ট প্রায় শেষের দিকে। আজ (৩ নভেম্বর) জমা দিতে পারি। গ্রিল না থাকায় মূলত দুর্ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এই হাসপাতালের ইতিহাসে এরকম ঘটনা এটিই প্রথম। ৮০-৮৪ সালে নির্মিত এই ভবনে এরকম কোনো কিছু এতদিন ঘটেনি। মেয়েটার মৃত্যুটা আসলে ওইখানে লেখা ছিল, এটা নিছক একটা দুর্ঘটনা।’
তদন্ত প্রতিবেদনে কী সুপারিশ করা হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা সুপারিশ করবো- যেন গ্রিল লাগানো হয়। তাছাড়া ওই বেডের পজিশন ঠিক ছিল না। টয়লেটে আসা যাওয়া সমস্যার কারণে বেডটি জানালার পাশে আড়াআড়ি রাখা হয়েছিল। এই বিষয়টিও জানানো হবে। এছাড়া দুর্ঘটনা এড়াতে সবার সচেতনতাও জরুরি।’
নিরাপত্তার চেয়ে ভবনের সৌন্দর্যকে প্রাধান্য
বিএমইউর সি ব্লকের ওই বহুতল ভবনের জানালায় গ্রিল না থাকা নিয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালেয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ভবনের নিরাপত্তার বিষয়টি নকশা ও নির্মাণের সময়ই গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, বছরের পর বছর ভবনটির জানালাগুলোতে গ্রিল না থাকার বিষয়টি কারও নজরে না আসাটা দুঃখজনক। শুধু এই হাসপাতালে নয়, নকশার নামে অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তার চেয়ে সৌন্দর্যকে প্রাধান্য দিয়ে গ্রিল ছাড়া কাচের দরজা-জানালা দেওয়া হচ্ছে। এতে নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এতে অগ্নিকাণ্ডের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও সমস্যা হতে পারে।

