শিরোনাম

ব্যবসা সহজ করতে নানা উদ্যোগ সরকারের

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
ব্যবসা সহজ করতে নানা উদ্যোগ সরকারের
গ্রাফিক্স: সিটিজেন জার্নাল

ব্যবসা করার জন্য নিবন্ধন, বিভিন্ন অনুমোদন, ছাড়পত্রসহ অন্যান্য সরকারি সেবার আবেদন সর্বোচ্চ এক সপ্তাহের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা মতামত বা ছাড়পত্র না দিলে আবেদনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদিত বলে গণ্য হবে। দেশে বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও ব্যবসা করার প্রক্রিয়া সহজ করতে আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরে এমন নানা উদ্যোগ নিতে চলেছে সরকার।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেট ঘোষণাকালে এসব তথ্য জানান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশে ব্যবসা সহজ করা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে বেসরকারি খাতকে আরও গতিশীল করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য ব্যবসা ও বিনিয়োগ-সংক্রান্ত সেবায় সময়, ব্যয়, অনিশ্চয়তা ও দাপ্তরিক জটিলতা কমানো হবে।

তিনি আরও বলেন, এই বিনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের মানে কোনো প্রয়োজনীয় আইন, বিধি বা তদারকি ব্যবস্থা বিলোপ করা নয়; বরং জনস্বার্থ, পরিবেশ ও বিনিয়োগকারীর অধিকার অক্ষুণ্ন রেখেই প্রক্রিয়া সহজ ও দুর্নীতিমুক্ত করা হবে। যাচাইয়ের কাজ স্পষ্ট নিয়মে নির্দিষ্ট সময়ে প্রযুক্তির সহায়তায় করা হবে।

৪৮ ঘণ্টায় কোম্পানি নিবন্ধন

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, কোম্পানির নামের ছাড়পত্র, নিবন্ধন আবেদন, ফি পরিশোধ ও সনদ প্রদান পুরোপুরি অনলাইনে সম্পন্ন করে সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কোম্পানি নিবন্ধনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ছোট ও নতুন ব্যবসার জন্য অনলাইনভিত্তিক প্রাথমিক অনুমোদন ব্যবস্থা রাখা হবে, যাতে উদ্যোক্তারা দ্রুত কাজ শুরু করে পরবর্তী ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে বাকি নিবন্ধন সম্পন্ন করতে পারেন।

এ ছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবসা সহজ করতে সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার ট্রেড লাইসেন্স সেবা ধাপে ধাপে কেন্দ্রীয় সেবা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হবে।

অর্থমন্ত্রী আরও জানান, বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও দক্ষ জনবলের কাজের অনুমতি বা ওয়ার্ক পারমিট সর্বোচ্চ ৭ দিনের মধ্যে এবং বিনিয়োগকারী ও প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভিসা ১০ দিনের মধ্যে দেওয়া হবে। যোগ্য বিনিয়োগকারীদের জন্য পাঁচ বছর মেয়াদি ‘মাল্টিপল এন্ট্রি’ ভিসা (একবার ভিসা নিয়ে একাধিকবার আসার সুযোগ) চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিদেশি কর্মীদের নিরাপত্তা ছাড়পত্রের আবেদন ও যাচাই প্রক্রিয়াও অনলাইনভিত্তিক ও নির্দিষ্ট সময়সীমার আওতায় আনা হচ্ছে।

সমন্বিত শিল্প-সুবিধা

নির্বাচিত শিল্পাঞ্চল ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ বা সমন্বিত শিল্প-সুবিধা চালু করা হবে বলে জানান আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

তিনি বলেন, এই সুবিধার আওতায় জমি, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, সড়ক সংযোগ ও প্রাথমিক অনুমোদন আগে থেকেই সমন্বিতভাবে প্রস্তুত রাখা হবে। ফলে উদ্যোক্তারা জমি পাওয়ামাত্রই দ্রুত কারখানা স্থাপন ও উৎপাদন শুরু করতে পারবেন।

এ ছাড়া বিনিয়োগকারীদের আইনি সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক আস্থা বাড়াতে দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তি সম্প্রসারণ ও দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি হালনাগাদ করার কথা জানান অর্থমন্ত্রী।

কর কর্মকর্তাদের একক ক্ষমতা থাকছে না

দেশে কর, মূসক (ভ্যাট), কাস্টমস শুল্ক, বন্ড ও ব্যাংকিং ব্যবস্থা আধুনিকায়নের মাধ্যমে ব্যবসা সহজ করতে একগুচ্ছ সংস্কার ও বিনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

বাজেট বক্তৃতায় তিনি জানান, প্রস্তাবিত বাজেটে কর কর্মকর্তাদের একক ক্ষমতা বিলোপ করা, কর ও ভ্যাট আপিলের ফি কমানো এবং কাস্টমসে পণ্য জট কমাতে সরকারি পরীক্ষাগারের পাশাপাশি বেসরকারি পরীক্ষাগার ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, শতভাগ রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিবছর বন্ডের নিরীক্ষা করার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হচ্ছে।

ব্যক্তি করদাতাদের পাশাপাশি আগামী অর্থবছর থেকে কোম্পানি করদাতাদের কর্পোরেট আয়কর রিটার্নও অনলাইনে দাখিলের ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, বছরের শুরুর দিকে রিটার্ন দিলে পাওয়া যাবে বিশেষ কর প্রণোদনা। পাশাপাশি, আগামী অর্থবছরের শুরু থেকে ‘ই-ভ্যাট’ পদ্ধতিতে অনলাইনে ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। ক্ষুদ্র ভ্যাটদাতাদের জন্য আনা হচ্ছে সহজ ও আলাদা ভ্যাট রিটার্ন ফরম।

মুনাফা প্রত্যাবাসন সুবিধা বাড়লো

অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বৈধ মুনাফা ও মূলধন প্রত্যাবাসনের আবেদন নিষ্পত্তির জন্য সর্বোচ্চ ৩০ দিনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হচ্ছে।

তিনি জানান, অতালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে এক কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনে মূল্যায়ন প্রতিবেদনের প্রয়োজন হবে না এবং ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন ছাড়াই মূলধন নিজ দেশে ফেরত নেওয়া যাবে।

৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ডিজিটাল ‘ই-লোন’

বাজেট বক্তৃতায় ডিজিটাল মাধ্যমে তাৎক্ষণিক ক্ষুদ্র ঋণ বা ‘ই-লোন’ চালু, পরিবেশবান্ধব গাড়ির ঋণসীমা বৃদ্ধি, পুঁজিবাজারে শেয়ার নিষ্পত্তির সময় কমানো এবং দেশের প্রথম কমোডিটি এক্সচেঞ্জ চালুর কথা জানান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

ডিজিটাল পদ্ধতিতে ‘ই-লোন’ এর আওতায় গ্রাহকেরা কোনো ধরনের দাপ্তরিক জটিলতা ছাড়াই সম্পূর্ণ ডিজিটাল উপায়ে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা ক্ষুদ্র ঋণ পাবেন। প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) পদ্ধতিকে সম্পূর্ণ অনলাইনে ও প্রযুক্তিনির্ভর করা হচ্ছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা এসব বিনিয়ন্ত্রণকরণ কার্যক্রম দ্রুত সময়ের মধ্যে ও সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন করবো।

/এফআর/