আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে তীব্র বায়ুদূষণ, দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ কয়েক লাখ মানুষ

আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে তীব্র বায়ুদূষণ, দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ কয়েক লাখ মানুষ
মো. ইমরান হোসেন

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের আমিনবাজারের মধুমতি পরিবহনের বাস স্টপেজ ঘেঁষে ল্যান্ডফিল (ময়লা ফেলার স্থায়ী জায়গা)। ওই এলাকায় প্রায় দুই কিলোমিটার দূরেও ছড়িয়ে পড়েছে দুর্গন্ধ। মহাসড়কের পাশ দিয়ে এক পথচারী যাচ্ছিলেন। তিনি এক হাতে বাজারের ব্যাগ আর অন্য হাত দিয়ে নাক-মুখ চেপে রেখেছেন। আরেক পথচারী তার শিশু সন্তানের মুখে কাপড় দিয়ে ঢেকে রেখেছেন।
গত ১৭ আগস্ট দুপুর ১২ টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আমিনবাজার ল্যান্ডফিলের কয়েকটি স্থান ঘুরে অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও মানুষের দুর্ভোগের এই চিত্র দেখা গেছে।
মধুমতি এলাকায় ল্যান্ডফিলের একটি স্থানে গিয়ে দেখা যায়, ভেতরে পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কারের কাজ করছে। রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে আসা সিটি করপোরেশনের থেকে বর্জ্য সেখানে ফেলা হচ্ছে। ওই স্থানে ঢুকতে চাইলে দায়িত্বরত আনসার সদস্যরা এই প্রতিনিধিকে আটকে দেন এবং বলেন, ‘সিটি করপোরেশন অনুমতি ছাড়া ভেতরে প্রবেশ করা যাবে না।’
ল্যান্ডফিলের ভাগাড় পাহারা দেওয়ার কাজের বিষয়ে জানতে চাইলে উজ্জ্বল নামের এক আনসার সদস্য বলেন, ‘এখানে কাজ করতে আমাদের কষ্ট হচ্ছে। দশ মাস ধরে এখানে কাজ করছি। বড় স্যাররা আসে, আবার ভিজিট করে চলে যায়। এখানে কাজ করে আমরা শ্বাসকষ্ট ও অ্যালার্জিতে আক্রান্ত হচ্ছি।’

ল্যান্ডফিলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা শরীফ নামের একজন বলেন, ‘এটি বিশাল জায়গা নিয়ে গড়ে উঠেছে। আগে এখানে কৃষি জমি ছিল। কিন্তু ময়লা ফেলার কারণে অধিকাংশ জমি এখন অনুর্বর হয়ে গেছে। জমিতে এখন আর ফসল হয় না। এখানে যখন ল্যান্ডফিলের কাজ শুরু করা হয়েছিল তখন শুনছিলাম, এই বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে করে গ্যাস তৈরি করবে। কিন্তু এখন তেমন কোনো উদ্যোগ দেখছি না।’
আমিনবাজারের মধুমতি মডেল টাউন এলাকার কামাল বলেন, ‘আমার বাসা মধুমতি বাজারের কাছে মধুমতি হাউজিংয়ে। বাসায় যেতে হলে এই পথ দিয়ে যেতে হয়। কিন্তু দুর্গন্ধের কারণে এখান দিয়ে যাতায়াত করতে কষ্ট হয় । দুর্গন্ধে অনেক সময় বমি চলে আসে।’
স্থানীয় এক চায়ের দোকানদার বলেন, ‘আমার দোকানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ময়লা ফেলতে আসা গাড়ির ড্রাইভার ও কর্মীরা এসে খাবার খায় এবং আড্ডা দেয়। তারা প্রায়ই এই এলাকার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিয়ে সমালোচনা করে। অতিরিক্ত রোদ এবং ঠান্ডা পড়লে মাঝেমধ্যে আমার শ্বাসকষ্ট হয়।’
এই ল্যান্ডফিলে প্রায়ই ঢাকা থেকে ময়লাবাহী গাড়ি নিয়ে আসে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের একজন চালক। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রথম প্রথম এখানে আসতে কষ্ট হতো। এখানে আসার কারণে দুর্গন্ধে যেমন সমস্যা হয় তেমন ময়লা-আবর্জনা শরীরে লেগে যাওয়ায় চর্মসহ নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হচ্ছি। তবুও এটা পেশা। তাই বাধ্য হয়ে এখানে কাজ করছি।’
