গভীর সংকটে দেশের অর্থনীতি, বিশ্বব্যাংকের সতর্কতা

গভীর সংকটে দেশের অর্থনীতি, বিশ্বব্যাংকের সতর্কতা
মরিয়ম সেঁজুতি

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা– এই দ্বিমুখী চাপে দেশের প্রবৃদ্ধি শ্লথ হয়ে পড়েছে। যুদ্ধের কারণে এ বছর বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ গরিব মানুষ বাড়তে পারে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে তাদের প্রকৃত আয় কমতে পারে। তারা দারিদ্র্য সীমার ওপরে উঠতে পারবে না।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক চিত্র। প্রতিবেদনটি প্রকাশ উপলক্ষে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ে আজ সকালে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা।
সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, অবিলম্বে সাহসী সংস্কার পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে। এ ছাড়া বিশ্বব্যাংক বলছে, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছর বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতিসহ নানা কারণে দারিদ্র্য বাড়ছে। ২০২২ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২১ দশমিক ৪ শতাংশে। ২০২৫ সালে নতুন করে ১৪ লাখ মানুষ গরিব হয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের আগে ধারণা করা হয়েছিল চলতি বছর ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে ওঠবেন, কিন্তু যুদ্ধের কারণে মাত্র ৫ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে ওঠতে পারেন। এর মানে, এ বছর প্রায় ১২ লাখ মানুষ গরিব থেকে যাবেন। বিশ্বব্যাংক বলছে, যুদ্ধ পরিস্থিতি না থাকলে ২০২৮ সাল নাগাদ দারিদ্র্যের হার ১৯ দশমিক ৩ শতাংশে নামতে পারে।
প্রতিবেদনে দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়ার কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি, শ্রমের কম মজুরি, কর্মসংস্থানের গতি যাওয়া। এ ছাড়া বৈষম্য বাড়বে, এমন পূর্বাভাসও দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। বিশ্বব্যাংকের মতে, ইরান যুদ্ধের কারণে এ বছর দারিদ্র্যের হার কমবে মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। প্রতিবছর গড়ে ১ শতাংশের বেশি হারে দারিদ্র্য কমে।
বিশ্বব্যাংকের ডিভিশন ডিরেক্টর (বাংলাদেশ ও ভুটান) জ্যঁ পেম বলেন, বাংলাদেশে কাঙ্খিত রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কের কারণে বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া কয়েক বছর ধরে দারিদ্র্য কমার গতি কমেছে। তার মতে, শোভন কর্মসংস্থানের জন্য বিনিয়োগ পরিবেশ সহজ করা দরকার।
জ্যঁ পেম বলেন, বিগত দিনে প্রয়োজনীয় যেসব সংস্কারের উদ্যোগ শুরু হয়েছে। এই সংস্কার যেন অব্যাহত থাকে। যদিও সংস্কার খুব কঠিন হবে। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে দ্রুত স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব ৬ খাতে
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশের অন্তত ছয়টি খাতে পড়তে পারে। প্রথমত, চলতি হিসাবের ভারসাম্যের স্থিতিশীলতা নস্ট হতে পারে। কারণ, আমদানি-রপ্তানি, প্রবাসী আয়, টাকার অবমূল্যায়নে প্রভাব পড়তে পারে। দ্বিতীয়ত, ভোগব্যয় ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাবের কারণে জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে টান পড়তে পারে। তৃতীয়ত, জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহনের খরচ বেড়ে গেলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। চতুর্থ, ১২ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্য সীমার নিচে নেমে যেতে পারেন। পঞ্চমত, আর্থিক চাপ বাড়তে পারে। যেমন সার ও জ্বালানিতে ভর্তুকি খরচ বৃদ্ধি এবং সবশেষ, বৈষম্য বাড়তে পারে। ২০২৬ সালে গিনি সূচক দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে।
প্রবৃদ্ধিতে টান, বাড়ছে দারিদ্র্য
বুধবার (৮ এপ্রিল) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, চলতি ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৩.৯ শতাংশে নামতে পারে। এর আগে টানা তিন বছর ধরে প্রবৃদ্ধি ধীরগতিতে চলছে।
সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি। প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০২২ সালে যেখানে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮.৭ শতাংশ, ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১.৪ শতাংশে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে গত তিন বছরে নতুন করে প্রায় ১৪ লক্ষ মানুষ দরিদ্র হয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের মজুরি দ্রব্যমূল্যের সাথে পাল্লা দিতে না পারায় তাদের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের ক্ষত ও রাজস্ব সংকট
দেশের আর্থিক খাতের নাজুক অবস্থা নিয়ে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩০.৬ শতাংশ, যা ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এছাড়া বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততা ন্যূনতম সীমার নিচে নেমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি মোকাবিলার ক্ষমতা কমে গেছে।
