সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে দলীয় নেতাদের নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক

সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে দলীয় নেতাদের নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক
সিজেডএন ডেস্ক

দেশের ১১টি সরকারি সংস্থা, বোর্ড ও করপোরেশনের সর্বোচ্চ পদে এক বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন ক্ষমতাসীন বিএনপির একাধিক নেতা। একসঙ্গে এত সংখ্যক সক্রিয় রাজনীতিককে সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ দায়িত্বে বসানোর ঘটনা বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে বিরল বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আইন অনুযায়ী এসব প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহী পদে বাইরে থেকে কাউকে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের কোনো বাধা নেই। তবে দীর্ঘদিন ধরে এসব দায়িত্বে মূলত প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়াই প্রচলিত রীতি ছিল। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সরকারের আমলে এ ধরনের নিয়োগ ছিল সীমিত।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীতে রাজনীতিবিদদের এমন নিয়োগ থেকে উল্লেখযোগ্য সাফল্যের নজির খুব বেশি দেখা যায়নি। ফলে এবার নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিরা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়। একই সঙ্গে আইনে থাকা এই সুযোগ ভবিষ্যতে অপব্যবহারের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে কয়েকজন ইতোমধ্যে নিজ নিজ কর্মস্থলে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)সহ আরও কয়েকটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদেও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।
কারা দায়িত্ব পেলেন
গত বৃহস্পতিবার রাতে পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ১১টি সরকারি সংস্থা, বোর্ড ও করপোরেশনের শীর্ষ পদে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের এক বছরের চুক্তিতে নিয়োগ দেয়। তারা সবাই গ্রেড-২ মর্যাদায় দায়িত্ব পালন করবেন।
সরকারি ও দলীয় সূত্রগুলো বলছে, এই নিয়োগের পেছনে মূলত তিনটি কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থেকে বঞ্চিত হওয়া নেতাদের মূল্যায়ন করা। দ্বিতীয়ত, প্রশাসনের ভেতরে সরকারের আস্থাভাজন কর্মকর্তা না পাওয়া। তৃতীয়ত, এত দিন আমলাদের মাধ্যমে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ার ধারণা।
দলীয় সূত্র জানায়, নিয়োগ পাওয়া অনেক নেতাই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। কেউ মনোনয়ন পাননি, আবার কাউকে দলীয় সিদ্ধান্তে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে হয়েছিল। এবার তাদের বিকল্পভাবে মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান হয়েছেন বিএনপির বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক এবং রাজশাহীর সাবেক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) চেয়ারম্যান হয়েছেন দলের সহধর্মবিষয়ক সম্পাদক আবদুল বারী।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের (বিসিসিটি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন সহ-বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক কাজী রওনাকুল ইসলাম।
বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান হয়েছেন যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহসভাপতি জাকির হোসেন। বাংলাদেশ জুট করপোরেশনের চেয়ারম্যান করা হয়েছে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মামুন হাসানকে।
বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক হয়েছেন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কার্যকরী সভাপতি সালাহ্উদ্দিন সরকার।
বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ রাশেদুল হক।
জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের নির্বাহী সচিব করা হয়েছে যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মো. কামরুজ্জামানকে।
বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের চেয়ারম্যান হয়েছেন বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল খালেক। বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পেয়েছেন দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শামসুজ্জামান।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) চেয়ারম্যান হয়েছেন বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক বেনজীর আহমেদ।
এ ছাড়া নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে এক বছরের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সামসুল আলমকে।
কেন এই সিদ্ধান্ত
সরকার কেন প্রচলিত রীতি ভেঙে আমলাদের পরিবর্তে রাজনৈতিক নেতাদের এসব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব দিল এ নিয়ে প্রশাসন ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা চলছে।