ভয়ংকর মরণফাঁদ বিএমইউর সি ব্লক
জুবায়ের আহমেদ

অসুস্থ মায়ের সঙ্গে দেখা করতে হাসপাতালে এসেছিলেন স্কুলছাত্রী সামিয়া নুর। দুপুরে মা-এর সামনে বসে ভাত খায় সে। খাওয়া শেষে ওয়ার্ডের শয্যা সঙ্গে থাকা জানালার পাশে গিয়ে বসে। পরে উঠে বাহিরে তাকাতেই অসাবধানতাবশত সেই জানালা দিয়ে নিচে পড়ে মারা যায় সামিয়া নুর। গত ২৪ অক্টোবর দুপুরে দেশের প্রধান ও বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতাল বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সি ব্লকের আট তলার গাইনি ওয়ার্ডে ঘটে এই দুর্ঘটনা। গ্রিল না থাকায় ওই জানালা দিয়ে পড়ে মারা গেছে সামিয়া নুর।
বিএমইউ সূত্র, রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএমইউ চালুর শুরুতে নির্মিত সি ব্লকের ভবনটি ১০ তলা। এই ভবনের কোনো তলার জানালায় গ্রিল নেই। এই কারণে সি ব্লক এখন ভয়ংকর মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। এখানে প্রতিদিন হাজারখানেক রোগী ভর্তি থাকে। ওই ঘটনার পর থেকে এখানে ভর্তি হওয়া রোগী ও তাদের স্বজনেরা আতঙ্কে আছেন।
সামিয়া নুরের মতো ১৫ বছরের কিশোরীর এই বেদনায়ক মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনা ও রোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে অবহেলার বিষয়গুলোই সামনে এসেছে। আর এই বিষয় নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে উঠেছে নানা প্রশ্ন ।
নিরাপত্তা নিশ্চিতের উদ্যোগ নেই
এই ঘটনা তদন্তে বিএমইউ কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিক একটি কমিটি গঠন করেছিল। তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা। কিন্তু মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) পর্যন্ত কোনো প্রতিবেদনই জমা দেয়নি ওই কমিটি। দুর্ঘটনায় একজনের প্রাণ গেলেও জানালায় গ্রিল লাগানোর বিষয়টিও স্পষ্ট করেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ফলে সি ব্লকের ভবনটিতে থাকা রোগী ও তাদের স্বজনেরা রয়েছন চরম ঝুঁকিতে।
যা ঘটেছিলো সামিয়া নুরের সঙ্গে
সামিয়া নুরদের বাড়ি গাজীপুরের বোর্ডবাজার সাইনবোর্ডসংলগ্ন কলমেশ্বর এলাকায়। তার বাবার নাম নুরুন্নবী আর মায়ের নাম পারুল আক্তার। সামিয়া গাজীপুরের কামারজুরী ইউসুফ আলী হাই স্কুল অ্যান্ড গার্লস কলেজের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন।
মেয়ের এই করুণ মৃত্যুর বিষয়ে জানতে চাইলে সামিয়ার বাবা নুরুন্নবী বলেন, ‘আমার স্ত্রীর জরায়ু টিউমারের চিকিৎসার জন্য তাকে ও মেয়েকে নিয়ে ১৭ অক্টোবর হাসপাতালে এসেছিলাম। ২৮ অক্টোবর অপারেশন হওয়ার কথা ছিল। সেজন্য অপারেশনের আগে সি ব্লকের আট তলার ওই ওয়ার্ডের ছয় নম্বর বেডে সামিয়ার মা ভর্তি ছিল। ঘটনার দিন দুপুরে সামিয়া বাইরে থেকে এসে ভাত খায়। এরপর মায়ের বেডে বসে এবং একপর্যায়ে জানালা দিয়ে নিচে তাকায়। তখনই ভারসাম্য হারিয়ে নিচে পড়ে যায়। বেড আর জানালার মধ্যে কোনো দূরত্ব ছিল না।’
ঘটনার দিন পাশে থাকা এক রোগী বলেন, ‘আমি দুপুরে ঘুমানোর আগে মা-মেয়েকে বেডের কাছে দেখেছি। হঠাৎ ঘুমের মধ্যে চিৎকার শুনে উঠে জানতে পারি, জানালা দিয়ে মেয়ে পড়ে গেছে।’
গত ৩১ অক্টোবর দুপুর ২টার দিকে বিএমইউর সি ব্লকের আট তলায় গিয়ে দেখা যায়, গাইনি ওয়ার্ডের ওই জানালার পাশের শয্যায় নতুন রোগী এসেছে। শয্যার পাশে থাকা জানালাটির দৈর্ঘ্য চার ফুট ও প্রস্থ তিন ফুট। জানালায় গ্রিল বা কোনো নিরাপত্তাবেষ্টনী নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঘটনার সময় সামিয়ার মায়ের শয্যাটি জানালার পাশে আড়াআড়ি রাখা ছিল। সেই শয্যায় বসা অবস্থায় জানালা দিয়ে বাইরে তাকানোর সময় নিচে পড়ে যায় সামিয়া।
ওয়ার্ডে জানালার পাশে শয্যা রাখার কারণ জানতে চাইলে ওই ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা এক নার্স বলেন, পাশেই শৌচাগারের প্রবেশপথ থাকায় শয্যাটি এভাবে রাখা হয়েছিল। অন্যভাবে রাখলে শৌচাগারে যাতায়াতে রোগীদের সমস্যা হয়।
পুরো ভবনের জানালায় গ্রিল নেই
সামিয়ার মৃত্যুর পর গত ২৯ অক্টোবর ঘটনাস্থল ঘুরে দেখা গেছে, সি ব্লকের ১০ তলা ভবনটির কোন তলার ওয়ার্ডের জানালায় গ্রিল নেই। এ ছাড়া কোন কোন ওয়ার্ডের রোগীদের শৌচাগারের জানালাতেও কোনো গ্রিল নেই। তাই এসব শৌচাগারও ঝুঁকিপূর্ণ।
সি ব্লকের লিফটেও সমস্যা
জানালার গ্রিল না থাকায় নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত রোগী ও তাদের স্বজনেরা । বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও শারীরিকভাবে দুর্বল রোগীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। শুধু জানালার নিরাপত্তা নয়, ভবনটির লিফটে ওঠানামার সময়ও ভোগান্তির চিত্র দেখা গেছে। লিফটে চলাচলের সময় যাত্রীরা বারবার ঝাঁকুনি অনুভব করছেন।

