শিরোনাম

দীর্ঘদিন ধরেই চলছিল পরিচয় বদলের খেলা, শেষে মাউশিতে ধরা

সিজেডএন  ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
দীর্ঘদিন ধরেই চলছিল পরিচয় বদলের খেলা, শেষে মাউশিতে ধরা
পুলিশের হাতে আটক মহিবুল্লাহ

রাজধানীর সচিবালয় থেকে শুরু করে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) প্রশাসনিক বিভিন্ন দপ্তরে দীর্ঘদিন ধরে অবাধে যাতায়াত ছিল মুহিব্বুল্লাহ নামে এক ব্যক্তির। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে তিনি কখনও নিজেকে ৩৬তম বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা, কখনও কোনো প্রতিমন্ত্রীর একান্ত ব্যক্তিগত সহকারী (এপিএস), আবার কখনও যুগ্ম সচিব হিসেবে পরিচয় দিতেন। প্রয়োজন অনুযায়ী বদলে যেত তার পরিচয়। শেষ পর্যন্ত ভুয়া ডিও (ডেমি-অফিশিয়াল) লেটার নিয়ে বদলির সুপারিশ করতে গিয়ে মাউশির কর্মকর্তাদের হাতে ধরা পড়েন এই কথিত বহুরূপী প্রতারক।

সোমবার (২৭ জুলাই) বিকালে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের নামে তৈরি একটি ডিও লেটার নিয়ে মাউশিতে হাজির হন মুহিব্বুল্লাহ। জামালপুরের একটি বিদ্যালয়ের হিসাব সহকারী আশেক মাহমুদকে একটি কলেজে হিসাবরক্ষক হিসেবে পদায়নের সুপারিশ ছিল ওই চিঠিতে। তবে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের সন্দেহের কারণে শেষ পর্যন্ত তার প্রতারণার মুখোশ খুলে যায়।

মাউশি সূত্র জানায়, চিঠিটি প্রশাসন শাখায় পৌঁছানোর পর এর ভাষা, স্মারক নম্বর, স্বাক্ষর ও উপস্থাপনায় অসঙ্গতি ধরা পড়ে। বিষয়টি যাচাই করতে গিয়ে কর্মকর্তারা জানতে পারেন, বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজের ইংরেজি বিভাগে মুহিব্বুল্লাহ নামে কোনো শিক্ষকই নেই। এরপর তাকে আটক করে তার সঙ্গে থাকা ব্যাগ তল্লাশি করা হয়।

তল্লাশিতে বেরিয়ে আসে প্রতারণার বিস্ময়কর চিত্র। কর্মকর্তারা জানান, ব্যাগ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ১৩টি ভুয়া ডিও লেটার, বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের পরিচয়ে তৈরি বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজের ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপকের জাল পরিচয়পত্র, একটি উচ্চমূল্যের চেক, সোনালী ব্যাংকের চেকবই, বিভিন্ন কর্মকর্তার যোগাযোগ নম্বরের তালিকা, অসংখ্য ভিজিটিং কার্ড এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের বদলি-সংক্রান্ত জাল নথিপত্র।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর তাকে শাহবাগ থানার পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

দীর্ঘদিন ধরেই চলছিল পরিচয় বদলের খেলা

মাউশির কর্মকর্তাদের ভাষ্য, মুহিব্বুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে বদলির সুপারিশ নিয়ে যাতায়াত করতেন। অধিকাংশ কর্মকর্তা তাকে বিসিএস ক্যাডারের সদস্য বলেই বিশ্বাস করতেন।

তদন্তে জানা গেছে, তিনি কখনও নিজেকে ৩৬তম বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা, কখনও প্রতিমন্ত্রীর এপিএস, আবার কখনও যুগ্ম সচিব পরিচয়ে বিভিন্ন দপ্তরে প্রবেশ করতেন। তার গলায় সব সময় ঝুলত একটি ভুয়া সরকারি পরিচয়পত্র। কখনও আনুষ্ঠানিক পোশাক পরে নিজেকে সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক হিসেবেও পরিচয় দিতেন।

