বিদেশে চাকরির স্বপ্ন, বাস্তবে মানবপাচারের ফাঁদ

বিদেশে চাকরির স্বপ্ন, বাস্তবে মানবপাচারের ফাঁদ
সিজেডএন ডেস্ক

বিদেশে ভালো চাকরি আর উচ্চ আয়ের স্বপ্ন দেখিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় প্রতারক চক্র লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশে পৌঁছানোর পর চাকরি তো মিলছেই না, বরং নির্যাতন, জিম্মি ও জোরপূর্বক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে বাধ্য হওয়ার মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়ছেন বাংলাদেশিরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে মানবপাচারের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে ভুয়া চাকরির প্রলোভন।
বিশ্ব মানব পাচারবিরোধী দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য বলছে, শ্রমবাজার সংকুচিত হয়ে আসায় ঝুঁকি নিয়েও বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছেন অনেকেই। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সংঘবদ্ধ চক্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলছে।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ইতালিতে যাওয়ার জন্য ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়া অভিবাসীদের মধ্যে গত কয়েক বছরের মতো এবারও বাংলাদেশিরা শীর্ষে রয়েছে। একইভাবে গ্রিসমুখী সমুদ্রপথে যাত্রাকারীদের তালিকাতেও এবার প্রথম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা জানান, ইতালি বা গ্রিসে পৌঁছানোর আশায় অধিকাংশ বাংলাদেশিকে প্রথমে লিবিয়ায় নেওয়া হয়। সেখানে বিভিন্ন ক্যাম্পে আটকে রেখে তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হয় এবং মুক্তিপণ হিসেবে পরিবারের কাছ থেকে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। চলতি বছরের মার্চে লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে নৌকাডুবিতে অন্তত ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়, যাদের মধ্যে ১২ জনই ছিলেন সুনামগঞ্জের বাসিন্দা।
ইউরোপীয় সীমান্তরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের তথ্য উদ্ধৃত করে ব্র্যাক জানিয়েছে, ২০২৫ সালে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ২০ হাজার ২৫৯ জন বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেন। আর ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ইতালিতে প্রবেশ করেছেন আরও ৪ হাজার ২৪৯ জন বাংলাদেশি। একই সময়ে লিবিয়া থেকে সমুদ্রপথে গ্রিসে পৌঁছেছেন ৩ হাজার ৬০৮ জন বাংলাদেশি।
এদিকে মানবপাচার-সংক্রান্ত অপরাধের বিচার প্রক্রিয়াও ধীরগতির। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মানব পাচার আইনে ১ হাজার ১২৬টি নতুন মামলা হয়েছে। পুরোনো মামলাসহ চলতি বছরের মে পর্যন্ত মোট ৫ হাজার ২৮৪টি মামলা বিচারাধীন বা তদন্তাধীন অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৩০৬টি মামলা বিচারাধীন এবং ১ হাজার ৯৭৮টি মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে মানব পাচারের ৫০০টির বেশি নতুন মামলা হলেও এ সময়ে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১৭টি।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেছেন, মানবপাচার ও অনিয়ম ঠেকাতে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর অনিয়মে জড়িত ৪৯টি রিক্রুটিং এজেন্সি এবং রাশিয়ায় কর্মী পাঠানো তিনটি এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া কম্বোডিয়ায় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নতুন শ্রমবাজারের আড়ালে প্রতারণা
অভিবাসন গবেষণা প্রতিষ্ঠান রামরুর তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া বাংলাদেশের নতুন শ্রমবাজার হিসেবে গুরুত্ব পেলেও এর আড়ালে প্রতারণার ঘটনাও বাড়ছে। গত বছর রাশিয়ায় গেছেন ৪ হাজার ৭২৭ জন বাংলাদেশি কর্মী, যা আগের বছরের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। তবে অভিযোগ রয়েছে, চাকরির কথা বলে অনেককে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে।
