শিরোনাম

ঢাকা-১১ আসন

উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটের আশা, দ্বিমুখী লড়াইয়ের আভাস

উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটের আশা, দ্বিমুখী লড়াইয়ের আভাস
রাত পোহালেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। প্রচার-প্রচারণা শেষ। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের পোস্টার ঝুলছে ঢাকা-১১ আসনের বনশ্রী এলাকায় ছবি: সংগৃহীত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গনভোটকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকার প্রতিটি আসনেই এখন টানটান উত্তেজনা। বিশেষ করে ঢাকা-১১ (বাড্ডা-ভাটারা-রামপুরা) রাজনৈতিক উত্তাপ একটু বেশিই। কারণ এখানে আলোচনায় রয়েছেন দুই প্রার্থী। এরা হলেন বিএনপির এম এ কাইয়ুম ও এনসিপির নাহিদ ইসলাম।

স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই আসনে ৯ জন প্রার্থী আছেন। শেষ মুহূর্তে বড় দুই জোটসহ অন্যান্য দলের প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণায় মুখর ছিল বিভিন্ন এলাকা। মাইকিং, পথসভা ও জনসভা শেষ হওয়ার পর এখন আর শোরগোল নেই। এই নিস্তবদ্ধতার মধ্যেও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট হবে আশা প্রকাশ করেছেন এই আসনের সাধারণ ভোটাররা।

বাড্ডা ও রামপুরার অলিগলি এখনও নির্বাচনী পোস্টার ঝুলছে। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে পাড়ার মোড়- সবখানেই আলোচনার মূল বিষয় এখন আগামীকালের ভোট। প্রচারণা থেমে গেলেও ভোটাররা হিসাব-নিকাশ কষছেন কাকে ভোট দেবেন। আগামীকাল ভোটের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে ঢাকা-১১ আসনের জনপ্রতিনিধি।

প্রচারণা বন্ধ থাকলেও প্রার্থীদের দম ফেলার সময় নেই। রামপুরা, বাড্ডা এলাকার একাধিক প্রার্থীর কার্যালয়ে দেখা গেছে কর্মীদের ব্যস্ততা।

এই আসনের কয়েকজন ভোটার বলেন, বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী এম এ কাইয়ুম এই আসন পুনরুদ্ধারে প্রাণপন চেষ্টা চালাচ্ছেন। কিন্তু তার প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন ১১ দলীয় ঐক্যের তরুণ জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের চেতনা এবং নতুন প্রজন্মের ভোটারদের সমর্থন নিয়ে নাহিদ ইসলাম এলাকায় এক নতুন ধারার রাজনীতির জোয়ার সৃষ্টি করেছেন। মূলত এই দুই প্রার্থীর মধ্যেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে।

প্রার্থীদের শেষ মুহূর্তের কৌশল

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্বে থাকায় ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলামের জনপ্রিয়তা আছে। তার প্রতীক শাপলা কলি। তরুণ এই নেতা অনলাইন তথ্যসেবা ও হটলাইনের মাধ্যমে ভোটারদের কেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। তিনি মূলত ‘ভূমিদস্যু নির্মূল’ এবং ‘নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি’র চর্চা শুরুর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।

এই আসনে বিএনপি নেতা এম এ কাইয়ুমও একজন শক্তিশালী প্রার্থী। অভিজ্ঞ ও প্রবীন এই রাজনীতিবিদেরও জনসমর্থন একবারে কম নয়। তার পক্ষে স্থানীয় নেতা-কর্মীদের বিশাল একটি অংশ সক্রিয় রয়েছে। পাশাপাশি কেন্দ্রগুলোতে ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে কর্মীদের বিশেষ নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। এই প্রার্থী ও তার কর্মী-সমর্থকেরা জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।

বনশ্রী এলাকার সি ব্লকে এম এ কাইয়ুমের নির্বাচনী কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকজন কর্মী বসে আছেন। বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছেন। জানতে চাইলে একজন কর্মী বলেন, আগামীকাল সকাল থেকেই ভোট। তাই কে, কোথায়, কীভাবে দায়িত্ব পালন করবে সেই বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেয়া হচ্ছে।

বিএনপি ও এনসিপির প্রার্থীর পাশাপাশি এই আসনে কিছুটা হলেও আলোচনায় আছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় নেতা শেখ ফজলে রাব্বী মাসউদ। ২০২০ সালে তিনি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরশনের নির্বাচনে অংশ নেন এবং ভালো ভোট পান। বাড্ডা ও রামপুরা এলাকার বিশাল একটি অংশের ধর্মপ্রাণ ভোটার এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির মাঝে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। মাসউদের শক্তিশালী অবস্থান মূলত বিএনপি ও ১১ দলের প্রার্থীর ভোট সমীকরণে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সাধারণ ভোটাররা।

এলাকার সমস্যা

এখানে পর্যাপ্তসংখ্যক সরকারি উচ্চবিদ্যালয়, হাসপাতাল এবং খেলার মাঠ নেই। বিশেষ করে ভাটারা ও বাড্ডা এলাকায় কোনো বড় সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্র না থাকায় বাসিন্দাদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এ ছাড়া অনুন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, যানজট এবং মাদক এই আসনের বিভিন্ন এলাকার বড় সমস্যা।

ভোটারদের মানসিকতা

রামপুরা এলাকার কয়েকজন প্রবীণ ভোটার বলেন, এই এলাকায় বিএনপি শক্তিশালী। তবে উত্তর বাড্ডা ও ভাটারার তরুণ ভোটাররা বলছেন ভিন্ন কথা। তারা চান, এমন একজন প্রতিনিধি যিনি এলাকার অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হবেন। বনশ্রী এলাকার একজন প্রবীণ ভোটার নির্বাচন প্রসঙ্গে বলেন, ‘নির্বাচনে এই এলাকার প্রবীণ রাজনীতিবিদের সঙ্গে তরুণ নেতার লড়াই হবে।’

তরুণ ভোটার

এবারের নির্বাচনে নতুন ভোটারদের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। রামপুরার একজন শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা গত ১৫ বছরে অনেক কিছু দেখেছি, এবার চাই এমন কাউকে যিনি সত্যিই এলাকার উন্নয়ন করবেন এবং সবকিছু সিন্ডিকেটমুক্ত করবেন।’

নিরাপত্তা ও প্রস্তুতি

নিরাপত্তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে কিছুটা উদ্বেগ থাকলেও, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল এবং সিসিটিভি ক্যামেরা থাকায় ভোটাররা কেন্দ্রে যাওয়ার সাহস পাচ্ছেন। বিশেষ করে নারী ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জামায়াতসহ বিভিন্ন দল নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে। ভোটকেন্দ্রগুলোতে নির্বাচনী সরঞ্জাম পৌঁছাতে শুরু করেছে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভোটগ্রহণ সুষ্ঠু করতে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন। তবে এই আসনে মূলত বিএনপি এবং ১১-দলীয় জোটের (নাহিদ ইসলাম সমর্থিত) মধ্যে দ্বিমুখী লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তাই নারী ভোটারদের নিরাপত্তা এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

ঢাকা-১১ এখন শুধু একটি নির্বাচনী এলাকা নয়, এটি ‘পুরনো রাজনীতি’ বনাম ‘নতুন ধারার রাজনীতি’র এক পরীক্ষাক্ষেত্র। ১২ ফেব্রুয়ারিই বাড্ডা, ভাটারা ও রামপুরার মানুষ শেষ পর্যন্ত কাকে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে বেছে নেবে- সেই বিষয়টি নির্ধারিত হবে।

/বিবি/