বিএনপির একাধিক নেতা এবং প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সিদ্ধান্তটির পেছনে তিনটি প্রধান বিবেচনা রয়েছে।
প্রথমত, বিগত সরকারের সময় রাজপথে সক্রিয় থাকা কিন্তু নির্বাচনে মনোনয়ন না পাওয়া বা দলীয় সিদ্ধান্তে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো নেতাদের মূল্যায়ন করা।
দ্বিতীয়ত, সরকারের ধারণা অনুযায়ী প্রশাসনের ভেতরে সব গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত বিশ্বস্ত কর্মকর্তা নেই।
তৃতীয়ত, দীর্ঘদিন ধরে আমলাদের নেতৃত্বে পরিচালিত অনেক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা ও সাফল্য আসেনি বলে সরকারের মূল্যায়ন।
এ বিষয়ে জানতে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকার মনে করছে প্রশাসনে যে গতিশীলতা প্রত্যাশিত ছিল, তা অর্জিত হয়নি। পাশাপাশি আস্থাভাজন কর্মকর্তার সংকটও রয়েছে। সে কারণেই প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
দলীয়করণের আশঙ্কা
সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে সক্রিয় রাজনীতিবিদদের নিয়োগকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন না প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা।
তাদের মতে, এর ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাব, তদবির এবং দলীয়করণের প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।
একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাজশাহীর সাবেক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল এখন অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার একটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হয়েছেন। এতে প্রশাসনিক কাঠামো ও পদমর্যাদা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
প্রশাসনের কর্মকর্তারা আরও বলছেন, কোনো সরকারি কর্মকর্তা অনিয়ম করলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া, এমনকি পেনশন স্থগিত করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের জবাবদিহির কাঠামো কী হবে, তা স্পষ্ট নয়।
নিয়োগপ্রাপ্তদের বক্তব্য
বিসিকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া বেনজীর আহমেদ বলেন, দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও বিসিক তার সম্ভাবনা অনুযায়ী এগোতে পারেনি। দেশের বিভিন্ন শিল্পনগরীতে অনেক প্লট বরাদ্দ থাকলেও সেগুলোর যথাযথ ব্যবহার হয়নি। সরকার এখন বিসিককে কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে চায়, আর সে লক্ষ্যেই তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী রওনাকুল ইসলাম বলেন, সংস্থাটি দীর্ঘদিন ধরে কাঙ্ক্ষিতভাবে কাজ করতে পারেনি। তার ভাষ্য, অতীতে প্রশাসনিক নেতৃত্বে প্রয়োজনীয় উদ্যোগের ঘাটতি ছিল। তিনি দায়িত্ব নিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে আরও সক্রিয় ও জনমুখী করার চেষ্টা করবেন।
আইনে সুযোগ থাকলেও বিতর্ক রয়ে গেছে
এসব প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট আইন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সরকারকে চেয়ারম্যান বা প্রধান নির্বাহী নিয়োগের ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে বিসিক আইন, ২০১৩-এর ১২(২) ধারায় বলা হয়েছে, চেয়ারম্যান সরকার নিয়োগ দেবে এবং তিনিই করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। নৈতিক স্খলনের দায়ে দণ্ডিত, আদালত কর্তৃক দেউলিয়া ঘোষিত বা চাকরিচ্যুত ব্যক্তি ছাড়া অন্য যে কাউকে এই পদে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট, তাঁত বোর্ডসহ অন্যান্য সংস্থার আইনেও প্রায় একই ধরনের বিধান রয়েছে।
বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) সাবেক রেক্টর ও সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদারের মতে, আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে এই নিয়োগে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। কারণ আইন সরকারকে সেই ক্ষমতা দিয়েছে। তবে একসঙ্গে এত সংখ্যক রাজনৈতিক ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়ার নজির আগে দেখা যায়নি।
তবে বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন হলো, যদি উদ্দেশ্য হয় প্রতিষ্ঠানকে গতিশীল করা, তাহলে সংশ্লিষ্ট খাতে অভিজ্ঞতা ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের বিষয়টি কেন বাধ্যতামূলক করা হয়নি?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারের সাবেক এক অর্থসচিব বলেন, অতীতে আমলাদের নিয়োগের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষ দক্ষতার বিষয়টি সব সময় বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। এখন রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়োগের ক্ষেত্রেও কী বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেটি সরকারের বিষয়।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ আবদুল আউয়াল মজুমদারের মতে, এখন সময়ই বলে দেবে এই সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর হয়। তার ভাষায়, যদি নতুন দায়িত্বপ্রাপ্তরা দুর্নীতি কমাতে, কাজের গতি বাড়াতে এবং সরকারি অর্থের সাশ্রয় নিশ্চিত করতে পারেন, তাহলে সরকার এই মডেলের কার্যকারিতা মূল্যায়নের সুযোগ পাবে।