এ বছরের প্রথম ছয় মাসে রাশিয়ায় যাওয়ার জন্য ছাড়পত্র নিয়েছেন ২ হাজার ১২৫ জন কর্মী। তাদের মধ্যে কেউ যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে ফিরেছেন, কেউ নিহত হয়েছেন, আবার কেউ দেশে ফেরার আকুতি জানিয়ে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।
লক্ষ্মীপুরের জাহাঙ্গীর আলমও এমনই এক ভুক্তভোগী। বাবুর্চির চাকরির আশ্বাসে রাশিয়ায় গেলেও তাঁকে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। প্রশিক্ষণ ছাড়াই অস্ত্র ধরিয়ে দেওয়া হয়। সাত মাস পর বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় দেশে ফিরতে সক্ষম হন তিনি।
কম্বোডিয়াও এখন মানবপাচারের অন্যতম গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। কল সেন্টারে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে সেখানে নিয়ে গিয়ে অনেক বাংলাদেশিকে অনলাইন প্রতারণা বা স্ক্যাম পরিচালনায় বাধ্য করা হয়। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সম্প্রতি দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসব স্ক্যাম সেন্টারের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে জুন মাসে ৫৮৩ বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। তবে গত দেড় বছরে ১৫ হাজারের বেশি কর্মীকে কম্বোডিয়ায় যাওয়ার ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।
শাস্তির অভাবে বাড়ছে পাচার
ব্র্যাকের জরিপে দেখা গেছে, কম্বোডিয়া থেকে ফিরে আসা ৯৮ শতাংশ বাংলাদেশি সেখানে প্রতিশ্রুত চাকরি পাননি। ৯০ শতাংশ জানিয়েছেন, তাদের জোর করে অনলাইন প্রতারণার কাজে যুক্ত করা হয়েছিল। ৮৮ শতাংশের চলাফেরার স্বাধীনতা ছিল না এবং ৮৬ শতাংশের পাসপোর্ট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। এছাড়া ২৭ শতাংশ শারীরিক এবং ৩৮ শতাংশ মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মানব পাচার আইনে দায়ের হওয়া ৪ হাজার ৪২৭ মামলার ৯৪ থেকে ৯৫ শতাংশ আসামি খালাস পেয়েছেন। ফলে পাচারকারীরা কার্যত শাস্তির বাইরে থেকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, আগে জোরপূর্বক মানবপাচারের ঘটনা বেশি ঘটলেও এখন অভিবাসনের স্বপ্ন দেখিয়ে পাচারের প্রবণতা বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চাকরির বিজ্ঞাপন দিয়ে মানুষকে প্রলুব্ধ করা হচ্ছে। আর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবে পাচারকারী চক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানবপাচার প্রতিরোধে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, নিরাপদ অভিবাসন সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, বৈধ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বিদেশে ভালো চাকরি আর উচ্চ আয়ের স্বপ্ন দেখিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় প্রতারক চক্র লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশে পৌঁছানোর পর চাকরি তো মিলছেই না, বরং নির্যাতন, জিম্মি ও জোরপূর্বক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে বাধ্য হওয়ার মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়ছেন বাংলাদেশিরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে মানবপাচারের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে ভুয়া চাকরির প্রলোভন।
বিশ্ব মানব পাচারবিরোধী দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য বলছে, শ্রমবাজার সংকুচিত হয়ে আসায় ঝুঁকি নিয়েও বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছেন অনেকেই। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সংঘবদ্ধ চক্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলছে।