তুরস্কের এক পাচারকারীর মুখে ইউরোপ যাত্রার গল্প

তুরস্কের এক পাচারকারীর মুখে ইউরোপ যাত্রার গল্প
সিজেডএন ডেস্ক

অবৈধ পথে ইউরোপ যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে হাজার হাজার মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় ঠেলে দিচ্ছে আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্র। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভুয়া কাগজপত্র, মিথ্যা আশ্বাস আর বিপজ্জনক সমুদ্রপথ সবকিছুকে কাজে লাগিয়ে গড়ে উঠেছে কোটি কোটি ডলারের অবৈধ এই ব্যবসা।
তুরস্কের ইস্তাম্বুলে এক মানবপাচারকারীর সঙ্গে কথা বলে এই চক্রের ভেতরের নানা তথ্য তুলে ধরেছে বিবিসির অনুসন্ধানী অনুষ্ঠান প্যানোরামা। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে ওই পাচারকারী জানিয়েছেন, কীভাবে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ইউরোপে পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়া পরিচালনা করা হয়।
ইস্তাম্বুলের একটি গোপন আস্তানায় বিবিসির সাংবাদিকের সঙ্গে দেখা করেন মধ্যপ্রাচ্যের বংশোদ্ভূত ওই তরুণ পাচারকারী। নিজেকে অপরাধী হিসেবে দেখতে নারাজ তিনি। দাবি করেন, তিনি নাকি মানুষের সহায়তা করছেন।
মানবপাচার অবৈধ এ কথা স্বীকার করেও তিনি বলেন, ‘আমার কাছে এটি মানবিকতার বিষয়। আমরা মানুষকে সাহায্য করি, তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করি। কাউকে অপমান বা আঘাত করি না।’
তবে বাস্তবতা বলছে, এই ব্যবসার পেছনে রয়েছে বিপুল অর্থের লেনদেন এবং হাজারো মানুষের জীবন ঝুঁকিতে ফেলার ভয়ংকর চিত্র।
মাথাপিছু ১৭ হাজার ডলারের ব্যবসা
তুরস্ক থেকে ইউরোপে মানবপাচার এখন একটি সুসংগঠিত অবৈধ ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। পাচারকারী জানান, একজন মানুষকে ব্রিটেনে পৌঁছে দিতে গড়ে ১৭ হাজার ডলার পর্যন্ত নেওয়া হয়।
তিনি বলেন, ‘পুরো পরিবার যাচ্ছে নাকি একজন যাচ্ছে, তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। মাথাপিছু একই রেট।’
তার ভাষ্য অনুযায়ী, অভিবাসনপ্রত্যাশীদের প্রথমে ইস্তাম্বুলের বিভিন্ন নিরাপদ বাড়িতে রাখা হয়। সেখানে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। পরে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে গভীর রাতে তাদের ভ্যানে করে পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়।
এরপর ছোট ছোট দলে ভাগ করে পায়ে হেঁটে সমুদ্রতীরে পৌঁছানো হয়। সেখান থেকে শুরু হয় বিপজ্জনক নৌযাত্রা।
দায় এড়াতে ‘চুক্তিপত্র’
ছোট নৌকায় সমুদ্র পাড়ি দিয়ে মানুষের জীবন ঝুঁকিতে ফেলার অভিযোগের বিষয়ে ওই পাচারকারী দাবি করেন, যাত্রার ঝুঁকি সম্পর্কে আগেই জানিয়ে দেওয়া হয়।
তিনি একটি তথাকথিত ‘ডিসক্লেমার ফর্ম’-এর কথা জানান, যেখানে লেখা থাকে যাত্রাপথে মৃত্যু, গ্রেপ্তার বা নিখোঁজ হওয়ার জন্য পাচারকারী দায়ী থাকবে না।
ওই ফর্মে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের স্বাক্ষর নেওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি।
তবে অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন কোনো কাগজপত্র মানবপাচারকারীদের দায়মুক্তি দিতে পারে না। কারণ অর্থের বিনিময়ে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় মানুষকে ঠেলে দেওয়া নিজেই একটি অপরাধ।
রোয়ান্ডা পরিকল্পনাও ঠেকাতে পারেনি যাত্রা
অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে যুক্তরাজ্য সরকার রোয়ান্ডা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল। এর আওতায় অবৈধভাবে ব্রিটেনে প্রবেশকারীদের আফ্রিকার দেশ রোয়ান্ডায় পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ব্রিটিশ সরকারের দাবি, এই পরিকল্পনার মাধ্যমে মানবপাচারকারীদের ব্যবসা বন্ধ করা সম্ভব হবে।
কিন্তু তুরস্কের ওই পাচারকারী দাবি করেন, এতে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের আগ্রহ কমবে না।
তিনি বলেন, ‘ব্রিটেন যদি প্রতিদিন এক হাজার মানুষকেও রোয়ান্ডায় পাঠায়, তবুও তারা থামবে না। যারা মৃত্যুকে ভয় পায় না, তারা রোয়ান্ডাকে ভয় পাবে না।’
ইংলিশ চ্যানেলে বাড়ছে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা
ব্রিটিশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে ব্রিটেনে প্রবেশের চেষ্টা দিন দিন বাড়ছে। চলতি বছরেই ৩০ হাজারের বেশি মানুষ এই বিপজ্জনক পথ ব্যবহার করেছে।
গত বছরও প্রায় ৩০ হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশী একইভাবে চ্যানেল অতিক্রম করেছে।
মানবপাচারকারীরা তুরস্ক থেকে শুরু করে গ্রিস, ইতালি, ফ্রান্স হয়ে ব্রিটেনে পৌঁছানোর পুরো রুট নিয়ন্ত্রণ করে। পথে বিভিন্ন অপরাধী চক্রও যুক্ত থাকে।
ভুয়া কাগজপত্র থেকে প্রশিক্ষণ সবই মেলে
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পাচারকারী চক্র শুধু নৌযাত্রার ব্যবস্থা করে না; তারা ভুয়া পাসপোর্ট, ভুয়া পরিচয়পত্র, এমনকি অভিবাসন কর্মকর্তাদের সম্ভাব্য প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রশিক্ষণও বিক্রি করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা বিভিন্ন প্যাকেজের বিজ্ঞাপন দেয়। অর্থের পরিমাণ অনুযায়ী যাত্রার সুবিধাও নির্ধারণ করা হয়।
যারা বেশি অর্থ দিতে পারে, তাদের জন্য তুলনামূলক উন্নত ব্যবস্থার কথাও জানিয়েছেন ওই পাচারকারী।
হাজারো প্রাণ যাচ্ছে সমুদ্রপথে
ভূমধ্যসাগর ও ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিতে গিয়ে প্রতিবছর বহু মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। গত বছর শুধু ভূমধ্যসাগরেই প্রায় দুই হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে।
তারপরও উন্নত জীবনের আশায় মানুষ এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে পা বাড়াচ্ছে।
অভিবাসন বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব ও বৈধ অভিবাসনের সীমিত সুযোগ মানুষকে পাচারকারীদের ওপর নির্ভরশীল করে তুলছে।
মানবিক সংকটের আড়ালে কোটি ডলারের বাণিজ্য
তুরস্কের ওই পাচারকারী নিজেকে ব্যবসায়ী হিসেবে উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, এটি অন্য যেকোনো ব্যবসার মতোই পরিচালনা করেন তিনি।
কিন্তু বাস্তবে এই ‘ব্যবসা’র মূল পণ্য মানুষের অসহায়ত্ব। স্বপ্ন দেখিয়ে, ভয় দেখিয়ে এবং বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানবপাচারের বিশাল নেটওয়ার্ক।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ বা কঠোর আইন দিয়ে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। নিরাপদ অভিবাসনের সুযোগ বাড়ানো, ভুয়া নিয়োগ বন্ধ করা এবং পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর বিচার নিশ্চিত করাই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।