২০২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত প্রথমবারের মতো ৭ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন এই রাজস্ব আয় সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও জনসেবায় বিনিয়োগের ক্ষমতাকে পঙ্গু করে দিচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্য সংকটের ছায়া
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় ‘হেডউইন্ড’ বা প্রতিকূল বাতাস হিসেবে কাজ করছে। জ্বালানির দাম বাড়লে একদিকে যেমন মূল্যস্ফীতি বাড়বে, অন্যদিকে সরকারকে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হবে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ আরও বাড়বে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা দীর্ঘদিনের গল্পের অংশ। কিন্তু রাজস্ব আদায় এবং আর্থিক খাতে বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই স্থিতিস্থাপকতা আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপট
আঞ্চলিকভাবেও প্রবৃদ্ধি কিছুটা শ্লথ হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার গড় প্রবৃদ্ধি ২০২৫ সালে ৭ শতাংশ থেকে কমে ২০২৬ সালে ৬.৩ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। তবে বিশ্বব্যাংক মনে করে, ভারত ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলো যদি সময়োচিত নীতি সংস্কার করতে পারে, তবে ২০২৭ সাল নাগাদ আবার প্রবৃদ্ধি ঘুরে দাঁড়াবে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো—একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা যা কেবল বড় ব্যবসায়ীদের নয়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক হবে।
জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৩.৯ শতাংশ
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছর বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এর আগে জানুয়ারি মাসে বিশ্বব্যাংক বলেছিল, চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে। এখন ইরান যুদ্ধের কারণে সেই পূর্বাভাস আরও কমানো হলো।
বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির হার ঠিক করেছে সাড়ে ৫ শতাংশ। নতুন সরকার অবশ্য এখনো জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সংশোধন করেনি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল।
মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে
বিশ্বব্যাংক বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং আমদানি খরচ বাড়তে পারে। এতে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে বলে আশংকা করা হচ্ছে। এখনো এ দেশে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৮ শতাংশের মতো, যা সীমিত আয়ের মানুষকে ভোগাচ্ছে।
বিশ্বব্যাংক মনে করে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সীমিত, রাজস্ব ও মুদ্রানীতি কঠোর এবং ব্যাংক খাত ভঙ্গুর থাকায় দীর্ঘস্থায়ী ধাক্কা মোকাবিলার সক্ষমতা বাংলাদেশের কম। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর।
২০২৬ সালের নির্বাচনের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে এবং কাঠামোগত সংস্কারে দ্রুত অগ্রগতি হলে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার সম্ভব বলে মনে করছে সংস্থাটি। সামষ্টিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, রাজস্ব বাড়ানো, আর্থিক খাত শক্তিশালী করা এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে জরুরি সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সংস্কারে মনোযোগ
বিশ্বব্যাংক সংস্কারে মনোযোগ দিতে বলেছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে স্বল্পমেয়াদে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সংস্কার করতে হবে। কাঠামোগত সংস্কারের ভিত্তি তৈরি করতে হবে। নতুন শোভন কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে।
যেসব সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে, তা হলো সামষ্টিক অর্থনীতির মৌলিক বিষয়গুলো শক্তিশালী করা। যখন আমদানি খরচ বেড়ে যায়, তখন ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া উচিত। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি দিয়ে চাহিদার বিষয়টি নজরে রাখতে হবে। আবার পর্যাপ্ত সরবরাহ, দুর্নীতি প্রতিরোধের মাধ্যমে সরবরাহের দিকটি ঠিক রাখতে হবে। ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তৈরি পোশাকসহ কিছু বড় রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা উচ্চ ব্যয়, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং অর্থায়নের সীমাবদ্ধতায় ভুগছেন। বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে লক্ষ্যভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ শিথিল, প্রতিযোগিতা নীতি জোরদার, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সমতা নিশ্চিত, বাণিজ্যনীতি সহজ করা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানো জরুরি।
বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা বলেন, দ্রুত বাড়তে থাকা কর্মশক্তিকে কাজে লাগাতে এবং প্রবৃদ্ধি টেকসই রাখতে ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মনীতির অনিশ্চয়তা কমানো, প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং উদ্যোক্তাদের বাধা দূর করা গেলে বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা– এই দ্বিমুখী চাপে দেশের প্রবৃদ্ধি শ্লথ হয়ে পড়েছে। যুদ্ধের কারণে এ বছর বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ গরিব মানুষ বাড়তে পারে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে তাদের প্রকৃত আয় কমতে পারে। তারা দারিদ্র্য সীমার ওপরে উঠতে পারবে না।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক চিত্র। প্রতিবেদনটি প্রকাশ উপলক্ষে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ে আজ সকালে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা।
সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, অবিলম্বে সাহসী সংস্কার পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে। এ ছাড়া বিশ্বব্যাংক বলছে, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছর বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতিসহ নানা কারণে দারিদ্র্য বাড়ছে। ২০২২ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২১ দশমিক ৪ শতাংশে। ২০২৫ সালে নতুন করে ১৪ লাখ মানুষ গরিব হয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের আগে ধারণা করা হয়েছিল চলতি বছর ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে ওঠবেন, কিন্তু যুদ্ধের কারণে মাত্র ৫ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে ওঠতে পারেন। এর মানে, এ বছর প্রায় ১২ লাখ মানুষ গরিব থেকে যাবেন। বিশ্বব্যাংক বলছে, যুদ্ধ পরিস্থিতি না থাকলে ২০২৮ সাল নাগাদ দারিদ্র্যের হার ১৯ দশমিক ৩ শতাংশে নামতে পারে।
প্রতিবেদনে দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়ার কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি, শ্রমের কম মজুরি, কর্মসংস্থানের গতি যাওয়া। এ ছাড়া বৈষম্য বাড়বে, এমন পূর্বাভাসও দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। বিশ্বব্যাংকের মতে, ইরান যুদ্ধের কারণে এ বছর দারিদ্র্যের হার কমবে মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। প্রতিবছর গড়ে ১ শতাংশের বেশি হারে দারিদ্র্য কমে।
বিশ্বব্যাংকের ডিভিশন ডিরেক্টর (বাংলাদেশ ও ভুটান) জ্যঁ পেম বলেন, বাংলাদেশে কাঙ্খিত রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কের কারণে বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া কয়েক বছর ধরে দারিদ্র্য কমার গতি কমেছে। তার মতে, শোভন কর্মসংস্থানের জন্য বিনিয়োগ পরিবেশ সহজ করা দরকার।
জ্যঁ পেম বলেন, বিগত দিনে প্রয়োজনীয় যেসব সংস্কারের উদ্যোগ শুরু হয়েছে। এই সংস্কার যেন অব্যাহত থাকে। যদিও সংস্কার খুব কঠিন হবে। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে দ্রুত স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব ৬ খাতে
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশের অন্তত ছয়টি খাতে পড়তে পারে। প্রথমত, চলতি হিসাবের ভারসাম্যের স্থিতিশীলতা নস্ট হতে পারে। কারণ, আমদানি-রপ্তানি, প্রবাসী আয়, টাকার অবমূল্যায়নে প্রভাব পড়তে পারে। দ্বিতীয়ত, ভোগব্যয় ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাবের কারণে জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে টান পড়তে পারে। তৃতীয়ত, জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহনের খরচ বেড়ে গেলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। চতুর্থ, ১২ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্য সীমার নিচে নেমে যেতে পারেন। পঞ্চমত, আর্থিক চাপ বাড়তে পারে। যেমন সার ও জ্বালানিতে ভর্তুকি খরচ বৃদ্ধি এবং সবশেষ, বৈষম্য বাড়তে পারে। ২০২৬ সালে গিনি সূচক দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে।
প্রবৃদ্ধিতে টান, বাড়ছে দারিদ্র্য
বুধবার (৮ এপ্রিল) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, চলতি ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৩.৯ শতাংশে নামতে পারে। এর আগে টানা তিন বছর ধরে প্রবৃদ্ধি ধীরগতিতে চলছে।
সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি। প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০২২ সালে যেখানে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮.৭ শতাংশ, ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১.৪ শতাংশে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে গত তিন বছরে নতুন করে প্রায় ১৪ লক্ষ মানুষ দরিদ্র হয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের মজুরি দ্রব্যমূল্যের সাথে পাল্লা দিতে না পারায় তাদের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের ক্ষত ও রাজস্ব সংকট
দেশের আর্থিক খাতের নাজুক অবস্থা নিয়ে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩০.৬ শতাংশ, যা ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এছাড়া বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততা ন্যূনতম সীমার নিচে নেমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি মোকাবিলার ক্ষমতা কমে গেছে।
