ইইউর বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি কমলো ১৯ শতাংশ

ইইউর বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি কমলো ১৯ শতাংশ
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পোশাক বাজারে বড় ধরনের মন্দা দেখা দিয়েছে, যার সবচেয়ে বড় দায় মেটাতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি-এপ্রিল মেয়াদে বৈশ্বিক এই জোটের পোশাক আমদানি সার্বিকভাবে কমলেও, প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে আশঙ্কাজনক হারে। ইউরোস্ট্যাটের সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করে এই উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে।
চলতি ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে (জানুয়ারি-এপ্রিল) বিশ্ববাজার থেকে ইইউর পোশাক আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ দশমিক ৪২ শতাংশ কমেছে। এই সময়ে তাদের মোট পোশাক আমদানি হয়েছে ২৭ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ইউরো বা ৩ লাখ ৩৮ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকার, যা ২০২৫ সালের একই সময়ে ছিল ৩১ বিলিয়ন ইউরো বা ৩ লাখ ৭৮ হাজার ২০০ কোটি টাকা। পোশাকের চাহিদা এবং গড় মূল্য—উভয়ই প্রায় ৫ শতাংশের বেশি হ্রাস পাওয়ায় এই সার্বিক সংকোচন তৈরি হয়েছে।
তবে এই মন্দার বাজারে প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় ধস নেমেছে বাংলাদেশের রপ্তানিতে। ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে ইউরোপে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ১৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬ দশমিক ৯ বিলিয়ন ইউরো বা ৭৪ হাজার ২৯৮ কোটি টাকায়, যা আগের বছর ছিল ৭ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ইউরো বা ৯১ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ, মাত্র চার মাসেই বাংলাদেশ ইউরোপের বাজার থেকে প্রায় ১৭ হাজার ৬৯০ কোটি টাকার রপ্তানি আয় হারিয়েছে।
কেবল চার মাসের সামগ্রিক চিত্রই নয়, একক মাস হিসেবে ২০২৬ সালের এপ্রিলের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ ছিল। ওই মাসে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় আগের বছরের এপ্রিলের তুলনায় ১৯ দশমিক ৫৩ শতাংশ কমে গেছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো চাহিদার ধীরগতি। ক্রেতারা এখন আগের তুলনায় ছোট আকারের অর্ডার দিচ্ছেন এবং মূল্য নিয়ে কঠোর দরকষাকষি করছেন। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি খরচ, শ্রম ব্যয় এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার পরিবর্তনও রপ্তানিকারকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্টদের মতে, যেখানে চীন সস্তা দামে বাজার ধরে রাখছে এবং ভিয়েতনাম বেশি দামে কম পণ্য বিক্রি করে নিজেদের আয় অক্ষুণ্ন রাখছে, সেখানে বাংলাদেশ একই সঙ্গে পণ্যের পরিমাণ ও মূল্য— উভয় দিক থেকেই মার খাচ্ছে। এই দ্বৈত দুর্বলতা অন্য কোনো শীর্ষ প্রতিযোগী দেশের মধ্যে দেখা যায়নি। বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি, দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং বায়ারদের সঙ্গে দর কষাকষির সক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণেই বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত আজ এই কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। ইউরোপের বাজারে নিজেদের অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ এবং উন্নত সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের দিকে এখনই নজর দেওয়া জরুরি।
কেন এই বিপর্যয়
সাধারণত পোশাকের বাজারে রপ্তানি কমলে তা মূলত পরিমাণের (ভলিউম) ওপর নির্ভর করে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঘটেছে উল্টো ও আশঙ্কাজনক এক প্রবণতা। প্রথম চার মাসে ইউরোপে বাংলাদেশের পোশাক পাঠানোর পরিমাণ বা ভলিউম কমেছে ৯ দশমিক ৯১ শতাংশ (৪৩৫ দশমিক ৯৭ মিলিয়ন কেজি)। কিন্তু পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য কমে গেছে রেকর্ড ১০ দশমিক ৪৫ শতাংশ (প্রতি কেজি পোশাকের দাম ১৫ দশমিক ৫৯ ইউরো থেকে নেমে এসেছে ১৩ দশমিক ৯৬ ইউরোতে)। এর অর্থ হলো, বাংলাদেশ পরিমাণগতভাবে বাজার যতটা ধরে রাখতে পেরেছে, তার চেয়ে অনেক বেশি লোকসান গুনেছে পণ্যের ন্যায্য মূল্য না পেয়ে।