দেশের ১১টি সরকারি সংস্থা, বোর্ড ও করপোরেশনের সর্বোচ্চ পদে এক বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন ক্ষমতাসীন বিএনপির একাধিক নেতা। একসঙ্গে এত সংখ্যক সক্রিয় রাজনীতিককে সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ দায়িত্বে বসানোর ঘটনা বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে বিরল বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আইন অনুযায়ী এসব প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহী পদে বাইরে থেকে কাউকে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের কোনো বাধা নেই। তবে দীর্ঘদিন ধরে এসব দায়িত্বে মূলত প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়াই প্রচলিত রীতি ছিল। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সরকারের আমলে এ ধরনের নিয়োগ ছিল সীমিত।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীতে রাজনীতিবিদদের এমন নিয়োগ থেকে উল্লেখযোগ্য সাফল্যের নজির খুব বেশি দেখা যায়নি। ফলে এবার নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিরা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়। একই সঙ্গে আইনে থাকা এই সুযোগ ভবিষ্যতে অপব্যবহারের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে কয়েকজন ইতোমধ্যে নিজ নিজ কর্মস্থলে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)সহ আরও কয়েকটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদেও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।
কারা দায়িত্ব পেলেন
গত বৃহস্পতিবার রাতে পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ১১টি সরকারি সংস্থা, বোর্ড ও করপোরেশনের শীর্ষ পদে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের এক বছরের চুক্তিতে নিয়োগ দেয়। তারা সবাই গ্রেড-২ মর্যাদায় দায়িত্ব পালন করবেন।
সরকারি ও দলীয় সূত্রগুলো বলছে, এই নিয়োগের পেছনে মূলত তিনটি কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থেকে বঞ্চিত হওয়া নেতাদের মূল্যায়ন করা। দ্বিতীয়ত, প্রশাসনের ভেতরে সরকারের আস্থাভাজন কর্মকর্তা না পাওয়া। তৃতীয়ত, এত দিন আমলাদের মাধ্যমে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ার ধারণা।
দলীয় সূত্র জানায়, নিয়োগ পাওয়া অনেক নেতাই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। কেউ মনোনয়ন পাননি, আবার কাউকে দলীয় সিদ্ধান্তে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে হয়েছিল। এবার তাদের বিকল্পভাবে মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান হয়েছেন বিএনপির বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক এবং রাজশাহীর সাবেক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) চেয়ারম্যান হয়েছেন দলের সহধর্মবিষয়ক সম্পাদক আবদুল বারী।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের (বিসিসিটি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন সহ-বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক কাজী রওনাকুল ইসলাম।
বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান হয়েছেন যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহসভাপতি জাকির হোসেন। বাংলাদেশ জুট করপোরেশনের চেয়ারম্যান করা হয়েছে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মামুন হাসানকে।
বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক হয়েছেন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কার্যকরী সভাপতি সালাহ্উদ্দিন সরকার।
বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ রাশেদুল হক।
জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের নির্বাহী সচিব করা হয়েছে যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মো. কামরুজ্জামানকে।
বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের চেয়ারম্যান হয়েছেন বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল খালেক। বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পেয়েছেন দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শামসুজ্জামান।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) চেয়ারম্যান হয়েছেন বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক বেনজীর আহমেদ।
এ ছাড়া নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে এক বছরের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সামসুল আলমকে।
কেন এই সিদ্ধান্ত
সরকার কেন প্রচলিত রীতি ভেঙে আমলাদের পরিবর্তে রাজনৈতিক নেতাদের এসব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব দিল এ নিয়ে প্রশাসন ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা চলছে।
বিএনপির একাধিক নেতা এবং প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সিদ্ধান্তটির পেছনে তিনটি প্রধান বিবেচনা রয়েছে।
