শিরোনাম

তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে দ্রুত নির্বাচন, আয়করে সমতার দাবি

ঢাবি সংবাদদাতা
ঢাবি সংবাদদাতা
তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে দ্রুত নির্বাচন, আয়করে সমতার দাবি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি দবা দাবি জানিয়েছে চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস স্টুডেন্টস পলিসি ফোরাম

তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে দ্রুত প্রত্যক্ষ নির্বাচন আয়োজন, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত পাহাড়ি-বাঙালি সব নাগরিকের জন্য সমান মানদণ্ডে আয়কর নির্ধারণ এবং শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে জাতিগত বৈষম্য দূর করে যোগ্যতার ভিত্তিতে সমান সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস স্টুডেন্টস পলিসি ফোরাম।

আজ শুক্রবার (২৮ আগস্ট) বিকাল চারটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির পক্ষ থেকে এসব দাবি জানানো হয়। সংগঠনের মুখপাত্র মোহাম্মদ রিয়াজুল হাসান লিখিত বক্তব্যে দাবিগুলো তুলে ধরেন। পরে আহ্বায়ক হাবিব আল মাহমুদ দাবিগুলোর বিভিন্ন দিক ও যুক্তি তুলে ধরেন।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের সামগ্রিক উন্নয়ন, গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা ও বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে এসব দাবি জানানো হয়েছে।

রিয়াজুল হাসান বলেন, ১৯৮৯ সালে ‘পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন’-এর আওতায় রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠিত হয়। দেশের অন্যান্য জেলা পরিষদের তুলনায় এসব পরিষদ বিশেষায়িত ও স্বায়ত্তশাসিত কাঠামোর অধিকারী। বর্তমানে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের অধীনে ৩০টি, রাঙামাটিতে ৩৩টি এবং বান্দরবানে ২৮টি সরকারি বিভাগ ন্যস্ত রয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

তবে ১৯৮৯ সালের ২৫ জুনের পর প্রায় ৩৭ বছরেও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচন হয়নি বলে দাবি করেছে সংগঠনটি। সম্প্রতি গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদও জনগণের প্রত্যক্ষ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে পারেনি বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।

রিয়াজুল হাসান বলেন, জনগণের ভোট ছাড়া মনোনীত ব্যক্তিদের মাধ্যমে দীর্ঘদিন পরিষদ পরিচালিত হওয়ায় জবাবদিহির ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তাই জাতীয় পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে স্থানীয় ভোটার তালিকা প্রণয়ন করে অবাধ, সুষ্ঠু ও সব দলের অংশগ্রহণে প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠন করতে হবে।

জেলা পরিষদে নির্বাচন না হওয়ার প্রভাব তুলে ধরে হাবিব আল মাহমুদ বলেন, পার্বত্য জেলা পরিষদগুলো শুধু আনুষ্ঠানিক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান নয়; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, প্রাথমিক শিক্ষা, হাসপাতাল ও মৎস্যসহ জনগুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে এসব পরিষদের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে।

তার ভাষ্য, নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকলে অনির্বাচিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সুযোগ তৈরি হয়। এতে দুর্নীতি, অনিয়ম ও লুটপাটের সুযোগ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে জনগণের উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান জবাবদিহির বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বাস্থ্যসেবার সংকটের প্রসঙ্গ টেনে হাবিব আল মাহমুদ বলেন, সম্প্রতি চিকিৎসার অভাবে শিশু মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। অথচ ওই অঞ্চলের হাসপাতাল ও চিকিৎসাসেবা-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম জেলা পরিষদের দায়িত্ব ও নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত। কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে জেলা পরিষদে নির্বাচিত ও জবাবদিহিমূলক প্রতিনিধিত্ব প্রয়োজন।

সংবাদ সম্মেলনে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত সব স্থায়ী নাগরিকের জন্য সমান মানদণ্ডে আয়কর নিরূপণ ও দাখিলের বিধান করার দাবিও জানানো হয়।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ি ও বাঙালি উভয় জনগোষ্ঠীই দুর্গম ভৌগোলিক পরিবেশ, যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, সীমিত কর্মসংস্থান, অবকাঠামোগত পশ্চাৎপদতা এবং তুলনামূলক বেশি জীবনযাত্রার ব্যয়ের মতো বাস্তবতার মুখোমুখি।

সংগঠনটির দাবি, ‘আয়কর আইন, ২০২৩’-এর সংশোধিত ষষ্ঠ তফসিলের ১৯ নম্বর বিধিতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ কর অব্যাহতির সুবিধা রাখা হলেও একই অঞ্চলে বসবাসরত বাঙালি নাগরিকেরা সেই সুবিধা পাচ্ছেন না। একই ভৌগোলিক ও আর্থসামাজিক বাস্তবতায় বসবাস করেও জাতিগত পরিচয়ের কারণে কর-সুবিধায় পার্থক্য তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।

এ ধরনের ব্যবস্থা সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদের সমতা ও বৈষম্যহীনতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেও দাবি করা হয়। সংগঠনটির মতে, পার্বত্য অঞ্চলের বিশেষ ভৌগোলিক ও আর্থসামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় কর-সুবিধা নির্ধারণে জাতিগত পরিচয়ের পরিবর্তে অভিন্ন ও অঞ্চলভিত্তিক মানদণ্ড অনুসরণ করা অধিকতর ন্যায়সংগত।

শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে পার্বত্য অঞ্চলের বাঙালি জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ পিছিয়ে রয়েছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়।

বক্তারা বলেন, উচ্চশিক্ষা, শিক্ষাবৃত্তি, আবাসন ও বিশেষ শিক্ষা সহায়তার ক্ষেত্রে সুযোগের ঘাটতির কারণে অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দিনমজুরি, কৃষিকাজ, পরিবহন শ্রম ও ক্ষুদ্র ব্যবসার মতো পেশায় বাঙালি জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য অংশ যুক্ত রয়েছে বলেও তারা দাবি করেন।

এ কারণে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ নির্ধারণে শুধু জাতিগত পরিচয় নয়, শিক্ষাগত পশ্চাৎপদতা, আর্থসামাজিক অবস্থা, ভৌগোলিক প্রতিকূলতা ও প্রকৃত প্রয়োজন বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিদ্যমান কোটা ব্যবস্থার পরিবর্তনেরও দাবি জানানো হয়েছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়, সুবিধাটি শুধু ‘উপজাতি’ বা ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কোটা’ হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে ‘পার্বত্য কোটা’ হিসেবে চালু করা উচিত। এতে পার্বত্য অঞ্চলের ভৌগোলিক ও আর্থসামাজিক বাস্তবতায় পিছিয়ে থাকা বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য সমান সুযোগ তৈরি করা সম্ভব হবে।

সংবাদ সম্মেলনে সিএইচটি স্টুডেন্টস পলিসি ফোরামের পক্ষ থেকে তিন দফা দাবি তুলে ধরা হয়—

১. পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন অনুযায়ী রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলা পরিষদে অবিলম্বে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে।

২. ‘আয়কর আইন, ২০২৩’-এর বৈষম্যমূলক বিধান সংশোধন করে পাহাড়ি-বাঙালি সব নাগরিকের জন্য সমান মানদণ্ডে আয়কর নিরূপণ ও দাখিলের বিধান জারি করতে হবে।

৩. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সব ধরনের জাতিগত বৈষম্য দূর করে যোগ্যতার ভিত্তিতে সমান সুযোগ দিতে হবে।

/এমআর/