শিরোনাম

রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের দাবিতে জাবিতে পদযাত্রা

জাবি প্রতিনিধি
জাবি প্রতিনিধি
রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের দাবিতে জাবিতে পদযাত্রা
পদযাত্রা শেষে আয়োজিত সমাবেশে জাবি শিক্ষার্থীরা। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) ‘মার্চ ফর রোহিঙ্গা’ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ সময় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর সংঘটিত গণহত্যা, নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিবাদ এবং তাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের দাবি জানানো হয়।

কর্মসূচির অংশ হিসেবে মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে একটি র‍্যালির আয়োজন করা হয়। র‌্যালিটি অদম্য-২৪ স্মৃতিস্তম্ভ থেকে শুরু হয়ে শহীদ মিনারসংলগ্ন সড়কে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

র‍্যালিতে অংশগ্রহণকারীদের ‘রোহিঙ্গাদের গণহত্যা বন্ধ করতে হবে’, ‘জাস্টিস, জাস্টিস, উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘নাফ থেকে কালাদান, মুক্ত হবে আরাকান’, ‘ফ্রম দ্য মাউন্টেন টু দ্য সি, আরাকান উইল বি ফ্রি’, ‘নিপীড়নের বিরুদ্ধে, গণহত্যার বিরুদ্ধে, ডাইরেক্ট অ্যাকশন’ এবং ‘বিশ্বমুসলিম ঐক্য গড়ো, আরাকান মুক্ত করবো’ এসব স্লোগান দিতে দেখা যায়।

র‌্যালি শেষে আয়োজিত সমাবেশে জাবি ছাত্রশক্তির সভাপতি জিয়া উদ্দিন আয়ান বলেন, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী রাখাইনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন চালায়। হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের মতো বর্বরতার মুখে পড়ে লাখো রোহিঙ্গা নিজেদের বসতভিটা ছেড়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।

তিনি বলেন, প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও রোহিঙ্গারা এখনো নিরাপদ ও মর্যাদার সঙ্গে নিজ ভূমিতে ফিরে যেতে পারেনি। বিভিন্ন সময়ে সরকার পরিবর্তন হলেও এই সংকটের টেকসই সমাধান দৃশ্যমান হয়নি। ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রশ্নটি আজও অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়ে গেছে।

বাংলাদেশের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে জিয়া উদ্দিন আয়ান বলেন, মানবিক দায়িত্ববোধ থেকেই বাংলাদেশ বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে এত মানুষের অবস্থানের কারণে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠী, অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফায় রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সরকারকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও মিয়ানমারের সঙ্গে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে দ্রুত সংকট নিরসনের পথে এগোতে হবে। একই সঙ্গে আসন্ন জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে রোহিঙ্গা ইস্যুকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপন এবং আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সমাবেশে জাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) মাজহারুল ইসলাম বলেন, রোহিঙ্গারা দীর্ঘদিন ধরে জাতিগত নিধন, নির্যাতন ও বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে। তাদের ন্যায্য অধিকার এবং মানবিক মর্যাদার পক্ষে অবস্থান জানাতেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আজ এই কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছে।

তিনি বলেন, আরাকানের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বছরের পর বছর হত্যা, ধর্ষণ ও নিপীড়নের শিকার হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু এত বছর পরও সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি।

জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকার সমালোচনা করে মাজহারুল ইসলাম বলেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বৈশ্বিক উদ্যোগের ঘাটতি স্পষ্ট। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার কিংবা দায়ীদের জবাবদিহির বিষয়ে কার্যকর অগ্রগতি দেখা যায়নি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এ বিষয়ে কী অবস্থান নেয়, তা এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় আরও দৃঢ় ও ফলপ্রসূ কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। দেশের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে হবে।

জাকসু জিএস আরও বলেন, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার অবস্থানের কারণে মানবিক সংকটের পাশাপাশি সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত নানা চ্যালেঞ্জও তৈরি হয়েছে। তাই এ পরিস্থিতিকে দীর্ঘায়িত না করে দ্রুত সমাধানের পথ খুঁজে বের করা জরুরি। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করতে জাতিসংঘকে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।

সমাবেশে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতি সংহতি প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক মো. মিজানুর রহমান জামি বলেন, মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চলে বসবাসরত রোহিঙ্গারা দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিত নিপীড়ন ও জাতিগত নিধনের শিকার হয়ে আসছে। অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা নিজেদের ঘরবাড়ি ও ভূমি থেকে উচ্ছেদ হয়েছে। পাশাপাশি তাদের নাগরিকত্ব, শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে চলমান জাতিগত নিধন বন্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যে কঠোর ও কার্যকর ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন ছিল, তা তারা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে। মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নে পশ্চিমা দেশগুলো প্রায়ই উচ্চকণ্ঠ হলেও মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর চলমান নির্যাতনের ক্ষেত্রে তাদের কার্যকর ভূমিকার ঘাটতি স্পষ্ট। এ পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা এবং তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আন্তর্জাতিক মহলের আরও দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করা প্রয়োজন।

অবিলম্বে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদার সঙ্গে নিজ ভূমিতে প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা, তাদের নাগরিকত্ব ও শিক্ষার অধিকারসহ সব মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং জাতিগত নিধনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আন্তর্জাতিক বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান অধ্যাপক জামি।

/এফআর/