সূত্র: বিবিসি

অবৈধ পথে ইউরোপ যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে হাজার হাজার মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় ঠেলে দিচ্ছে আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্র। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভুয়া কাগজপত্র, মিথ্যা আশ্বাস আর বিপজ্জনক সমুদ্রপথ সবকিছুকে কাজে লাগিয়ে গড়ে উঠেছে কোটি কোটি ডলারের অবৈধ এই ব্যবসা।
তুরস্কের ইস্তাম্বুলে এক মানবপাচারকারীর সঙ্গে কথা বলে এই চক্রের ভেতরের নানা তথ্য তুলে ধরেছে বিবিসির অনুসন্ধানী অনুষ্ঠান প্যানোরামা। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে ওই পাচারকারী জানিয়েছেন, কীভাবে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ইউরোপে পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়া পরিচালনা করা হয়।
ইস্তাম্বুলের একটি গোপন আস্তানায় বিবিসির সাংবাদিকের সঙ্গে দেখা করেন মধ্যপ্রাচ্যের বংশোদ্ভূত ওই তরুণ পাচারকারী। নিজেকে অপরাধী হিসেবে দেখতে নারাজ তিনি। দাবি করেন, তিনি নাকি মানুষের সহায়তা করছেন।
মানবপাচার অবৈধ এ কথা স্বীকার করেও তিনি বলেন, ‘আমার কাছে এটি মানবিকতার বিষয়। আমরা মানুষকে সাহায্য করি, তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করি। কাউকে অপমান বা আঘাত করি না।’
তবে বাস্তবতা বলছে, এই ব্যবসার পেছনে রয়েছে বিপুল অর্থের লেনদেন এবং হাজারো মানুষের জীবন ঝুঁকিতে ফেলার ভয়ংকর চিত্র।
মাথাপিছু ১৭ হাজার ডলারের ব্যবসা
তুরস্ক থেকে ইউরোপে মানবপাচার এখন একটি সুসংগঠিত অবৈধ ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। পাচারকারী জানান, একজন মানুষকে ব্রিটেনে পৌঁছে দিতে গড়ে ১৭ হাজার ডলার পর্যন্ত নেওয়া হয়।
তিনি বলেন, ‘পুরো পরিবার যাচ্ছে নাকি একজন যাচ্ছে, তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। মাথাপিছু একই রেট।’
তার ভাষ্য অনুযায়ী, অভিবাসনপ্রত্যাশীদের প্রথমে ইস্তাম্বুলের বিভিন্ন নিরাপদ বাড়িতে রাখা হয়। সেখানে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। পরে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে গভীর রাতে তাদের ভ্যানে করে পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়।
এরপর ছোট ছোট দলে ভাগ করে পায়ে হেঁটে সমুদ্রতীরে পৌঁছানো হয়। সেখান থেকে শুরু হয় বিপজ্জনক নৌযাত্রা।
দায় এড়াতে ‘চুক্তিপত্র’
ছোট নৌকায় সমুদ্র পাড়ি দিয়ে মানুষের জীবন ঝুঁকিতে ফেলার অভিযোগের বিষয়ে ওই পাচারকারী দাবি করেন, যাত্রার ঝুঁকি সম্পর্কে আগেই জানিয়ে দেওয়া হয়।
তিনি একটি তথাকথিত ‘ডিসক্লেমার ফর্ম’-এর কথা জানান, যেখানে লেখা থাকে যাত্রাপথে মৃত্যু, গ্রেপ্তার বা নিখোঁজ হওয়ার জন্য পাচারকারী দায়ী থাকবে না।
ওই ফর্মে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের স্বাক্ষর নেওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি।
তবে অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন কোনো কাগজপত্র মানবপাচারকারীদের দায়মুক্তি দিতে পারে না। কারণ অর্থের বিনিময়ে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় মানুষকে ঠেলে দেওয়া নিজেই একটি অপরাধ।
রোয়ান্ডা পরিকল্পনাও ঠেকাতে পারেনি যাত্রা
অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে যুক্তরাজ্য সরকার রোয়ান্ডা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল। এর আওতায় অবৈধভাবে ব্রিটেনে প্রবেশকারীদের আফ্রিকার দেশ রোয়ান্ডায় পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ব্রিটিশ সরকারের দাবি, এই পরিকল্পনার মাধ্যমে মানবপাচারকারীদের ব্যবসা বন্ধ করা সম্ভব হবে।
কিন্তু তুরস্কের ওই পাচারকারী দাবি করেন, এতে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের আগ্রহ কমবে না।
তিনি বলেন, ‘ব্রিটেন যদি প্রতিদিন এক হাজার মানুষকেও রোয়ান্ডায় পাঠায়, তবুও তারা থামবে না। যারা মৃত্যুকে ভয় পায় না, তারা রোয়ান্ডাকে ভয় পাবে না।’
ইংলিশ চ্যানেলে বাড়ছে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা
ব্রিটিশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে ব্রিটেনে প্রবেশের চেষ্টা দিন দিন বাড়ছে। চলতি বছরেই ৩০ হাজারের বেশি মানুষ এই বিপজ্জনক পথ ব্যবহার করেছে।
গত বছরও প্রায় ৩০ হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশী একইভাবে চ্যানেল অতিক্রম করেছে।
মানবপাচারকারীরা তুরস্ক থেকে শুরু করে গ্রিস, ইতালি, ফ্রান্স হয়ে ব্রিটেনে পৌঁছানোর পুরো রুট নিয়ন্ত্রণ করে। পথে বিভিন্ন অপরাধী চক্রও যুক্ত থাকে।
ভুয়া কাগজপত্র থেকে প্রশিক্ষণ সবই মেলে
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পাচারকারী চক্র শুধু নৌযাত্রার ব্যবস্থা করে না; তারা ভুয়া পাসপোর্ট, ভুয়া পরিচয়পত্র, এমনকি অভিবাসন কর্মকর্তাদের সম্ভাব্য প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রশিক্ষণও বিক্রি করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা বিভিন্ন প্যাকেজের বিজ্ঞাপন দেয়। অর্থের পরিমাণ অনুযায়ী যাত্রার সুবিধাও নির্ধারণ করা হয়।
যারা বেশি অর্থ দিতে পারে, তাদের জন্য তুলনামূলক উন্নত ব্যবস্থার কথাও জানিয়েছেন ওই পাচারকারী।
হাজারো প্রাণ যাচ্ছে সমুদ্রপথে
ভূমধ্যসাগর ও ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিতে গিয়ে প্রতিবছর বহু মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। গত বছর শুধু ভূমধ্যসাগরেই প্রায় দুই হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে।
তারপরও উন্নত জীবনের আশায় মানুষ এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে পা বাড়াচ্ছে।
অভিবাসন বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব ও বৈধ অভিবাসনের সীমিত সুযোগ মানুষকে পাচারকারীদের ওপর নির্ভরশীল করে তুলছে।
মানবিক সংকটের আড়ালে কোটি ডলারের বাণিজ্য
তুরস্কের ওই পাচারকারী নিজেকে ব্যবসায়ী হিসেবে উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, এটি অন্য যেকোনো ব্যবসার মতোই পরিচালনা করেন তিনি।
কিন্তু বাস্তবে এই ‘ব্যবসা’র মূল পণ্য মানুষের অসহায়ত্ব। স্বপ্ন দেখিয়ে, ভয় দেখিয়ে এবং বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানবপাচারের বিশাল নেটওয়ার্ক।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ বা কঠোর আইন দিয়ে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। নিরাপদ অভিবাসনের সুযোগ বাড়ানো, ভুয়া নিয়োগ বন্ধ করা এবং পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর বিচার নিশ্চিত করাই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।
সূত্র: বিবিসি

