শিরোনাম

অযত্নে ভাষাশহীদ রফিকের স্মৃতি, জবিতে নেই দৃশ্যমান স্মারক

জবি প্রতিনিধি
অযত্নে ভাষাশহীদ রফিকের স্মৃতি, জবিতে নেই দৃশ্যমান স্মারক
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা শহীদ রফিক ভবন। ছবি: সংগৃহীত

বাংলা ভাষার মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম বাঙালি জাতিসত্তার ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিতে গিয়ে দেশের সাহসী তরুণেরা জীবন বিসর্জন দিয়েছিলেন। তাদের আত্মত্যাগ শুধু একটি দাবির আন্দোলন ছিল না, ছিল জাতিগত আত্মপরিচয় ও অধিকার রক্ষার লড়াই।

১৯৫২ সালের সেই উত্তাল সময়ে প্রথম শহীদদের একজন ছিলেন রফিক উদ্দিন আহমদ। তৎকালীন জগন্নাথ কলেজের (বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) হিসাববিজ্ঞান বিভাগের এই শিক্ষার্থী বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ২১ ফেব্রুয়ারি গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। তার আত্মত্যাগ ভাষা আন্দোলনকে নতুন গতি দেয়।

১৯২৬ সালের ৩০ অক্টোবর মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলার পারিল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রফিক উদ্দিন। বাবা আবদুল লতিফ মিয়া ও মা রাফিজা খাতুনের সাত সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন বড়। স্থানীয় বায়রা স্কুল থেকে মাধ্যমিক শেষ করে ভর্তি হন মানিকগঞ্জ দেবেন্দ্র কলেজে। পরে পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখে ঢাকায় এসে বাবার মুদ্রণ ব্যবসায় যুক্ত হন। পরবর্তীতে আবার উচ্চশিক্ষার জন্য তৎকালীন জগন্নাথ কলেজে হিসাববিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন।

সে সময় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। ১৪৪ ধারা জারি থাকলেও ছাত্রসমাজ আন্দোলনে অটল ছিল। ব্যক্তিগত জীবনে সামনে ছিল বিয়ের আয়োজন; ২১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় তার বাড়ি ফেরার কথা ছিল। কিন্তু ভাষার দাবিকে অগ্রাধিকার দিয়ে তিনি সেদিন মিছিলে যোগ দেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ এলাকায় আন্দোলনকারীরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করলে পুলিশ গুলি চালায়। এতে রফিক মাথায় গুলিবিদ্ধ হন এবং ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় জানা যায়, তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। ওইদিন গুলিবিদ্ধ আরও কয়েকজনকে ভর্তি করা হয়, যাদের মধ্যে বরকত পরে মারা যান। গভীর রাতে সামরিক প্রহরায় আজিমপুর কবরস্থানে রফিককে দাফন করা হয়। পরবর্তীতে তার আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০০ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি একাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্তে পুরোনো বিজনেস স্টাডিজ ভবনের নাম পরিবর্তন করে ‘ভাষা শহীদ রফিক ভবন’ রাখা হয়। বর্তমানে ভবনটিতে বাংলা ও ইতিহাস বিভাগ এবং নিচতলায় মেডিকেল সেন্টার রয়েছে। তবে এ নামকরণ ছাড়া ক্যাম্পাসে তার স্মরণে কোনো ভাস্কর্য বা স্মৃতিস্তম্ভ নেই।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, ভাষাশহীদ রফিকের নামে ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে একটি স্থায়ী নামফলক স্থাপন করা যেতে পারে, যেখানে রফিক উদ্দিনের সংক্ষিপ্ত জীবনী ও ভাষা আন্দোলনে তার ভূমিকা তুলে ধরা থাকবে। এতে নতুন শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাবে।

এছাড়া ভাষার মাসে তাকে ঘিরে বিশেষ আলোচনা সভা, সেমিনার ও স্মরণ অনুষ্ঠান আয়োজনের দাবি উঠেছে।

নিয়মিত সাংস্কৃতিক কর্মসূচির মাধ্যমে তার জীবন ও আত্মত্যাগ তুলে ধরা হলে তা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভাষা আন্দোলনের চেতনা জাগ্রত রাখতে সহায়ক হবে। দৃশ্যমান এই স্মারক শুধু শ্রদ্ধার নিদর্শনই হবে না, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ইতিহাস সংরক্ষণেরও অংশ হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

ইতিহাস বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ফেরদৌসী ফ্লোরা বলেন, ‘আমরা প্রায়ই ভাষা আন্দোলন নিয়ে আলোচনা করি, শহীদ মিনারে ফুল দিই। কিন্তু এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই একজন ছাত্র যে ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছেন, সে বিষয়ে অনেকেই বিস্তারিত জানি না। ক্যাম্পাসে যদি তার একটি নামফলক, ম্যুরাল বা ছোট একটি স্মৃতি কর্নার থাকতো, তাহলে নতুন শিক্ষার্থীরা ইতিহাসটা সহজে জানতে পারত। প্রশাসনের উচিত বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা।’

এ বিষয়ে বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোজাহারুল আলম সেলিম সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘ভাষাশহীদ রফিকের নামে স্মৃতিস্তম্ভ বা তেমন কোন উদ্যোগ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে নেওয়া হয়নি। তবে আমরা বিভাগের উদ্যোগে এই বিভাগের ভবনটির নাম তার নামে রেখেছিলাম। শহীদ রফিকের স্মৃতি ধরে রাখতে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি স্মৃতিস্তম্ভ বা গবেষণাধর্মী কোনো কাজ করা হলে নতুন প্রজন্ম ইতিহাস সম্পর্কে আরও সচেতন হবে।’

/জেএইচ/