মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ও বাণিজ্য ঘাটতিতে সংকটে অর্থনীতি

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ও বাণিজ্য ঘাটতিতে সংকটে অর্থনীতি
মরিয়ম সেঁজুতি

আমদানি ও রপ্তানিতে বড় ধরনের ব্যবধানে বেড়েছে বাণিজ্য ঘাটতি। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যে চলা যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাবে দেশের অর্থনীতি এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাবে নিত্যপণ্যের দামের সঙ্গে বেড়ে গেছে যানবাহনের ভাড়া। এতে সাধারন মানুষের অস্বস্তি ও ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হ্রাস এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি দ্রুত বাড়ছে। যদিও রেমিট্যান্স প্রবাহ ভালো থাকায় সাময়িকভাবে চলতি হিসাবের ঘাটতি কিছুটা কম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১১ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঘাটতি বেড়েছে ২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে এখনই ‘আপৎকালীন বিশেষ পরিকল্পনা নিতে হবে হবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, বিলাসী পণ্য আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করা এবং বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির পথ সচল রাখা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং রপ্তানি খাতে বিশেষ নজরদারি বজায় রাখতে হবে।
এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, বাণিজ্য প্রবাহের এই পরিবর্তনই মূলত ঘাটতি বাড়ার প্রধান কারণ। তার মতে, আমদানি বাড়া এবং রপ্তানি কমার কারণে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে।
প্রথম সাত মাসে সামগ্রিক লেনদেনের ভারসাম্য তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক অবস্থায় রয়েছে। রপ্তানি কমা এবং আমদানি বাড়ার পরও শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ চলতি হিসাবের ঘাটতি কমাতে সহায়তা করেছে। তবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি আগামী মাসগুলোতে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে
জাহিদ হোসেন সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ, বিশ্বব্যাংক (ঢাকা কার্যালয়)
জাহিদ হোসেন বলেন, প্রথম সাত মাসে সামগ্রিক লেনদেনের ভারসাম্য তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক অবস্থায় রয়েছে। রপ্তানি কমা এবং আমদানি বাড়ার পরও শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ চলতি হিসাবের ঘাটতি কমাতে সহায়তা করেছে। তবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি আগামী মাসগুলোতে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
মার্চ মাস থেকে যুদ্ধের প্রভাব দৃশ্যমান হতে পারে উল্লেখ করে জাহিদ হোসেন বলেন, এতে ভবিষ্যতে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংরক্ষণ করা বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে সময়ে রপ্তানি আয় সামান্য কমেছে। গত অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে রপ্তানি আয় ছিল ২৬ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৬ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ডলারে। অন্যদিকে আমদানি ব্যয় বেড়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে আমদানি ব্যয় ছিল ৩৮ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার। এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৯ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারে।
বাণিজ্য ঘাটতি
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, গত কয়েক মাসে দেশের আমদানি ব্যয় যে হারে বেড়েছে, রপ্তানি আয় সেভাবে তাল মেলাতে পারছে না। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি- সাত মাসে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার। যা গত অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতি ছিল ১১ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, জুলাই থেকে জানুয়ারি এই সাত মাসে দেশে আমদানি খরচ ৪ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ৩৯ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, রপ্তানি আয় ১ দশমিক ১ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ২৬ দশমিক শূন্য নয় বিলিয়ন ডলারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন ও ইসরাইলের যুদ্ধের প্রভাবে টাকার মান দুর্বল হতে শুরু করেছে। ফলে অচিরেই আমদানি খরচ বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমলে বাণিজ্য ভারসাম্যের উপর আরও চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র- ইরান যুদ্ধের প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা পাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম রাতারাতি বেড়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের সিংহভাগ তেল পরিবহন করা হয়। এই প্রণালি ইরানের নিয়ন্ত্রণে। যুদ্ধের কারণে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে। এতে জ্বালানি তেলের দাম কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা নিয়ে চিন্তিত বিশেষজ্ঞরা।