প্রথমত, বিগত সরকারের সময় রাজপথে সক্রিয় থাকা কিন্তু নির্বাচনে মনোনয়ন না পাওয়া বা দলীয় সিদ্ধান্তে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো নেতাদের মূল্যায়ন করা।
দ্বিতীয়ত, সরকারের ধারণা অনুযায়ী প্রশাসনের ভেতরে সব গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত বিশ্বস্ত কর্মকর্তা নেই।
তৃতীয়ত, দীর্ঘদিন ধরে আমলাদের নেতৃত্বে পরিচালিত অনেক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা ও সাফল্য আসেনি বলে সরকারের মূল্যায়ন।
এ বিষয়ে জানতে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকার মনে করছে প্রশাসনে যে গতিশীলতা প্রত্যাশিত ছিল, তা অর্জিত হয়নি। পাশাপাশি আস্থাভাজন কর্মকর্তার সংকটও রয়েছে। সে কারণেই প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
দলীয়করণের আশঙ্কা
সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে সক্রিয় রাজনীতিবিদদের নিয়োগকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন না প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা।
তাদের মতে, এর ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাব, তদবির এবং দলীয়করণের প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।
একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাজশাহীর সাবেক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল এখন অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার একটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হয়েছেন। এতে প্রশাসনিক কাঠামো ও পদমর্যাদা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
প্রশাসনের কর্মকর্তারা আরও বলছেন, কোনো সরকারি কর্মকর্তা অনিয়ম করলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া, এমনকি পেনশন স্থগিত করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের জবাবদিহির কাঠামো কী হবে, তা স্পষ্ট নয়।
নিয়োগপ্রাপ্তদের বক্তব্য
বিসিকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া বেনজীর আহমেদ বলেন, দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও বিসিক তার সম্ভাবনা অনুযায়ী এগোতে পারেনি। দেশের বিভিন্ন শিল্পনগরীতে অনেক প্লট বরাদ্দ থাকলেও সেগুলোর যথাযথ ব্যবহার হয়নি। সরকার এখন বিসিককে কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে চায়, আর সে লক্ষ্যেই তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী রওনাকুল ইসলাম বলেন, সংস্থাটি দীর্ঘদিন ধরে কাঙ্ক্ষিতভাবে কাজ করতে পারেনি। তার ভাষ্য, অতীতে প্রশাসনিক নেতৃত্বে প্রয়োজনীয় উদ্যোগের ঘাটতি ছিল। তিনি দায়িত্ব নিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে আরও সক্রিয় ও জনমুখী করার চেষ্টা করবেন।
আইনে সুযোগ থাকলেও বিতর্ক রয়ে গেছে
এসব প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট আইন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সরকারকে চেয়ারম্যান বা প্রধান নির্বাহী নিয়োগের ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে বিসিক আইন, ২০১৩-এর ১২(২) ধারায় বলা হয়েছে, চেয়ারম্যান সরকার নিয়োগ দেবে এবং তিনিই করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। নৈতিক স্খলনের দায়ে দণ্ডিত, আদালত কর্তৃক দেউলিয়া ঘোষিত বা চাকরিচ্যুত ব্যক্তি ছাড়া অন্য যে কাউকে এই পদে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট, তাঁত বোর্ডসহ অন্যান্য সংস্থার আইনেও প্রায় একই ধরনের বিধান রয়েছে।
বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) সাবেক রেক্টর ও সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদারের মতে, আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে এই নিয়োগে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। কারণ আইন সরকারকে সেই ক্ষমতা দিয়েছে। তবে একসঙ্গে এত সংখ্যক রাজনৈতিক ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়ার নজির আগে দেখা যায়নি।
তবে বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন হলো, যদি উদ্দেশ্য হয় প্রতিষ্ঠানকে গতিশীল করা, তাহলে সংশ্লিষ্ট খাতে অভিজ্ঞতা ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের বিষয়টি কেন বাধ্যতামূলক করা হয়নি?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারের সাবেক এক অর্থসচিব বলেন, অতীতে আমলাদের নিয়োগের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষ দক্ষতার বিষয়টি সব সময় বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। এখন রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়োগের ক্ষেত্রেও কী বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেটি সরকারের বিষয়।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ আবদুল আউয়াল মজুমদারের মতে, এখন সময়ই বলে দেবে এই সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর হয়। তার ভাষায়, যদি নতুন দায়িত্বপ্রাপ্তরা দুর্নীতি কমাতে, কাজের গতি বাড়াতে এবং সরকারি অর্থের সাশ্রয় নিশ্চিত করতে পারেন, তাহলে সরকার এই মডেলের কার্যকারিতা মূল্যায়নের সুযোগ পাবে।

সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে দলীয় নেতাদের নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক
সিজেডএন ডেস্ক

দেশের ১১টি সরকারি সংস্থা, বোর্ড ও করপোরেশনের সর্বোচ্চ পদে এক বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন ক্ষমতাসীন বিএনপির একাধিক নেতা। একসঙ্গে এত সংখ্যক সক্রিয় রাজনীতিককে সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ দায়িত্বে বসানোর ঘটনা বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে বিরল বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আইন অনুযায়ী এসব প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহী পদে বাইরে থেকে কাউকে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের কোনো বাধা নেই। তবে দীর্ঘদিন ধরে এসব দায়িত্বে মূলত প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়াই প্রচলিত রীতি ছিল। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সরকারের আমলে এ ধরনের নিয়োগ ছিল সীমিত।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীতে রাজনীতিবিদদের এমন নিয়োগ থেকে উল্লেখযোগ্য সাফল্যের নজির খুব বেশি দেখা যায়নি। ফলে এবার নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিরা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়। একই সঙ্গে আইনে থাকা এই সুযোগ ভবিষ্যতে অপব্যবহারের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে কয়েকজন ইতোমধ্যে নিজ নিজ কর্মস্থলে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)সহ আরও কয়েকটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদেও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।
কারা দায়িত্ব পেলেন
গত বৃহস্পতিবার রাতে পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ১১টি সরকারি সংস্থা, বোর্ড ও করপোরেশনের শীর্ষ পদে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের এক বছরের চুক্তিতে নিয়োগ দেয়। তারা সবাই গ্রেড-২ মর্যাদায় দায়িত্ব পালন করবেন।
সরকারি ও দলীয় সূত্রগুলো বলছে, এই নিয়োগের পেছনে মূলত তিনটি কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থেকে বঞ্চিত হওয়া নেতাদের মূল্যায়ন করা। দ্বিতীয়ত, প্রশাসনের ভেতরে সরকারের আস্থাভাজন কর্মকর্তা না পাওয়া। তৃতীয়ত, এত দিন আমলাদের মাধ্যমে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ার ধারণা।
দলীয় সূত্র জানায়, নিয়োগ পাওয়া অনেক নেতাই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। কেউ মনোনয়ন পাননি, আবার কাউকে দলীয় সিদ্ধান্তে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে হয়েছিল। এবার তাদের বিকল্পভাবে মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান হয়েছেন বিএনপির বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক এবং রাজশাহীর সাবেক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) চেয়ারম্যান হয়েছেন দলের সহধর্মবিষয়ক সম্পাদক আবদুল বারী।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের (বিসিসিটি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন সহ-বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক কাজী রওনাকুল ইসলাম।
বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান হয়েছেন যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহসভাপতি জাকির হোসেন। বাংলাদেশ জুট করপোরেশনের চেয়ারম্যান করা হয়েছে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মামুন হাসানকে।
বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক হয়েছেন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কার্যকরী সভাপতি সালাহ্উদ্দিন সরকার।
বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ রাশেদুল হক।
জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের নির্বাহী সচিব করা হয়েছে যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মো. কামরুজ্জামানকে।
বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের চেয়ারম্যান হয়েছেন বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল খালেক। বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পেয়েছেন দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শামসুজ্জামান।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) চেয়ারম্যান হয়েছেন বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক বেনজীর আহমেদ।
এ ছাড়া নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে এক বছরের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সামসুল আলমকে।
কেন এই সিদ্ধান্ত
সরকার কেন প্রচলিত রীতি ভেঙে আমলাদের পরিবর্তে রাজনৈতিক নেতাদের এসব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব দিল এ নিয়ে প্রশাসন ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা চলছে।
বিএনপির একাধিক নেতা এবং প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সিদ্ধান্তটির পেছনে তিনটি প্রধান বিবেচনা রয়েছে।