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ইতালিতে যাওয়ার জন্য ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়া অভিবাসীদের মধ্যে গত কয়েক বছরের মতো এবারও বাংলাদেশিরা শীর্ষে রয়েছে। একইভাবে গ্রিসমুখী সমুদ্রপথে যাত্রাকারীদের তালিকাতেও এবার প্রথম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা জানান, ইতালি বা গ্রিসে পৌঁছানোর আশায় অধিকাংশ বাংলাদেশিকে প্রথমে লিবিয়ায় নেওয়া হয়। সেখানে বিভিন্ন ক্যাম্পে আটকে রেখে তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হয় এবং মুক্তিপণ হিসেবে পরিবারের কাছ থেকে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। চলতি বছরের মার্চে লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে নৌকাডুবিতে অন্তত ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়, যাদের মধ্যে ১২ জনই ছিলেন সুনামগঞ্জের বাসিন্দা।
ইউরোপীয় সীমান্তরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের তথ্য উদ্ধৃত করে ব্র্যাক জানিয়েছে, ২০২৫ সালে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ২০ হাজার ২৫৯ জন বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেন। আর ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ইতালিতে প্রবেশ করেছেন আরও ৪ হাজার ২৪৯ জন বাংলাদেশি। একই সময়ে লিবিয়া থেকে সমুদ্রপথে গ্রিসে পৌঁছেছেন ৩ হাজার ৬০৮ জন বাংলাদেশি।
এদিকে মানবপাচার-সংক্রান্ত অপরাধের বিচার প্রক্রিয়াও ধীরগতির। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মানব পাচার আইনে ১ হাজার ১২৬টি নতুন মামলা হয়েছে। পুরোনো মামলাসহ চলতি বছরের মে পর্যন্ত মোট ৫ হাজার ২৮৪টি মামলা বিচারাধীন বা তদন্তাধীন অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৩০৬টি মামলা বিচারাধীন এবং ১ হাজার ৯৭৮টি মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে মানব পাচারের ৫০০টির বেশি নতুন মামলা হলেও এ সময়ে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১৭টি।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেছেন, মানবপাচার ও অনিয়ম ঠেকাতে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর অনিয়মে জড়িত ৪৯টি রিক্রুটিং এজেন্সি এবং রাশিয়ায় কর্মী পাঠানো তিনটি এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া কম্বোডিয়ায় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নতুন শ্রমবাজারের আড়ালে প্রতারণা
অভিবাসন গবেষণা প্রতিষ্ঠান রামরুর তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া বাংলাদেশের নতুন শ্রমবাজার হিসেবে গুরুত্ব পেলেও এর আড়ালে প্রতারণার ঘটনাও বাড়ছে। গত বছর রাশিয়ায় গেছেন ৪ হাজার ৭২৭ জন বাংলাদেশি কর্মী, যা আগের বছরের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। তবে অভিযোগ রয়েছে, চাকরির কথা বলে অনেককে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে।
এ বছরের প্রথম ছয় মাসে রাশিয়ায় যাওয়ার জন্য ছাড়পত্র নিয়েছেন ২ হাজার ১২৫ জন কর্মী। তাদের মধ্যে কেউ যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে ফিরেছেন, কেউ নিহত হয়েছেন, আবার কেউ দেশে ফেরার আকুতি জানিয়ে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।
লক্ষ্মীপুরের জাহাঙ্গীর আলমও এমনই এক ভুক্তভোগী। বাবুর্চির চাকরির আশ্বাসে রাশিয়ায় গেলেও তাঁকে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। প্রশিক্ষণ ছাড়াই অস্ত্র ধরিয়ে দেওয়া হয়। সাত মাস পর বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় দেশে ফিরতে সক্ষম হন তিনি।
কম্বোডিয়াও এখন মানবপাচারের অন্যতম গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। কল সেন্টারে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে সেখানে নিয়ে গিয়ে অনেক বাংলাদেশিকে অনলাইন প্রতারণা বা স্ক্যাম পরিচালনায় বাধ্য করা হয়। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সম্প্রতি দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসব স্ক্যাম সেন্টারের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে জুন মাসে ৫৮৩ বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। তবে গত দেড় বছরে ১৫ হাজারের বেশি কর্মীকে কম্বোডিয়ায় যাওয়ার ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।