প্রতিযোগী দেশগুলোর কৌশলী অবস্থান
বাংলাদেশের এই দ্বিমুখী সংকটের বিপরীতে অন্যান্য প্রতিযোগী দেশগুলো বেশ কৌশলী অবস্থান নিয়েছে। ইইউর বাজারে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে চীন ব্যাপক মূল্যছাড়ের নীতি গ্রহণ করেছে। তাদের পণ্যের গড় দাম ৭ দশমিক ৭০ শতাংশ কমলেও, তারা একমাত্র প্রধান দেশ হিসেবে ইইউতে পোশাক সরবরাহের পরিমাণ ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ বাড়াতে পেরেছে। ফলে তাদের মোট আয় কমেছে মাত্র ৪ দশমিক ৭০ শতাংশ (৭ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ইউরো)।
দামের দিক থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে ভিয়েতনাম। প্রথম চার মাসে তাদের পণ্যের পরিমাণ ৭ দশমিক ১১ শতাংশ কমলেও, প্রিমিয়াম পজিশনিংয়ের কারণে গড় ইউনিট মূল্য বেড়েছে ৬ দশমিক ৯০ শতাংশ। ফলে তাদের সার্বিক রপ্তানি আয় প্রায় অপরিবর্তিত থেকে ১ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ইউরো ধরে রাখতে পেরেছে।
তুরস্কের রপ্তানি আয় ১৬ দশমিক ৬০ শতাংশ কমলেও তাদের পণ্যের মূল্য ১ দশমিক ৪৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নির্দেশ করে তাদের এই পতন মূলত পরিমাণগত, দামের প্রতিযোগিতা থেকে নয়। অন্যদিকে ভারতের আয় কমেছে ১২ দশমিক ১০ শতাংশ।
পাকিস্তানের বাজারে এক অদ্ভুত চিত্র দেখা গেছে। তাদের পণ্যের পরিমাণ ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ বাড়লেও রপ্তানি মূল্য অস্বাভাবিকভাবে ২২ দশমিক ৪৯ শতাংশ ধস নেমেছে, যার ফলে সামগ্রিক আয় ১৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির জন্য সবচেয়ে বড় বাজার। বড় এ বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে চারটি চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। আর যে কারণে তৈরি পোশাক রপ্তানি বিপর্যয় বলে মন্তব্য করেছেন পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল।
তিনি সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, প্রথমত, বর্তমানে পুরো ইউরোপে অর্থনৈতিক মন্দা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলছে। এর ফলে সেখানকার মানুষের পোশাক কেনার গড় খরচ কমে গেছে এবং ইউরোপের সামগ্রিক আমদানি প্রায় ১০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এটি বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য একটি বড় ধাক্কা।
দ্বিতীয়ত, চীন বর্তমানে অত্যন্ত আগ্রাসীভাবে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার চেষ্টা করছে। চীনের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত এবং তাদের লিড টাইম (পণ্য পৌঁছানোর সময়) অনেক কম। এই সুযোগ-সুবিধাগুলো বাংলাদেশের তুলনায় বেশি হওয়ায় বায়াররা চীনের দিকে বেশি ঝুঁকছে, যা বাংলাদেশের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
তৃতীয়ত, এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের বিষয়টি নিয়ে বায়ারদের মধ্যে এক ধরনের সংশয় বা ধোঁয়াশা কাজ করছে। এর ফলে তারা ঝুঁকি কমাতে অনেক সময় অন্য দেশগুলোকে বিকল্প হিসেবে বেছে নিচ্ছে। মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, এই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে গেলে বায়াররা আবার ফিরে আসবে।
চতুর্থত, বাংলাদেশের পোশাক খাতে কিছু অভ্যন্তরীণ প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। তিনি মনে করেন, নতুন সরকার যেভাবে কাজ শুরু করেছে এবং অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা যদি আরও উন্নত করা সম্ভব হয়, তবে বাংলাদেশ অবশ্যই এই সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবে।