প্রথমত, বিগত সরকারের সময় রাজপথে সক্রিয় থাকা কিন্তু নির্বাচনে মনোনয়ন না পাওয়া বা দলীয় সিদ্ধান্তে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো নেতাদের মূল্যায়ন করা।
দ্বিতীয়ত, সরকারের ধারণা অনুযায়ী প্রশাসনের ভেতরে সব গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত বিশ্বস্ত কর্মকর্তা নেই।
তৃতীয়ত, দীর্ঘদিন ধরে আমলাদের নেতৃত্বে পরিচালিত অনেক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা ও সাফল্য আসেনি বলে সরকারের মূল্যায়ন।
এ বিষয়ে জানতে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকার মনে করছে প্রশাসনে যে গতিশীলতা প্রত্যাশিত ছিল, তা অর্জিত হয়নি। পাশাপাশি আস্থাভাজন কর্মকর্তার সংকটও রয়েছে। সে কারণেই প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
দলীয়করণের আশঙ্কা
সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে সক্রিয় রাজনীতিবিদদের নিয়োগকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন না প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা।
তাদের মতে, এর ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাব, তদবির এবং দলীয়করণের প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।
একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাজশাহীর সাবেক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল এখন অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার একটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হয়েছেন। এতে প্রশাসনিক কাঠামো ও পদমর্যাদা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
প্রশাসনের কর্মকর্তারা আরও বলছেন, কোনো সরকারি কর্মকর্তা অনিয়ম করলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া, এমনকি পেনশন স্থগিত করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের জবাবদিহির কাঠামো কী হবে, তা স্পষ্ট নয়।
নিয়োগপ্রাপ্তদের বক্তব্য
বিসিকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া বেনজীর আহমেদ বলেন, দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও বিসিক তার সম্ভাবনা অনুযায়ী এগোতে পারেনি। দেশের বিভিন্ন শিল্পনগরীতে অনেক প্লট বরাদ্দ থাকলেও সেগুলোর যথাযথ ব্যবহার হয়নি। সরকার এখন বিসিককে কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে চায়, আর সে লক্ষ্যেই তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী রওনাকুল ইসলাম বলেন, সংস্থাটি দীর্ঘদিন ধরে কাঙ্ক্ষিতভাবে কাজ করতে পারেনি। তার ভাষ্য, অতীতে প্রশাসনিক নেতৃত্বে প্রয়োজনীয় উদ্যোগের ঘাটতি ছিল। তিনি দায়িত্ব নিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে আরও সক্রিয় ও জনমুখী করার চেষ্টা করবেন।
আইনে সুযোগ থাকলেও বিতর্ক রয়ে গেছে
এসব প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট আইন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সরকারকে চেয়ারম্যান বা প্রধান নির্বাহী নিয়োগের ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে বিসিক আইন, ২০১৩-এর ১২(২) ধারায় বলা হয়েছে, চেয়ারম্যান সরকার নিয়োগ দেবে এবং তিনিই করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। নৈতিক স্খলনের দায়ে দণ্ডিত, আদালত কর্তৃক দেউলিয়া ঘোষিত বা চাকরিচ্যুত ব্যক্তি ছাড়া অন্য যে কাউকে এই পদে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট, তাঁত বোর্ডসহ অন্যান্য সংস্থার আইনেও প্রায় একই ধরনের বিধান রয়েছে।
বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) সাবেক রেক্টর ও সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদারের মতে, আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে এই নিয়োগে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। কারণ আইন সরকারকে সেই ক্ষমতা দিয়েছে। তবে একসঙ্গে এত সংখ্যক রাজনৈতিক ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়ার নজির আগে দেখা যায়নি।
তবে বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন হলো, যদি উদ্দেশ্য হয় প্রতিষ্ঠানকে গতিশীল করা, তাহলে সংশ্লিষ্ট খাতে অভিজ্ঞতা ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের বিষয়টি কেন বাধ্যতামূলক করা হয়নি?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারের সাবেক এক অর্থসচিব বলেন, অতীতে আমলাদের নিয়োগের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষ দক্ষতার বিষয়টি সব সময় বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। এখন রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়োগের ক্ষেত্রেও কী বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেটি সরকারের বিষয়।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ আবদুল আউয়াল মজুমদারের মতে, এখন সময়ই বলে দেবে এই সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর হয়। তার ভাষায়, যদি নতুন দায়িত্বপ্রাপ্তরা দুর্নীতি কমাতে, কাজের গতি বাড়াতে এবং সরকারি অর্থের সাশ্রয় নিশ্চিত করতে পারেন, তাহলে সরকার এই মডেলের কার্যকারিতা মূল্যায়নের সুযোগ পাবে।