তুরস্কের এক পাচারকারীর মুখে ইউরোপ যাত্রার গল্প
সিজেডএন ডেস্ক

অবৈধ পথে ইউরোপ যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে হাজার হাজার মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় ঠেলে দিচ্ছে আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্র। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভুয়া কাগজপত্র, মিথ্যা আশ্বাস আর বিপজ্জনক সমুদ্রপথ সবকিছুকে কাজে লাগিয়ে গড়ে উঠেছে কোটি কোটি ডলারের অবৈধ এই ব্যবসা।
তুরস্কের ইস্তাম্বুলে এক মানবপাচারকারীর সঙ্গে কথা বলে এই চক্রের ভেতরের নানা তথ্য তুলে ধরেছে বিবিসির অনুসন্ধানী অনুষ্ঠান প্যানোরামা। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে ওই পাচারকারী জানিয়েছেন, কীভাবে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ইউরোপে পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়া পরিচালনা করা হয়।
ইস্তাম্বুলের একটি গোপন আস্তানায় বিবিসির সাংবাদিকের সঙ্গে দেখা করেন মধ্যপ্রাচ্যের বংশোদ্ভূত ওই তরুণ পাচারকারী। নিজেকে অপরাধী হিসেবে দেখতে নারাজ তিনি। দাবি করেন, তিনি নাকি মানুষের সহায়তা করছেন।
মানবপাচার অবৈধ এ কথা স্বীকার করেও তিনি বলেন, ‘আমার কাছে এটি মানবিকতার বিষয়। আমরা মানুষকে সাহায্য করি, তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করি। কাউকে অপমান বা আঘাত করি না।’
তবে বাস্তবতা বলছে, এই ব্যবসার পেছনে রয়েছে বিপুল অর্থের লেনদেন এবং হাজারো মানুষের জীবন ঝুঁকিতে ফেলার ভয়ংকর চিত্র।
মাথাপিছু ১৭ হাজার ডলারের ব্যবসা
তুরস্ক থেকে ইউরোপে মানবপাচার এখন একটি সুসংগঠিত অবৈধ ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। পাচারকারী জানান, একজন মানুষকে ব্রিটেনে পৌঁছে দিতে গড়ে ১৭ হাজার ডলার পর্যন্ত নেওয়া হয়।
তিনি বলেন, ‘পুরো পরিবার যাচ্ছে নাকি একজন যাচ্ছে, তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। মাথাপিছু একই রেট।’
তার ভাষ্য অনুযায়ী, অভিবাসনপ্রত্যাশীদের প্রথমে ইস্তাম্বুলের বিভিন্ন নিরাপদ বাড়িতে রাখা হয়। সেখানে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। পরে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে গভীর রাতে তাদের ভ্যানে করে পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়।
এরপর ছোট ছোট দলে ভাগ করে পায়ে হেঁটে সমুদ্রতীরে পৌঁছানো হয়। সেখান থেকে শুরু হয় বিপজ্জনক নৌযাত্রা।
দায় এড়াতে ‘চুক্তিপত্র’
ছোট নৌকায় সমুদ্র পাড়ি দিয়ে মানুষের জীবন ঝুঁকিতে ফেলার অভিযোগের বিষয়ে ওই পাচারকারী দাবি করেন, যাত্রার ঝুঁকি সম্পর্কে আগেই জানিয়ে দেওয়া হয়।
তিনি একটি তথাকথিত ‘ডিসক্লেমার ফর্ম’-এর কথা জানান, যেখানে লেখা থাকে যাত্রাপথে মৃত্যু, গ্রেপ্তার বা নিখোঁজ হওয়ার জন্য পাচারকারী দায়ী থাকবে না।
ওই ফর্মে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের স্বাক্ষর নেওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি।
তবে অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন কোনো কাগজপত্র মানবপাচারকারীদের দায়মুক্তি দিতে পারে না। কারণ অর্থের বিনিময়ে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় মানুষকে ঠেলে দেওয়া নিজেই একটি অপরাধ।
রোয়ান্ডা পরিকল্পনাও ঠেকাতে পারেনি যাত্রা
অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে যুক্তরাজ্য সরকার রোয়ান্ডা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল। এর আওতায় অবৈধভাবে ব্রিটেনে প্রবেশকারীদের আফ্রিকার দেশ রোয়ান্ডায় পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ব্রিটিশ সরকারের দাবি, এই পরিকল্পনার মাধ্যমে মানবপাচারকারীদের ব্যবসা বন্ধ করা সম্ভব হবে।
কিন্তু তুরস্কের ওই পাচারকারী দাবি করেন, এতে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের আগ্রহ কমবে না।
তিনি বলেন, ‘ব্রিটেন যদি প্রতিদিন এক হাজার মানুষকেও রোয়ান্ডায় পাঠায়, তবুও তারা থামবে না। যারা মৃত্যুকে ভয় পায় না, তারা রোয়ান্ডাকে ভয় পাবে না।’
ইংলিশ চ্যানেলে বাড়ছে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা
ব্রিটিশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে ব্রিটেনে প্রবেশের চেষ্টা দিন দিন বাড়ছে। চলতি বছরেই ৩০ হাজারের বেশি মানুষ এই বিপজ্জনক পথ ব্যবহার করেছে।
গত বছরও প্রায় ৩০ হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশী একইভাবে চ্যানেল অতিক্রম করেছে।
মানবপাচারকারীরা তুরস্ক থেকে শুরু করে গ্রিস, ইতালি, ফ্রান্স হয়ে ব্রিটেনে পৌঁছানোর পুরো রুট নিয়ন্ত্রণ করে। পথে বিভিন্ন অপরাধী চক্রও যুক্ত থাকে।
ভুয়া কাগজপত্র থেকে প্রশিক্ষণ সবই মেলে
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পাচারকারী চক্র শুধু নৌযাত্রার ব্যবস্থা করে না; তারা ভুয়া পাসপোর্ট, ভুয়া পরিচয়পত্র, এমনকি অভিবাসন কর্মকর্তাদের সম্ভাব্য প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রশিক্ষণও বিক্রি করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা বিভিন্ন প্যাকেজের বিজ্ঞাপন দেয়। অর্থের পরিমাণ অনুযায়ী যাত্রার সুবিধাও নির্ধারণ করা হয়।
যারা বেশি অর্থ দিতে পারে, তাদের জন্য তুলনামূলক উন্নত ব্যবস্থার কথাও জানিয়েছেন ওই পাচারকারী।
হাজারো প্রাণ যাচ্ছে সমুদ্রপথে
ভূমধ্যসাগর ও ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিতে গিয়ে প্রতিবছর বহু মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। গত বছর শুধু ভূমধ্যসাগরেই প্রায় দুই হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে।
তারপরও উন্নত জীবনের আশায় মানুষ এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে পা বাড়াচ্ছে।
অভিবাসন বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব ও বৈধ অভিবাসনের সীমিত সুযোগ মানুষকে পাচারকারীদের ওপর নির্ভরশীল করে তুলছে।
মানবিক সংকটের আড়ালে কোটি ডলারের বাণিজ্য
তুরস্কের ওই পাচারকারী নিজেকে ব্যবসায়ী হিসেবে উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, এটি অন্য যেকোনো ব্যবসার মতোই পরিচালনা করেন তিনি।
কিন্তু বাস্তবে এই ‘ব্যবসা’র মূল পণ্য মানুষের অসহায়ত্ব। স্বপ্ন দেখিয়ে, ভয় দেখিয়ে এবং বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানবপাচারের বিশাল নেটওয়ার্ক।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ বা কঠোর আইন দিয়ে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। নিরাপদ অভিবাসনের সুযোগ বাড়ানো, ভুয়া নিয়োগ বন্ধ করা এবং পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর বিচার নিশ্চিত করাই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।
সূত্র: বিবিসি