রেমিট্যান্স প্রবাহে ঝুঁকি
বাণিজ্য ঘাটতি বাড়লেও চলতি হিসাবে কিছুটা স্বস্তির খবর মিলেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে চলতি হিসাবের ঘাটতি নেমে এসেছে ৩৮১ মিলিয়ন ডলারে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতি ছিল ১ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রবাসী আয়ের শক্তিশালী প্রবাহের কারণেই এই উন্নতি সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই- জানুয়ারি সময়ে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১৯ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ১৫ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার।
তবে মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে রেমিট্যান্স প্রবাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।
ডলারের বিপরীতে কমছে টাকার মান
দেশে রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবাহ থাকলেও ইরানসহ গোটা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দেশে ডলারের দাম বাড়তে শুরু করেছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলারের দাম বেড়েছে প্রায় ১ টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, বৃহস্পতিবার দেশের আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ১২৩ টাকা ৩০ পয়সা পর্যন্ত ওঠে। এর চেয়েও বেশি দরে কিছু ব্যাংক রেমিট্যান্সে ডলার কিনেছে। তবে সপ্তাহের শুরুতে প্রতি ডলারের দর ছিল সর্বোচ্চ ১২২ টাকা ৫০ পয়সা।
এ ছাড়া বিশ্বব্যাপী তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের জ্বালানি আমদানি বিল মেটাতে ব্যাংকগুলোতে ডলার কেনার পরিমান আরও বেড়েছে।
ব্যাংকের পাশাপাশি রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলোতেও ডলারের দর বেড়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোতেও বৃহস্পতিবার ডলারের দর ১২৬ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত উঠেছিল। খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ইতিহাসের সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আসার পরও ডলারের দাম বেড়ে যাওয়া অযৌক্তিক। এ বিসয়ে জানতে চাইলে মতিঝিল দিলকুশার একটি মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘যুদ্ধের প্রভাবে ব্যাংকগুলোতে ডলারের দাম বেড়েছে। তাই আমরাও কিছুটা বাড়তি দামে বিক্রি করছি।’
এদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ডলারের বাজার অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে একটি চক্র। তবে রেমিট্যান্স গতিশীল থাকায় ডলারের দর বাড়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান গণমাধ্যমকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক রপ্তানি বাণিজ্যে কোনো আঘাত আসবে না। তবে যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদী হলে এবং প্রবাসী শ্রমিকরা কাজ হারালে তা অশনিসংকেত হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পা ফেলতে হবে। অপ্রয়োজনীয় আমদানি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ এবং বিকল্প বাজার থেকে জ্বালানি সংগ্রহের পথ খোলা রাখা জরুরি। একই সাথে যুদ্ধের প্রভাবে রপ্তানি খাত (বিশেষ করে তৈরি পোশাক) যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।
এদিকে, রপ্তানি খাতের ব্যবসায়ীরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান সংঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তে থাকা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং আর্থিক ব্যবস্থায় অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। এতে দেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় বেড়ে যেতে পারে, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়তে পারে এবং রপ্তানিতে নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে বাংলাদেশের বহির্খাতের জন্য বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে। বৈশ্বিক বাজারে প্রতি ব্যারেল ১০ মার্কিন ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ার ফলে বাংলাদেশের মাসিক আমদানি ব্যয় প্রায় ৭০- ৮০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বেড়ে যাবে এবং দেশের বাণিজ্য ঘাটতি আরও সম্প্রসারিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
এ ব্যবসায়ী নেতা আরও বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে গত সাত মাস ধরে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। সংঘাতের মাত্রা আরও বাড়লে আমদানি ও রপ্তানি উভয় ক্ষেত্রেই ব্যয় আশঙ্কাজনকভাবে বাড়বে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিয়ন্ত্রণ, বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ এবং রপ্তানি খাতকে সক্রিয় রাখার পাশাপাশি প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা জরুরি। এসব কাজ না করতে পারলে বাণিজ্য ঘাটতি ও বৈশ্বিক অস্থিরতার এই দ্বিমুখী চাপ দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

