শিরোনাম

ইলিশ কেনা এখন স্বপ্নের বিষয়

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
ইলিশ কেনা এখন স্বপ্নের বিষয়
ইলিশ মাছ

ঢাকা শহরের সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর জন্য ইলিশ কেনা স্বপ্নের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ৫ বছরের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি দামে এখন ইলিশ বিক্রি হচ্ছে। অনেক মানুষ বাজারে এসে ইলিশ দেখেন, দাম করেন পরে অন্য মাছ কিনে বাড়ি ফেরেন। সংশ্লিষ্ট বিক্রেতারা ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ায় সরবরাহ ঘাটতি ও ইলিশ ধরার খরচ বেড়ে যাওয়াকে দায়ী করছেন।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে জানা গেছে, ৪ থেকে ৫টি মিলে এক কেজি হয় এমন মাছের দাম এখন ৮শ থেকে ৯শ টাকা। ৩টিতে এক কেজি হয় এ ধরনের প্রতি কেজি মাছ মানভেদে ১২শ থেকে ১৪শ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আধা কেজি বা এর কাছাকাছি ওজনের ইলিশের দাম হাঁকা হচ্ছে ১৪শ থেকে ১৮শ টাকা।

এছাড়া ৭শ থেকে ৯শ গ্রাম ওজনের মাছ প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮৫০ টাকা থেকে ২২শ টাকায়। এক কেজি বা এর কাছাকাছি ওজনের মাছ বিক্রি করতে দেখা গেছে ২ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ২ হাজার ৫শ টাকায় বা তারও বেশি দামে।

এক থেকে দেড় কেজি ওজনের ইলিশ ২ হাজার ৬০০ থেকে ৩ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেড় কেজির বেশি ওজনের ইলিশের দাম কোথাও ৩ হাজার ৫০০ থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে। নদী বা সাগরের মাছ এবং মাছের রঙের ওপরও দামের পার্থক্য হচ্ছে।

নদীর ইলিশের স্বাদের জন্য চাঁদপুর দেশজুড়ে পরিচিত। এ পরিচয়ে চড়া দামে অনেকেই ঢাকার ইলিশ বিক্রি করেন। চাঁদপুরের জেলেরাও এখন আশা অনুযায়ী ইলিশ না পেয়ে হতাশ।

ইলিশের সংকটের প্রভাব পড়েছে দেশের অন্যতম বড় পাইকারি বাজার চাঁদপুর বড় স্টেশন মাছঘাটেও। যেখানে মৌসুমে দিন-রাত বেচাবিক্রির ধুম লেগে থাকে সেখানে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়। সরবরাহ কম থাকায় দাম বেড়েছে।

বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ২০২০-২১ সালে ইলিশের সর্বনিম্ন গড় দাম ছিল ৯শ টাকা এবং সর্বোচ্চ দাম ছিল ১ হাজার ৪শ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দাম ছিল ৭৫০ থেকে ১৮শ টাকা। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ৯শ টাকা থেকে ২২শ টাকায় ইলিশ বিক্রি হয়েছে।

গবেষকরা বলছেন, জলবায়ুর পরিবর্তন, নদীদূষণ, নাব্যর সংকট এবং অতিরিক্ত মাছ আহরণের কারণে উৎপাদনে প্রভাব পড়েছে। গত দুই বছর সামগ্রিক উৎপাদন কমেছে, ইলিশের গড় আকারও ছোট হয়ে গেছে। এক সময় ইলিশের গড় আকার ছিল ৪০০ থেকে ৪৫০ গ্রাম, যা এখন ৩০০ থেকে সাড়ে ৩৫০ গ্রামে দাঁড়িয়েছে।

