সীমান্ত পেরিয়ে আসছে মাদক, মহানগরগুলো বড় বাজার

সীমান্ত পেরিয়ে আসছে মাদক, মহানগরগুলো বড় বাজার
নিজস্ব প্রতিবেদক

সীমান্তে মাদক ঢোকার খবর প্রায়ই আসে। বড় চালান ধরা পড়ার ঘটনাও কম নয়। কিন্তু এসব চালানের গন্তব্য কোথায় - সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সামনে আসে দেশের বড় শহরগুলো। সীমান্ত দিয়ে আসা বিপুল পরিমাণ মাদকের খুব অল্প অংশ স্থানীয় বাজারে বিক্রি হয়। এর বড় অংশই সড়ক ও নৌপথে রাজধানীসহ দেশের মহানগরগুলোতে চলে যায়।
গত ১৭ আগস্ট কক্সবাজার থেকে তিন লাখ ইয়াবা নিয়ে একটি প্রাডো গাড়ি ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছিল। চট্টগ্রামে একদিন যাত্রাবিরতির পর গাড়িটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ওঠে। ঢাকায় পৌঁছানোর আগেই কুমিল্লায় সেটি আটক করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ।
এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। গত পাঁচ মাসে কক্সবাজারের বিভিন্ন সীমান্তে প্রায় ২৭ লাখ ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি চালানের গন্তব্য ছিল ঢাকা। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, রাজধানীতে পৌঁছানোর পর এসব মাদক দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল।
অর্থাৎ সীমান্তে মাদক প্রবেশের পর তার পথ থেমে যাচ্ছে না, বরং তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ একটি সরবরাহশৃঙ্খল-কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম, সেখান থেকে কুমিল্লা হয়ে ঢাকা; আবার রাজধানী ও অন্যান্য বড় শহর থেকে তা ছড়িয়ে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে হওয়া বিচারাধীন মামলার তথ্য বিশ্লেষণেও এই প্রবণতার সঙ্গে মিল পাওয়া যায়।
বড় বাজার আট মহানগরে
তবে মহানগরগুলোর মধ্যে মামলার চাপ সমান নয়। সবচেয়ে বেশি মামলা ঢাকা মহানগরে—২১ হাজার ৯২০টি। দ্বিতীয় অবস্থানে চট্টগ্রাম মহানগর—১৫ হাজার ৪৪টি।
শুধু ঢাকা ও চট্টগ্রামেই বিচারাধীন গুরুতর মাদক মামলার সংখ্যা ৩৬ হাজার ৯৬৪। আট মহানগরের মোট মামলার প্রায় ৭৭ শতাংশই এই দুই শহরে।
অন্য মহানগরগুলোর মধ্যে রাজশাহীতে ৪ হাজার ১২১, গাজীপুরে ২ হাজার ৬২৩, রংপুরে ১ হাজার ২১৮, খুলনায় ১ হাজার ১৮৭, বরিশালে ১ হাজার ২১ এবং সিলেটে ৮১৪টি মামলা বিচারাধীন।
এই পরিসংখ্যান মাদক বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে—যেসব এলাকায় জনসংখ্যা বেশি, পরিবহনব্যবস্থা বিস্তৃত এবং ক্রেতার বাজার বড়, সেসব শহরেই মাদকের মামলা ও বাজারের চাপ বেশি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, বড় শহরগুলো মাদক কারবারিদের জন্য একাধিক সুবিধা তৈরি করে। বিপুল জনসংখ্যার কারণে ক্রেতা পাওয়া সহজ। ভাড়া বাসা ও অস্থায়ী আবাসে মাদক মজুত করা যায়। পাশাপাশি সড়ক, নৌ ও রেল যোগাযোগ থাকায় দ্রুত এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় চালান সরিয়ে নেওয়া সম্ভব।
কক্সবাজার থেকে ঢাকা: একটি অন্যতম সরবরাহ করিডর
মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা কক্সবাজার দীর্ঘদিন ধরেই ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ বা আইস প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ পথ। সীমান্ত দিয়ে ঢোকার পর এসব মাদকের একটি বড় অংশ চট্টগ্রাম হয়ে রাজধানীমুখী হয়।
চলতি বছরের ১১ এপ্রিল নাফ নদীসংলগ্ন সীমান্ত এলাকায় এক অভিযানেই ১০ লাখ ৫৯ হাজার ৪০০ ইয়াবা উদ্ধার করে বিজিবি। বাহিনীর হিসাবে, এক দিনে তাদের ইতিহাসে এটিই ছিল ইয়াবা জব্দের সবচেয়ে বড় ঘটনা। এরপরও উখিয়া, টেকনাফ ও রামুতে বড় চালান ধরা পড়েছে।
চট্টগ্রামও এই সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। গত ১০ এপ্রিল কক্সবাজার সীমান্ত থেকে আসা একটি মাছ ধরার ট্রলার থেকে চট্টগ্রাম নগরে পাঁচ লাখ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।
এরপর আসে কুমিল্লা। কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় সড়কপথে এই জেলার ওপর দিয়ে যেতে হয়। গত আগস্টে তিন লাখ ইয়াবার চালান আটকের ঘটনাটি তারই উদাহরণ। এর আগে জুনেও কুমিল্লায় গাড়িতে পরিবহনের সময় এক লাখ ৬০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার হয়।