আমদানি ও রপ্তানিতে বড় ধরনের ব্যবধানে বেড়েছে বাণিজ্য ঘাটতি। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যে চলা যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাবে দেশের অর্থনীতি এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাবে নিত্যপণ্যের দামের সঙ্গে বেড়ে গেছে যানবাহনের ভাড়া। এতে সাধারন মানুষের অস্বস্তি ও ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হ্রাস এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি দ্রুত বাড়ছে। যদিও রেমিট্যান্স প্রবাহ ভালো থাকায় সাময়িকভাবে চলতি হিসাবের ঘাটতি কিছুটা কম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১১ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঘাটতি বেড়েছে ২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে এখনই ‘আপৎকালীন বিশেষ পরিকল্পনা নিতে হবে হবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, বিলাসী পণ্য আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করা এবং বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির পথ সচল রাখা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং রপ্তানি খাতে বিশেষ নজরদারি বজায় রাখতে হবে।
এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, বাণিজ্য প্রবাহের এই পরিবর্তনই মূলত ঘাটতি বাড়ার প্রধান কারণ। তার মতে, আমদানি বাড়া এবং রপ্তানি কমার কারণে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে।
প্রথম সাত মাসে সামগ্রিক লেনদেনের ভারসাম্য তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক অবস্থায় রয়েছে। রপ্তানি কমা এবং আমদানি বাড়ার পরও শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ চলতি হিসাবের ঘাটতি কমাতে সহায়তা করেছে। তবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি আগামী মাসগুলোতে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে
জাহিদ হোসেন সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ, বিশ্বব্যাংক (ঢাকা কার্যালয়)
জাহিদ হোসেন বলেন, প্রথম সাত মাসে সামগ্রিক লেনদেনের ভারসাম্য তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক অবস্থায় রয়েছে। রপ্তানি কমা এবং আমদানি বাড়ার পরও শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ চলতি হিসাবের ঘাটতি কমাতে সহায়তা করেছে। তবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি আগামী মাসগুলোতে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
মার্চ মাস থেকে যুদ্ধের প্রভাব দৃশ্যমান হতে পারে উল্লেখ করে জাহিদ হোসেন বলেন, এতে ভবিষ্যতে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংরক্ষণ করা বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে সময়ে রপ্তানি আয় সামান্য কমেছে। গত অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে রপ্তানি আয় ছিল ২৬ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৬ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ডলারে। অন্যদিকে আমদানি ব্যয় বেড়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে আমদানি ব্যয় ছিল ৩৮ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার। এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৯ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারে।
বাণিজ্য ঘাটতি
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, গত কয়েক মাসে দেশের আমদানি ব্যয় যে হারে বেড়েছে, রপ্তানি আয় সেভাবে তাল মেলাতে পারছে না। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি- সাত মাসে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার। যা গত অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতি ছিল ১১ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, জুলাই থেকে জানুয়ারি এই সাত মাসে দেশে আমদানি খরচ ৪ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ৩৯ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, রপ্তানি আয় ১ দশমিক ১ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ২৬ দশমিক শূন্য নয় বিলিয়ন ডলারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন ও ইসরাইলের যুদ্ধের প্রভাবে টাকার মান দুর্বল হতে শুরু করেছে। ফলে অচিরেই আমদানি খরচ বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমলে বাণিজ্য ভারসাম্যের উপর আরও চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র- ইরান যুদ্ধের প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা পাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম রাতারাতি বেড়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের সিংহভাগ তেল পরিবহন করা হয়। এই প্রণালি ইরানের নিয়ন্ত্রণে। যুদ্ধের কারণে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে। এতে জ্বালানি তেলের দাম কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা নিয়ে চিন্তিত বিশেষজ্ঞরা।
