শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে পোগোজ ল্যাবরেটরি স্কুল

শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে পোগোজ ল্যাবরেটরি স্কুল
শেখ শাহরিয়ার হোসেন

পুরান ঢাকার ব্যস্ত সড়ক, ঐতিহাসিক স্থাপনা আর শত বছরের পুরোনো ঐতিহ্যের ভিড়ে এখনো শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে পোগোজ ল্যাবরেটরি স্কুল এন্ড কলেজ। ১৮৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রাচীনতম বিদ্যালয়গুলোর অন্যতম এই প্রতিষ্ঠানটি শুধু শিক্ষার ইতিহাসের অংশ নয়, ঢাকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশেরও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী।
জানা যায়, আর্মেনীয় ব্যবসায়ী ও জমিদার নিকোলাস পোগোজ বা নিকি পোগোজ ১৮৪৮ সালের ১২ জুন বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। ঢাকা শহরে প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রথম বেসরকারি বিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠানটির শুরু হয়েছিল পোগোজের নিজ বাসার নিচতলায়। সে সময় বিদ্যালয়টির নাম ছিল ‘পোগোজ অ্যাংলো-ভারনাকুলার স্কুল’।
প্রতিষ্ঠার কয়েক বছর পর বিদ্যালয়টি আরমানিটোলায় স্থানান্তর করা হয়। ১৮৫৫ সালে জেসি পেনিওটির ভাড়া বাসায় স্কুলটির কার্যক্রম পরিচালিত হয়। পরে ১৮৬০ সালে বিদ্যালয়টি সদরঘাট এলাকার একটি দোতলা ভবনে স্থানান্তরিত হয়। বিভিন্ন স্থানে কার্যক্রম পরিচালনার পর প্রতিষ্ঠানটি পুরান ঢাকার চিত্তরঞ্জন এভিনিউয়ে বর্তমান ঠিকানায় স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
দীর্ঘ পথচলায় পোগোজ স্কুল শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসংখ্য কৃতী ব্যক্তিত্ব তৈরি করেছে। বিদ্যালয়টির সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিলেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ, পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান এবং বাংলা ভাষায় পবিত্র কুরআনের প্রথম অনুবাদক গিরিশচন্দ্র সেন।
এ ছাড়া ঢাকা কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ ড. পি. কে. রায়, সমাজসেবী ও ঢাকা পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান রায়বাহাদুর আনন্দচন্দ্র রায়, ব্রিটিশ ভারতের প্রথম ভারতীয় মন্ত্রিসভার সদস্য স্যার কে. জি. গুপ্তসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরা এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন বলে প্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্টরা জানান।
পোগোজ স্কুলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সাহিত্য ও সংস্কৃতিরও বহু স্মরণীয় নাম। কবি শামসুর রাহমান ও কায়কোবাদ, সম্পাদক কালীপ্রসন্ন ঘোষ এবং জনপ্রিয় কৌতুকাভিনেতা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ছিলেন। বিভিন্ন সময় দেশের খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও সমাজসংস্কারকরাও বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেছেন। তাদের মধ্যে স্বামী বিবেকানন্দ ও কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
শত বছরের বেশি সময় ধরে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার পর ২০১৫ সালের ১৩ আগস্ট পোগোজ স্কুল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে একীভূত হয়। এরপর প্রতিষ্ঠানটির নাম পরিবর্তন করে ‘পোগোজ ল্যাবরেটরি স্কুল ও কলেজ’ রাখা হয়। বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিষদের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বর্তমানে প্রাচীন ঐতিহ্য ধরে রাখার পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। পাঠ্যবইভিত্তিক শিক্ষার পাশাপাশি শৃঙ্খলা, নৈতিকতা, সংস্কৃতি ও সহশিক্ষা কার্যক্রমেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুস্ময় হাওলাদার বলেন, এত পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী একটি প্রতিষ্ঠানে পড়া-শোনা করতে পেরে আমি গর্বিত। আমাদের স্কুলের ইতিহাস জানলে ভালো লাগে। আমরা চাই, এই ঐতিহ্য ভবিষ্যতেও অক্ষুণ্ন থাকুক এবং শিক্ষার মান আরও উন্নত হোক।
আরেক শিক্ষার্থী হাসিব সরকার বলেন, আমাদের স্কুলের অনেক বিখ্যাত সাবেক শিক্ষার্থী রয়েছেন। তাদের সাফল্য আমাদের অনুপ্রেরণা দেয়। আমরাও ভালো পড়াশোনা করে ভবিষ্যতে দেশের জন্য কাজ করতে চাই।