এ বিষয়ে বিএমইউর সি ব্লকে ভর্তি হওয়া এক রোগীর স্বজন মো. আলম এর সঙ্গে সিটিজেন জার্নাল টোয়েন্টিফোরের এই প্রতিনিধির কথা হয়। তিনি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, 'ওপর থেকে নিচে তাকালে মাথা চক্কর দেয়। মনে হয় পড়ে যাব। কেউ ভুল করে জানালার পাশে দাঁড়ানোর পর সাবধান না হলে নিচে পড়ে যেতে পারে।’
হাসপাতালে ভর্তি লিপি আক্তার নামের অপর এক রোগী বলেন, ‘আমার পাশের রোগী তার ছোট মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে আসছে। মেয়েটা জানালা দিয়ে উঁকি দিতে চায়। তাই জানালা বন্ধ করে রেখেছিলাম। এইটা সত্যিই অনেক ঝুঁকিপূর্ণ।’
আরেক রোগীর স্বজন আক্তার হোসেন একইভাবে ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ করে বলেন, ‘একটি মেয়ের ওপর থেকে পড়ে মারা যাওয়ার কথা শুনেছি। এটা তো অবশ্যই ঝুঁকিপূর্ণ। এত বড় একটা ভবন অথচ বছরের পর বছর জানালায় কোনো গ্রিল নাই, এটা নিয়ে কেউ ভাবছে না। এখন একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেলো, এর দায় কে নেবে।’
সামিয়াকে নেওয়া হয় ঢামেক হাসপাতালে
আট তলা থেকে পড়ে যাওয়ার পর সামিয়াকে প্রথমে বিএমইউ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে নেওয়ার কিছুক্ষণ পর ২৪ অক্টোবর বিকালে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন ।
সামিয়ার বাবা নুরুন্নবীর অভিযোগ, বিএমইউতে তার মেয়েকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না দিয়েই ঢাকা মেডিকেলে পাঠানো হয়েছে। তার মেয়ে পড়ে যাওয়ার পর বিএমইউ কর্তৃপক্ষ দায় নিতে চায়নি। তাই দ্রুত ঢাকা মেডিকেলে রেফার করেছে। সেখানে নেওয়ার কিছুক্ষণ পর চিকিৎসকেরা তার মেয়ে মারা গেছে বলে তাকে জানিয়েছে।
ঘটনার সময় দায়িত্বে থাকা এক নার্স নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘সামিয়ার ঘাড়ে আঘাত লেগেছিল এবং শরীরের ভেতরে রক্তক্ষরণ হচ্ছিলো। উচ্চমাত্রায় অক্সিজেন দিয়েও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাচ্ছিলো না। এ কারণে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।’

জবাবদিহি নেই
সামিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় রোগীদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে ঘটনাটি যেন ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এই বিষয়ে সংবাদ সংগ্রহের কাজে সি ব্লকে গেলে সিটিজেন জার্নালের এই প্রতিবেদককে বাধা দেয় আনসার সদস্যরা। জানালার ছবি তোলার সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্সরাও বাধা দেন।
এমনকি এ বিষয়ে বিএমইউয়ের পরিচালক (হাসপাতাল) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. ইরতেকা রহমানের সঙ্গে তার অফিসে গিয়ে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। সামিয়া নুরের মৃত্যুর ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিএমইউ কর্তৃপক্ষ । কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে কমিটির প্রধান বিএমইউর উপপরিচালক (হাসপাতাল) ডা. আবুনূর মো. মাসুদ রানার দপ্তরে গেলে তিনি সিটিজেন জার্নাল টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘আমাদের রিপোর্ট প্রায় শেষের দিকে। আজ (৩ নভেম্বর) জমা দিতে পারি। গ্রিল না থাকায় মূলত দুর্ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এই হাসপাতালের ইতিহাসে এরকম ঘটনা এটিই প্রথম। ৮০-৮৪ সালে নির্মিত এই ভবনে এরকম কোনো কিছু এতদিন ঘটেনি। মেয়েটার মৃত্যুটা আসলে ওইখানে লেখা ছিল, এটা নিছক একটা দুর্ঘটনা।’
তদন্ত প্রতিবেদনে কী সুপারিশ করা হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা সুপারিশ করবো- যেন গ্রিল লাগানো হয়। তাছাড়া ওই বেডের পজিশন ঠিক ছিল না। টয়লেটে আসা যাওয়া সমস্যার কারণে বেডটি জানালার পাশে আড়াআড়ি রাখা হয়েছিল। এই বিষয়টিও জানানো হবে। এছাড়া দুর্ঘটনা এড়াতে সবার সচেতনতাও জরুরি।’
নিরাপত্তার চেয়ে ভবনের সৌন্দর্যকে প্রাধান্য
বিএমইউর সি ব্লকের ওই বহুতল ভবনের জানালায় গ্রিল না থাকা নিয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালেয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ভবনের নিরাপত্তার বিষয়টি নকশা ও নির্মাণের সময়ই গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, বছরের পর বছর ভবনটির জানালাগুলোতে গ্রিল না থাকার বিষয়টি কারও নজরে না আসাটা দুঃখজনক। শুধু এই হাসপাতালে নয়, নকশার নামে অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তার চেয়ে সৌন্দর্যকে প্রাধান্য দিয়ে গ্রিল ছাড়া কাচের দরজা-জানালা দেওয়া হচ্ছে। এতে নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এতে অগ্নিকাণ্ডের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও সমস্যা হতে পারে।

বিএমইউতে সহযোগী অধ্যাপক নিয়োগে অনিয়মের ঘটনায় হাইকোর্টের রুল
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হলেন অধ্যাপক সিদ্দিকী
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে কেনাকাটায় অনিয়ম তদন্তে সংসদীয় কমিটি গঠন