রেমিট্যান্স প্রবাহে ঝুঁকি
বাণিজ্য ঘাটতি বাড়লেও চলতি হিসাবে কিছুটা স্বস্তির খবর মিলেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে চলতি হিসাবের ঘাটতি নেমে এসেছে ৩৮১ মিলিয়ন ডলারে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতি ছিল ১ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রবাসী আয়ের শক্তিশালী প্রবাহের কারণেই এই উন্নতি সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই- জানুয়ারি সময়ে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১৯ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ১৫ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার।
তবে মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে রেমিট্যান্স প্রবাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।
ডলারের বিপরীতে কমছে টাকার মান
দেশে রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবাহ থাকলেও ইরানসহ গোটা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দেশে ডলারের দাম বাড়তে শুরু করেছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলারের দাম বেড়েছে প্রায় ১ টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, বৃহস্পতিবার দেশের আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ১২৩ টাকা ৩০ পয়সা পর্যন্ত ওঠে। এর চেয়েও বেশি দরে কিছু ব্যাংক রেমিট্যান্সে ডলার কিনেছে। তবে সপ্তাহের শুরুতে প্রতি ডলারের দর ছিল সর্বোচ্চ ১২২ টাকা ৫০ পয়সা।
এ ছাড়া বিশ্বব্যাপী তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের জ্বালানি আমদানি বিল মেটাতে ব্যাংকগুলোতে ডলার কেনার পরিমান আরও বেড়েছে।
ব্যাংকের পাশাপাশি রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলোতেও ডলারের দর বেড়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোতেও বৃহস্পতিবার ডলারের দর ১২৬ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত উঠেছিল। খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ইতিহাসের সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আসার পরও ডলারের দাম বেড়ে যাওয়া অযৌক্তিক। এ বিসয়ে জানতে চাইলে মতিঝিল দিলকুশার একটি মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘যুদ্ধের প্রভাবে ব্যাংকগুলোতে ডলারের দাম বেড়েছে। তাই আমরাও কিছুটা বাড়তি দামে বিক্রি করছি।’
এদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ডলারের বাজার অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে একটি চক্র। তবে রেমিট্যান্স গতিশীল থাকায় ডলারের দর বাড়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান গণমাধ্যমকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক রপ্তানি বাণিজ্যে কোনো আঘাত আসবে না। তবে যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদী হলে এবং প্রবাসী শ্রমিকরা কাজ হারালে তা অশনিসংকেত হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পা ফেলতে হবে। অপ্রয়োজনীয় আমদানি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ এবং বিকল্প বাজার থেকে জ্বালানি সংগ্রহের পথ খোলা রাখা জরুরি। একই সাথে যুদ্ধের প্রভাবে রপ্তানি খাত (বিশেষ করে তৈরি পোশাক) যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।
এদিকে, রপ্তানি খাতের ব্যবসায়ীরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান সংঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তে থাকা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং আর্থিক ব্যবস্থায় অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। এতে দেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় বেড়ে যেতে পারে, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়তে পারে এবং রপ্তানিতে নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে বাংলাদেশের বহির্খাতের জন্য বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে। বৈশ্বিক বাজারে প্রতি ব্যারেল ১০ মার্কিন ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ার ফলে বাংলাদেশের মাসিক আমদানি ব্যয় প্রায় ৭০- ৮০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বেড়ে যাবে এবং দেশের বাণিজ্য ঘাটতি আরও সম্প্রসারিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
এ ব্যবসায়ী নেতা আরও বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে গত সাত মাস ধরে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। সংঘাতের মাত্রা আরও বাড়লে আমদানি ও রপ্তানি উভয় ক্ষেত্রেই ব্যয় আশঙ্কাজনকভাবে বাড়বে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিয়ন্ত্রণ, বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ এবং রপ্তানি খাতকে সক্রিয় রাখার পাশাপাশি প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা জরুরি। এসব কাজ না করতে পারলে বাণিজ্য ঘাটতি ও বৈশ্বিক অস্থিরতার এই দ্বিমুখী চাপ দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ও বাণিজ্য ঘাটতিতে সংকটে অর্থনীতি