একজন অভিভাবক আব্দুল্লাহ আল মোমিন বলেন, পোগোজ স্কুল শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি ঢাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষার্থী তৈরি করে আসছে। তবে সময়ের সঙ্গে শিক্ষার পরিবেশ ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। ঐতিহ্যের পাশাপাশি শিক্ষার মান ধরে রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক মো. আবদুস সাত্তার (ভারপ্রাপ্ত) সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, পোগোজ ল্যাবরেটরি স্কুল ও কলেজের ইতিহাস অনেক সমৃদ্ধ। আমাদের শিক্ষার্থীরা শুধু পড়াশোনাতেই নয় সহশিক্ষা কার্যক্রমের সাথেও যুক্ত হচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে গর্ব ও দায়িত্ববোধ তৈরি করে। আমরা চেষ্টা করছি আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের ঐতিহাসিক মূল্যবোধের সমন্বয় ঘটাতে।
প্রতিষ্ঠার প্রায় ১৭৮ বছর পরও পুরান ঢাকার শিক্ষা ও ঐতিহ্যের অন্যতম প্রতীক হিসেবে টিকে আছে পোগোজ ল্যাবরেটরি স্কুল ও কলেজ। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থায় এসেছে নানা পরিবর্তন, বদলেছে প্রতিষ্ঠানটির নাম ও প্রশাসনিক কাঠামো। তবে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার যে লক্ষ্য নিয়ে নিকোলাস পোগোজ বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেই ধারাই এখনো বহন করে চলেছে দেশের অন্যতম প্রাচীন এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

পুরান ঢাকার ব্যস্ত সড়ক, ঐতিহাসিক স্থাপনা আর শত বছরের পুরোনো ঐতিহ্যের ভিড়ে এখনো শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে পোগোজ ল্যাবরেটরি স্কুল এন্ড কলেজ। ১৮৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রাচীনতম বিদ্যালয়গুলোর অন্যতম এই প্রতিষ্ঠানটি শুধু শিক্ষার ইতিহাসের অংশ নয়, ঢাকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশেরও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী।
জানা যায়, আর্মেনীয় ব্যবসায়ী ও জমিদার নিকোলাস পোগোজ বা নিকি পোগোজ ১৮৪৮ সালের ১২ জুন বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। ঢাকা শহরে প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রথম বেসরকারি বিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠানটির শুরু হয়েছিল পোগোজের নিজ বাসার নিচতলায়। সে সময় বিদ্যালয়টির নাম ছিল ‘পোগোজ অ্যাংলো-ভারনাকুলার স্কুল’।
প্রতিষ্ঠার কয়েক বছর পর বিদ্যালয়টি আরমানিটোলায় স্থানান্তর করা হয়। ১৮৫৫ সালে জেসি পেনিওটির ভাড়া বাসায় স্কুলটির কার্যক্রম পরিচালিত হয়। পরে ১৮৬০ সালে বিদ্যালয়টি সদরঘাট এলাকার একটি দোতলা ভবনে স্থানান্তরিত হয়। বিভিন্ন স্থানে কার্যক্রম পরিচালনার পর প্রতিষ্ঠানটি পুরান ঢাকার চিত্তরঞ্জন এভিনিউয়ে বর্তমান ঠিকানায় স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
দীর্ঘ পথচলায় পোগোজ স্কুল শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসংখ্য কৃতী ব্যক্তিত্ব তৈরি করেছে। বিদ্যালয়টির সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিলেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ, পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান এবং বাংলা ভাষায় পবিত্র কুরআনের প্রথম অনুবাদক গিরিশচন্দ্র সেন।
এ ছাড়া ঢাকা কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ ড. পি. কে. রায়, সমাজসেবী ও ঢাকা পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান রায়বাহাদুর আনন্দচন্দ্র রায়, ব্রিটিশ ভারতের প্রথম ভারতীয় মন্ত্রিসভার সদস্য স্যার কে. জি. গুপ্তসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরা এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন বলে প্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্টরা জানান।
পোগোজ স্কুলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সাহিত্য ও সংস্কৃতিরও বহু স্মরণীয় নাম। কবি শামসুর রাহমান ও কায়কোবাদ, সম্পাদক কালীপ্রসন্ন ঘোষ এবং জনপ্রিয় কৌতুকাভিনেতা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ছিলেন। বিভিন্ন সময় দেশের খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও সমাজসংস্কারকরাও বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেছেন। তাদের মধ্যে স্বামী বিবেকানন্দ ও কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