২০২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত প্রথমবারের মতো ৭ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন এই রাজস্ব আয় সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও জনসেবায় বিনিয়োগের ক্ষমতাকে পঙ্গু করে দিচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্য সংকটের ছায়া
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় ‘হেডউইন্ড’ বা প্রতিকূল বাতাস হিসেবে কাজ করছে। জ্বালানির দাম বাড়লে একদিকে যেমন মূল্যস্ফীতি বাড়বে, অন্যদিকে সরকারকে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হবে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ আরও বাড়বে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা দীর্ঘদিনের গল্পের অংশ। কিন্তু রাজস্ব আদায় এবং আর্থিক খাতে বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই স্থিতিস্থাপকতা আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপট
আঞ্চলিকভাবেও প্রবৃদ্ধি কিছুটা শ্লথ হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার গড় প্রবৃদ্ধি ২০২৫ সালে ৭ শতাংশ থেকে কমে ২০২৬ সালে ৬.৩ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। তবে বিশ্বব্যাংক মনে করে, ভারত ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলো যদি সময়োচিত নীতি সংস্কার করতে পারে, তবে ২০২৭ সাল নাগাদ আবার প্রবৃদ্ধি ঘুরে দাঁড়াবে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো—একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা যা কেবল বড় ব্যবসায়ীদের নয়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক হবে।
জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৩.৯ শতাংশ
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছর বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এর আগে জানুয়ারি মাসে বিশ্বব্যাংক বলেছিল, চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে। এখন ইরান যুদ্ধের কারণে সেই পূর্বাভাস আরও কমানো হলো।
বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির হার ঠিক করেছে সাড়ে ৫ শতাংশ। নতুন সরকার অবশ্য এখনো জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সংশোধন করেনি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল।
মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে
বিশ্বব্যাংক বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং আমদানি খরচ বাড়তে পারে। এতে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে বলে আশংকা করা হচ্ছে। এখনো এ দেশে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৮ শতাংশের মতো, যা সীমিত আয়ের মানুষকে ভোগাচ্ছে।
বিশ্বব্যাংক মনে করে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সীমিত, রাজস্ব ও মুদ্রানীতি কঠোর এবং ব্যাংক খাত ভঙ্গুর থাকায় দীর্ঘস্থায়ী ধাক্কা মোকাবিলার সক্ষমতা বাংলাদেশের কম। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর।
২০২৬ সালের নির্বাচনের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে এবং কাঠামোগত সংস্কারে দ্রুত অগ্রগতি হলে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার সম্ভব বলে মনে করছে সংস্থাটি। সামষ্টিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, রাজস্ব বাড়ানো, আর্থিক খাত শক্তিশালী করা এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে জরুরি সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সংস্কারে মনোযোগ
বিশ্বব্যাংক সংস্কারে মনোযোগ দিতে বলেছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে স্বল্পমেয়াদে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সংস্কার করতে হবে। কাঠামোগত সংস্কারের ভিত্তি তৈরি করতে হবে। নতুন শোভন কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে।
যেসব সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে, তা হলো সামষ্টিক অর্থনীতির মৌলিক বিষয়গুলো শক্তিশালী করা। যখন আমদানি খরচ বেড়ে যায়, তখন ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া উচিত। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি দিয়ে চাহিদার বিষয়টি নজরে রাখতে হবে। আবার পর্যাপ্ত সরবরাহ, দুর্নীতি প্রতিরোধের মাধ্যমে সরবরাহের দিকটি ঠিক রাখতে হবে। ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তৈরি পোশাকসহ কিছু বড় রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা উচ্চ ব্যয়, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং অর্থায়নের সীমাবদ্ধতায় ভুগছেন। বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে লক্ষ্যভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ শিথিল, প্রতিযোগিতা নীতি জোরদার, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সমতা নিশ্চিত, বাণিজ্যনীতি সহজ করা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানো জরুরি।
বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা বলেন, দ্রুত বাড়তে থাকা কর্মশক্তিকে কাজে লাগাতে এবং প্রবৃদ্ধি টেকসই রাখতে ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মনীতির অনিশ্চয়তা কমানো, প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং উদ্যোক্তাদের বাধা দূর করা গেলে বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে।

গভীর সংকটে দেশের অর্থনীতি, বিশ্বব্যাংকের সতর্কতা