মরিয়ম সেঁজুতি

আমদানি ও রপ্তানিতে বড় ধরনের ব্যবধানে বেড়েছে বাণিজ্য ঘাটতি। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যে চলা যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাবে দেশের অর্থনীতি এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাবে নিত্যপণ্যের দামের সঙ্গে বেড়ে গেছে যানবাহনের ভাড়া। এতে সাধারন মানুষের অস্বস্তি ও ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হ্রাস এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি দ্রুত বাড়ছে। যদিও রেমিট্যান্স প্রবাহ ভালো থাকায় সাময়িকভাবে চলতি হিসাবের ঘাটতি কিছুটা কম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১১ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঘাটতি বেড়েছে ২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে এখনই ‘আপৎকালীন বিশেষ পরিকল্পনা নিতে হবে হবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, বিলাসী পণ্য আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করা এবং বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির পথ সচল রাখা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং রপ্তানি খাতে বিশেষ নজরদারি বজায় রাখতে হবে।
এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, বাণিজ্য প্রবাহের এই পরিবর্তনই মূলত ঘাটতি বাড়ার প্রধান কারণ। তার মতে, আমদানি বাড়া এবং রপ্তানি কমার কারণে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে।
প্রথম সাত মাসে সামগ্রিক লেনদেনের ভারসাম্য তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক অবস্থায় রয়েছে। রপ্তানি কমা এবং আমদানি বাড়ার পরও শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ চলতি হিসাবের ঘাটতি কমাতে সহায়তা করেছে। তবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি আগামী মাসগুলোতে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে
জাহিদ হোসেন সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ, বিশ্বব্যাংক (ঢাকা কার্যালয়)
জাহিদ হোসেন বলেন, প্রথম সাত মাসে সামগ্রিক লেনদেনের ভারসাম্য তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক অবস্থায় রয়েছে। রপ্তানি কমা এবং আমদানি বাড়ার পরও শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ চলতি হিসাবের ঘাটতি কমাতে সহায়তা করেছে। তবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি আগামী মাসগুলোতে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
মার্চ মাস থেকে যুদ্ধের প্রভাব দৃশ্যমান হতে পারে উল্লেখ করে জাহিদ হোসেন বলেন, এতে ভবিষ্যতে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংরক্ষণ করা বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে সময়ে রপ্তানি আয় সামান্য কমেছে। গত অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে রপ্তানি আয় ছিল ২৬ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৬ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ডলারে। অন্যদিকে আমদানি ব্যয় বেড়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে আমদানি ব্যয় ছিল ৩৮ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার। এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৯ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারে।
বাণিজ্য ঘাটতি
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, গত কয়েক মাসে দেশের আমদানি ব্যয় যে হারে বেড়েছে, রপ্তানি আয় সেভাবে তাল মেলাতে পারছে না। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি- সাত মাসে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার। যা গত অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতি ছিল ১১ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, জুলাই থেকে জানুয়ারি এই সাত মাসে দেশে আমদানি খরচ ৪ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ৩৯ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, রপ্তানি আয় ১ দশমিক ১ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ২৬ দশমিক শূন্য নয় বিলিয়ন ডলারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন ও ইসরাইলের যুদ্ধের প্রভাবে টাকার মান দুর্বল হতে শুরু করেছে। ফলে অচিরেই আমদানি খরচ বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমলে বাণিজ্য ভারসাম্যের উপর আরও চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র- ইরান যুদ্ধের প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা পাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম রাতারাতি বেড়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের সিংহভাগ তেল পরিবহন করা হয়। এই প্রণালি ইরানের নিয়ন্ত্রণে। যুদ্ধের কারণে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে। এতে জ্বালানি তেলের দাম কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা নিয়ে চিন্তিত বিশেষজ্ঞরা।
