শিরোনাম

এস আলমসহ অন্যদের সম্পদ দেশে ফেরাতে যত চ্যালেঞ্জ

সিজেডএন  ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
এস আলমসহ অন্যদের সম্পদ দেশে ফেরাতে যত চ্যালেঞ্জ
ডলার পাচার। গ্রাফিক্স: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে প্রথম ধাপে ৬টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে করা মামলার কার্যক্রমে অগ্রাধিকার দিয়েছে টাস্কফোর্স। সেই তালিকায় প্রথমদিকেই রয়েছে সাইফুল আলম চৌধুরীর এস আলম গ্রুপের নাম।

সম্প্রতি সাইপ্রাসের রাজধানী নিকোশিয়ার একটি আদালত এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলমের একটি বিলাসবহুল বাড়ি জব্দের আদেশ দিয়েছে। স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে অর্থ পাচারের অভিযোগ তদন্তের অংশ হিসেবে এ আদেশ দেওয়া হয়েছে।

২০২৪ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক শ্বেতপত্রে বলা হয়, আওয়ামী লীগের টানা ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন বা ২৩ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে।

৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করে। বাংলাদেশ থেকে কোন দেশে কী পরিমাণ অর্থ পাচার করা হয়েছে, দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে সেটি তদন্ত করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা শাখা ‘বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট’ (বিএফআইইউ)।

অনুসন্ধানে এখন পর্যন্ত দেড় ডজনের মতো দেশ ও এলাকার নাম পেয়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা। সেগুলো হলো– যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, সাইপ্রাস, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, চীনের হংকং, থাইল্যান্ড, ফিলিপিন্স, ভারত, লুক্সেমবার্গ, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস, যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি স্বশাসিত অঞ্চল আইল অব ম্যান, ব্রিটিশ আইলসের অন্তর্ভুক্ত দ্বীপ জার্সি, ইংলিশ চ্যানেল অঞ্চলের দ্বীপ গার্নসি এবং ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের দ্বীপরাষ্ট্র সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস। এসব দেশের সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযুক্তদের সম্পদ জব্দের অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ।

প্রথম ধাপে যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা অগ্রাধিকার পাচ্ছে, সেগুলো হলো– এস আলম গ্রুপ, আরামিট গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, নাসা গ্রুপ ও ওরিয়ন গ্রুপ। সম্প্রতি সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, এসব মামলার কার্যক্রম এরইমধ্যে শুরু হয়েছে।

অভিযুক্তদের মধ্যে যুক্তরাজ্য, সাইপ্রাস এবং আইল অব ম্যানে এস আলম গ্রুপের সাইফুল আলম, আরামিট গ্রুপের সাইফুজ্জামান চৌধুরী এবং বেক্সিমকো গ্রুপের সালমান এফ রহমান পরিবারের সদস্যদের কিছু সম্পদ জব্দ করেছে সেদেশের সরকার।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জব্দ করা সম্পদ এখনই ফেরত আনতে পারবে না বাংলাদেশ। ফেরত পাওয়ার জন্য আগে ওইসব দেশের আদালতে প্রমাণ করতে হবে যে, সম্পদগুলো বাংলাদেশ থেকে পাচার করা হয়েছিল।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, যে অর্থ পাচার হয়, তার মাত্র এক শতাংশ দেশে ফেরত আসে। এর জন্য ৭ থেকে ২০ বছর বা আরও বেশি সময় লেগে যায়।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিস) গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবীর বলেন, অভিযোগ প্রমাণ করতে হলে আমাদের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দেখাতে হবে যে, টাকা আমাদের দেশ থেকে বেআইনিভাবে ওই দেশে পাচার করা হয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় যে সমস্যা, সেটা হলো আমরা এখনো সেভাবে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ আসলে জোগাড় করতে পারিনি।

তিনি বলেন, সামনের দিনগুলোতেও অর্থ পাচারের তথ্য-প্রমাণ জোগাড় করাও সহজ হবে না। কারণ অর্থগুলো অন্য দেশে ঢুকেছে বিনিয়োগ হিসেবে। আর সেই বিনিয়োগটা গেছে তৃতীয় আরেকটি দেশ হয়ে। সব মিলিয়ে পাচারের অর্থ শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে ফিরবে কি-না, সেটা নিশ্চিত নয়।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, যে অর্থ পাচার হয়, তার মাত্র এক শতাংশ দেশে ফেরত আসে। এর জন্য ৭ থেকে ২০ বছর বা আরও বেশি সময় লেগে যায়।

তিনি বলেন, মামলা চালানোটা এমনিতেই ব্যয়বহুল একটা ব্যাপার। তারপরও সেটা যদি বছরের পর বছর ধরে চালাতে হয়, সেটার জন্য বড় বাজেট দরকার হবে। আবার এত টাকা-পয়সা খরচের পর মামলায় আমরা জিতবো কি-না, সেটাও নিশ্চিত নয়।

কর্মকর্তারা বলছেন, পাচারের অর্থ ফেরানোর ক্ষেত্রে আরেকটি বড় বাধা হলো বিভিন্ন দেশের আইনি কাঠামোর পার্থক্য। এ কারণে যেসব দেশে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে, সেসব দেশের সঙ্গে পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তি (এমএলএ) করতে উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ।

এ লক্ষ্যে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড এবং হংকংয়ের কাছে চুক্তির প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও হংকং ইতিবাচক সাড়া দিলেও অন্য দেশগুলো এখন পর্যন্ত পৃথক চুক্তিতে আগ্রহ দেখায়নি।

প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, পাচারের অর্থ যেসব দেশে গেছে, সেসব দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

অন্যদিকে, এস আলম গ্রুপ, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী এবং বেক্সিমকো গ্রুপ বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে অর্থ পাচারের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তারা আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সামনে নানা আইনি ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ থাকলেও অন্তত একটি মামলায় সফল হয়ে পাচারের অর্থ দেশে ফেরানো গেলে তা ভবিষ্যতে অর্থ পাচার রোধে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে।

সূত্র: বিবিসি

/এফসি/