শিরোনাম

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বদলে গেল বাংলাদেশের গম আমদানির উৎস

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বদলে গেল বাংলাদেশের গম আমদানির উৎস
প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশের গম আমদানির বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধের প্রভাবে এবার নতুন এক বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় গম সরবরাহকারী দেশে পরিণত হয়েছে আর্জেন্টিনা। চার বছর আগে শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর আমদানির উৎসে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল, এবার তারই স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা গেছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ মোট ৭৪ লাখ ৩৪ হাজার টন গম আমদানি করেছে। যা দেশের ইতিহাসে এক অর্থবছরে সর্বোচ্চ। আগের বছরের তুলনায় গম আমদানি বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ। এর মধ্যে প্রায় ২২ লাখ টন গম এসেছে আর্জেন্টিনা থেকে, যা মোট আমদানির প্রায় ৩০ শতাংশ। এই গম আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫৬ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার।

একসময় বাংলাদেশের গম আমদানির বাজারে রাশিয়া ও ইউক্রেন ছিল সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দুটি উৎস। প্রায় প্রতি বছরই দেশ দুটির কোনো একটি শীর্ষ অবস্থানে থাকত। তবে ২০২২ সালে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কৃষিপণ্য সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। ফলে আমদানিকারকেরা ঝুঁকি কমাতে বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেন। সেই ধারাবাহিকতায় আর্জেন্টিনার গুরুত্ব দ্রুত বাড়তে থাকে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশটি চতুর্থ বৃহত্তম সরবরাহকারী থাকলেও মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এবার শীর্ষে উঠে এসেছে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের গম বাজারে রাশিয়ার অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। সর্বশেষ অর্থবছরে দেশটি থেকে আমদানি হয়েছে ১৬ লাখ ৭৯ হাজার টন গম, যা মোট আমদানির প্রায় ২৩ শতাংশ। অথচ এর আগের অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট গম আমদানির প্রায় ৪৪ শতাংশই এসেছিল রাশিয়া থেকে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে দেশটির অংশীদারত্ব প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।

এদিকে উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ শক্ত গমের ক্ষেত্রে কানাডা এখনো বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের অন্যতম পছন্দ। গত অর্থবছরে দেশটি থেকে ১৬ লাখ ৭০ হাজার টন গম আমদানি হয়েছে, যা মোট আমদানির প্রায় ২২ দশমিক ৫ শতাংশ। ফলে গম সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে কানাডা দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।

কয়েক বছর বিরতির পর আবারও বাংলাদেশের গম বাজারে ফিরে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশটি থেকে কোনো গম আমদানি না হলেও সর্বশেষ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছে ৭ লাখ ৪৪ হাজার টন গম। মোট আমদানিতে এর অংশ প্রায় ১০ শতাংশ। এর বেশির ভাগই সরকারিভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে। আমদানি হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের গমের প্রায় ৯৫ শতাংশ এনেছে সরকার, আর বাকি অংশ আমদানি করেছে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।

শুধু উৎসের পরিবর্তনই নয়, আর্জেন্টিনা থেকে গম আমদানিতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণও বেড়েছে। আগে হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দেশটি থেকে গম আনলেও গত অর্থবছরে ৪৬টি প্রতিষ্ঠান আর্জেন্টিনা থেকে গম আমদানি করেছে।

এ বিষয়ে ডেল্টা এগ্রোফুড ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর ওই অঞ্চলের সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় বিকল্প উৎস খুঁজতে বাধ্য হন ব্যবসায়ীরা। সরবরাহ ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্যেই আর্জেন্টিনা থেকে আমদানি বাড়ানো হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের গম আমদানির উৎসে যে বৈচিত্র্য তৈরি হয়েছে, তা সরবরাহ ব্যবস্থাকে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল করেছে। এখন রাশিয়ার পাশাপাশি আর্জেন্টিনা, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলও গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী হিসেবে উঠে এসেছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি ভবিষ্যতেও বাংলাদেশের গম আমদানির ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

/এসবি/