শিরোনাম

রাজধানীর বাস টার্মিনাল স্থানান্তরে ৭ চ্যালেঞ্জ

সিজেডএন  ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
রাজধানীর বাস টার্মিনাল স্থানান্তরে ৭ চ্যালেঞ্জ
রাজধানীর ধোলাইপাড় এলাকায় দূরপাল্লার বাসের জন্য যাত্রীদের অপেক্ষা । ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

যানজট কমাতে ঢাকার বাস টার্মিনাল ও কাউন্টারগুলোকে একটি কাঠামোর মধ্যে আনতে চায় সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ১৫ জুন ৪টি বাস টার্মিনাল শহরের বাইরে স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়েছেন। এগুলো হলো– ফুলবাড়িয়া-গুলিস্তান বাস টার্মিনাল, গাবতলী বাস টার্মিনাল, মহাখালী বাস টার্মিনাল ও সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী বাস টার্মিনাল।

বাস টার্মিনাল সরিয়ে নেওয়ার এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও সড়ক যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও পরিবহন খাত সংশ্লিষ্টরা। যদিও এগুলো ঢাকার বাইরে নেওয়ার ক্ষেত্রে ৭টি চ্যালেঞ্জের কথা জানিয়েছেন তারা।

১. বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সমন্বয়

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বাস টার্মিনাল স্থানান্তরের প্রক্রিয়ায় দুই থেকে আড়াই বছর সময় লাগতে পারে। এক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার বিষয়টি সামনে আনছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারও ঢাকার বাস টার্মিনালগুলো স্থানান্তরের কথা বলেছিল, কিন্তু কাজ হয়নি।

২. অবকাঠামোগত সক্ষমতা

সরকারের পরিকল্পনা হলো– গাবতলী বাস টার্মিনাল সাভারের হেমায়েতপুরে সরানো হবে; সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল নেওয়া হবে কাঁচপুরে; গুলিস্তান-ফুলবাড়িয়া টার্মিনাল যাবে কেরানীগঞ্জে এবং মহাখালী বাস টার্মিনাল অস্থায়ীভাবে ঢাকার পূর্বাচলে– যা পরবর্তীতে টঙ্গীর কাছাকাছি সরিয়ে নেওয়া হবে।

এছাড়া ঢাকার কলাবাগান, কল্যাণপুরসহ যে-সব জায়গায় অস্থায়ী বাস টার্মিনালের মতো তৈরি হয়েছে, সেগুলোও পর্যায়ক্রমে সরিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।

ঢাকার বাইরে যে-সব জায়গায় এই টার্মিনালগুলো নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, সেখানে জমি অধিগ্রহণ, বাস রাখার জায়গা, যাত্রীদের চলাচল ও অপেক্ষা করার ব্যবস্থাসহ নতুন অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়টি চ্যালেঞ্জ হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, ঢাকার বাইরে বিশাল আকৃতির আধুনিক টার্মিনাল তৈরির জন্য বিপুল পরিমাণ জমি অধিগ্রহণ করা এবং সেখানে বিভিন্ন রকম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা একটি দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো– শহরের বাইরে যে-সব অবকাঠামো তৈরির কথা বলা হচ্ছে, সেগুলোকে বাস টার্মিনাল হিসেবে বিবেচনায় না নিয়ে বরং বাস ডিপো হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। বাসগুলো সেখানে থাকবে, যখন তার যাত্রী নেওয়ার সময় হবে তখন সে টার্মিনালে আসবে, যাত্রী নিয়ে চলে যাবে।

রাজধানীর বাস টার্মিনাল স্থানান্তরে ৭ চ্যালেঞ্জ-2
রাজধানীর ধোলাইপাড় এলাকায় সড়কে বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানো হচ্ছে। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

৩. টার্মিনাল থেকে ঢাকায় প্রবেশ

ঢাকার টার্মিনালগুলো সাভারের হেমায়েতপুরে, কাঁচপুর এবং কেরানীগঞ্জের মতো যে-সব জায়গায় নেওয়া হবে, সেসব জায়গার সঙ্গে ঢাকার শাটল বা সংযোগ পরিবহন ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, দূরপাল্লার যাত্রীরা যখন ঢাকার বাইরে নামবেন, তখন তারা কীভাবে সহজে এবং কম খরচে শহরের ভেতরে ঢুকবেন, সেই সুব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।