রেমিট্যান্স প্রবাহে ঝুঁকি
বাণিজ্য ঘাটতি বাড়লেও চলতি হিসাবে কিছুটা স্বস্তির খবর মিলেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে চলতি হিসাবের ঘাটতি নেমে এসেছে ৩৮১ মিলিয়ন ডলারে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতি ছিল ১ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রবাসী আয়ের শক্তিশালী প্রবাহের কারণেই এই উন্নতি সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই- জানুয়ারি সময়ে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১৯ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ১৫ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার।
তবে মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে রেমিট্যান্স প্রবাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।
ডলারের বিপরীতে কমছে টাকার মান
দেশে রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবাহ থাকলেও ইরানসহ গোটা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দেশে ডলারের দাম বাড়তে শুরু করেছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলারের দাম বেড়েছে প্রায় ১ টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, বৃহস্পতিবার দেশের আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ১২৩ টাকা ৩০ পয়সা পর্যন্ত ওঠে। এর চেয়েও বেশি দরে কিছু ব্যাংক রেমিট্যান্সে ডলার কিনেছে। তবে সপ্তাহের শুরুতে প্রতি ডলারের দর ছিল সর্বোচ্চ ১২২ টাকা ৫০ পয়সা।
এ ছাড়া বিশ্বব্যাপী তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের জ্বালানি আমদানি বিল মেটাতে ব্যাংকগুলোতে ডলার কেনার পরিমান আরও বেড়েছে।
ব্যাংকের পাশাপাশি রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলোতেও ডলারের দর বেড়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোতেও বৃহস্পতিবার ডলারের দর ১২৬ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত উঠেছিল। খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ইতিহাসের সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আসার পরও ডলারের দাম বেড়ে যাওয়া অযৌক্তিক। এ বিসয়ে জানতে চাইলে মতিঝিল দিলকুশার একটি মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘যুদ্ধের প্রভাবে ব্যাংকগুলোতে ডলারের দাম বেড়েছে। তাই আমরাও কিছুটা বাড়তি দামে বিক্রি করছি।’
এদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ডলারের বাজার অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে একটি চক্র। তবে রেমিট্যান্স গতিশীল থাকায় ডলারের দর বাড়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান গণমাধ্যমকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক রপ্তানি বাণিজ্যে কোনো আঘাত আসবে না। তবে যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদী হলে এবং প্রবাসী শ্রমিকরা কাজ হারালে তা অশনিসংকেত হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পা ফেলতে হবে। অপ্রয়োজনীয় আমদানি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ এবং বিকল্প বাজার থেকে জ্বালানি সংগ্রহের পথ খোলা রাখা জরুরি। একই সাথে যুদ্ধের প্রভাবে রপ্তানি খাত (বিশেষ করে তৈরি পোশাক) যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।
এদিকে, রপ্তানি খাতের ব্যবসায়ীরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান সংঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তে থাকা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং আর্থিক ব্যবস্থায় অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। এতে দেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় বেড়ে যেতে পারে, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়তে পারে এবং রপ্তানিতে নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে বাংলাদেশের বহির্খাতের জন্য বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে। বৈশ্বিক বাজারে প্রতি ব্যারেল ১০ মার্কিন ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ার ফলে বাংলাদেশের মাসিক আমদানি ব্যয় প্রায় ৭০- ৮০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বেড়ে যাবে এবং দেশের বাণিজ্য ঘাটতি আরও সম্প্রসারিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
এ ব্যবসায়ী নেতা আরও বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে গত সাত মাস ধরে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। সংঘাতের মাত্রা আরও বাড়লে আমদানি ও রপ্তানি উভয় ক্ষেত্রেই ব্যয় আশঙ্কাজনকভাবে বাড়বে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিয়ন্ত্রণ, বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ এবং রপ্তানি খাতকে সক্রিয় রাখার পাশাপাশি প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা জরুরি। এসব কাজ না করতে পারলে বাণিজ্য ঘাটতি ও বৈশ্বিক অস্থিরতার এই দ্বিমুখী চাপ দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।