কুমিল্লায় বর্তমানে ন্যূনতম পাঁচ বছর বা তার বেশি শাস্তিযোগ্য মাদক মামলাই বিচারাধীন ১০ হাজার ৪৬৪টি।
শুধু এই তিনটি জেলার তথ্যই মাদক সরবরাহের পথ সম্পর্কে একটি ধারণা দেয়। কক্সবাজারে বিচারাধীন গুরুতর মাদক মামলা ১২ হাজার ৬০০টি, যা দেশের জেলাগুলোর মধ্যে তৃতীয় সর্বোচ্চ। কুমিল্লার পাশাপাশি রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জেও এমন মামলা রয়েছে ৭ হাজার ৪১১টি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিচারাধীন গুরুতর মাদক মামলা ৫ হাজার ৯২৭টি, রাজশাহীতে ৫ হাজার ১২৬ এবং দিনাজপুরে ৪ হাজার ১৪৮টি।
ফলে মামলার ভৌগোলিক বিস্তারেও একটি প্রবণতা স্পষ্ট-সীমান্ত, পরিবহন করিডর এবং বড় বাজার-এই তিন ধরনের এলাকাতেই মাদক মামলার চাপ তুলনামূলক বেশি।
যতটা ধরা পড়ে, তার চেয়ে অনেক বেশি থেকে যায়
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ভেতর দিয়ে যত মাদক চোরাচালান হয়, তার সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়। অর্থাৎ আনুমানিক ৮০ শতাংশ মাদকই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়িয়ে যায়।
এ কারণেই বড় চালান আটকের ঘটনাকে মাদক নিয়ন্ত্রণের সাফল্য হিসেবে দেখলেও এর বিপরীত ছবিটিও বিবেচনায় নিতে হয়। একটি চালান ধরা পড়ার অর্থ একই সময়ে আরও বহু চালান দেশের ভেতরে পৌঁছে যাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া নয়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হাসান মারুফ বলেন, প্রায় সব মাদকই বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রবেশ করে। সীমান্ত এলাকায় মাদকবিরোধী তৎপরতা বেশি থাকায় বড় চালান ধরা পড়ার ঘটনাও সেখানে বেশি।
ঢাকায় মামলার সংখ্যা বেশি হওয়ার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, বড় শহরে ভাসমান মানুষ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেশি। মাদকসেবীর সংখ্যাও সেখানে বেশি থাকে। সীমান্ত দিয়ে মাদক ঢুকলেও বড় বাজার হিসেবে শেষ পর্যন্ত ঢাকা শহরের নামই আসে।
নিষিদ্ধ মাদক ব্যবহারকারী ৮২ লাখ
মাদকের বাজার যে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, তা উঠে এসেছে সরকারের তত্ত্বাবধানে করা গবেষণাতেও।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে গত বছর বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি (বিএমইউ) ও রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্টস লিমিটেড (আরএমসিএল) পরিচালিত গবেষণায় দেশে অবৈধ মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৮১ লাখ ৯৫ হাজার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মোট জনসংখ্যার হিসাবে এই হার ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
গবেষণায় আরও বলা হয়, মাদক ব্যবহারকারীরা বছরে আনুমানিক ৫৯ হাজার কোটি টাকা মাদকের পেছনে ব্যয় করেন। প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, তাঁরা সহজেই মাদক পান।
অর্থাৎ মাদক সরবরাহের অবকাঠামো যতক্ষণ সক্রিয় থাকে, ততক্ষণ কেবল সীমান্তে অভিযান চালিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
১৩৫ কার্যদিবসের মামলা, চলতে থাকে ১০ বছর
সরবরাহের পাশাপাশি মাদক নিয়ন্ত্রণের আরেকটি দুর্বল জায়গা বিচারপ্রক্রিয়া। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৫১ ধারা অনুযায়ী, বিচার শুরুর জন্য মামলা পাওয়ার পর ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে তা নিষ্পত্তি করার কথা। অনিবার্য কারণে তা সম্ভব না হলে আরও ৩০ কার্যদিবস এবং যুক্তিসংগত কারণে সর্বশেষ আরও ১৫ কার্যদিবস সময় নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ ১৩৫ কার্যদিবস। কিন্তু বাস্তব চিত্র এর সম্পূর্ণ বিপরীত।
চট্টগ্রামের একটি মাদক মামলাই এর উদাহরণ। ২০১৬ সালে করা মামলাটি প্রায় ১০ বছর ধরে চলেছে। সাক্ষীরা আদালতে উপস্থিত না হওয়ায় দীর্ঘদিন সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়েই আটকে ছিল মামলা। শেষ পর্যন্ত চলতি বছরের ৫ জুন আসামি মো. রমজান আলী খালাস পান। মামলার দীর্ঘ সময়ে বিভিন্ন মেয়াদে তাঁকে কারাগারেও থাকতে হয়েছে।
আদালতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, তদন্ত শেষ করা ও অভিযোগপত্র দিতে বিলম্বের পর বিচারপর্বেও সাক্ষীর অনুপস্থিতি, তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য দিতে না আসা, আলামত উপস্থাপনে জটিলতা, রাষ্ট্রপক্ষের প্রস্তুতির ঘাটতি এবং বিচারকের স্বল্পতা মামলাকে দীর্ঘায়িত করে।
ফলে আইনে ১৩৫ কার্যদিবসের সীমা থাকলেও বাস্তবে একটি মাদক মামলা শেষ হতে লেগে যাচ্ছে বছরের পর বছর।
এক লাখ মামলার জন্য ২২ ট্রাইব্যুনাল
মামলার এই দীর্ঘসূত্রতা কাটাতে ৩ সেপ্টেম্বর সরকার ১০ জেলা ও মহানগর এলাকার জন্য ২২টি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে। এসব ট্রাইব্যুনালে ন্যূনতম পাঁচ বছর বা তার বেশি শাস্তিযোগ্য চলমান মাদক মামলাগুলো স্থানান্তর করা হবে।
আইন মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, এসব এলাকায় এমন বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ২ হাজার ৫৪০। অর্থাৎ দেশে বিচারাধীন গুরুতর মাদক মামলার প্রায় ৬২ শতাংশই নতুন ট্রাইব্যুনালের আওতায় আসবে।
ঢাকা মহানগরের জন্য চারটি এবং ঢাকা জেলার জন্য একটি ট্রাইব্যুনাল করা হয়েছে। চট্টগ্রাম মহানগরের জন্য তিনটি ও জেলার জন্য একটি। কক্সবাজারে তিনটি এবং কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জে দুটি করে ট্রাইব্যুনাল করা হয়েছে। রাজশাহী জেলা ও মহানগরের জন্য দুটি এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বগুড়া, দিনাজপুর ও যশোরে একটি করে ট্রাইব্যুনাল রয়েছে।
ট্রাইব্যুনাল গঠনের এলাকাগুলোও তাৎপর্যপূর্ণ। এগুলোর মধ্যে রয়েছে রাজধানী ও বড় মহানগর, মাদক প্রবেশের সীমান্তবর্তী জেলা এবং মাদক পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ করিডর।
শুধু সীমান্ত বন্ধ করলেই কি বাজার বন্ধ হবে?
দেশে মাদক প্রবেশের প্রধান পথ সীমান্ত হলেও এর বাজার সীমান্তে সীমাবদ্ধ নয়। বরং সীমান্ত থেকে কয়েক শ কিলোমিটার দূরের বড় শহরগুলোই হয়ে উঠছে মাদকের চাহিদা ও সরবরাহের কেন্দ্র।
ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিভাগের পরিচালক ইকবাল মাসুদ বলেন, ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে মাদকের বড় ভোক্তাশ্রেণি তৈরি হয়েছে। টেকনাফসহ সীমান্ত দিয়ে আসা মাদক নানা পথে এসব শহরে পৌঁছাচ্ছে। কোনো সীমান্তে কড়াকড়ি হলে পাচারকারীরা রুট বদলে অন্য সীমান্ত ব্যবহার করছে। এমনকি বাংলাদেশকে কখনো ট্রানজিট হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে। তাঁর মতে, সীমান্ত থেকে নগর পর্যন্ত মাদকের পুরো সরবরাহব্যবস্থা ঠেকাতে না পারলে মাদক প্রতিরোধ সম্ভব না।

সীমান্তে মাদক ঢোকার খবর প্রায়ই আসে। বড় চালান ধরা পড়ার ঘটনাও কম নয়। কিন্তু এসব চালানের গন্তব্য কোথায় - সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সামনে আসে দেশের বড় শহরগুলো। সীমান্ত দিয়ে আসা বিপুল পরিমাণ মাদকের খুব অল্প অংশ স্থানীয় বাজারে বিক্রি হয়। এর বড় অংশই সড়ক ও নৌপথে রাজধানীসহ দেশের মহানগরগুলোতে চলে যায়।
গত ১৭ আগস্ট কক্সবাজার থেকে তিন লাখ ইয়াবা নিয়ে একটি প্রাডো গাড়ি ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছিল। চট্টগ্রামে একদিন যাত্রাবিরতির পর গাড়িটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ওঠে। ঢাকায় পৌঁছানোর আগেই কুমিল্লায় সেটি আটক করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ।
এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। গত পাঁচ মাসে কক্সবাজারের বিভিন্ন সীমান্তে প্রায় ২৭ লাখ ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি চালানের গন্তব্য ছিল ঢাকা। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, রাজধানীতে পৌঁছানোর পর এসব মাদক দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল।
অর্থাৎ সীমান্তে মাদক প্রবেশের পর তার পথ থেমে যাচ্ছে না, বরং তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ একটি সরবরাহশৃঙ্খল-কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম, সেখান থেকে কুমিল্লা হয়ে ঢাকা; আবার রাজধানী ও অন্যান্য বড় শহর থেকে তা ছড়িয়ে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে হওয়া বিচারাধীন মামলার তথ্য বিশ্লেষণেও এই প্রবণতার সঙ্গে মিল পাওয়া যায়।