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের একদল গবেষক ‘ঢাকা ল্যান্ডফিল ওয়াস্ট প্র্যাকটিস: অ্যাড্রেসিং আরবান পলিউশন অ্যান্ড হেলথ হেজার্ডস’ শিরোনামের গবেষণা করেন। ২০২১ সালে এটি ‘বিল্ডিংস অ্যান্ড সিটিস জার্নালে’ প্রকাশিত হয়। এতে মাতুয়াইল ও আমিনবাজার ল্যান্ডফিল দুটি জনবসতি, জলাশয় এবং কৃষিভূমির অত্যন্ত কাছে অবস্থিত বলে উল্লেখ করা হয়। আর এ কারণে স্থানীয় লোকজন শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগ এবং পেটের পীড়ার সমস্যায় ভুগছেন বলে তথ্য উপস্থাপন করা হয়। ল্যান্ডফিলের বিষাক্ত তরল ভূগর্ভস্থ পানি ও মাটি দূষিত করছে, যা মৎস্য চাষ এবং কৃষিকাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এ ছাড়া বর্জ্য পোড়ানোর ধোঁয়া এবং তীব্র দুর্গন্ধ ও বায়ুদূষণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সালে প্রায় ৫৫ একর কৃষিজমি ভরাট করে গড়ে তোলা হয় আমিনবাজার ল্যান্ডফিল। রাজধানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চাপ সামাল দিতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়। শুরুতে এটি ছিল অস্থায়ী সমাধান। কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই বাড়তে থাকে বর্জ্যের স্তূপ। এতে ছড়িয়ে পড়তে থাকে দুর্গন্ধ, বদলে যেতে থাকে আশপাশের পরিবেশ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৭ সালেই শেষ হয়ে যায় এই ল্যান্ডফিলটির ধারণক্ষমতা। তবুও থেমে থাকেনি বর্জ্য ফেলা। কোনো আধুনিকায়ন এবং সম্প্রসারণ ছাড়া ৫০০ ট্রাকে করে নিয়ে আসা প্রায় সাড়ে তিন হাজার টন বর্জ্য প্রতিদিন এখানে ফেলছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)।
জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের এক গবেষণার ফলাফলে বলা হয়েছে, ঢাকার আমিনবাজার ও মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল থেকে প্রতিবছর ৫০ হাজার টন মিথেন গ্যাসের নির্গমন হচ্ছে। এ ছাড়া এই বর্জ্য থেকে কার্বন মনোক্সাইড, হাইড্রোজেন সায়ানাইড, মাইক্রোপ্লাস্টিকের মতো বিষাক্ত উপাদন এখানের মাটি ও ভূগর্ভন্থ পানিতে মিশে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, বর্জ্য কিংবা ময়লা-আবর্জনা দুইভাবে সমস্যা সৃষ্টি করে। প্রথমত, বর্জ্যের তীব্র দুর্গন্ধে শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা হতে পারে। দ্বিতীয়ত, ময়লা-আবর্জনা জমে পচে যাওয়ার পর সেগুলোতে জীবাণু তৈরি হয়, যা খাদ্যনালীতে প্রবেশ করলে বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি হতে পারে। এ ছাড়া ময়লা-আবর্জনার সংস্পর্শে আসলে অ্যালার্জিও হতে পারে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) জনসংযোগ কর্মকর্তা (পিআরও) মো. জাকির হোসেন বলেন, ২০১৭ সালে ল্যান্ডফিলের বর্জ্য ধারণক্ষমতা শেষ হয়েছে তা ঠিক। কিন্তু ঢাকা শহরের ময়লা ফেলার আর কোনো জায়গা নেই। তাই বাধ্য হয়ে আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে তা ফেলতে হচ্ছে। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য চীনের একটা কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। তাদের কাজ শেষ হতে আরও সময় লাগবে।