শাস্তির অভাবে বাড়ছে পাচার
ব্র্যাকের জরিপে দেখা গেছে, কম্বোডিয়া থেকে ফিরে আসা ৯৮ শতাংশ বাংলাদেশি সেখানে প্রতিশ্রুত চাকরি পাননি। ৯০ শতাংশ জানিয়েছেন, তাদের জোর করে অনলাইন প্রতারণার কাজে যুক্ত করা হয়েছিল। ৮৮ শতাংশের চলাফেরার স্বাধীনতা ছিল না এবং ৮৬ শতাংশের পাসপোর্ট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। এছাড়া ২৭ শতাংশ শারীরিক এবং ৩৮ শতাংশ মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মানব পাচার আইনে দায়ের হওয়া ৪ হাজার ৪২৭ মামলার ৯৪ থেকে ৯৫ শতাংশ আসামি খালাস পেয়েছেন। ফলে পাচারকারীরা কার্যত শাস্তির বাইরে থেকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, আগে জোরপূর্বক মানবপাচারের ঘটনা বেশি ঘটলেও এখন অভিবাসনের স্বপ্ন দেখিয়ে পাচারের প্রবণতা বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চাকরির বিজ্ঞাপন দিয়ে মানুষকে প্রলুব্ধ করা হচ্ছে। আর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবে পাচারকারী চক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানবপাচার প্রতিরোধে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, নিরাপদ অভিবাসন সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, বৈধ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বিদেশে চাকরির স্বপ্ন, বাস্তবে মানবপাচারের ফাঁদ
সিজেডএন ডেস্ক

বিদেশে ভালো চাকরি আর উচ্চ আয়ের স্বপ্ন দেখিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় প্রতারক চক্র লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশে পৌঁছানোর পর চাকরি তো মিলছেই না, বরং নির্যাতন, জিম্মি ও জোরপূর্বক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে বাধ্য হওয়ার মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়ছেন বাংলাদেশিরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে মানবপাচারের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে ভুয়া চাকরির প্রলোভন।
বিশ্ব মানব পাচারবিরোধী দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য বলছে, শ্রমবাজার সংকুচিত হয়ে আসায় ঝুঁকি নিয়েও বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছেন অনেকেই। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সংঘবদ্ধ চক্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলছে।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ইতালিতে যাওয়ার জন্য ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়া অভিবাসীদের মধ্যে গত কয়েক বছরের মতো এবারও বাংলাদেশিরা শীর্ষে রয়েছে। একইভাবে গ্রিসমুখী সমুদ্রপথে যাত্রাকারীদের তালিকাতেও এবার প্রথম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা জানান, ইতালি বা গ্রিসে পৌঁছানোর আশায় অধিকাংশ বাংলাদেশিকে প্রথমে লিবিয়ায় নেওয়া হয়। সেখানে বিভিন্ন ক্যাম্পে আটকে রেখে তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হয় এবং মুক্তিপণ হিসেবে পরিবারের কাছ থেকে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। চলতি বছরের মার্চে লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে নৌকাডুবিতে অন্তত ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়, যাদের মধ্যে ১২ জনই ছিলেন সুনামগঞ্জের বাসিন্দা।
ইউরোপীয় সীমান্তরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের তথ্য উদ্ধৃত করে ব্র্যাক জানিয়েছে, ২০২৫ সালে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ২০ হাজার ২৫৯ জন বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেন। আর ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ইতালিতে প্রবেশ করেছেন আরও ৪ হাজার ২৪৯ জন বাংলাদেশি। একই সময়ে লিবিয়া থেকে সমুদ্রপথে গ্রিসে পৌঁছেছেন ৩ হাজার ৬০৮ জন বাংলাদেশি।