বড় বাজার আট মহানগরে
তবে মহানগরগুলোর মধ্যে মামলার চাপ সমান নয়। সবচেয়ে বেশি মামলা ঢাকা মহানগরে—২১ হাজার ৯২০টি। দ্বিতীয় অবস্থানে চট্টগ্রাম মহানগর—১৫ হাজার ৪৪টি।
শুধু ঢাকা ও চট্টগ্রামেই বিচারাধীন গুরুতর মাদক মামলার সংখ্যা ৩৬ হাজার ৯৬৪। আট মহানগরের মোট মামলার প্রায় ৭৭ শতাংশই এই দুই শহরে।
অন্য মহানগরগুলোর মধ্যে রাজশাহীতে ৪ হাজার ১২১, গাজীপুরে ২ হাজার ৬২৩, রংপুরে ১ হাজার ২১৮, খুলনায় ১ হাজার ১৮৭, বরিশালে ১ হাজার ২১ এবং সিলেটে ৮১৪টি মামলা বিচারাধীন।
এই পরিসংখ্যান মাদক বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে—যেসব এলাকায় জনসংখ্যা বেশি, পরিবহনব্যবস্থা বিস্তৃত এবং ক্রেতার বাজার বড়, সেসব শহরেই মাদকের মামলা ও বাজারের চাপ বেশি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, বড় শহরগুলো মাদক কারবারিদের জন্য একাধিক সুবিধা তৈরি করে। বিপুল জনসংখ্যার কারণে ক্রেতা পাওয়া সহজ। ভাড়া বাসা ও অস্থায়ী আবাসে মাদক মজুত করা যায়। পাশাপাশি সড়ক, নৌ ও রেল যোগাযোগ থাকায় দ্রুত এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় চালান সরিয়ে নেওয়া সম্ভব।
কক্সবাজার থেকে ঢাকা: একটি অন্যতম সরবরাহ করিডর
মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা কক্সবাজার দীর্ঘদিন ধরেই ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ বা আইস প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ পথ। সীমান্ত দিয়ে ঢোকার পর এসব মাদকের একটি বড় অংশ চট্টগ্রাম হয়ে রাজধানীমুখী হয়।
চলতি বছরের ১১ এপ্রিল নাফ নদীসংলগ্ন সীমান্ত এলাকায় এক অভিযানেই ১০ লাখ ৫৯ হাজার ৪০০ ইয়াবা উদ্ধার করে বিজিবি। বাহিনীর হিসাবে, এক দিনে তাদের ইতিহাসে এটিই ছিল ইয়াবা জব্দের সবচেয়ে বড় ঘটনা। এরপরও উখিয়া, টেকনাফ ও রামুতে বড় চালান ধরা পড়েছে।
চট্টগ্রামও এই সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। গত ১০ এপ্রিল কক্সবাজার সীমান্ত থেকে আসা একটি মাছ ধরার ট্রলার থেকে চট্টগ্রাম নগরে পাঁচ লাখ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।
এরপর আসে কুমিল্লা। কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় সড়কপথে এই জেলার ওপর দিয়ে যেতে হয়। গত আগস্টে তিন লাখ ইয়াবার চালান আটকের ঘটনাটি তারই উদাহরণ। এর আগে জুনেও কুমিল্লায় গাড়িতে পরিবহনের সময় এক লাখ ৬০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার হয়।
কুমিল্লায় বর্তমানে ন্যূনতম পাঁচ বছর বা তার বেশি শাস্তিযোগ্য মাদক মামলাই বিচারাধীন ১০ হাজার ৪৬৪টি।
শুধু এই তিনটি জেলার তথ্যই মাদক সরবরাহের পথ সম্পর্কে একটি ধারণা দেয়। কক্সবাজারে বিচারাধীন গুরুতর মাদক মামলা ১২ হাজার ৬০০টি, যা দেশের জেলাগুলোর মধ্যে তৃতীয় সর্বোচ্চ। কুমিল্লার পাশাপাশি রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জেও এমন মামলা রয়েছে ৭ হাজার ৪১১টি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিচারাধীন গুরুতর মাদক মামলা ৫ হাজার ৯২৭টি, রাজশাহীতে ৫ হাজার ১২৬ এবং দিনাজপুরে ৪ হাজার ১৪৮টি।
ফলে মামলার ভৌগোলিক বিস্তারেও একটি প্রবণতা স্পষ্ট-সীমান্ত, পরিবহন করিডর এবং বড় বাজার-এই তিন ধরনের এলাকাতেই মাদক মামলার চাপ তুলনামূলক বেশি।
যতটা ধরা পড়ে, তার চেয়ে অনেক বেশি থেকে যায়
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ভেতর দিয়ে যত মাদক চোরাচালান হয়, তার সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়। অর্থাৎ আনুমানিক ৮০ শতাংশ মাদকই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়িয়ে যায়।
এ কারণেই বড় চালান আটকের ঘটনাকে মাদক নিয়ন্ত্রণের সাফল্য হিসেবে দেখলেও এর বিপরীত ছবিটিও বিবেচনায় নিতে হয়। একটি চালান ধরা পড়ার অর্থ একই সময়ে আরও বহু চালান দেশের ভেতরে পৌঁছে যাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া নয়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হাসান মারুফ বলেন, প্রায় সব মাদকই বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রবেশ করে। সীমান্ত এলাকায় মাদকবিরোধী তৎপরতা বেশি থাকায় বড় চালান ধরা পড়ার ঘটনাও সেখানে বেশি।