ডিএনসিসির পিআরও জাকির হোসেন আরও বলেন, আমিনবাজার ল্যান্ডফিল থেকে ময়লা-আবর্জনা সরানোর কাজ চলমান। সম্পূর্ণ ময়লা সরাতে এবং স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে আরও ৫-৬ বছর লাগবে।

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের আমিনবাজারের মধুমতি পরিবহনের বাস স্টপেজ ঘেঁষে ল্যান্ডফিল (ময়লা ফেলার স্থায়ী জায়গা)। ওই এলাকায় প্রায় দুই কিলোমিটার দূরেও ছড়িয়ে পড়েছে দুর্গন্ধ। মহাসড়কের পাশ দিয়ে এক পথচারী যাচ্ছিলেন। তিনি এক হাতে বাজারের ব্যাগ আর অন্য হাত দিয়ে নাক-মুখ চেপে রেখেছেন। আরেক পথচারী তার শিশু সন্তানের মুখে কাপড় দিয়ে ঢেকে রেখেছেন।
গত ১৭ আগস্ট দুপুর ১২ টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আমিনবাজার ল্যান্ডফিলের কয়েকটি স্থান ঘুরে অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও মানুষের দুর্ভোগের এই চিত্র দেখা গেছে।
মধুমতি এলাকায় ল্যান্ডফিলের একটি স্থানে গিয়ে দেখা যায়, ভেতরে পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কারের কাজ করছে। রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে আসা সিটি করপোরেশনের থেকে বর্জ্য সেখানে ফেলা হচ্ছে। ওই স্থানে ঢুকতে চাইলে দায়িত্বরত আনসার সদস্যরা এই প্রতিনিধিকে আটকে দেন এবং বলেন, ‘সিটি করপোরেশন অনুমতি ছাড়া ভেতরে প্রবেশ করা যাবে না।’
ল্যান্ডফিলের ভাগাড় পাহারা দেওয়ার কাজের বিষয়ে জানতে চাইলে উজ্জ্বল নামের এক আনসার সদস্য বলেন, ‘এখানে কাজ করতে আমাদের কষ্ট হচ্ছে। দশ মাস ধরে এখানে কাজ করছি। বড় স্যাররা আসে, আবার ভিজিট করে চলে যায়। এখানে কাজ করে আমরা শ্বাসকষ্ট ও অ্যালার্জিতে আক্রান্ত হচ্ছি।’

ল্যান্ডফিলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা শরীফ নামের একজন বলেন, ‘এটি বিশাল জায়গা নিয়ে গড়ে উঠেছে। আগে এখানে কৃষি জমি ছিল। কিন্তু ময়লা ফেলার কারণে অধিকাংশ জমি এখন অনুর্বর হয়ে গেছে। জমিতে এখন আর ফসল হয় না। এখানে যখন ল্যান্ডফিলের কাজ শুরু করা হয়েছিল তখন শুনছিলাম, এই বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে করে গ্যাস তৈরি করবে। কিন্তু এখন তেমন কোনো উদ্যোগ দেখছি না।’
আমিনবাজারের মধুমতি মডেল টাউন এলাকার কামাল বলেন, ‘আমার বাসা মধুমতি বাজারের কাছে মধুমতি হাউজিংয়ে। বাসায় যেতে হলে এই পথ দিয়ে যেতে হয়। কিন্তু দুর্গন্ধের কারণে এখান দিয়ে যাতায়াত করতে কষ্ট হয় । দুর্গন্ধে অনেক সময় বমি চলে আসে।’
স্থানীয় এক চায়ের দোকানদার বলেন, ‘আমার দোকানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ময়লা ফেলতে আসা গাড়ির ড্রাইভার ও কর্মীরা এসে খাবার খায় এবং আড্ডা দেয়। তারা প্রায়ই এই এলাকার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিয়ে সমালোচনা করে। অতিরিক্ত রোদ এবং ঠান্ডা পড়লে মাঝেমধ্যে আমার শ্বাসকষ্ট হয়।’
এই ল্যান্ডফিলে প্রায়ই ঢাকা থেকে ময়লাবাহী গাড়ি নিয়ে আসে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের একজন চালক। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রথম প্রথম এখানে আসতে কষ্ট হতো। এখানে আসার কারণে দুর্গন্ধে যেমন সমস্যা হয় তেমন ময়লা-আবর্জনা শরীরে লেগে যাওয়ায় চর্মসহ নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হচ্ছি। তবুও এটা পেশা। তাই বাধ্য হয়ে এখানে কাজ করছি।’
