শিরোনাম

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী আজ, উদযাপনের শুরু যেভাবে

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী আজ, উদযাপনের শুরু যেভাবে
মসজিদ ও উট। প্রতীকী ছবি

মুসলমানদের কাছে ইসলাম ধর্মের সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর জন্ম ও মৃত্যুর পূণ্যময় দিন। ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের ১২ রবিউল আউয়াল (সোমবার) তিনি আরবের মক্কা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। ৬৩ বছর বয়সে একইদিনে তিনি ইন্তেকাল করেন। আজ বুধবার (২৬ আগস্ট) ঈদে মিলাদুন্নবী। মুসলমানরা দিনটি গভীর আবেগের সঙ্গে পালন করে থাকেন। তবে দিনটি উদযাপনের সূচনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলেমদের মধ্যে মতভেদ চলে আসছে। কেউ মনে করেন, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) নিজেই তার জন্মদিনকে স্মরণ করেছেন। আবার কেউ মনে করেন, এ ধরনের আনুষ্ঠানিক উদযাপন ফাতেমীয়দের সময় থেকে শুরু হওয়া একটি বিদআত।

মিলাদুন্নবী উদযাপনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

মিলাদুন্নবী উপলক্ষে সম্মিলিত জিকিরের আয়োজন, নাত ও কোরআন তিলাওয়াত, মিষ্টি বিতরণ এবং রাস্তা ও বিভিন্ন চত্বর সাজানো হয়ে থাকে।

অনেক ইসলামি পণ্ডিত মনে করেন, মহানবী (সা.)-এর সময় থেকেই দিনটি স্মরণ করার প্রচলন ছিল। কারণ তিনি সোমবার রোজা রাখতেন এবং বলতেন, এই দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি। আরেকটি মত হলো আনুষ্ঠানিকভাবে মিলাদুন্নবী উদযাপনের প্রচলন হয় ফাতেমীয়দের সময় থেকে। তবে ইতিহাসের বিভিন্ন বিবরণ এই ধারণাকে পুরোপুরি সমর্থন করে না।

ফাতেমীয় আমল

প্রচলিত আছে, ৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে মিসরে প্রবেশের পর ফাতেমীয় খলিফা আল-মুইজ লিদিনিল্লাহর শাসনামলে মিলাদুন্নবীর সূচনা হয়।

কিছু ইতিহাসবিদের মতে, মিসরীয়দের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরির অন্যতম উপায় হিসেবে আল-মুইজ লিদিনিল্লাহ মিলাদুন্নবী উদযাপনকে ব্যবহার করেছিলেন। তবে সে সময়ের আয়োজন বর্তমান সময়ের মতো ছিল না। তখন মূলত মিষ্টি ও সদকা বিতরণের মধ্যেই এটি সীমাবদ্ধ ছিলো।আনুষ্ঠানিক উদযাপনের অংশ হিসেবে মানুষ কাজি আল-কুজাতের মিছিলের সঙ্গে অংশ নিত এবং সবাই আল-আজহার মসজিদের দিকে যেত।এরপর বিভিন্ন প্রতিনিধিদল খলিফার প্রাসাদে যেত। সেখানে বক্তৃতা ও খলিফার জন্য দোয়া করার মাধ্যমে সমাপ্ত হতো।

মিলাদুন্নবীর পাশাপাশি ফাতেমীয়রা ইমাম আলী, সাইয়্যিদা ফাতিমা জাহরা এবং তৎকালীন ফাতেমীয় ইমামের জন্মদিনও উদযাপন করত। পরে খলিফা আল-মুস্তালি বিল্লাহর শাসনামলে এসব আয়োজন বাতিল করা হয়।

বর্তমানে শিয়ারা মিলাদুন্নবী উদযাপন করেন। তবে সুন্নিদের তুলনায় তারা ভিন্ন দিনে পালন করেন। শিয়াদের বিশ্বাস, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) রবিউল আউয়াল মাসের ১৭ তারিখে জন্মগ্রহণ করেন।

সুন্নিদের মধ্যে প্রথম মিলাদ উদযাপন

অনেক ইসলাম বিশারদের ধারণা, মিলাদুন্নবী উদযাপন ফাতেমীয়দের চালু করা একটি বিদআত। ফাতেমীয়দের আগে বা পরে আহলে সুন্নতের মধ্যে এর কোনো প্রচলন ছিল না।

তবে ইতিহাসবিদ ও ফকিহ জালালুদ্দিন আস-সুয়ুতির মতে বর্তমানে আমরা যেভাবে মিলাদুন্নবী উদযাপন দেখি, সে ধরনের আয়োজন প্রথম করেছিলেন সালাহউদ্দিন আইয়ুবির সময়কার আরবিলের শাসক বাদশা মুজাফফররুদ্দীন আবু সাঈদ কৌকরী। তার মিলাদুন্নবী উদযাপনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন ইবনে কাসির, হাফেজ আজ-জাহাবি, সিবত ইবনে আল-জাওজি ও ইবনে খাল্লিকান।

ইবনে কাসির তার আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে মুজাফফর সম্পর্কে লিখেছেন, তিনি ছিলেন দানশীল, মর্যাদাবান ও মহান শাসকদের একজন। তার অনেক ভালো কাজ ছিল এবং তিনি একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। তিনি রবিউল আউয়াল মাসে মহানবী (সা.)-এর জন্ম উপলক্ষে বড় ধরনের আয়োজন করতেন।