ব্যাগভর্তি ভুয়া ডিও লেটার

মাউশির কর্মকর্তারা উদ্ধার হওয়া ডিও লেটারগুলো পর্যালোচনা করে দেখেছেন, একই ধরনের কৌশল ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে বদলি ও পদায়নের সুপারিশ করা হচ্ছিল।

একটি চিঠিতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের নামে ভুয়া প্যাড ব্যবহার করে ফেনী সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোবাশ্বেরা আক্তারকে ঢাকার কবি নজরুল সরকারি কলেজে বদলির সুপারিশ করা হয়। সেখানে তাকে প্রতিমন্ত্রীর ছোট বোন হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়। বোনজামাইয়ের অসুস্থতা এবং সন্তানদের পড়াশোনার বিষয় তুলে ধরে মানবিক কারণ দেখিয়ে বদলির আবেদন করা হয়েছিল।

আরেকটি ভুয়া ডিও লেটারে কবি নজরুল সরকারি কলেজের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ইউসুফকে প্রেষণে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের পরিদর্শক পদে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়। ওই চিঠিতে দাবি করা হয়, তিনি প্রতিমন্ত্রীর এলাকার পরিচিত ব্যক্তি এবং ছাত্রজীবনে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পাশাপাশি তাকে জাতীয়তাবাদী আদর্শের প্রতি বিশ্বস্ত ব্যক্তি হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।

পারিবারিক সংকট দেখিয়ে বদলির সুপারিশ

উদ্ধার হওয়া আরেকটি জাল চিঠিতে ফকিরহাটের এক সহকারী শিক্ষক ইউসুফ হাসানকে বগুড়ায় বদলির জন্য আবেদন করা হয়। সেখানে প্রতিমন্ত্রীর জাল স্বাক্ষরের পাশাপাশি ‘Take Necessary Action’ নির্দেশনাও ব্যবহার করা হয়েছিল।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, শিক্ষকের স্ত্রী অন্য জেলায় কর্মরত, শ্বশুর পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী, দুই শিশুর দেখভাল নিয়ে পরিবার সংকটে রয়েছে এবং শ্যালিকার বাসায় থাকতে হচ্ছে। এসব আবেগঘন কারণ তুলে ধরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছিল।

শুধু মাউশি নয়, ছিল সচিবালয়েও নিয়মিত যাতায়াত

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, মুহিব্বুল্লাহ শুধু মাউশিতেই নয়, সচিবালয় ও অন্যান্য প্রশাসনিক দপ্তরেও নিয়মিত যাতায়াত করতেন। পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজের পরিচয় পরিবর্তন করে বিভিন্ন দপ্তরে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতেন তিনি।

যা বলছে মাউশি

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) অধ্যাপক মো. নাজমুল হক বলেন, বিকেলে প্রতিমন্ত্রীর নামে তৈরি একটি ভুয়া ডিও লেটার নিয়ে বদলির সুপারিশ করতে আসা এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। তিনি নিজেকে ৩৬তম বিসিএস কর্মকর্তা বলে পরিচয় দিয়েছিলেন।

তিনি জানান, প্রশাসন শাখার কর্মকর্তারা সন্দেহ হলে তার ব্যাগ তল্লাশি করেন। সেখান থেকে বিভিন্ন সরকারি কলেজ, শিক্ষা বোর্ড, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের নামে তৈরি অসংখ্য জাল ডিও লেটার, বদলির আবেদনপত্র এবং ভুয়া পরিচয়পত্র উদ্ধার করা হয়। এরপর প্রয়োজনীয় প্রমাণসহ তাঁকে শাহবাগ থানার পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

তদন্তে নামছে পুলিশ

শাহবাগ থানা পুলিশ জানিয়েছে, আটক ব্যক্তির বিরুদ্ধে সরকারি নথি জালিয়াতি, ভুয়া পরিচয় ব্যবহার এবং প্রতারণার অভিযোগে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।

পুলিশের ধারণা, এ ঘটনায় আরও ব্যক্তি বা কোনো সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত থাকতে পারে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে বিস্তারিত তদন্ত শুরু হয়েছে।

/এমআর/