৪. যানজটের ঝুঁকি

বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এবং ধীরগতির শহর হিসেবে পরিচিত ঢাকা। এর প্রধান কারণ হিসেবে শহরের ভৌগোলিক বিন্যাস ও অপরিকল্পিত পরিবহন ব্যবস্থাকেই দায়ী করা হয়।

রাজধানীর ৩টি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ ও বাণিজ্যিক এলাকায় অবস্থিত সায়দাবাদ, গুলিস্তান এবং মহাখালী বাস টার্মিনাল দীর্ঘদিন ধরেই ঢাকার অভ্যন্তরীণ যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে। টার্মিনালগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েও নতুন করে যানজটের ঝুঁকি রয়েছে বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, যে-সব এলাকায় টার্মিনালগুলো তৈরি করা হবে, সেখানকার পরিবহন ব্যবস্থাপনা এবং যোগাযোগ পরিকল্পনাও আগে তৈরি করতে হবে।

রাজধানীর বাস টার্মিনাল স্থানান্তরে ৭ চ্যালেঞ্জ-3
রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা না থাকায় যানজটের এমন দৃশ্য প্রতিদিনের। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

৫. বাস রুট রেশনালাইজেশনে ধীরগতি

ঢাকার যানজট নিরসনে অতীতেও নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে নগর পরিবহন চলাচলে শৃঙ্খলা আনতে কোম্পানিভিত্তিক বাস চলাচলের সিদ্ধান্তটি বেশ আলোচিত।

বর্তমানের খণ্ডিত ও বিশৃঙ্খল বাস মালিকানা ব্যবস্থা ভেঙে 'একক কোম্পানি' গঠন প্রক্রিয়াও দীর্ঘ সময় ধরে চলছে। ধারণা ছিল, এর মধ্য দিয়ে ইন্টারসিটি বাস চলাচলে বাসগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা কমবে এবং ই-টিকেটিং পদ্ধতিতে নিয়ম মেনে বাসগুলো চলাচল করবে। কিন্তু এই পরিকল্পনা নানা কারণে পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু টার্মিনাল সরালেই ঢাকা যানজট সমস্যার সমাধান হবে না, যদি বাসের রুট ও পরিচালনার পদ্ধতিতে শৃঙ্খলা না আসে। এক্ষেত্রে টার্মিনাল স্থানান্তর এবং রুট রেশনালাইজেশন একে অপরের পরিপূরক বলেই মনে করেন তারা।

৬. মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের প্রভাব

পরিবহন সেক্টরের শক্তিশালী সিন্ডিকেট এবং শ্রমিক ইউনিয়নগুলোকে এই সিদ্ধান্তের পক্ষে আনা এবং তাদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করা একটি বড় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার গণপরিবহন খাতে প্রভাবশালী মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে। টার্মিনাল স্থানান্তরের ফলে রুট পারমিট, চাঁদাবাজি এবং প্রতিদিনের নগদ আয়ের কাঠামোতে পরিবর্তন আসবে, যা অনেকেই মেনে নিতে চাইবেন না। এক্ষেত্রে, রাজনৈতিক ও ব্যাবসায়িক প্রভাবমুক্ত হয়ে টার্মিনাল স্থানান্তর করা এবং কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

যদিও গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানোর ক্ষেত্রে পরিবহন সংশ্লিষ্টদের সিন্ডিকেট এবং যে-কোনো দাবি আদায়ে চাপ প্রয়োগের অভিযোগ অতীতেও নানা সময়ে উঠেছে।

৭. যাত্রীদের নিরাপত্তা

ঢাকা শহরের বাইরে টার্মিনালগুলোতে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়টিকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। এর পাশাপাশি পর্যাপ্ত ওয়েটিং লাউঞ্জ, খাবার ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা থাকা দরকার বলেও মনে করেন তারা।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ হাদিউজ্জামান বলেন, নাইট কোচগুলো যখন ভোররাতে ওই টার্মিনালে যাত্রী নামিয়ে দেবে বা সেখান থেকে যাত্রা করবে, তখন যাত্রীরা কী করবে, সেখানে নিরাপত্তার একটা বড় ঝুঁকি রয়েছে। এছাড়া, টার্মিনালগুলো যদি কেবল বাস রাখার ‘গ্যারেজ’ হিসেবেই ব্যবহৃত হয় এবং যাত্রীসেবার আধুনিক মান নিশ্চিত না হয়, তবে যাত্রীরা সেই টার্মিনাল ব্যবহার করতে নিরুৎসাহিত হবেন।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

/এফসি/