শিরোনাম

সালমান শাহকে হারানোর তিন দশক, এখনো কাটেনি রহস্যের জট

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
সালমান শাহকে হারানোর তিন দশক, এখনো কাটেনি রহস্যের জট
বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহ

তিন দশক পেরিয়ে গেলেও বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহর মৃত্যুর রহস্যের জট এখনও কাটেনি। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর নিউ ইস্কাটনের ভাড়া বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় তার মরদেহ। তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন, নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছিল-দীর্ঘ তদন্ত ও একাধিক আইনি প্রক্রিয়ার পরও প্রশ্নটির চূড়ান্ত উত্তর মেলেনি।

সালমান শাহর পরিবার শুরু থেকেই তার মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করে আসছে। ছেলের মৃত্যুর ৩০ বছর পূর্তিতেও সেই অবস্থানে অনড় তার মা নীলা চৌধুরী।

তার দাবি, ৬ সেপ্টেম্বরকে সালমান শাহর মৃত্যু দিবস নয়, হত্যা দিবস হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

ঘটনার দিন সকালে নিউ ইস্কাটনের বাসায় সালমান শাহকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান তার স্ত্রী সামিরা হক। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। ওই দিনই সালমানের বাবা কমরউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী রমনা থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা করেন।

তবে পরের বছর পরিবারের অবস্থানে পরিবর্তন আসে। ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই সালমানকে হত্যা করা হয়েছে দাবি করে অপমৃত্যুর মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন করেন তার বাবা। এরপর শুরু হয় দীর্ঘ তদন্ত ও আইনি লড়াই।

১৯৯৭ সালের নভেম্বরে সিআইডি তদন্ত শেষে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। সেখানে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সালমান শাহর পরিবার ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে রিভিশন মামলা করে। পরে ২০০৩ সালে বিষয়টি বিচার বিভাগীয় তদন্তে যায়। প্রায় ১১ বছর পর, ২০১৪ সালে দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনেও মৃত্যুকে অপমৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

২০১৫ সালে নীলা চৌধুরী নারাজি আবেদন করলে তদন্তের দায়িত্ব র‌্যাবকে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত। রাষ্ট্রপক্ষের রিভিশনের পর সেই আদেশ বাতিল হলে তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিবিআই আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। সেখানেও সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়। ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর আদালত প্রতিবেদনটি গ্রহণ করে আসামিদের অব্যাহতি দেন।

তবে এখানেই শেষ হয়নি মামলা। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত পরিবারের রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করেন। একই সঙ্গে সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা হিসেবে এজাহার গ্রহণ ও তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়।এরপর নীলা চৌধুরীর পক্ষে তার ভাই মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম বাদী হয়ে রমনা থানায় হত্যা মামলা করেন।

মামলায় সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী সামিরা হকসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়। আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সামিরার মা লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই এবং অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডনসহ আরও কয়েকজন।

নতুন মামলায় চলতি বছরের ৯ আগস্ট হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ডনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠান আদালত। এ মামলায় এখন পর্যন্ত তিনিই একমাত্র গ্রেপ্তার আসামি। মামলাটি বর্তমানে সিআইডি তদন্ত করছে। ৩০ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তা পারেনি সংস্থাটি। পরে আদালত আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন দাখিলের নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন। তদন্ত সংস্থাটি এ নিয়ে নবমবারের মতো সময় পেয়েছে।

সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা মজিবুর রহমান বলেন, তদন্ত এখনো চলছে। গ্রেপ্তার ডনকে এখনো জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে আশা করছেন তারা।

অন্যদিকে বাদীপক্ষের আইনজীবী মো. আবিদ হাসানের দাবি, দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে সালমান শাহর পরিবার ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে। সব আসামিকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।

এদিকে, ডনের আইনজীবীদের দাবি, সালমান শাহর মৃত্যুর সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই এবং তাকে মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।

সালমানের মা নীলা চৌধুরী বলেন, ছেলের মৃত্যুর পরও পরিবারকে বিভিন্নভাবে হয়রানি ও হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে। এসব ঘটনার পাশাপাশি সালমানের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের নানা টানাপোড়েনই হত্যার অভিযোগকে আরও জোরালো করে।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো আদালতের চূড়ান্ত বিচারে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে তিন দশক পরও সালমান শাহর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে অপেক্ষা শেষ হয়নি। চলমান সিআইডি তদন্ত এবং পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়াই নির্ধারণ করবে, ১৯৯৬ সালের সেই মৃত্যু আত্মহত্যা ছিল, নাকি এর পেছনে ছিল কোনো হত্যাকাণ্ড।

/এসবি/