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের একদল গবেষক ‘ঢাকা ল্যান্ডফিল ওয়াস্ট প্র্যাকটিস: অ্যাড্রেসিং আরবান পলিউশন অ্যান্ড হেলথ হেজার্ডস’ শিরোনামের গবেষণা করেন। ২০২১ সালে এটি ‘বিল্ডিংস অ্যান্ড সিটিস জার্নালে’ প্রকাশিত হয়। এতে মাতুয়াইল ও আমিনবাজার ল্যান্ডফিল দুটি জনবসতি, জলাশয় এবং কৃষিভূমির অত্যন্ত কাছে অবস্থিত বলে উল্লেখ করা হয়। আর এ কারণে স্থানীয় লোকজন শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগ এবং পেটের পীড়ার সমস্যায় ভুগছেন বলে তথ্য উপস্থাপন করা হয়। ল্যান্ডফিলের বিষাক্ত তরল ভূগর্ভস্থ পানি ও মাটি দূষিত করছে, যা মৎস্য চাষ এবং কৃষিকাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এ ছাড়া বর্জ্য পোড়ানোর ধোঁয়া এবং তীব্র দুর্গন্ধ ও বায়ুদূষণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সালে প্রায় ৫৫ একর কৃষিজমি ভরাট করে গড়ে তোলা হয় আমিনবাজার ল্যান্ডফিল। রাজধানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চাপ সামাল দিতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়। শুরুতে এটি ছিল অস্থায়ী সমাধান। কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই বাড়তে থাকে বর্জ্যের স্তূপ। এতে ছড়িয়ে পড়তে থাকে দুর্গন্ধ, বদলে যেতে থাকে আশপাশের পরিবেশ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৭ সালেই শেষ হয়ে যায় এই ল্যান্ডফিলটির ধারণক্ষমতা। তবুও থেমে থাকেনি বর্জ্য ফেলা। কোনো আধুনিকায়ন এবং সম্প্রসারণ ছাড়া ৫০০ ট্রাকে করে নিয়ে আসা প্রায় সাড়ে তিন হাজার টন বর্জ্য প্রতিদিন এখানে ফেলছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)।
জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের এক গবেষণার ফলাফলে বলা হয়েছে, ঢাকার আমিনবাজার ও মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল থেকে প্রতিবছর ৫০ হাজার টন মিথেন গ্যাসের নির্গমন হচ্ছে। এ ছাড়া এই বর্জ্য থেকে কার্বন মনোক্সাইড, হাইড্রোজেন সায়ানাইড, মাইক্রোপ্লাস্টিকের মতো বিষাক্ত উপাদন এখানের মাটি ও ভূগর্ভন্থ পানিতে মিশে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, বর্জ্য কিংবা ময়লা-আবর্জনা দুইভাবে সমস্যা সৃষ্টি করে। প্রথমত, বর্জ্যের তীব্র দুর্গন্ধে শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা হতে পারে। দ্বিতীয়ত, ময়লা-আবর্জনা জমে পচে যাওয়ার পর সেগুলোতে জীবাণু তৈরি হয়, যা খাদ্যনালীতে প্রবেশ করলে বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি হতে পারে। এ ছাড়া ময়লা-আবর্জনার সংস্পর্শে আসলে অ্যালার্জিও হতে পারে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) জনসংযোগ কর্মকর্তা (পিআরও) মো. জাকির হোসেন বলেন, ২০১৭ সালে ল্যান্ডফিলের বর্জ্য ধারণক্ষমতা শেষ হয়েছে তা ঠিক। কিন্তু ঢাকা শহরের ময়লা ফেলার আর কোনো জায়গা নেই। তাই বাধ্য হয়ে আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে তা ফেলতে হচ্ছে। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য চীনের একটা কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। তাদের কাজ শেষ হতে আরও সময় লাগবে।
ডিএনসিসির পিআরও জাকির হোসেন আরও বলেন, আমিনবাজার ল্যান্ডফিল থেকে ময়লা-আবর্জনা সরানোর কাজ চলমান। সম্পূর্ণ ময়লা সরাতে এবং স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে আরও ৫-৬ বছর লাগবে।

আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে তীব্র বায়ুদূষণ, দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ কয়েক লাখ মানুষ
মো. ইমরান হোসেন

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের আমিনবাজারের মধুমতি পরিবহনের বাস স্টপেজ ঘেঁষে ল্যান্ডফিল (ময়লা ফেলার স্থায়ী জায়গা)। ওই এলাকায় প্রায় দুই কিলোমিটার দূরেও ছড়িয়ে পড়েছে দুর্গন্ধ। মহাসড়কের পাশ দিয়ে এক পথচারী যাচ্ছিলেন। তিনি এক হাতে বাজারের ব্যাগ আর অন্য হাত দিয়ে নাক-মুখ চেপে রেখেছেন। আরেক পথচারী তার শিশু সন্তানের মুখে কাপড় দিয়ে ঢেকে রেখেছেন।
গত ১৭ আগস্ট দুপুর ১২ টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আমিনবাজার ল্যান্ডফিলের কয়েকটি স্থান ঘুরে অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও মানুষের দুর্ভোগের এই চিত্র দেখা গেছে।
মধুমতি এলাকায় ল্যান্ডফিলের একটি স্থানে গিয়ে দেখা যায়, ভেতরে পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কারের কাজ করছে। রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে আসা সিটি করপোরেশনের থেকে বর্জ্য সেখানে ফেলা হচ্ছে। ওই স্থানে ঢুকতে চাইলে দায়িত্বরত আনসার সদস্যরা এই প্রতিনিধিকে আটকে দেন এবং বলেন, ‘সিটি করপোরেশন অনুমতি ছাড়া ভেতরে প্রবেশ করা যাবে না।’
ল্যান্ডফিলের ভাগাড় পাহারা দেওয়ার কাজের বিষয়ে জানতে চাইলে উজ্জ্বল নামের এক আনসার সদস্য বলেন, ‘এখানে কাজ করতে আমাদের কষ্ট হচ্ছে। দশ মাস ধরে এখানে কাজ করছি। বড় স্যাররা আসে, আবার ভিজিট করে চলে যায়। এখানে কাজ করে আমরা শ্বাসকষ্ট ও অ্যালার্জিতে আক্রান্ত হচ্ছি।’

ল্যান্ডফিলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা শরীফ নামের একজন বলেন, ‘এটি বিশাল জায়গা নিয়ে গড়ে উঠেছে। আগে এখানে কৃষি জমি ছিল। কিন্তু ময়লা ফেলার কারণে অধিকাংশ জমি এখন অনুর্বর হয়ে গেছে। জমিতে এখন আর ফসল হয় না। এখানে যখন ল্যান্ডফিলের কাজ শুরু করা হয়েছিল তখন শুনছিলাম, এই বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে করে গ্যাস তৈরি করবে। কিন্তু এখন তেমন কোনো উদ্যোগ দেখছি না।’
আমিনবাজারের মধুমতি মডেল টাউন এলাকার কামাল বলেন, ‘আমার বাসা মধুমতি বাজারের কাছে মধুমতি হাউজিংয়ে। বাসায় যেতে হলে এই পথ দিয়ে যেতে হয়। কিন্তু দুর্গন্ধের কারণে এখান দিয়ে যাতায়াত করতে কষ্ট হয় । দুর্গন্ধে অনেক সময় বমি চলে আসে।’
স্থানীয় এক চায়ের দোকানদার বলেন, ‘আমার দোকানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ময়লা ফেলতে আসা গাড়ির ড্রাইভার ও কর্মীরা এসে খাবার খায় এবং আড্ডা দেয়। তারা প্রায়ই এই এলাকার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিয়ে সমালোচনা করে। অতিরিক্ত রোদ এবং ঠান্ডা পড়লে মাঝেমধ্যে আমার শ্বাসকষ্ট হয়।’
এই ল্যান্ডফিলে প্রায়ই ঢাকা থেকে ময়লাবাহী গাড়ি নিয়ে আসে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের একজন চালক। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রথম প্রথম এখানে আসতে কষ্ট হতো। এখানে আসার কারণে দুর্গন্ধে যেমন সমস্যা হয় তেমন ময়লা-আবর্জনা শরীরে লেগে যাওয়ায় চর্মসহ নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হচ্ছি। তবুও এটা পেশা। তাই বাধ্য হয়ে এখানে কাজ করছি।’