ঢাকায় মামলার সংখ্যা বেশি হওয়ার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, বড় শহরে ভাসমান মানুষ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেশি। মাদকসেবীর সংখ্যাও সেখানে বেশি থাকে। সীমান্ত দিয়ে মাদক ঢুকলেও বড় বাজার হিসেবে শেষ পর্যন্ত ঢাকা শহরের নামই আসে।
নিষিদ্ধ মাদক ব্যবহারকারী ৮২ লাখ
মাদকের বাজার যে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, তা উঠে এসেছে সরকারের তত্ত্বাবধানে করা গবেষণাতেও।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে গত বছর বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি (বিএমইউ) ও রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্টস লিমিটেড (আরএমসিএল) পরিচালিত গবেষণায় দেশে অবৈধ মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৮১ লাখ ৯৫ হাজার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মোট জনসংখ্যার হিসাবে এই হার ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
গবেষণায় আরও বলা হয়, মাদক ব্যবহারকারীরা বছরে আনুমানিক ৫৯ হাজার কোটি টাকা মাদকের পেছনে ব্যয় করেন। প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, তাঁরা সহজেই মাদক পান।
অর্থাৎ মাদক সরবরাহের অবকাঠামো যতক্ষণ সক্রিয় থাকে, ততক্ষণ কেবল সীমান্তে অভিযান চালিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
১৩৫ কার্যদিবসের মামলা, চলতে থাকে ১০ বছর
সরবরাহের পাশাপাশি মাদক নিয়ন্ত্রণের আরেকটি দুর্বল জায়গা বিচারপ্রক্রিয়া। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৫১ ধারা অনুযায়ী, বিচার শুরুর জন্য মামলা পাওয়ার পর ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে তা নিষ্পত্তি করার কথা। অনিবার্য কারণে তা সম্ভব না হলে আরও ৩০ কার্যদিবস এবং যুক্তিসংগত কারণে সর্বশেষ আরও ১৫ কার্যদিবস সময় নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ ১৩৫ কার্যদিবস। কিন্তু বাস্তব চিত্র এর সম্পূর্ণ বিপরীত।
চট্টগ্রামের একটি মাদক মামলাই এর উদাহরণ। ২০১৬ সালে করা মামলাটি প্রায় ১০ বছর ধরে চলেছে। সাক্ষীরা আদালতে উপস্থিত না হওয়ায় দীর্ঘদিন সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়েই আটকে ছিল মামলা। শেষ পর্যন্ত চলতি বছরের ৫ জুন আসামি মো. রমজান আলী খালাস পান। মামলার দীর্ঘ সময়ে বিভিন্ন মেয়াদে তাঁকে কারাগারেও থাকতে হয়েছে।
আদালতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, তদন্ত শেষ করা ও অভিযোগপত্র দিতে বিলম্বের পর বিচারপর্বেও সাক্ষীর অনুপস্থিতি, তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য দিতে না আসা, আলামত উপস্থাপনে জটিলতা, রাষ্ট্রপক্ষের প্রস্তুতির ঘাটতি এবং বিচারকের স্বল্পতা মামলাকে দীর্ঘায়িত করে।
ফলে আইনে ১৩৫ কার্যদিবসের সীমা থাকলেও বাস্তবে একটি মাদক মামলা শেষ হতে লেগে যাচ্ছে বছরের পর বছর।
এক লাখ মামলার জন্য ২২ ট্রাইব্যুনাল
মামলার এই দীর্ঘসূত্রতা কাটাতে ৩ সেপ্টেম্বর সরকার ১০ জেলা ও মহানগর এলাকার জন্য ২২টি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে। এসব ট্রাইব্যুনালে ন্যূনতম পাঁচ বছর বা তার বেশি শাস্তিযোগ্য চলমান মাদক মামলাগুলো স্থানান্তর করা হবে।
আইন মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, এসব এলাকায় এমন বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ২ হাজার ৫৪০। অর্থাৎ দেশে বিচারাধীন গুরুতর মাদক মামলার প্রায় ৬২ শতাংশই নতুন ট্রাইব্যুনালের আওতায় আসবে।
ঢাকা মহানগরের জন্য চারটি এবং ঢাকা জেলার জন্য একটি ট্রাইব্যুনাল করা হয়েছে। চট্টগ্রাম মহানগরের জন্য তিনটি ও জেলার জন্য একটি। কক্সবাজারে তিনটি এবং কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জে দুটি করে ট্রাইব্যুনাল করা হয়েছে। রাজশাহী জেলা ও মহানগরের জন্য দুটি এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বগুড়া, দিনাজপুর ও যশোরে একটি করে ট্রাইব্যুনাল রয়েছে।
ট্রাইব্যুনাল গঠনের এলাকাগুলোও তাৎপর্যপূর্ণ। এগুলোর মধ্যে রয়েছে রাজধানী ও বড় মহানগর, মাদক প্রবেশের সীমান্তবর্তী জেলা এবং মাদক পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ করিডর।
শুধু সীমান্ত বন্ধ করলেই কি বাজার বন্ধ হবে?