শত বছরের বেশি সময় ধরে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার পর ২০১৫ সালের ১৩ আগস্ট পোগোজ স্কুল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে একীভূত হয়। এরপর প্রতিষ্ঠানটির নাম পরিবর্তন করে ‘পোগোজ ল্যাবরেটরি স্কুল ও কলেজ’ রাখা হয়। বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিষদের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বর্তমানে প্রাচীন ঐতিহ্য ধরে রাখার পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। পাঠ্যবইভিত্তিক শিক্ষার পাশাপাশি শৃঙ্খলা, নৈতিকতা, সংস্কৃতি ও সহশিক্ষা কার্যক্রমেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুস্ময় হাওলাদার বলেন, এত পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী একটি প্রতিষ্ঠানে পড়া-শোনা করতে পেরে আমি গর্বিত। আমাদের স্কুলের ইতিহাস জানলে ভালো লাগে। আমরা চাই, এই ঐতিহ্য ভবিষ্যতেও অক্ষুণ্ন থাকুক এবং শিক্ষার মান আরও উন্নত হোক।
আরেক শিক্ষার্থী হাসিব সরকার বলেন, আমাদের স্কুলের অনেক বিখ্যাত সাবেক শিক্ষার্থী রয়েছেন। তাদের সাফল্য আমাদের অনুপ্রেরণা দেয়। আমরাও ভালো পড়াশোনা করে ভবিষ্যতে দেশের জন্য কাজ করতে চাই।
একজন অভিভাবক আব্দুল্লাহ আল মোমিন বলেন, পোগোজ স্কুল শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি ঢাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষার্থী তৈরি করে আসছে। তবে সময়ের সঙ্গে শিক্ষার পরিবেশ ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। ঐতিহ্যের পাশাপাশি শিক্ষার মান ধরে রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক মো. আবদুস সাত্তার (ভারপ্রাপ্ত) সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, পোগোজ ল্যাবরেটরি স্কুল ও কলেজের ইতিহাস অনেক সমৃদ্ধ। আমাদের শিক্ষার্থীরা শুধু পড়াশোনাতেই নয় সহশিক্ষা কার্যক্রমের সাথেও যুক্ত হচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে গর্ব ও দায়িত্ববোধ তৈরি করে। আমরা চেষ্টা করছি আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের ঐতিহাসিক মূল্যবোধের সমন্বয় ঘটাতে।
প্রতিষ্ঠার প্রায় ১৭৮ বছর পরও পুরান ঢাকার শিক্ষা ও ঐতিহ্যের অন্যতম প্রতীক হিসেবে টিকে আছে পোগোজ ল্যাবরেটরি স্কুল ও কলেজ। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থায় এসেছে নানা পরিবর্তন, বদলেছে প্রতিষ্ঠানটির নাম ও প্রশাসনিক কাঠামো। তবে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার যে লক্ষ্য নিয়ে নিকোলাস পোগোজ বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেই ধারাই এখনো বহন করে চলেছে দেশের অন্যতম প্রাচীন এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে পোগোজ ল্যাবরেটরি স্কুল
শেখ শাহরিয়ার হোসেন

পুরান ঢাকার ব্যস্ত সড়ক, ঐতিহাসিক স্থাপনা আর শত বছরের পুরোনো ঐতিহ্যের ভিড়ে এখনো শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে পোগোজ ল্যাবরেটরি স্কুল এন্ড কলেজ। ১৮৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রাচীনতম বিদ্যালয়গুলোর অন্যতম এই প্রতিষ্ঠানটি শুধু শিক্ষার ইতিহাসের অংশ নয়, ঢাকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশেরও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী।
জানা যায়, আর্মেনীয় ব্যবসায়ী ও জমিদার নিকোলাস পোগোজ বা নিকি পোগোজ ১৮৪৮ সালের ১২ জুন বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। ঢাকা শহরে প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রথম বেসরকারি বিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠানটির শুরু হয়েছিল পোগোজের নিজ বাসার নিচতলায়। সে সময় বিদ্যালয়টির নাম ছিল ‘পোগোজ অ্যাংলো-ভারনাকুলার স্কুল’।
প্রতিষ্ঠার কয়েক বছর পর বিদ্যালয়টি আরমানিটোলায় স্থানান্তর করা হয়। ১৮৫৫ সালে জেসি পেনিওটির ভাড়া বাসায় স্কুলটির কার্যক্রম পরিচালিত হয়। পরে ১৮৬০ সালে বিদ্যালয়টি সদরঘাট এলাকার একটি দোতলা ভবনে স্থানান্তরিত হয়। বিভিন্ন স্থানে কার্যক্রম পরিচালনার পর প্রতিষ্ঠানটি পুরান ঢাকার চিত্তরঞ্জন এভিনিউয়ে বর্তমান ঠিকানায় স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