বৈশ্বিক মন্দা, চীনের সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে বর্তমানে পোশাক রপ্তানিতে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলেও মনে করেন বিজিএমইএর সাবেক এই পরিচালক।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পোশাক বাজারে বড় ধরনের মন্দা দেখা দিয়েছে, যার সবচেয়ে বড় দায় মেটাতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি-এপ্রিল মেয়াদে বৈশ্বিক এই জোটের পোশাক আমদানি সার্বিকভাবে কমলেও, প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে আশঙ্কাজনক হারে। ইউরোস্ট্যাটের সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করে এই উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে।
চলতি ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে (জানুয়ারি-এপ্রিল) বিশ্ববাজার থেকে ইইউর পোশাক আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ দশমিক ৪২ শতাংশ কমেছে। এই সময়ে তাদের মোট পোশাক আমদানি হয়েছে ২৭ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ইউরো বা ৩ লাখ ৩৮ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকার, যা ২০২৫ সালের একই সময়ে ছিল ৩১ বিলিয়ন ইউরো বা ৩ লাখ ৭৮ হাজার ২০০ কোটি টাকা। পোশাকের চাহিদা এবং গড় মূল্য—উভয়ই প্রায় ৫ শতাংশের বেশি হ্রাস পাওয়ায় এই সার্বিক সংকোচন তৈরি হয়েছে।
তবে এই মন্দার বাজারে প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় ধস নেমেছে বাংলাদেশের রপ্তানিতে। ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে ইউরোপে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ১৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬ দশমিক ৯ বিলিয়ন ইউরো বা ৭৪ হাজার ২৯৮ কোটি টাকায়, যা আগের বছর ছিল ৭ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ইউরো বা ৯১ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ, মাত্র চার মাসেই বাংলাদেশ ইউরোপের বাজার থেকে প্রায় ১৭ হাজার ৬৯০ কোটি টাকার রপ্তানি আয় হারিয়েছে।
কেবল চার মাসের সামগ্রিক চিত্রই নয়, একক মাস হিসেবে ২০২৬ সালের এপ্রিলের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ ছিল। ওই মাসে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় আগের বছরের এপ্রিলের তুলনায় ১৯ দশমিক ৫৩ শতাংশ কমে গেছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো চাহিদার ধীরগতি। ক্রেতারা এখন আগের তুলনায় ছোট আকারের অর্ডার দিচ্ছেন এবং মূল্য নিয়ে কঠোর দরকষাকষি করছেন। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি খরচ, শ্রম ব্যয় এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার পরিবর্তনও রপ্তানিকারকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্টদের মতে, যেখানে চীন সস্তা দামে বাজার ধরে রাখছে এবং ভিয়েতনাম বেশি দামে কম পণ্য বিক্রি করে নিজেদের আয় অক্ষুণ্ন রাখছে, সেখানে বাংলাদেশ একই সঙ্গে পণ্যের পরিমাণ ও মূল্য— উভয় দিক থেকেই মার খাচ্ছে। এই দ্বৈত দুর্বলতা অন্য কোনো শীর্ষ প্রতিযোগী দেশের মধ্যে দেখা যায়নি। বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি, দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং বায়ারদের সঙ্গে দর কষাকষির সক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণেই বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত আজ এই কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। ইউরোপের বাজারে নিজেদের অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ এবং উন্নত সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের দিকে এখনই নজর দেওয়া জরুরি।
কেন এই বিপর্যয়
সাধারণত পোশাকের বাজারে রপ্তানি কমলে তা মূলত পরিমাণের (ভলিউম) ওপর নির্ভর করে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঘটেছে উল্টো ও আশঙ্কাজনক এক প্রবণতা। প্রথম চার মাসে ইউরোপে বাংলাদেশের পোশাক পাঠানোর পরিমাণ বা ভলিউম কমেছে ৯ দশমিক ৯১ শতাংশ (৪৩৫ দশমিক ৯৭ মিলিয়ন কেজি)। কিন্তু পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য কমে গেছে রেকর্ড ১০ দশমিক ৪৫ শতাংশ (প্রতি কেজি পোশাকের দাম ১৫ দশমিক ৫৯ ইউরো থেকে নেমে এসেছে ১৩ দশমিক ৯৬ ইউরোতে)। এর অর্থ হলো, বাংলাদেশ পরিমাণগতভাবে বাজার যতটা ধরে রাখতে পেরেছে, তার চেয়ে অনেক বেশি লোকসান গুনেছে পণ্যের ন্যায্য মূল্য না পেয়ে।
