শিরোনাম

ভারতের অ্যান্টিডাম্পিং শুল্কের চাপে সংকটে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
ভারতের অ্যান্টিডাম্পিং শুল্কের চাপে সংকটে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত
পাটকলে কাজ করছেন একজন শ্রমিক

ভারতে বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। দেশটির বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ট্রেড রেমেডিজ (ডিজিটিআর) বিদ্যমান অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক বহাল রেখে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক নতুন শুল্কহার নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। এই প্রস্তাব কার্যকর হলে আগের তালিকার বাইরে থাকা বাংলাদেশি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও উচ্চ হারে শুল্ক আরোপের ঝুঁকি তৈরি হবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত ২৫ জুন প্রকাশিত ডিজিটিআরের তদন্ত প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে আমদানি হওয়া পাট সুতা, হেসিয়ান কাপড়, পাটের বস্তা এবং বাংলাদেশের স্যাকিং ক্লথের ওপর আরোপিত অ্যান্টিডাম্পিং শুল্কের মধ্যবর্তী পর্যালোচনার ফল তুলে ধরা হয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করলেই নতুন শুল্কহার কার্যকর হবে বলে জানানো হয়।

২০১৭ সালে ভারত বাংলাদেশের ৫৫টি উৎপাদক ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের ওপর অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক আরোপ করেছিল। নতুন পর্যালোচনায় সেই কাঠামো বহাল থাকলেও তালিকার বাইরে থাকা প্রতিষ্ঠানের জন্য তুলনামূলক অনেক বেশি শুল্কের সুপারিশ করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, ওয়াহাব জুট মিলসের পাটসুতার ওপর প্রতি টনে ৬৯ ডলার শুল্কের প্রস্তাব দেওয়া হলেও তালিকার বাইরে থাকা যেকোনো প্রতিষ্ঠানের একই পণ্যে প্রতি টনে ৪৪৫ ডলার শুল্কের সুপারিশ করা হয়েছে। হেসিয়ান কাপড়ের ক্ষেত্রেও তালিকার বাইরের প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রতি টনে ৮৮ ডলার শুল্কের প্রস্তাব রয়েছে। তবে জনতা জুট মিলস, ন্যাশনাল জুট ম্যানুফ্যাকচারিং করপোরেশন, আলহাজ জুট মিলস এবং সাদাত জুট ইন্ডাস্ট্রিজের ক্ষেত্রে অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক শূন্য করার সুপারিশ করেছে ডিজিটিআর।

এ বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, বাংলাদেশ বিষয়টি নিয়ে ভারতের সঙ্গে আলোচনা করবে। এতে দুই দেশের বাণিজ্যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। এমন কোনো পদক্ষেপ না নিতে ভারতকে অনুরোধ জানানো হবে।

ব্যবসায়ীরা জানান, ভারতের নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার আগেই কূটনৈতিক ও আইনি উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। অ্যান্টিডাম্পিং ও কাউন্টারভেইলিং শুল্ক মোকাবিলায় ভারতের মতো বিশেষায়িত কাঠামো বাংলাদেশে নেই, ফলে এ ধরনের বাণিজ্যিক বিরোধে আমরা পিছিয়ে পড়ছি।

বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি তাপস প্রামাণিক বলেন, ভারতের অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের পাটশিল্পের জন্য বড় বাধা। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অনেক প্রতিষ্ঠান এখন ভারতীয় বাজারকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়িক পরিকল্পনাই করছে না।

এদিকে, ডিজিটিআর জানিয়েছে, ২০১৭ সালে শুল্ক আরোপের পরও ভারতীয় পাটশিল্প ডাম্পিংয়ের ক্ষতির ঝুঁকি থেকে পুরোপুরি বের হতে পারেনি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ থেকে পাট সুতা ও হেসিয়ান কাপড়ের রপ্তানিমূল্য কমেছে, কিন্তু কাঁচা পাটের দাম সেই অনুপাতে কমেনি। একই সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাটপণ্যের রপ্তানিও বেড়েছে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা জানান, আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা, ডলারের বিনিময় হার, পরিবহন ব্যয় এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার কারণেই রপ্তানিমূল্যে পরিবর্তন এসেছে; এটি কোনোভাবেই ডাম্পিং নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন শুল্ক কার্যকর হলে ভারতের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও কমবে। এতে রপ্তানি, পাটকল, কৃষক, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই দ্রুত দ্বিপক্ষীয় আলোচনা এবং প্রয়োজন হলে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) আওতায় আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় আনার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

/এসবি/