দেশে মাদক প্রবেশের প্রধান পথ সীমান্ত হলেও এর বাজার সীমান্তে সীমাবদ্ধ নয়। বরং সীমান্ত থেকে কয়েক শ কিলোমিটার দূরের বড় শহরগুলোই হয়ে উঠছে মাদকের চাহিদা ও সরবরাহের কেন্দ্র।
ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিভাগের পরিচালক ইকবাল মাসুদ বলেন, ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে মাদকের বড় ভোক্তাশ্রেণি তৈরি হয়েছে। টেকনাফসহ সীমান্ত দিয়ে আসা মাদক নানা পথে এসব শহরে পৌঁছাচ্ছে। কোনো সীমান্তে কড়াকড়ি হলে পাচারকারীরা রুট বদলে অন্য সীমান্ত ব্যবহার করছে। এমনকি বাংলাদেশকে কখনো ট্রানজিট হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে। তাঁর মতে, সীমান্ত থেকে নগর পর্যন্ত মাদকের পুরো সরবরাহব্যবস্থা ঠেকাতে না পারলে মাদক প্রতিরোধ সম্ভব না।

সীমান্ত পেরিয়ে আসছে মাদক, মহানগরগুলো বড় বাজার
নিজস্ব প্রতিবেদক

সীমান্তে মাদক ঢোকার খবর প্রায়ই আসে। বড় চালান ধরা পড়ার ঘটনাও কম নয়। কিন্তু এসব চালানের গন্তব্য কোথায় - সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সামনে আসে দেশের বড় শহরগুলো। সীমান্ত দিয়ে আসা বিপুল পরিমাণ মাদকের খুব অল্প অংশ স্থানীয় বাজারে বিক্রি হয়। এর বড় অংশই সড়ক ও নৌপথে রাজধানীসহ দেশের মহানগরগুলোতে চলে যায়।
গত ১৭ আগস্ট কক্সবাজার থেকে তিন লাখ ইয়াবা নিয়ে একটি প্রাডো গাড়ি ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছিল। চট্টগ্রামে একদিন যাত্রাবিরতির পর গাড়িটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ওঠে। ঢাকায় পৌঁছানোর আগেই কুমিল্লায় সেটি আটক করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ।
এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। গত পাঁচ মাসে কক্সবাজারের বিভিন্ন সীমান্তে প্রায় ২৭ লাখ ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি চালানের গন্তব্য ছিল ঢাকা। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, রাজধানীতে পৌঁছানোর পর এসব মাদক দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল।
অর্থাৎ সীমান্তে মাদক প্রবেশের পর তার পথ থেমে যাচ্ছে না, বরং তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ একটি সরবরাহশৃঙ্খল-কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম, সেখান থেকে কুমিল্লা হয়ে ঢাকা; আবার রাজধানী ও অন্যান্য বড় শহর থেকে তা ছড়িয়ে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে হওয়া বিচারাধীন মামলার তথ্য বিশ্লেষণেও এই প্রবণতার সঙ্গে মিল পাওয়া যায়।
বড় বাজার আট মহানগরে
তবে মহানগরগুলোর মধ্যে মামলার চাপ সমান নয়। সবচেয়ে বেশি মামলা ঢাকা মহানগরে—২১ হাজার ৯২০টি। দ্বিতীয় অবস্থানে চট্টগ্রাম মহানগর—১৫ হাজার ৪৪টি।
শুধু ঢাকা ও চট্টগ্রামেই বিচারাধীন গুরুতর মাদক মামলার সংখ্যা ৩৬ হাজার ৯৬৪। আট মহানগরের মোট মামলার প্রায় ৭৭ শতাংশই এই দুই শহরে।
অন্য মহানগরগুলোর মধ্যে রাজশাহীতে ৪ হাজার ১২১, গাজীপুরে ২ হাজার ৬২৩, রংপুরে ১ হাজার ২১৮, খুলনায় ১ হাজার ১৮৭, বরিশালে ১ হাজার ২১ এবং সিলেটে ৮১৪টি মামলা বিচারাধীন।
এই পরিসংখ্যান মাদক বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে—যেসব এলাকায় জনসংখ্যা বেশি, পরিবহনব্যবস্থা বিস্তৃত এবং ক্রেতার বাজার বড়, সেসব শহরেই মাদকের মামলা ও বাজারের চাপ বেশি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, বড় শহরগুলো মাদক কারবারিদের জন্য একাধিক সুবিধা তৈরি করে। বিপুল জনসংখ্যার কারণে ক্রেতা পাওয়া সহজ। ভাড়া বাসা ও অস্থায়ী আবাসে মাদক মজুত করা যায়। পাশাপাশি সড়ক, নৌ ও রেল যোগাযোগ থাকায় দ্রুত এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় চালান সরিয়ে নেওয়া সম্ভব।
কক্সবাজার থেকে ঢাকা: একটি অন্যতম সরবরাহ করিডর
মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা কক্সবাজার দীর্ঘদিন ধরেই ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ বা আইস প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ পথ। সীমান্ত দিয়ে ঢোকার পর এসব মাদকের একটি বড় অংশ চট্টগ্রাম হয়ে রাজধানীমুখী হয়।
চলতি বছরের ১১ এপ্রিল নাফ নদীসংলগ্ন সীমান্ত এলাকায় এক অভিযানেই ১০ লাখ ৫৯ হাজার ৪০০ ইয়াবা উদ্ধার করে বিজিবি। বাহিনীর হিসাবে, এক দিনে তাদের ইতিহাসে এটিই ছিল ইয়াবা জব্দের সবচেয়ে বড় ঘটনা। এরপরও উখিয়া, টেকনাফ ও রামুতে বড় চালান ধরা পড়েছে।
চট্টগ্রামও এই সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। গত ১০ এপ্রিল কক্সবাজার সীমান্ত থেকে আসা একটি মাছ ধরার ট্রলার থেকে চট্টগ্রাম নগরে পাঁচ লাখ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।
এরপর আসে কুমিল্লা। কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় সড়কপথে এই জেলার ওপর দিয়ে যেতে হয়। গত আগস্টে তিন লাখ ইয়াবার চালান আটকের ঘটনাটি তারই উদাহরণ। এর আগে জুনেও কুমিল্লায় গাড়িতে পরিবহনের সময় এক লাখ ৬০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার হয়।
কুমিল্লায় বর্তমানে ন্যূনতম পাঁচ বছর বা তার বেশি শাস্তিযোগ্য মাদক মামলাই বিচারাধীন ১০ হাজার ৪৬৪টি।
শুধু এই তিনটি জেলার তথ্যই মাদক সরবরাহের পথ সম্পর্কে একটি ধারণা দেয়। কক্সবাজারে বিচারাধীন গুরুতর মাদক মামলা ১২ হাজার ৬০০টি, যা দেশের জেলাগুলোর মধ্যে তৃতীয় সর্বোচ্চ। কুমিল্লার পাশাপাশি রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জেও এমন মামলা রয়েছে ৭ হাজার ৪১১টি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিচারাধীন গুরুতর মাদক মামলা ৫ হাজার ৯২৭টি, রাজশাহীতে ৫ হাজার ১২৬ এবং দিনাজপুরে ৪ হাজার ১৪৮টি।
ফলে মামলার ভৌগোলিক বিস্তারেও একটি প্রবণতা স্পষ্ট-সীমান্ত, পরিবহন করিডর এবং বড় বাজার-এই তিন ধরনের এলাকাতেই মাদক মামলার চাপ তুলনামূলক বেশি।
যতটা ধরা পড়ে, তার চেয়ে অনেক বেশি থেকে যায়
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ভেতর দিয়ে যত মাদক চোরাচালান হয়, তার সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়। অর্থাৎ আনুমানিক ৮০ শতাংশ মাদকই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়িয়ে যায়।
এ কারণেই বড় চালান আটকের ঘটনাকে মাদক নিয়ন্ত্রণের সাফল্য হিসেবে দেখলেও এর বিপরীত ছবিটিও বিবেচনায় নিতে হয়। একটি চালান ধরা পড়ার অর্থ একই সময়ে আরও বহু চালান দেশের ভেতরে পৌঁছে যাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া নয়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হাসান মারুফ বলেন, প্রায় সব মাদকই বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রবেশ করে। সীমান্ত এলাকায় মাদকবিরোধী তৎপরতা বেশি থাকায় বড় চালান ধরা পড়ার ঘটনাও সেখানে বেশি।
ঢাকায় মামলার সংখ্যা বেশি হওয়ার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, বড় শহরে ভাসমান মানুষ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেশি। মাদকসেবীর সংখ্যাও সেখানে বেশি থাকে। সীমান্ত দিয়ে মাদক ঢুকলেও বড় বাজার হিসেবে শেষ পর্যন্ত ঢাকা শহরের নামই আসে।
নিষিদ্ধ মাদক ব্যবহারকারী ৮২ লাখ
মাদকের বাজার যে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, তা উঠে এসেছে সরকারের তত্ত্বাবধানে করা গবেষণাতেও।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে গত বছর বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি (বিএমইউ) ও রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্টস লিমিটেড (আরএমসিএল) পরিচালিত গবেষণায় দেশে অবৈধ মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৮১ লাখ ৯৫ হাজার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মোট জনসংখ্যার হিসাবে এই হার ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
