শিরোনাম
এক্সপ্লেইনার

যুদ্ধক্ষেত্রে এআই: সামরিক প্রযুক্তির শীর্ষে যেসব কোম্পানি

সিজেডএন  ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
যুদ্ধক্ষেত্রে এআই: সামরিক প্রযুক্তির শীর্ষে যেসব কোম্পানি
মার্কিন সেনাবাহিনীর ব্যবহৃত এআই প্রযুক্তি সম্পন্ন ড্রোন। ছবি: আল জাজিরা

যুগ যুগ ধরে যুদ্ধ বলতে আমাদের চোখে ভেসে উঠত ভারী ট্যাংক, রণতরী, ফাইটার জেট কিংবা গোলন্দাজ বাহিনীর বিকট গর্জন। এসব ভারী অস্ত্র তৈরির পেছনে থাকত হাতেগোনা কয়েকটি বিশাল সরকারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সময় বদলেছে, আর তার সঙ্গে বদলে গেছে যুদ্ধের সংজ্ঞাও। ঐতিহ্যবাহী সেই ক্ষেত্র থেকে সরে এসে যুদ্ধক্ষেত্র এখন দ্রুত দখল করে নিচ্ছে কম্পিউটার সফটওয়্যার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

আজকাল সামরিক বাহিনীগুলো সরাসরি ময়দানে নামার চেয়ে স্ক্রিনের পেছনে বসে বোতাম টিপেই নির্ধারণ করছে যুদ্ধের ভাগ্য। প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর এ পরিবর্তন সামরিক বিশ্বকে এক নতুন যুগের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে, যেখানে পুরোনো সামরিক-শিল্পব্যবস্থা বদলে তৈরি হচ্ছে নতুন ‘সামরিক-প্রযুক্তি খাত’। বিশ্বজুড়ে প্রতিরক্ষায় কোটি কোটি ডলার ঢালা হচ্ছে, আর এই বিশাল অঙ্কের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে অল্প কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান।

যুদ্ধক্ষেত্রে এআই সামরিক প্রযুক্তির শীর্ষে যেসব কোম্পানি (2)
অ্যান্ডুরিলের তৈরি চালকবিহীন যুদ্ধবিমান ‘ফিউরি’

এই পরিবর্তনের ধারা কিন্তু আজকের নয়। ২০০০ ও ২০১০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন কর্মসূচির মাধ্যমেই মূলত দূর থেকে স্ক্রিনে দেখে হামলা চালানোর সংস্কৃতি জোরদার হয়। বর্তমানে সেই ধারণাই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। বিভিন্ন দেশ এখন তড়িঘড়ি করে নিজেদের সেনাবাহিনীকে এআই-বান্ধব করে গড়ে তুলছে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ২.৭ বিলিয়ন ডলারের এক বিশাল চুক্তি করেছে, যার অধীনে প্রতি বছর ৬০ হাজার সেনাকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। অন্যদিকে, ন্যাটো জোটের এয়ার কমান্ড সিস্টেম পরিচালনার জন্য প্যালান্টিয়ার, অ্যান্ডুরিল ও আথিয়ার মতো শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনও পিছিয়ে নেই। তারা নিজেদের গোপনীয় নেটওয়ার্কে এআই মোতায়েন করতে একাধিক শীর্ষ টেক জায়ান্টের সঙ্গে চুক্তি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৫ সাল নাগাদ বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় প্রায় ২.৮৮ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর ফলে এবং ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের কারণে এই ধরনের চুক্তি রাতারাতি বহুগুণ বেড়ে গেছে।

সামরিক খাতে এআই-এর এই বিশাল বিস্তার এবং কে কোন ভূমিকা পালন করছে তা স্পষ্ট করতে স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা ইনস্টিটিউট বা ‘সিপ্রি’ পুরো সামরিক শিল্পকে চারটি প্রধান ভাগে ভাগ করেছে। প্রথম ভাগটি হলো দীর্ঘদিনের পুরোনো এবং বড় বড় অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, যাদের ‘ডিফেন্স প্রাইমস’ বলা হয়। লকহিড মার্টিন, আরটিএক্স, নর্থরপ গ্রামান, বিএই সিস্টেমস এবং জেনারেল ডায়নামিকসের মতো ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানগুলো এতদিন মূলত ভারী অস্ত্র সরবরাহ করে এসেছে। কিন্তু এখন তারা তাদের বিদ্যমান হার্ডওয়্যারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত করছে। উদাহরণস্বরূপ, লকহিড মার্টিন তাদের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানে এআই চালিত টুল যুক্ত করেছে, যা চোখের পলকে শত্রু বিমান চিহ্নিত করতে পারে। আবার এল৩হ্যারিসের ক্যামেরা সিস্টেমে এআই যুক্ত হয়ে রিয়েল-টাইমে নিখুঁত লক্ষ্য নির্ধারণে সাহায্য করছে।

