শিরোনাম

হাতির শুঁড়কে কেন প্রকৃতির বিস্ময় বলা হয়

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
হাতির শুঁড়কে কেন প্রকৃতির বিস্ময় বলা হয়
একটি এশিয়ান হাতি

হাতি শুধু পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ স্থলচর প্রাণী নয়, এর শরীরের কিছু বৈশিষ্ট্য প্রকৃতির অসাধারণ নকশারও প্রমাণ। বিশেষ করে হাতির শুঁড়কে প্রাণিজগতের সবচেয়ে বহুমুখী অঙ্গগুলোর একটি হিসেবে ধরা হয়। একে অনেক সময় প্রকৃতির ‘সুইস আর্মি নাইফ’ বলা হয়। কেননা একই অঙ্গ দিয়ে হাতি শ্বাস নেওয়া, গন্ধ শোঁকা, পানি পান করা, খাবার সংগ্রহ, ভারী বস্তু সরানো এবং সূক্ষ্ম জিনিস ধরার মতো নানা কাজ করতে পারে।

শুঁড়ের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো এর গঠন। মানুষের শরীরে প্রায় ৬০০টির কিছু বেশি পেশি থাকলেও হাতির শুঁড়ে কোনো হাড় বা তরুণাস্থি নেই। এটি সম্পূর্ণ পেশিনির্ভর একটি অঙ্গ। প্রজাতি ও গঠনের ওপর নির্ভর করে শুঁড়ে প্রায় ৪০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজারের মতো পেশিকলা রয়েছে। এতো বিপুল সংখ্যক পেশির সমন্বয়েই শুঁড় একদিকে অত্যন্ত শক্তিশালী, অন্যদিকে অসাধারণ নিখুঁতভাবে কাজ করতে পারে। ফলে হাতি এক টনেরও বেশি ওজনের গাছের গুঁড়ি সরিয়ে ফেলতে পারে, আবার একই শুঁড় দিয়ে মাটি থেকে ছোট্ট কোনো পাতা বা খাবারের টুকরোও অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তুলে নিতে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে, হাতি শুঁড় দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১৫০ মিটার বেগে বাতাস টানতে সক্ষম। মানুষের হাঁচির সময় বাতাসের গতি এর তুলনায় অনেক কম। এই শক্তিশালী টানের সাহায্যে হাতি শুঁড়ের ভেতরে একবারে প্রায় ৮ থেকে ৯ লিটার পানি নিতে পারে। তবে হাতি শুঁড় দিয়ে সরাসরি পানি পান করে না। বরং শুঁড়ে পানি টেনে নিয়ে সেটি মুখের ভেতর ঢেলে পান করে।

বিবর্তনের দিক থেকেও শুঁড় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ। এটি মূলত হাতির নাক ও ওপরের ঠোঁটের দীর্ঘ বিবর্তিত রূপ। শুঁড়ের ডগায় থাকা আঙুলের মতো সংবেদনশীল অংশ হাতিকে বিভিন্ন বস্তু স্পর্শ করে শনাক্ত ও নিখুঁতভাবে ধরতে সাহায্য করে। আফ্রিকান হাতির শুঁড়ের ডগায় সাধারণত দুটি এবং এশিয়ান হাতির ক্ষেত্রে একটি আঙুলসদৃশ অংশ থাকে।

হাতির যোগাযোগ ব্যবস্থাও বেশ বিস্ময়কর। তারা শুধু কান দিয়েই শব্দ ও সংকেত গ্রহণ করে না; পায়ের মাধ্যমেও মাটির কম্পন অনুভব করতে পারে। কোনো হাতি শক্তিশালী শব্দ করলে বা মাটিতে আঘাত করলে সৃষ্ট কম্পন দূরবর্তী এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। অন্য হাতিরা তাদের পায়ের সংবেদনশীল স্নায়ুর মাধ্যমে সেই কম্পন শনাক্ত করে আশপাশের পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পেতে পারে। এভাবেই তারা দূরে থাকা দলের সদস্যদের সংকেত বুঝতে সক্ষম হয়।

আফ্রিকা ও এশিয়ায় থাকা হাতিদের মধ্যে আকার, কান, দাঁত ও শারীরিক বৈশিষ্ট্যে বেশ কিছু পার্থক্য দেখা যায়। আফ্রিকান হাতির দুটি স্বীকৃত প্রজাতি হলো আফ্রিকান সাভানা হাতি ও আফ্রিকান ফরেস্ট হাতি। এর মধ্যে সাভানা হাতি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্থলচর প্রাণী। পূর্ণবয়স্ক একটি সাভানা হাতির উচ্চতা প্রায় ১০ থেকে ১৩ ফুট এবং ওজন ৩ হাজার ৬০০ থেকে ৬ হাজার ৪০০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। এদের কান তুলনামূলকভাবে অনেক বড় এবং পুরুষ ও স্ত্রী-উভয়েরই বড় দাঁত রয়েছে।

অন্যদিকে, এশিয়ান হাতি মূলত এশিয়ার বিভিন্ন বনাঞ্চলে বসবাস করে। আফ্রিকান হাতির তুলনায় এদের কান ছোট ও কিছুটা গোলাকার। এদের উচ্চতা প্রায় সাড়ে ৬ থেকে সাড়ে ১১ ফুট পর্যন্ত হতে পারে এবং ওজন প্রায় ৫ হাজার কেজি পর্যন্ত হয়। এশিয়ান হাতির ক্ষেত্রে সাধারণত সব পুরুষের বড় দাঁত থাকে না, তুলনামূলকভাবে অল্পসংখ্যক পুরুষের পূর্ণাঙ্গ দাঁত গজায়। অন্যদের ছোট দাঁত বা গজদাঁত দেখা যায়।

হাতিদের সামাজিক জীবনও বেশ সুসংগঠিত। সাধারণত স্ত্রী হাতিকে কেন্দ্র করে পরিবার বা দল গড়ে ওঠে। দলের সবচেয়ে বয়স্ক ও অভিজ্ঞ স্ত্রী হাতি নেতৃত্ব দেয়। খাবার ও পানির উৎস, নিরাপদ চলাচলের পথ এবং বিপদের সম্ভাবনা সম্পর্কে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা পুরো দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, পুরুষ হাতি বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছানোর পর সাধারণত মাতৃকেন্দ্রিক দল থেকে আলাদা হয়ে যায়। এরপর তারা একা অথবা ছোট পুরুষ হাতির দলে জীবন কাটায়।

/এসবি/