মরিয়ম সেঁজুতি

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা– এই দ্বিমুখী চাপে দেশের প্রবৃদ্ধি শ্লথ হয়ে পড়েছে। যুদ্ধের কারণে এ বছর বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ গরিব মানুষ বাড়তে পারে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে তাদের প্রকৃত আয় কমতে পারে। তারা দারিদ্র্য সীমার ওপরে উঠতে পারবে না।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক চিত্র। প্রতিবেদনটি প্রকাশ উপলক্ষে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ে আজ সকালে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা।
সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, অবিলম্বে সাহসী সংস্কার পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে। এ ছাড়া বিশ্বব্যাংক বলছে, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছর বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতিসহ নানা কারণে দারিদ্র্য বাড়ছে। ২০২২ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২১ দশমিক ৪ শতাংশে। ২০২৫ সালে নতুন করে ১৪ লাখ মানুষ গরিব হয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের আগে ধারণা করা হয়েছিল চলতি বছর ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে ওঠবেন, কিন্তু যুদ্ধের কারণে মাত্র ৫ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে ওঠতে পারেন। এর মানে, এ বছর প্রায় ১২ লাখ মানুষ গরিব থেকে যাবেন। বিশ্বব্যাংক বলছে, যুদ্ধ পরিস্থিতি না থাকলে ২০২৮ সাল নাগাদ দারিদ্র্যের হার ১৯ দশমিক ৩ শতাংশে নামতে পারে।
প্রতিবেদনে দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়ার কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি, শ্রমের কম মজুরি, কর্মসংস্থানের গতি যাওয়া। এ ছাড়া বৈষম্য বাড়বে, এমন পূর্বাভাসও দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। বিশ্বব্যাংকের মতে, ইরান যুদ্ধের কারণে এ বছর দারিদ্র্যের হার কমবে মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। প্রতিবছর গড়ে ১ শতাংশের বেশি হারে দারিদ্র্য কমে।
বিশ্বব্যাংকের ডিভিশন ডিরেক্টর (বাংলাদেশ ও ভুটান) জ্যঁ পেম বলেন, বাংলাদেশে কাঙ্খিত রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কের কারণে বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া কয়েক বছর ধরে দারিদ্র্য কমার গতি কমেছে। তার মতে, শোভন কর্মসংস্থানের জন্য বিনিয়োগ পরিবেশ সহজ করা দরকার।
জ্যঁ পেম বলেন, বিগত দিনে প্রয়োজনীয় যেসব সংস্কারের উদ্যোগ শুরু হয়েছে। এই সংস্কার যেন অব্যাহত থাকে। যদিও সংস্কার খুব কঠিন হবে। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে দ্রুত স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব ৬ খাতে
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশের অন্তত ছয়টি খাতে পড়তে পারে। প্রথমত, চলতি হিসাবের ভারসাম্যের স্থিতিশীলতা নস্ট হতে পারে। কারণ, আমদানি-রপ্তানি, প্রবাসী আয়, টাকার অবমূল্যায়নে প্রভাব পড়তে পারে। দ্বিতীয়ত, ভোগব্যয় ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাবের কারণে জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে টান পড়তে পারে। তৃতীয়ত, জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহনের খরচ বেড়ে গেলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। চতুর্থ, ১২ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্য সীমার নিচে নেমে যেতে পারেন। পঞ্চমত, আর্থিক চাপ বাড়তে পারে। যেমন সার ও জ্বালানিতে ভর্তুকি খরচ বৃদ্ধি এবং সবশেষ, বৈষম্য বাড়তে পারে। ২০২৬ সালে গিনি সূচক দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে।
প্রবৃদ্ধিতে টান, বাড়ছে দারিদ্র্য
বুধবার (৮ এপ্রিল) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, চলতি ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৩.৯ শতাংশে নামতে পারে। এর আগে টানা তিন বছর ধরে প্রবৃদ্ধি ধীরগতিতে চলছে।
সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি। প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০২২ সালে যেখানে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮.৭ শতাংশ, ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১.৪ শতাংশে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে গত তিন বছরে নতুন করে প্রায় ১৪ লক্ষ মানুষ দরিদ্র হয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের মজুরি দ্রব্যমূল্যের সাথে পাল্লা দিতে না পারায় তাদের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের ক্ষত ও রাজস্ব সংকট
দেশের আর্থিক খাতের নাজুক অবস্থা নিয়ে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩০.৬ শতাংশ, যা ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এছাড়া বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততা ন্যূনতম সীমার নিচে নেমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি মোকাবিলার ক্ষমতা কমে গেছে।