দীর্ঘ পথচলায় পোগোজ স্কুল শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসংখ্য কৃতী ব্যক্তিত্ব তৈরি করেছে। বিদ্যালয়টির সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিলেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ, পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান এবং বাংলা ভাষায় পবিত্র কুরআনের প্রথম অনুবাদক গিরিশচন্দ্র সেন।
এ ছাড়া ঢাকা কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ ড. পি. কে. রায়, সমাজসেবী ও ঢাকা পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান রায়বাহাদুর আনন্দচন্দ্র রায়, ব্রিটিশ ভারতের প্রথম ভারতীয় মন্ত্রিসভার সদস্য স্যার কে. জি. গুপ্তসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরা এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন বলে প্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্টরা জানান।
পোগোজ স্কুলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সাহিত্য ও সংস্কৃতিরও বহু স্মরণীয় নাম। কবি শামসুর রাহমান ও কায়কোবাদ, সম্পাদক কালীপ্রসন্ন ঘোষ এবং জনপ্রিয় কৌতুকাভিনেতা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ছিলেন। বিভিন্ন সময় দেশের খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও সমাজসংস্কারকরাও বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেছেন। তাদের মধ্যে স্বামী বিবেকানন্দ ও কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
শত বছরের বেশি সময় ধরে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার পর ২০১৫ সালের ১৩ আগস্ট পোগোজ স্কুল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে একীভূত হয়। এরপর প্রতিষ্ঠানটির নাম পরিবর্তন করে ‘পোগোজ ল্যাবরেটরি স্কুল ও কলেজ’ রাখা হয়। বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিষদের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বর্তমানে প্রাচীন ঐতিহ্য ধরে রাখার পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। পাঠ্যবইভিত্তিক শিক্ষার পাশাপাশি শৃঙ্খলা, নৈতিকতা, সংস্কৃতি ও সহশিক্ষা কার্যক্রমেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুস্ময় হাওলাদার বলেন, এত পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী একটি প্রতিষ্ঠানে পড়া-শোনা করতে পেরে আমি গর্বিত। আমাদের স্কুলের ইতিহাস জানলে ভালো লাগে। আমরা চাই, এই ঐতিহ্য ভবিষ্যতেও অক্ষুণ্ন থাকুক এবং শিক্ষার মান আরও উন্নত হোক।
আরেক শিক্ষার্থী হাসিব সরকার বলেন, আমাদের স্কুলের অনেক বিখ্যাত সাবেক শিক্ষার্থী রয়েছেন। তাদের সাফল্য আমাদের অনুপ্রেরণা দেয়। আমরাও ভালো পড়াশোনা করে ভবিষ্যতে দেশের জন্য কাজ করতে চাই।
একজন অভিভাবক আব্দুল্লাহ আল মোমিন বলেন, পোগোজ স্কুল শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি ঢাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষার্থী তৈরি করে আসছে। তবে সময়ের সঙ্গে শিক্ষার পরিবেশ ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। ঐতিহ্যের পাশাপাশি শিক্ষার মান ধরে রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক মো. আবদুস সাত্তার (ভারপ্রাপ্ত) সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, পোগোজ ল্যাবরেটরি স্কুল ও কলেজের ইতিহাস অনেক সমৃদ্ধ। আমাদের শিক্ষার্থীরা শুধু পড়াশোনাতেই নয় সহশিক্ষা কার্যক্রমের সাথেও যুক্ত হচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে গর্ব ও দায়িত্ববোধ তৈরি করে। আমরা চেষ্টা করছি আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের ঐতিহাসিক মূল্যবোধের সমন্বয় ঘটাতে।
প্রতিষ্ঠার প্রায় ১৭৮ বছর পরও পুরান ঢাকার শিক্ষা ও ঐতিহ্যের অন্যতম প্রতীক হিসেবে টিকে আছে পোগোজ ল্যাবরেটরি স্কুল ও কলেজ। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থায় এসেছে নানা পরিবর্তন, বদলেছে প্রতিষ্ঠানটির নাম ও প্রশাসনিক কাঠামো। তবে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার যে লক্ষ্য নিয়ে নিকোলাস পোগোজ বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেই ধারাই এখনো বহন করে চলেছে দেশের অন্যতম প্রাচীন এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

একাদশে এবার যেভাবে ভর্তি করা হবে