যুদ্ধক্ষেত্রে এআই সামরিক প্রযুক্তির শীর্ষে যেসব কোম্পানি (3)

দ্বিতীয় শ্রেণিতে রয়েছে নতুন উদ্ভাবনী সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান বা ‘নিওপ্রাইম’। এই স্টার্টআপগুলো সরাসরি অস্ত্র তৈরির চেয়ে ডেটা বিশ্লেষণ ও বিশেষায়িত সফটওয়্যার তৈরিতে বেশি গুরুত্ব দেয়। এ ক্ষেত্রের সবচেয়ে আলোচিত নাম ‘প্যালান্টিয়ার’। তাদের তৈরি ‘প্রজেক্ট ম্যাভেন’ এআই প্রযুক্তির সাহায্যে উপগ্রহের ছবি, ড্রোন ফুটেজ এবং সিগন্যাল বিশ্লেষণ করে লক্ষ্যবস্তু মুহূর্তের মধ্যে শনাক্ত ও অগ্রাধিকার দিতে পারে। ইউক্রেন এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের মতো সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলোতে এই ব্যবস্থা বহুলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। একইভাবে, ‘অ্যান্ডুরিল’ নামক অপর একটি স্টার্টআপের ল্যাটিস প্ল্যাটফর্ম বিভিন্ন সেন্সর ও স্বচালিত বাহনকে এক সুতোয় বেঁধে কমান্ড নেটওয়ার্ক তৈরি করে, যা মার্কিন বাহিনী সরাসরি মাঠে ব্যবহার করছে।

তৃতীয় ভাগটিতে রাজত্ব করছে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি জায়ান্ট বা ‘বিগ টেক’ প্রতিষ্ঠানগুলো। গুগল, মেটা, স্পেসএক্স, মাইক্রোসফট ও অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেসের মতো কোম্পানিগুলোর হাতে রয়েছে ক্লাউড কম্পিউটিং ও ডেটা প্রক্রিয়াকরণের বিপুল ক্ষমতা। মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও শ্রেণিবদ্ধ নেটওয়ার্কে সামরিক এআই মোতায়েনের জন্য ওপেনএআই, এনভিডিয়া ও ওরাকলের মতো জায়ান্টগুলোর সঙ্গে ইতিমধ্যে বড় চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী সামরিক ঠিকাদারদের সাথে হাত মিলিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান এখন বিশ্বযুদ্ধের নতুন পরিকাঠামো নির্মাণে পরোক্ষ কিন্তু সবচেয়ে প্রভাবশালী ভূমিকা রাখছে।

যুদ্ধক্ষেত্রে এআই সামরিক প্রযুক্তির শীর্ষে যেসব কোম্পানি

সর্বশেষ ও চতুর্থ ভাগে রয়েছে মৌলিক এআই মডেল নির্মাতা সংস্থাগুলো। ওপেনএআই, অ্যানথ্রোপিক কিংবা ইউরোপের মিস্ট্রাল এআই-এর মতো সংস্থাগুলো এখন শক্তিশালী এআই মডেল তৈরি করছে। সামরিক বাহিনীগুলো তাদের মূল সরঞ্জাম ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় ব্যবহারের জন্য সেগুলোকে উপযোগী করে নিচ্ছে। যদিও অনেক এআই ল্যাব শুরুতে যুদ্ধের ময়দানে তাদের প্রযুক্তি ব্যবহারের বিরুদ্ধে ছিল, তবে সময়ের প্রয়োজনে এবং বাণিজ্যিক চুক্তির কারণে সেই বাধাগুলো উঠে যাচ্ছে। কেবল পশ্চিমা বিশ্ব নয়, চীনও একই গতিতে এগিয়ে চলেছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, চীনা সামরিক বাহিনী মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও সিদ্ধান্ত নিতে মেটার ‘লামা’ মডেলের ওপর ভিত্তি করে ‘চ্যাটবিট’ নামক টুল তৈরি করেছে। পেন্টাগনের হিসাব অনুযায়ী, চীনের সামরিক এআই ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি, যা বছরে প্রায় দেড় থেকে দুই বিলিয়ন ডলার। এই প্রতিযোগিতায় চীনা টেক জায়ান্ট বাইদু, আলিবাবা, বিওয়াইডি ও টেনসেন্টের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও জড়িয়ে পড়েছে। প্রযুক্তি ও যুদ্ধের এই মেলবন্ধন পরিষ্কার করে দিচ্ছে, ভবিষ্যৎ যুদ্ধক্ষেত্র কেবল বারুদ বা কামানের ওপর নির্ভর করবে না। সেখানে মূল চালিকাশক্তি হবে অ্যালগরিদম ও ডেটা।

সূত্র: আল জাজিরা

/এমএকে/