শিরোনাম
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর

বিচারে দীর্ঘসূত্রতার সুযোগে ‘মব’ ও চাঁদাবাজির অভিযোগ

শেখ শাহরিয়ার হোসেন
শেখ শাহরিয়ার হোসেন
বিচারে দীর্ঘসূত্রতার সুযোগে ‘মব’ ও চাঁদাবাজির অভিযোগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটোক

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হলেও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) আওয়ামী লীগ-সমর্থক হিসেবে অভিযুক্ত এবং জুলাই আন্দোলন ও সহিংসতার ঘটনায় ভূমিকা রাখার অভিযোগে অভিযুক্ত শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এখনও কোনো দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অভিযোগ তদন্তে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কমিটি গঠন করলেও দুই বছরেও তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি। এতে একদিকে যেমন অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তি হয়নি, অন্যদিকে বিচারহীনতার এই দীর্ঘসূত্রতাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ে মবের রাজনীতি, সমঝোতা এবং চাঁদাবাজির অভিযোগও সামনে এসেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে চলমান ছাত্র আন্দোলনের বিরোধিতা এবং সরকারের প্রতি সমর্থন জানান। পরদিন ৪ আগস্ট জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নীল দলের ব্যানারে কয়েকজন শিক্ষক মানববন্ধন করে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিপক্ষে অবস্থান নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া আন্দোলন চলাকালে এবং পরবর্তী সময়েও কয়েকজন শিক্ষক বিভিন্ন গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রকাশ্য বিবৃতিতে আন্দোলনের সমালোচনা এবং আওয়ামী লীগের পক্ষে অবস্থান তুলে ধরেন বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

এসব ঘটনার পর শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের একটি অংশ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও শাস্তির দাবি জানায়। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করলেও দীর্ঘ দুই বছরেও সেই তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করা হয়নি। এতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেওয়ায় তদন্তের কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত দীর্ঘদিন ঝুলে থাকার সুযোগে একটি প্রভাবশালী চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। ভুক্তভোগীদের দাবি, ৫ আগস্টের পর থেকেই নির্দিষ্ট কয়েকজন শিক্ষককে কেন্দ্র করে মব সৃষ্টি, বিক্ষোভ এবং ভয়ভীতির পরিবেশ তৈরি করা হয়। একই সময়ে অভিযোগে থাকা অন্য শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তদন্ত, আন্দোলন কিংবা সামাজিকভাবে হেয় করার ভয় দেখিয়ে সমঝোতার নামে অর্থ ও অন্যান্য সুবিধা দাবি করা হয়। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, যারা সমঝোতায় রাজি হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে পরবর্তীতে আর কোনো কর্মসূচি দেখা যায়নি। অন্যদিকে যারা রাজি হননি, তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে নতুন করে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে।

একাধিক সূত্রের অভিযোগ, একই ধরনের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও সব অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সমানভাবে কর্মসূচি হয়নি। বরং বেছে বেছে কয়েকজনকে টার্গেট করে মব সৃষ্টি করা হয়েছে, আর অন্যদের ক্ষেত্রে নীরবতা পালন করা হয়েছে। এতে অভিযোগ উঠেছে, বিচার নয়, বরং ভয়ভীতি তৈরির মাধ্যমে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলই ছিল কিছু গোষ্ঠীর মূল উদ্দেশ্য।

ভুক্তভোগী এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গত বছর ছাত্রদলের এক নেতা আমাকে চাপ প্রয়োগ করে অভিযুক্তের তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার কথা বলে ৭০ হাজার টাকা নেয়। পরে বিভিন্ন মময়ে এসে আরো টাকা নেয়। কিন্তু আমার আম আর অভিযোগের তালিকা থেকে কাটেনি। এমন অনেকের সাথেই হয়েছি বলে শুনেছি।

ভুক্তভোগী আরেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ৫ আগস্টের পর একদিন শিবিরের নেতারা এসে চাপ প্রয়োগ করে। পরে আমি ছাত্রদলের কয়েকজনের সহযোগিতায় সেটা মিটমাট করি।

অভিযোগ আরও রয়েছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পরও কয়েকজন শিক্ষক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও প্রকাশ্য আলোচনায় আন্দোলনের সমালোচনা এবং আওয়ামী লীগের পক্ষে অবস্থান তুলে ধরলেও তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে বিচার প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একাংশ।

বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি শিক্ষক সংগঠনের নেতাদের বিরুদ্ধেও অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ-সমর্থক শিক্ষক নেতাদের সঙ্গে সমঝোতার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, শিক্ষক সমিতির পদ বণ্টন, প্রশাসনিক কমিটিতে অন্তর্ভুক্তি এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার বিনিময়ে এ ধরনের সমঝোতা হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ-সমর্থক হিসেবে অভিযুক্ত কয়েকজন শিক্ষক এখনও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব ও কমিটিতে দায়িত্ব পালন করছেন।

শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের একাংশের দাবি, তদন্ত দ্রুত শেষ করে প্রকৃত দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তদন্তকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি, মব সৃষ্টি ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগগুলোরও পৃথক তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তাদের মতে, বিচারহীনতার এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

এদিকে, গত ১৬ জুলাই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের নবনিযুক্ত ডিন ও শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. আইনুল ইসলামকে নিজ কার্যালয় থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য করেন বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

এ সময় জবি শাখা ছাত্রদল, জাতীয় ছাত্রশক্তি, ছাত্র অধিকার পরিষদ, ছাত্র শিবির, জকসুর নেতারা ডিন কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন এবং তার নিয়োগ বাতিলের দাবি জানান। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, জুলাই আন্দোলনের সময় অধ্যাপক আইনুল ইসলামের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক থাকায় তাকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে নিয়োগ দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।

জাতীয় ছাত্রশক্তির জবি শাখার সদস্য সচিব শাহিন মিয়া বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে আওয়ামী লীগপন্থী হিসেবে চিহ্নিত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে। এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে একাধিকবার স্মারকলিপি দেওয়া হলেও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রের প্রচলিত আইন অনুযায়ী যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিচার নিশ্চিত করা উচিত ছিল। কিন্তু তা না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছেট

সাম্প্রতিক ঘটনাকে ‘মব’ বলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাষ্ট্র যদি আইন প্রয়োগে ব্যর্থ হয়, তাহলে মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা কমে যায় এবং তারা প্রতিক্রিয়া দেখায়। তবে অভিযোগের বিচার প্রচলিত আইন অনুযায়ী হওয়া উচিত।

এ বিষয়ে কথা বলতে শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল ও শাখা ছাত্র শিবিরের সভাপতি আব্দুল আলিম আরিফঅকে বার বার কল দেওয়া হলেও তারা রিসিভ করেননি।

জবি শিক্ষক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মঞ্জুর মুর্শেদ ভূঁইয়া বলেন, জুলাই আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। অভিযোগ থাকলে তা প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে। আবার অভিযোগের আড়ালে কাউকে হয়রানি করার সুযোগও থাকা উচিত নয়।

তিনি আরও বলেন, তদন্তকে কেন্দ্র করে যদি কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তার, ভয়ভীতি প্রদর্শন, মব সৃষ্টি বা অনিয়মের অভিযোগ থাকে, সেগুলোও নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

অধ্যাপক ড. মো. আইনুল ইসলাম তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমাকে ফ্যাসিস্ট আখ্যা দেওয়ার বিষয়টি আমি প্রত্যাখ্যান করছি। তৎকালীন রেজিস্ট্রার হিসেবে আমন্ত্রণ পাওয়ায় আমি গণভবনে গিয়েছিলাম। সেখানে দেশের চলমান সংকট ও সহিংসতা বন্ধের বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। কোনো শিক্ষক কখনো শিক্ষার্থীদের প্রতিপক্ষ হতে পারেন না।

তিনি আরও বলেন, আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা উচিত।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও ইউট্যাব জবি শাখার সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, জুলাই আন্দোলনের বিরোধিতা এবং তৎকালীন সরকারের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগে কয়েকজন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর নাম প্রশাসনের কাছে এসেছে। এসব অভিযোগ তদন্তে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. রেজাউল করিমের সময়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তবে বিভিন্ন কারণে তদন্ত কার্যক্রম প্রত্যাশিত অগ্রগতি পায়নি। অনেককে ডাকা হলেও সবাই কমিটির সামনে হাজির হননি।

বিচারহীনতার সুযোগে সমঝোতা বা প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ ধরনের অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। অভিযুক্তদের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতার প্রশ্নই আসে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের সুষ্ঠু পরিবেশ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। অভিযোগের যথাযথ নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদদীন বলেন, জুলাই গণহত্যার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, সে আমার বাবা হোক কিংবা ছেলে হোক, তার বিচার হতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে এ ধরনের গণহত্যাকে উৎসাহিত করা হবে। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা অন্য কোনো পরিচয় বিবেচ্য নয়; যারা ওই সময়ে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন এবং যাদের বিরুদ্ধে দায়ের প্রমাণ পাওয়া যাবে, শিক্ষক, কর্মকর্তা কিংবা কর্মচারী যেই হোক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জুলাইয়ের প্রশ্নে কোনো আপস নেই।

তিনি আরও বলেন, জুলাইয়ের বিচার সংশ্লিষ্ট বোর্ড গঠন করা হয়েছে। তবে শিক্ষকদের মর্যাদা ও সম্মানের বিষয়টিও আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। অভিযোগের ভিত্তিতে নয়, সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ও তদন্তের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমার কোনো সহকর্মী যদি এ ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকেন, তাহলে তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

/এমআর/