প্রতিযোগী দেশগুলোর কৌশলী অবস্থান
বাংলাদেশের এই দ্বিমুখী সংকটের বিপরীতে অন্যান্য প্রতিযোগী দেশগুলো বেশ কৌশলী অবস্থান নিয়েছে। ইইউর বাজারে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে চীন ব্যাপক মূল্যছাড়ের নীতি গ্রহণ করেছে। তাদের পণ্যের গড় দাম ৭ দশমিক ৭০ শতাংশ কমলেও, তারা একমাত্র প্রধান দেশ হিসেবে ইইউতে পোশাক সরবরাহের পরিমাণ ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ বাড়াতে পেরেছে। ফলে তাদের মোট আয় কমেছে মাত্র ৪ দশমিক ৭০ শতাংশ (৭ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ইউরো)।
দামের দিক থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে ভিয়েতনাম। প্রথম চার মাসে তাদের পণ্যের পরিমাণ ৭ দশমিক ১১ শতাংশ কমলেও, প্রিমিয়াম পজিশনিংয়ের কারণে গড় ইউনিট মূল্য বেড়েছে ৬ দশমিক ৯০ শতাংশ। ফলে তাদের সার্বিক রপ্তানি আয় প্রায় অপরিবর্তিত থেকে ১ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ইউরো ধরে রাখতে পেরেছে।
তুরস্কের রপ্তানি আয় ১৬ দশমিক ৬০ শতাংশ কমলেও তাদের পণ্যের মূল্য ১ দশমিক ৪৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নির্দেশ করে তাদের এই পতন মূলত পরিমাণগত, দামের প্রতিযোগিতা থেকে নয়। অন্যদিকে ভারতের আয় কমেছে ১২ দশমিক ১০ শতাংশ।
পাকিস্তানের বাজারে এক অদ্ভুত চিত্র দেখা গেছে। তাদের পণ্যের পরিমাণ ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ বাড়লেও রপ্তানি মূল্য অস্বাভাবিকভাবে ২২ দশমিক ৪৯ শতাংশ ধস নেমেছে, যার ফলে সামগ্রিক আয় ১৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির জন্য সবচেয়ে বড় বাজার। বড় এ বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে চারটি চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। আর যে কারণে তৈরি পোশাক রপ্তানি বিপর্যয় বলে মন্তব্য করেছেন পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল।
তিনি সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, প্রথমত, বর্তমানে পুরো ইউরোপে অর্থনৈতিক মন্দা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলছে। এর ফলে সেখানকার মানুষের পোশাক কেনার গড় খরচ কমে গেছে এবং ইউরোপের সামগ্রিক আমদানি প্রায় ১০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এটি বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য একটি বড় ধাক্কা।
দ্বিতীয়ত, চীন বর্তমানে অত্যন্ত আগ্রাসীভাবে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার চেষ্টা করছে। চীনের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত এবং তাদের লিড টাইম (পণ্য পৌঁছানোর সময়) অনেক কম। এই সুযোগ-সুবিধাগুলো বাংলাদেশের তুলনায় বেশি হওয়ায় বায়াররা চীনের দিকে বেশি ঝুঁকছে, যা বাংলাদেশের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
তৃতীয়ত, এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের বিষয়টি নিয়ে বায়ারদের মধ্যে এক ধরনের সংশয় বা ধোঁয়াশা কাজ করছে। এর ফলে তারা ঝুঁকি কমাতে অনেক সময় অন্য দেশগুলোকে বিকল্প হিসেবে বেছে নিচ্ছে। মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, এই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে গেলে বায়াররা আবার ফিরে আসবে।
চতুর্থত, বাংলাদেশের পোশাক খাতে কিছু অভ্যন্তরীণ প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। তিনি মনে করেন, নতুন সরকার যেভাবে কাজ শুরু করেছে এবং অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা যদি আরও উন্নত করা সম্ভব হয়, তবে বাংলাদেশ অবশ্যই এই সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবে।
বৈশ্বিক মন্দা, চীনের সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে বর্তমানে পোশাক রপ্তানিতে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলেও মনে করেন বিজিএমইএর সাবেক এই পরিচালক।