গবেষণায় আরও বলা হয়, মাদক ব্যবহারকারীরা বছরে আনুমানিক ৫৯ হাজার কোটি টাকা মাদকের পেছনে ব্যয় করেন। প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, তাঁরা সহজেই মাদক পান।
অর্থাৎ মাদক সরবরাহের অবকাঠামো যতক্ষণ সক্রিয় থাকে, ততক্ষণ কেবল সীমান্তে অভিযান চালিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
১৩৫ কার্যদিবসের মামলা, চলতে থাকে ১০ বছর
সরবরাহের পাশাপাশি মাদক নিয়ন্ত্রণের আরেকটি দুর্বল জায়গা বিচারপ্রক্রিয়া। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৫১ ধারা অনুযায়ী, বিচার শুরুর জন্য মামলা পাওয়ার পর ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে তা নিষ্পত্তি করার কথা। অনিবার্য কারণে তা সম্ভব না হলে আরও ৩০ কার্যদিবস এবং যুক্তিসংগত কারণে সর্বশেষ আরও ১৫ কার্যদিবস সময় নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ ১৩৫ কার্যদিবস। কিন্তু বাস্তব চিত্র এর সম্পূর্ণ বিপরীত।
চট্টগ্রামের একটি মাদক মামলাই এর উদাহরণ। ২০১৬ সালে করা মামলাটি প্রায় ১০ বছর ধরে চলেছে। সাক্ষীরা আদালতে উপস্থিত না হওয়ায় দীর্ঘদিন সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়েই আটকে ছিল মামলা। শেষ পর্যন্ত চলতি বছরের ৫ জুন আসামি মো. রমজান আলী খালাস পান। মামলার দীর্ঘ সময়ে বিভিন্ন মেয়াদে তাঁকে কারাগারেও থাকতে হয়েছে।
আদালতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, তদন্ত শেষ করা ও অভিযোগপত্র দিতে বিলম্বের পর বিচারপর্বেও সাক্ষীর অনুপস্থিতি, তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য দিতে না আসা, আলামত উপস্থাপনে জটিলতা, রাষ্ট্রপক্ষের প্রস্তুতির ঘাটতি এবং বিচারকের স্বল্পতা মামলাকে দীর্ঘায়িত করে।
ফলে আইনে ১৩৫ কার্যদিবসের সীমা থাকলেও বাস্তবে একটি মাদক মামলা শেষ হতে লেগে যাচ্ছে বছরের পর বছর।
এক লাখ মামলার জন্য ২২ ট্রাইব্যুনাল
মামলার এই দীর্ঘসূত্রতা কাটাতে ৩ সেপ্টেম্বর সরকার ১০ জেলা ও মহানগর এলাকার জন্য ২২টি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে। এসব ট্রাইব্যুনালে ন্যূনতম পাঁচ বছর বা তার বেশি শাস্তিযোগ্য চলমান মাদক মামলাগুলো স্থানান্তর করা হবে।
আইন মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, এসব এলাকায় এমন বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ২ হাজার ৫৪০। অর্থাৎ দেশে বিচারাধীন গুরুতর মাদক মামলার প্রায় ৬২ শতাংশই নতুন ট্রাইব্যুনালের আওতায় আসবে।
ঢাকা মহানগরের জন্য চারটি এবং ঢাকা জেলার জন্য একটি ট্রাইব্যুনাল করা হয়েছে। চট্টগ্রাম মহানগরের জন্য তিনটি ও জেলার জন্য একটি। কক্সবাজারে তিনটি এবং কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জে দুটি করে ট্রাইব্যুনাল করা হয়েছে। রাজশাহী জেলা ও মহানগরের জন্য দুটি এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বগুড়া, দিনাজপুর ও যশোরে একটি করে ট্রাইব্যুনাল রয়েছে।
ট্রাইব্যুনাল গঠনের এলাকাগুলোও তাৎপর্যপূর্ণ। এগুলোর মধ্যে রয়েছে রাজধানী ও বড় মহানগর, মাদক প্রবেশের সীমান্তবর্তী জেলা এবং মাদক পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ করিডর।
শুধু সীমান্ত বন্ধ করলেই কি বাজার বন্ধ হবে?
দেশে মাদক প্রবেশের প্রধান পথ সীমান্ত হলেও এর বাজার সীমান্তে সীমাবদ্ধ নয়। বরং সীমান্ত থেকে কয়েক শ কিলোমিটার দূরের বড় শহরগুলোই হয়ে উঠছে মাদকের চাহিদা ও সরবরাহের কেন্দ্র।
ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিভাগের পরিচালক ইকবাল মাসুদ বলেন, ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে মাদকের বড় ভোক্তাশ্রেণি তৈরি হয়েছে। টেকনাফসহ সীমান্ত দিয়ে আসা মাদক নানা পথে এসব শহরে পৌঁছাচ্ছে। কোনো সীমান্তে কড়াকড়ি হলে পাচারকারীরা রুট বদলে অন্য সীমান্ত ব্যবহার করছে। এমনকি বাংলাদেশকে কখনো ট্রানজিট হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে। তাঁর মতে, সীমান্ত থেকে নগর পর্যন্ত মাদকের পুরো সরবরাহব্যবস্থা ঠেকাতে না পারলে মাদক প্রতিরোধ সম্ভব না।