২০২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত প্রথমবারের মতো ৭ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন এই রাজস্ব আয় সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও জনসেবায় বিনিয়োগের ক্ষমতাকে পঙ্গু করে দিচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্য সংকটের ছায়া
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় ‘হেডউইন্ড’ বা প্রতিকূল বাতাস হিসেবে কাজ করছে। জ্বালানির দাম বাড়লে একদিকে যেমন মূল্যস্ফীতি বাড়বে, অন্যদিকে সরকারকে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হবে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ আরও বাড়বে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা দীর্ঘদিনের গল্পের অংশ। কিন্তু রাজস্ব আদায় এবং আর্থিক খাতে বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই স্থিতিস্থাপকতা আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপট
আঞ্চলিকভাবেও প্রবৃদ্ধি কিছুটা শ্লথ হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার গড় প্রবৃদ্ধি ২০২৫ সালে ৭ শতাংশ থেকে কমে ২০২৬ সালে ৬.৩ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। তবে বিশ্বব্যাংক মনে করে, ভারত ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলো যদি সময়োচিত নীতি সংস্কার করতে পারে, তবে ২০২৭ সাল নাগাদ আবার প্রবৃদ্ধি ঘুরে দাঁড়াবে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো—একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা যা কেবল বড় ব্যবসায়ীদের নয়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক হবে।
জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৩.৯ শতাংশ
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছর বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এর আগে জানুয়ারি মাসে বিশ্বব্যাংক বলেছিল, চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে। এখন ইরান যুদ্ধের কারণে সেই পূর্বাভাস আরও কমানো হলো।
বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির হার ঠিক করেছে সাড়ে ৫ শতাংশ। নতুন সরকার অবশ্য এখনো জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সংশোধন করেনি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল।
মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে
বিশ্বব্যাংক বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং আমদানি খরচ বাড়তে পারে। এতে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে বলে আশংকা করা হচ্ছে। এখনো এ দেশে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৮ শতাংশের মতো, যা সীমিত আয়ের মানুষকে ভোগাচ্ছে।
বিশ্বব্যাংক মনে করে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সীমিত, রাজস্ব ও মুদ্রানীতি কঠোর এবং ব্যাংক খাত ভঙ্গুর থাকায় দীর্ঘস্থায়ী ধাক্কা মোকাবিলার সক্ষমতা বাংলাদেশের কম। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর।
২০২৬ সালের নির্বাচনের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে এবং কাঠামোগত সংস্কারে দ্রুত অগ্রগতি হলে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার সম্ভব বলে মনে করছে সংস্থাটি। সামষ্টিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, রাজস্ব বাড়ানো, আর্থিক খাত শক্তিশালী করা এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে জরুরি সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সংস্কারে মনোযোগ
বিশ্বব্যাংক সংস্কারে মনোযোগ দিতে বলেছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে স্বল্পমেয়াদে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সংস্কার করতে হবে। কাঠামোগত সংস্কারের ভিত্তি তৈরি করতে হবে। নতুন শোভন কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে।
যেসব সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে, তা হলো সামষ্টিক অর্থনীতির মৌলিক বিষয়গুলো শক্তিশালী করা। যখন আমদানি খরচ বেড়ে যায়, তখন ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া উচিত। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি দিয়ে চাহিদার বিষয়টি নজরে রাখতে হবে। আবার পর্যাপ্ত সরবরাহ, দুর্নীতি প্রতিরোধের মাধ্যমে সরবরাহের দিকটি ঠিক রাখতে হবে। ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তৈরি পোশাকসহ কিছু বড় রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা উচ্চ ব্যয়, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং অর্থায়নের সীমাবদ্ধতায় ভুগছেন। বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে লক্ষ্যভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ শিথিল, প্রতিযোগিতা নীতি জোরদার, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সমতা নিশ্চিত, বাণিজ্যনীতি সহজ করা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানো জরুরি।
বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা বলেন, দ্রুত বাড়তে থাকা কর্মশক্তিকে কাজে লাগাতে এবং প্রবৃদ্ধি টেকসই রাখতে ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মনীতির অনিশ্চয়তা কমানো, প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং উদ্যোক্তাদের বাধা দূর করা গেলে বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে।