ইইউর বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি কমলো ১৯ শতাংশ
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পোশাক বাজারে বড় ধরনের মন্দা দেখা দিয়েছে, যার সবচেয়ে বড় দায় মেটাতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি-এপ্রিল মেয়াদে বৈশ্বিক এই জোটের পোশাক আমদানি সার্বিকভাবে কমলেও, প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে আশঙ্কাজনক হারে। ইউরোস্ট্যাটের সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করে এই উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে।
চলতি ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে (জানুয়ারি-এপ্রিল) বিশ্ববাজার থেকে ইইউর পোশাক আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ দশমিক ৪২ শতাংশ কমেছে। এই সময়ে তাদের মোট পোশাক আমদানি হয়েছে ২৭ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ইউরো বা ৩ লাখ ৩৮ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকার, যা ২০২৫ সালের একই সময়ে ছিল ৩১ বিলিয়ন ইউরো বা ৩ লাখ ৭৮ হাজার ২০০ কোটি টাকা। পোশাকের চাহিদা এবং গড় মূল্য—উভয়ই প্রায় ৫ শতাংশের বেশি হ্রাস পাওয়ায় এই সার্বিক সংকোচন তৈরি হয়েছে।
তবে এই মন্দার বাজারে প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় ধস নেমেছে বাংলাদেশের রপ্তানিতে। ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে ইউরোপে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ১৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬ দশমিক ৯ বিলিয়ন ইউরো বা ৭৪ হাজার ২৯৮ কোটি টাকায়, যা আগের বছর ছিল ৭ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ইউরো বা ৯১ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ, মাত্র চার মাসেই বাংলাদেশ ইউরোপের বাজার থেকে প্রায় ১৭ হাজার ৬৯০ কোটি টাকার রপ্তানি আয় হারিয়েছে।
কেবল চার মাসের সামগ্রিক চিত্রই নয়, একক মাস হিসেবে ২০২৬ সালের এপ্রিলের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ ছিল। ওই মাসে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় আগের বছরের এপ্রিলের তুলনায় ১৯ দশমিক ৫৩ শতাংশ কমে গেছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো চাহিদার ধীরগতি। ক্রেতারা এখন আগের তুলনায় ছোট আকারের অর্ডার দিচ্ছেন এবং মূল্য নিয়ে কঠোর দরকষাকষি করছেন। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি খরচ, শ্রম ব্যয় এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার পরিবর্তনও রপ্তানিকারকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্টদের মতে, যেখানে চীন সস্তা দামে বাজার ধরে রাখছে এবং ভিয়েতনাম বেশি দামে কম পণ্য বিক্রি করে নিজেদের আয় অক্ষুণ্ন রাখছে, সেখানে বাংলাদেশ একই সঙ্গে পণ্যের পরিমাণ ও মূল্য— উভয় দিক থেকেই মার খাচ্ছে। এই দ্বৈত দুর্বলতা অন্য কোনো শীর্ষ প্রতিযোগী দেশের মধ্যে দেখা যায়নি। বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি, দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং বায়ারদের সঙ্গে দর কষাকষির সক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণেই বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত আজ এই কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। ইউরোপের বাজারে নিজেদের অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ এবং উন্নত সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের দিকে এখনই নজর দেওয়া জরুরি।
কেন এই বিপর্যয়
সাধারণত পোশাকের বাজারে রপ্তানি কমলে তা মূলত পরিমাণের (ভলিউম) ওপর নির্ভর করে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঘটেছে উল্টো ও আশঙ্কাজনক এক প্রবণতা। প্রথম চার মাসে ইউরোপে বাংলাদেশের পোশাক পাঠানোর পরিমাণ বা ভলিউম কমেছে ৯ দশমিক ৯১ শতাংশ (৪৩৫ দশমিক ৯৭ মিলিয়ন কেজি)। কিন্তু পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য কমে গেছে রেকর্ড ১০ দশমিক ৪৫ শতাংশ (প্রতি কেজি পোশাকের দাম ১৫ দশমিক ৫৯ ইউরো থেকে নেমে এসেছে ১৩ দশমিক ৯৬ ইউরোতে)। এর অর্থ হলো, বাংলাদেশ পরিমাণগতভাবে বাজার যতটা ধরে রাখতে পেরেছে, তার চেয়ে অনেক বেশি লোকসান গুনেছে পণ্যের ন্যায্য মূল্য না পেয়ে।
