শিরোনাম

পরীক্ষকদের মূল্যায়নের মানও যাচাই করবে শিক্ষা বোর্ড

শেখ শাহরিয়ার হোসেন
শেখ শাহরিয়ার হোসেন
পরীক্ষকদের মূল্যায়নের মানও যাচাই করবে শিক্ষা বোর্ড

এসএসসি, এইচএসসিসহ সব ধরনের পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নের দায়িত্ব পালনে পরীক্ষকদের অবহেলা রোধে শাস্তি দেওয়ার আইন করা হয়েছে। এছাড়া ফলাফলের যথার্থতা নিশ্চিত করতে উত্তরপত্র মূল্যায়নে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে সরকার।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশে প্রথমবারের মতো পরীক্ষকদের মূল্যায়নের মান যাচাই করবে শিক্ষা বোর্ড। এ জন্য দৈবচয়নের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট সংখ্যক উত্তরপত্র তৃতীয় পরীক্ষক বা বিশেষজ্ঞ দলের মাধ্যমে পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। একইসঙ্গে খাতা চ্যালেঞ্জের ক্ষেত্রে শুধু নম্বর গণনা নয়, পুরো উত্তরপত্র নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ থাকছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, চলমান এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা থেকেই এসব ব্যবস্থা বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চলছে। আগামী বছর থেকে এসএসসি ও এইচএসসিতে তা পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়, আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের একাধিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। গত ৭ জুলাই জাতীয় সংসদে ‘পাবলিক এক্সামিনেশনস (অফেন্সেস) (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল-২০২৬’ পাস হয়। নতুন আইনে বলা হয়েছে, কোনো পরীক্ষক উত্তরপত্র অতিমূল্যায়ন (ওভার অ্যাসেস) বা অবমূল্যায়ন (আন্ডার অ্যাসেস) করলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। তবে এ ক্ষেত্রে তৃতীয় পরীক্ষকের মাধ্যমে মূল্যায়নের অসঙ্গতি প্রমাণিত হতে হবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে একজন পরীক্ষক উত্তরপত্র মূল্যায়ন করে বোর্ডে জমা দেওয়ার পর তা সাধারণত আর যাচাই করা হয় না। ফলে মূল্যায়নে ভুল বা অবহেলা থেকে গেলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধরা পড়ে না। অতীতে নম্বর হেরফের, ওভার-মার্কিং, আন্ডার-মার্কিং এবং দায়িত্বে অবহেলার একাধিক অভিযোগ পাওয়ায় নতুন এই মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নতুন ব্যবস্থায় বোর্ডে জমা পড়া উত্তরপত্র থেকে দৈবচয়নের ভিত্তিতে নির্দিষ্টসংখ্যক খাতা নির্বাচন করা হবে। এরপর বোর্ড মনোনীত বিশেষজ্ঞ বা প্রধান পরীক্ষক সেগুলো পুনর্মূল্যায়ন করবেন। প্রথম ও দ্বিতীয় মূল্যায়নের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্ত এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উত্তরপত্র মূল্যায়নের মান বাড়াতে পরীক্ষকদের ওপর কাজের চাপও কমানো হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পাবলিক পরীক্ষায় পরীক্ষকের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে এবং জনপ্রতি মূল্যায়নের জন্য নির্ধারিত উত্তরপত্রের সংখ্যা কমিয়ে সর্বোচ্চ ৩০০টি করা হয়েছে। এতে প্রতিটি খাতা মূল্যায়নে পরীক্ষকরা আরও বেশি সময় দিতে পারবেন।

এদিকে ৪৩ বছর ধরে প্রচলিত খাতা পুনর্নিরীক্ষা পদ্ধতিতে কেবল চারটি বিষয় যাচাই করা হতো। সব প্রশ্নে নম্বর দেওয়া হয়েছে কি না, নম্বরের যোগফল সঠিক কি না, ওএমআর শিটে নম্বর সঠিকভাবে তোলা হয়েছে কি না এবং প্রাপ্ত নম্বর অনুযায়ী বৃত্ত পূরণ করা হয়েছে কি না। কিন্তু পরীক্ষকের মূল্যায়নের যথার্থতা যাচাইয়ের সুযোগ ছিল না। নতুন ব্যবস্থায় খাতা চ্যালেঞ্জের আবেদন করা শিক্ষার্থীদের উত্তরপত্রও পুনরায় মূল্যায়ন করা হবে।

উত্তরপত্র মূল্যায়নের মান বাড়াতে পরীক্ষকদের ওপর কাজের চাপও কমানো হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পাবলিক পরীক্ষায় পরীক্ষকের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে এবং জনপ্রতি মূল্যায়নের জন্য নির্ধারিত উত্তরপত্রের সংখ্যা কমিয়ে সর্বোচ্চ ৩০০টি করা হয়েছে। এতে প্রতিটি খাতা মূল্যায়নে পরীক্ষকরা আরও বেশি সময় দিতে পারবেন।

এছাড়া এবার থেকে তথাকথিত ‘মানবিক নম্বর’ বা অতিরিক্ত নম্বর দেওয়ার সুযোগও থাকছে না। এ বিষয়ে এরইমধ্যে শিক্ষা বোর্ডগুলো প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছে।

পোগোজ ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী মুনতাসির হোসেন বলেন, ‘এটি খুবই ইতিবাচক উদ্যোগ। একজন পরীক্ষার্থী হিসেবে মনে করি, এতে উত্তরপত্র মূল্যায়নে আরও স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে। ভুল মূল্যায়নের কারণে কেউ যেন তার প্রাপ্য নম্বর থেকে বঞ্চিত না হয়, সেই আস্থা তৈরি করবে এই সিদ্ধান্ত। আশা করি এটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হবে।’

ঢাকা গভ. মুসলিম হাই স্কুলের সিনিয়র শিক্ষক মো. আব্দুস সামাদ বলেন, একজন শিক্ষকের মূল ভিত্তিই হলো তার নৈতিকতা। তাই খাতা মূল্যায়নের সময় বিষয়টি শিক্ষকের মাথায় রাখা উচিত। তবে কারাদণ্ডের মতো এমন শাস্তি একজন শিক্ষককে দেওয়া উচিত হবে না।

জানতে চাইলে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, অতীতে কিছু উদ্বেগজনক ঘটনার কারণে উত্তরপত্র মূল্যায়নে জোরালো নজরদারি প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। দৈবচয়নের ভিত্তিতে পুনর্মূল্যায়নে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এতে মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে।

শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, আগে একজন পরীক্ষক উত্তরপত্র মূল্যায়ন করে জমা দেওয়ার পর সেটি সাধারণত আর কেউ যাচাই করতেন না। ফলে গাফিলতি, ওভার-মার্কিং বা আন্ডার-মার্কিং ধরা পড়ত না। নতুন ব্যবস্থায় দৈবচয়ন পদ্ধতিতে উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে পরীক্ষকদের কাজের মান যাচাই করা হবে। কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী পরীক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, উত্তরপত্র মূল্যায়নে কার্যকর মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা এবং কোনো পরীক্ষার্থী যেন তার প্রাপ্য নম্বর থেকে বঞ্চিত না হয়– সেজন্যই সরকার এই উদ্যোগ নিয়েছে।

/এফসি/