আয়োজনের ধরন সম্পর্কে সিবত ইবনে আল-জাওজি বলেন, কোনো এক মিলাদে মুজাফফরের পক্ষ থেকে খাবারের বিশাল আয়োজন দেখেছেন। এমন এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, সেখানে ৫ হাজার ভেড়ার মাথা ভুনা, ১০ হাজার মুরগি, ১ লাখ বাটিতে খাবার এবং ৩০ হাজার প্লেট মিষ্টি পরিবেশন করা হয়েছিল।

মিলাদে তার কাছে বিশিষ্ট আলেম ও সুফিরা উপস্থিত হতেন। তিনি তাদের উপহার দিতেন এবং অর্থ-সম্পদ দান করতেন। সুফিদের জন্য দুপুর থেকে ভোর পর্যন্ত সামা বা ধর্মীয় সংগীতের আয়োজন করতেন। নিজেও তাদের সঙ্গে নৃত্যে অংশ নিতেন।

মুজাফফরের মিলাদুন্নবীর আয়োজন সম্পর্কে আজ-জাহাবি বলেন, সে সময় ইরাক ও জাজিরা অঞ্চল থেকে তার কাছে মানুষ আসত। তার এবং তার আমিরদের জন্য কাঠের তৈরি গম্বুজ বা প্যাভিলিয়ন স্থাপন করা হতো এবং সেগুলো সাজানো হতো। সেখানে বাদ্যযন্ত্র ও বিভিন্ন বিনোদনের আয়োজন থাকত। এ আয়োজন কয়েক দিন চলত। বিপুলসংখ্যক গরু, উট ও ভেড়া জবাই করে খাবার রান্না করা হতো। সুফিদের জন্য একাধিক পোশাকের সেট প্রস্তুত করা হতো। মাঠে ধর্মীয় বক্তারা বক্তব্য দিতেন। এ উপলক্ষে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হতো।

উসমানীয় শাসনামলে মিলাদুন্নবী উদযাপন

উসমানীয় খেলাফতের সময়ও মিলাদুন্নবী উদযাপন করার ইতিহাস পাওয়া যায়। মুসলমানদের পরিচিত বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব ও উপলক্ষের প্রতি উসমানীয় সুলতানরা বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে কোরআন তিলাওয়াত করা হতো। এরপর মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মকাহিনি পাঠ করত। পরে মহানবীর (সা.) ওপর দরুদ পাঠের জন্য দালায়িলুল খায়রাত গ্রন্থ পাঠ করা হতো। এরপর কয়েকজন শায়খ জিকিরের আসরে বসতেন। নাত ও ধর্মীয় সংগীত পরিবেশনকারীরা নাশিদ পাঠ এবং নবীজির (সা.) ওপর দরুদ পাঠের ধ্বনি উঠত।

এসব আয়োজন হতো রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখের আগের রাতে। আর মিলাদুন্নবীর দিন সকালে রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা সুলতানকে শুভেচ্ছা জানাতে আসতেন।

মিলাদুন্নবী উদযাপন নিয়ে ফিকহি মতভেদ

মিলাদুন্নবী উদযাপন নিয়ে ফকিহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ মিলাদুন্নবী পালনের পক্ষে, আবার কেউ বিপক্ষে।

কিছু ফকিহ মনে করেন, এ ধরনের আয়োজন বিদআতে হাসানাহ। যা ভালো বা প্রশংসনীয় বিদআতের অন্তর্ভুক্ত। কারণ এর মাধ্যমে মহানবীর (সা.) মর্যাদা প্রকাশ এবং তার জন্মে আনন্দ ও খুশি প্রকাশ করা হয়। এসব আলেমের মধ্যে রয়েছেন ইমাম সুয়ুতি, ইবনে হাজার আল-আসকালানি, সাখাওয়ি, ইবনে আবেদিন, শামসুদ্দিন ইবনে আল-জাজারি, ইমাম নববী ও কাস্তাল্লানি।

অন্যদিকে, যারা মিলাদুন্নবীর আয়োজনের বিরোধিতা করেছেন, তাদের অন্যতম ছিলেন ইবনে তাইমিয়া, আশ-শাতিবি ও তাজুদ্দিন আল-ফাকিহানি। তাদের মতে, মিলাদুন্নবী উদযান এমন একটি বিদআত। এটা পূর্ববর্তী আলেমরা পছন্দ করেননি এবং পালনও করেননি।

বর্তমানেও আলেমদের মধ্যে মিলাদুন্নবী পালন নিয়ে মতভেদ রয়েছে। বিশেষ করে সালাফি ও সুফিদের মধ্যে। কখনো কখনো এ মতভেদ তাকফির বা কাউকে কাফের ঘোষণার পর্যায়েও পৌঁছে যায়।

সুফি তরিকা ও গোষ্ঠীগুলো মিলাদুন্নবী উদযাপনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। অন্যদিকে সালাফিরা মনে করেন, মিলাদুন্নবী উদযাপন একটি বিদআত।

সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি আবদুল আজিজ ইবনে বাজের মতে, শরিয়তে মিলাদুন্নবী উদযাপনের পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। কামহানবী (সা.) নিজে এটি উদযাপন করেননি এবং সাহাবিরাও তা করেননি। তাই তার মতে, এটি একটি বিদআত।

সূত্র: আরবি পোস্ট