প্রতিযোগী দেশগুলোর কৌশলী অবস্থান
বাংলাদেশের এই দ্বিমুখী সংকটের বিপরীতে অন্যান্য প্রতিযোগী দেশগুলো বেশ কৌশলী অবস্থান নিয়েছে। ইইউর বাজারে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে চীন ব্যাপক মূল্যছাড়ের নীতি গ্রহণ করেছে। তাদের পণ্যের গড় দাম ৭ দশমিক ৭০ শতাংশ কমলেও, তারা একমাত্র প্রধান দেশ হিসেবে ইইউতে পোশাক সরবরাহের পরিমাণ ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ বাড়াতে পেরেছে। ফলে তাদের মোট আয় কমেছে মাত্র ৪ দশমিক ৭০ শতাংশ (৭ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ইউরো)।
দামের দিক থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে ভিয়েতনাম। প্রথম চার মাসে তাদের পণ্যের পরিমাণ ৭ দশমিক ১১ শতাংশ কমলেও, প্রিমিয়াম পজিশনিংয়ের কারণে গড় ইউনিট মূল্য বেড়েছে ৬ দশমিক ৯০ শতাংশ। ফলে তাদের সার্বিক রপ্তানি আয় প্রায় অপরিবর্তিত থেকে ১ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ইউরো ধরে রাখতে পেরেছে।
তুরস্কের রপ্তানি আয় ১৬ দশমিক ৬০ শতাংশ কমলেও তাদের পণ্যের মূল্য ১ দশমিক ৪৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নির্দেশ করে তাদের এই পতন মূলত পরিমাণগত, দামের প্রতিযোগিতা থেকে নয়। অন্যদিকে ভারতের আয় কমেছে ১২ দশমিক ১০ শতাংশ।
পাকিস্তানের বাজারে এক অদ্ভুত চিত্র দেখা গেছে। তাদের পণ্যের পরিমাণ ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ বাড়লেও রপ্তানি মূল্য অস্বাভাবিকভাবে ২২ দশমিক ৪৯ শতাংশ ধস নেমেছে, যার ফলে সামগ্রিক আয় ১৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির জন্য সবচেয়ে বড় বাজার। বড় এ বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে চারটি চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। আর যে কারণে তৈরি পোশাক রপ্তানি বিপর্যয় বলে মন্তব্য করেছেন পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল।
তিনি সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, প্রথমত, বর্তমানে পুরো ইউরোপে অর্থনৈতিক মন্দা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলছে। এর ফলে সেখানকার মানুষের পোশাক কেনার গড় খরচ কমে গেছে এবং ইউরোপের সামগ্রিক আমদানি প্রায় ১০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এটি বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য একটি বড় ধাক্কা।
দ্বিতীয়ত, চীন বর্তমানে অত্যন্ত আগ্রাসীভাবে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার চেষ্টা করছে। চীনের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত এবং তাদের লিড টাইম (পণ্য পৌঁছানোর সময়) অনেক কম। এই সুযোগ-সুবিধাগুলো বাংলাদেশের তুলনায় বেশি হওয়ায় বায়াররা চীনের দিকে বেশি ঝুঁকছে, যা বাংলাদেশের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
তৃতীয়ত, এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের বিষয়টি নিয়ে বায়ারদের মধ্যে এক ধরনের সংশয় বা ধোঁয়াশা কাজ করছে। এর ফলে তারা ঝুঁকি কমাতে অনেক সময় অন্য দেশগুলোকে বিকল্প হিসেবে বেছে নিচ্ছে। মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, এই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে গেলে বায়াররা আবার ফিরে আসবে।
চতুর্থত, বাংলাদেশের পোশাক খাতে কিছু অভ্যন্তরীণ প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। তিনি মনে করেন, নতুন সরকার যেভাবে কাজ শুরু করেছে এবং অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা যদি আরও উন্নত করা সম্ভব হয়, তবে বাংলাদেশ অবশ্যই এই সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবে।
বৈশ্বিক মন্দা, চীনের সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে বর্তমানে পোশাক রপ্তানিতে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলেও মনে করেন বিজিএমইএর সাবেক এই পরিচালক।




