শিরোনাম

প্লট-ফ্ল্যাট বিক্রির নামে ভয়ঙ্কর প্রতারণা, ডোম-ইনো লিমিটেডে অবসায়ক নিয়োগের নির্দেশ হাইকোর্টের

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্লট-ফ্ল্যাট বিক্রির নামে ভয়ঙ্কর প্রতারণা, ডোম-ইনো 
লিমিটেডে অবসায়ক নিয়োগের নির্দেশ হাইকোর্টের
হাইকোর্ট। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

প্লট ও ফ্ল্যাট কিনতে চুক্তি করেছেন ১০-২০ বছর আগে। কেউ ধার-দেনা করে আবার কেউ সারা জীবনের সঞ্চয় ভেঙে প্লট ও ফ্ল্যাট বুকিং দিয়েছিলেন। কিন্তু আজও তা বুঝে পাননি। এভাবে প্রতারণার মাধ্যমে শত শত ক্রেতার কাছ থেকে কয়েক হাজার কোটি হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে দেশের অন্যতম আবাসন প্রতিষ্ঠান ডোম-ইনো লিমিটেডের বিরুদ্ধে। এই অবস্থায় ক্রেতাদের টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানটিতে একজন অস্থায়ী লিকুইডেটর বা অবসায়ক নিয়োগের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর শান্তিনগরে ‘ডোম-ইনো প্রমেসা’ নামক প্রকল্পে ফ্ল্যাট বুকিং দিয়ে প্রায় সব টাকা পরিশোধ করেছিলেন বেশকিছু ক্রেতা। কিন্তু ১০ বছর পরেও তারা ফ্ল্যাট বুঝে পাননি। এদের মধ্যে ৭৩ জন ভুক্তভোগী ফ্ল্যাট ক্রেতার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি সিকদার মাহমুদুর রাজির আদালত গত ৯ আগস্ট ‘ডোম-ইনো লিমিটেড’-এ অস্থায়ী লিকুইডেটর নিয়োগের আদেশ দেন।

রায়ে আদালত বলেছেন, আদালত কর্তৃক নিযুক্ত অস্থায়ী লিকুইডেটর আপাতত ‘ডোম-ইনো প্রমেসা’ প্রকল্পের সমুদয় দায়িত্বে থাকবেন। আদালত রায়ে এটিও বলেছেন, ডোম-ইনো কর্তৃক ভুক্তভোগী অন্যান্য প্লট মালিক ও ফ্ল্যাট ক্রেতারাও আদালতের শরণাপন্ন হলে তাদের আবেদনও বিবেচনায় নেওয়া হবে।

আবেদনকারীদের পক্ষে আদালতে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. নজরুল ইসলাম খান। তার সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী মোহাম্মদ জামিল খান ও মাহমুদ খলিল।

অস্থায়ী লিকুইডেটর বা অবসায়কের কার্যক্রম ও কাজের পরিধি সম্পর্কে কোম্পানি আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট মো. নজরুল ইসলাম খান বলেন, আদালতের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া এ ধরনের কর্মকর্তাকে ‘বিলুপ্তিকরণ কর্মকর্তা’ কিংবা ‘ঋণ ও সম্পদ নিষ্পত্তিকারক’ও বলা হয়ে থাকে। আইনি ও ব্যবসায়িক পরিভাষায় লিকুইডেটর হলেন এমন একজন ব্যক্তি, যাকে দেউলিয়া বা বন্ধ হয়ে যাওয়া কোনো কোম্পানির সম্পত্তি বিক্রি করে তার ঋণ ও পাওনা পরিশোধ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়।

লিকুইডেটরের দায়িত্ব সম্পর্কে বলা হয়েছে, তিনি বন্ধ হতে যাওয়া কোম্পানির সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন। কোম্পানির সম্পদ বা মালামাল বিক্রি করে নগদ অর্থে রূপান্তর করা এবং বিক্রয়লব্ধ অর্থ দিয়ে নিয়মানুয়ায়ী পাওনাদার ও ব্যাংকগুলোর ঋণ পরিশোধের দায়িত্বও পালন করেন। এছাড়া সব দেনা মেটানোর পর উদ্বৃত্ত অর্থ শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাও করেন লিকুইডেটর।