কমিশন জানিয়েছে, সাধারণত ৪ থেকে ৬ হাত বদলে ইলিশ মাছ খুচরা গ্রাহকের কাছে পৌঁছায়। প্রতিটি ধাপে মাছের দাম ৫৯ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। মাছ ধরার খরচ বেড়ে যাওয়া, হিমাগারে সংরক্ষণ করে চড়া দামে বিক্রি করা, রপ্তানির অনুমতি এবং নদীর মোহনায় ইলিশের পরিমাণ দুই-তৃতীয়াংশ কমে যাওয়ায় ইলিশের দাম বাড়ছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন ছিল ৫ লাখ ৬৫ হাজার টন। ২০২১-২২-এ উৎপাদন দাঁড়ায় ৬ লাখ ৬৭ হাজার টনে। ২০২২-২৩-এ উৎপাদন দাঁড়ায় ৫ লাখ ৭১ হাজার টনে। এরপর কমতে শুরু করে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ৫ লাখ ২৯ হাজার টনে। পরের অর্থবছরে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৪ হাজার টনে। সদ্যবিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আনুষ্ঠানিক হিসাব প্রকাশ না করলেও ধারণা করা হচ্ছে এটা ৫ লাখ টনের নিচে নামবে।

গবেষকরা বলছেন, জলবায়ুর পরিবর্তন, নদীদূষণ, নাব্যর সংকট এবং অতিরিক্ত মাছ আহরণের কারণে উৎপাদনে প্রভাব পড়েছে। গত দুই বছর সামগ্রিক উৎপাদন কমেছে, ইলিশের গড় আকারও ছোট হয়ে গেছে। এক সময় ইলিশের গড় আকার ছিল ৪০০ থেকে ৪৫০ গ্রাম, যা এখন ৩০০ থেকে সাড়ে ৩৫০ গ্রামে দাঁড়িয়েছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ডিম ছাড়ার মৌসুমে সাগর থেকে নদীপথে উজানে উঠে আসে মা ইলিশ। ডিম ছেড়ে আবার ফিরে যায় সাগরে। সাগর থেকে নদী, আর নদী থেকে সাগরে ইলিশের চলাচলের পথ (মাইগ্রেটরি রুট) পলি জমে ভরাট হচ্ছে। সেখানে সৃষ্টি হচ্ছে ডুবোচর। ইলিশ আর উজানে এগোতে পারছে না। এতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে ইলিশের প্রজনন।

জানা গেছে, ইলিশের জীবনচক্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নদীর বুকে জেগে ওঠা অন্তত ২৫টি চর। চাঁদপুরের মেঘনা-তেঁতুলিয়া নদীর মোহনায় তৈরি হওয়া এসব চরে প্রায় ৮৮ কোটি টন পলি জমেছে। নদীর গভীরতা ৫ থেকে ১০ মিটার (১৫ থেকে ৩০ ফুট) থাকার কথা থাকলেও পলি জমার কারণে তা কমে ২ থেকে ৩ মিটার হয়েছে।

বরিশাল বিভাগের সঙ্গে সরাসরি বঙ্গোপসাগরে যুক্ত ৯টি প্রধান মোহনা মেঘনা, তেঁতুলিয়া, ভোলা, পটুয়াখালী, আন্ধারমানিক, পায়রা, বিষখালী, গলাচিপা ও বলেশ্বর নদের তলদেশে পলি জমে চ্যানেলগুলো ভরাট হয়ে গেছে। গত ৩ বছরেই এই অঞ্চলে অন্তত ১ লাখ টন ইলিশ উৎপাদন কমে গেছে।

চাঁদপুরের জেলে, আড়তদার ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি বছরই ইলিশের উৎপাদন কমছে। এবারে সরবরাহ একেবারেই কম। চট্টগ্রামের জেলেরা জানান, কোথাও দুই-এক কেজি, কোথাও পাঁচ-ছয় কেজি ইলিশ মিললেও তা দিয়ে জ্বালানি, বরফ, শ্রমিকের মজুরিসহ অন্যান্য খরচ উঠছে না। ফলে হতাশা আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন উপকূলের শত শত মৎস্যজীবী।

তারা জানান, মৌসুম শুরুর আগে অনেকেই ব্যাংক, এনজিও কিংবা স্থানীয় মহাজনের কাছ থেকে ঋণ ও দাদন নিয়ে জাল, নৌকা ও মাছধরার সরঞ্জাম প্রস্তুত করেছেন। ভালো ইলিশের আশায় নেওয়া সেই ঋণ এখন তাদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

/এফসি/