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের একদল গবেষক ‘ঢাকা ল্যান্ডফিল ওয়াস্ট প্র্যাকটিস: অ্যাড্রেসিং আরবান পলিউশন অ্যান্ড হেলথ হেজার্ডস’ শিরোনামের গবেষণা করেন। ২০২১ সালে এটি ‘বিল্ডিংস অ্যান্ড সিটিস জার্নালে’ প্রকাশিত হয়। এতে মাতুয়াইল ও আমিনবাজার ল্যান্ডফিল দুটি জনবসতি, জলাশয় এবং কৃষিভূমির অত্যন্ত কাছে অবস্থিত বলে উল্লেখ করা হয়। আর এ কারণে স্থানীয় লোকজন শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগ এবং পেটের পীড়ার সমস্যায় ভুগছেন বলে তথ্য উপস্থাপন করা হয়। ল্যান্ডফিলের বিষাক্ত তরল ভূগর্ভস্থ পানি ও মাটি দূষিত করছে, যা মৎস্য চাষ এবং কৃষিকাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এ ছাড়া বর্জ্য পোড়ানোর ধোঁয়া এবং তীব্র দুর্গন্ধ ও বায়ুদূষণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সালে প্রায় ৫৫ একর কৃষিজমি ভরাট করে গড়ে তোলা হয় আমিনবাজার ল্যান্ডফিল। রাজধানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চাপ সামাল দিতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়। শুরুতে এটি ছিল অস্থায়ী সমাধান। কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই বাড়তে থাকে বর্জ্যের স্তূপ। এতে ছড়িয়ে পড়তে থাকে দুর্গন্ধ, বদলে যেতে থাকে আশপাশের পরিবেশ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৭ সালেই শেষ হয়ে যায় এই ল্যান্ডফিলটির ধারণক্ষমতা। তবুও থেমে থাকেনি বর্জ্য ফেলা। কোনো আধুনিকায়ন এবং সম্প্রসারণ ছাড়া ৫০০ ট্রাকে করে নিয়ে আসা প্রায় সাড়ে তিন হাজার টন বর্জ্য প্রতিদিন এখানে ফেলছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)।
জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের এক গবেষণার ফলাফলে বলা হয়েছে, ঢাকার আমিনবাজার ও মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল থেকে প্রতিবছর ৫০ হাজার টন মিথেন গ্যাসের নির্গমন হচ্ছে। এ ছাড়া এই বর্জ্য থেকে কার্বন মনোক্সাইড, হাইড্রোজেন সায়ানাইড, মাইক্রোপ্লাস্টিকের মতো বিষাক্ত উপাদন এখানের মাটি ও ভূগর্ভন্থ পানিতে মিশে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, বর্জ্য কিংবা ময়লা-আবর্জনা দুইভাবে সমস্যা সৃষ্টি করে। প্রথমত, বর্জ্যের তীব্র দুর্গন্ধে শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা হতে পারে। দ্বিতীয়ত, ময়লা-আবর্জনা জমে পচে যাওয়ার পর সেগুলোতে জীবাণু তৈরি হয়, যা খাদ্যনালীতে প্রবেশ করলে বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি হতে পারে। এ ছাড়া ময়লা-আবর্জনার সংস্পর্শে আসলে অ্যালার্জিও হতে পারে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) জনসংযোগ কর্মকর্তা (পিআরও) মো. জাকির হোসেন বলেন, ২০১৭ সালে ল্যান্ডফিলের বর্জ্য ধারণক্ষমতা শেষ হয়েছে তা ঠিক। কিন্তু ঢাকা শহরের ময়লা ফেলার আর কোনো জায়গা নেই। তাই বাধ্য হয়ে আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে তা ফেলতে হচ্ছে। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য চীনের একটা কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। তাদের কাজ শেষ হতে আরও সময় লাগবে।
ডিএনসিসির পিআরও জাকির হোসেন আরও বলেন, আমিনবাজার ল্যান্ডফিল থেকে ময়লা-আবর্জনা সরানোর কাজ চলমান। সম্পূর্ণ ময়লা সরাতে এবং স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে আরও ৫-৬ বছর লাগবে।