উচ্চ আদালতে এই আবেদনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম খান জানান, ডোম-ইনোর বিভিন্ন প্রকল্পে ফ্ল্যাট বুকিং দেওয়ার পর নির্ধারিত সময় পার হওয়ার ১০-১৫ বছর পরেও অনেকে ফ্ল্যাট না পাওয়ার অভিযোগ নিয়ে তার কাছে আসেন। চুক্তি অনুযায়ী তিন বছরের মধ্যে কোম্পানি ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেওয়ার কথা। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে কোথাও শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করে রাখা হয়েছে, কোথাও ভবন নির্মাণের কাজই শুরু করা হয়নি। এভাবে ১০-২০ বছর ধরে এসব স্থাপনা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। অভিযোগ পাওয়ার পর গত বছরের মাঝামাঝি কোম্পানি আইনের ২৪২ ধারায় প্রথমে তিনি ডোম-ইনোকে আইনি নোটিশ দেন। এখানে সুনির্দিষ্ট অর্থের উল্লেখ ছিল, অর্থ গ্রহণের স্বীকৃতি ও রসিদও ছিল। অর্থাৎ অর্থ দেওয়া নিয়ে কোম্পানি ও গ্রাহকের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। কিন্তু, ডোম-ইনো নোটিশের জবাব দেয়নি।

রাজধানীর শান্তিনগরে যেই ‘ডোম-ইনো প্রমেসা’ প্রকল্প অবসায়কের নিয়ন্ত্রণে যাবে বলে হাইকোর্ট আদেশ দিয়েছেন, সেখানে প্লট মালিক ও ফ্ল্যাট ক্রেতারা যেন নিজ দায়িত্বে ভবনের নির্মাণকাজ শেষ করতে না পারেন, সেজন্য ডোম-ইনো বিদ্যুৎ অফিসে লিখিত চিঠি দিয়ে স্থায়ীভাবে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করিয়েছে। এতে সেখানে বসবাসকারী পরিবারগুলো প্রায় এক বছর ধরে বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় জীবনযাপন করছেন। এই প্রকল্পে তিনটি ভবনে মোট ১৩৬টি ফ্ল্যাট নির্মাণ হওয়ার কথা। এর মধ্যে দুটি ভবন নির্মাণ হলেও অনেক কাজে এখনো শেষ হয়নি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডোম-ইনোর-এ রকম ভয়ঙ্কর প্রতারণার শিকার অন্তত ৮০ জন জমির মালিক ও শত শত ফ্ল্যাট ক্রেতা। ভুক্তভোগী প্লট মালিকদের বাড়ি ভেঙে জমি দখলে নিয়ে ১০ থেকে ২০ বছরের মধ্যেও ভবন নির্মাণ করেনি ডোম-ইনো। নিজেদের বাড়ি ভেঙে জমি কোম্পানিকে বুঝিয়ে দিয়ে বছরের পর বছর ধরে থাকতে হচ্ছে ভাড়া বাসায়। সব মিলিয়ে হাজারো পরিবারের নিজের ফ্ল্যাটে স্বপ্ন আটকে গেছে ডোম-ইনোর প্রতারণার ফাঁদে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতারণাসহ নানা অভিযোগে ডোম-ইনোর মালিক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আব্দুস সালামের বিরুদ্ধে অন্তত ১৩৬টি মামলা রয়েছে। একটি মামলায় কিছুদিন আগে তার চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন ঢাকা মহানগর সিনিয়র দায়রা জজ। দুটি আরবিট্রেশন মামলায় ১৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা করে জরিমানা হয়েছে তার। এই দুটি মামলায় জমির মালিকের দেওয়া পাওয়ার অব অ্যাটর্নিও বাতিল করেছে আরবিট্রেশন কোর্ট। শতাধিক মামলার মধ্যে অন্তত ১৭টিতে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। এসব দণ্ড ও পরোয়ানা মাথায় নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন আব্দুস সালাম এবং তার স্ত্রী ও কোম্পানির চেয়ারম্যান রিজওয়ানা ইসলাম।

/বিবি/