এদিকে মানবপাচার-সংক্রান্ত অপরাধের বিচার প্রক্রিয়াও ধীরগতির। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মানব পাচার আইনে ১ হাজার ১২৬টি নতুন মামলা হয়েছে। পুরোনো মামলাসহ চলতি বছরের মে পর্যন্ত মোট ৫ হাজার ২৮৪টি মামলা বিচারাধীন বা তদন্তাধীন অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৩০৬টি মামলা বিচারাধীন এবং ১ হাজার ৯৭৮টি মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে মানব পাচারের ৫০০টির বেশি নতুন মামলা হলেও এ সময়ে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১৭টি।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেছেন, মানবপাচার ও অনিয়ম ঠেকাতে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর অনিয়মে জড়িত ৪৯টি রিক্রুটিং এজেন্সি এবং রাশিয়ায় কর্মী পাঠানো তিনটি এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া কম্বোডিয়ায় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নতুন শ্রমবাজারের আড়ালে প্রতারণা
অভিবাসন গবেষণা প্রতিষ্ঠান রামরুর তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া বাংলাদেশের নতুন শ্রমবাজার হিসেবে গুরুত্ব পেলেও এর আড়ালে প্রতারণার ঘটনাও বাড়ছে। গত বছর রাশিয়ায় গেছেন ৪ হাজার ৭২৭ জন বাংলাদেশি কর্মী, যা আগের বছরের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। তবে অভিযোগ রয়েছে, চাকরির কথা বলে অনেককে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে।
এ বছরের প্রথম ছয় মাসে রাশিয়ায় যাওয়ার জন্য ছাড়পত্র নিয়েছেন ২ হাজার ১২৫ জন কর্মী। তাদের মধ্যে কেউ যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে ফিরেছেন, কেউ নিহত হয়েছেন, আবার কেউ দেশে ফেরার আকুতি জানিয়ে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।
লক্ষ্মীপুরের জাহাঙ্গীর আলমও এমনই এক ভুক্তভোগী। বাবুর্চির চাকরির আশ্বাসে রাশিয়ায় গেলেও তাঁকে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। প্রশিক্ষণ ছাড়াই অস্ত্র ধরিয়ে দেওয়া হয়। সাত মাস পর বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় দেশে ফিরতে সক্ষম হন তিনি।
কম্বোডিয়াও এখন মানবপাচারের অন্যতম গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। কল সেন্টারে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে সেখানে নিয়ে গিয়ে অনেক বাংলাদেশিকে অনলাইন প্রতারণা বা স্ক্যাম পরিচালনায় বাধ্য করা হয়। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সম্প্রতি দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসব স্ক্যাম সেন্টারের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে জুন মাসে ৫৮৩ বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। তবে গত দেড় বছরে ১৫ হাজারের বেশি কর্মীকে কম্বোডিয়ায় যাওয়ার ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।
শাস্তির অভাবে বাড়ছে পাচার
ব্র্যাকের জরিপে দেখা গেছে, কম্বোডিয়া থেকে ফিরে আসা ৯৮ শতাংশ বাংলাদেশি সেখানে প্রতিশ্রুত চাকরি পাননি। ৯০ শতাংশ জানিয়েছেন, তাদের জোর করে অনলাইন প্রতারণার কাজে যুক্ত করা হয়েছিল। ৮৮ শতাংশের চলাফেরার স্বাধীনতা ছিল না এবং ৮৬ শতাংশের পাসপোর্ট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। এছাড়া ২৭ শতাংশ শারীরিক এবং ৩৮ শতাংশ মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মানব পাচার আইনে দায়ের হওয়া ৪ হাজার ৪২৭ মামলার ৯৪ থেকে ৯৫ শতাংশ আসামি খালাস পেয়েছেন। ফলে পাচারকারীরা কার্যত শাস্তির বাইরে থেকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, আগে জোরপূর্বক মানবপাচারের ঘটনা বেশি ঘটলেও এখন অভিবাসনের স্বপ্ন দেখিয়ে পাচারের প্রবণতা বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চাকরির বিজ্ঞাপন দিয়ে মানুষকে প্রলুব্ধ করা হচ্ছে। আর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবে পাচারকারী চক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানবপাচার প্রতিরোধে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, নিরাপদ অভিবাসন সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, বৈধ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।









